এই পোস্টটি 91 বার দেখা হয়েছে
সল্টেড ব্রেড অবলম্বনে কাহিনীর বক্তা: জ্যাজিক বুনিয়াটিয়ান
অনেকদিন পর আমরা সবাই একটি স্থানে মিলিত হলাম। মিলিত হওয়ার পর সম্মিলিত কীর্তন করলাম এবং বহু দিন পর অনেক আইটেমের প্রসাদ। পেট ভরে খেলাম। কিন্তু সবার হৃদয়ে একটি গভীর শোকের ছায়া শচীসূতের জন্য তখনও ছিল। কিন্তু এসব ভুলে তবুও সবাই চেষ্টা করছিল কৃষ্ণ সেবার আনন্দে নিজেদের নিয়োজিত করতে। সবার হৃদয় তখনও কাঁদছিল। খুব শীঘ্রই ভগবানের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দয়ানবিশ দেবী দাসীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি জেলে থাকার সময়ই সে ভক্ত হয়েছিল। তার সঙ্গে বিবাহ হওয়ার আগে আমি মনে মনে পণ করেছিলাম যে, ‘আমি আমার প্রিয় বন্ধু শচীসূতের জন্য কিছু করতে চাই। তাই আমি বিবাহ করার পরিকল্পনা করে আমার সন্তানের নাম ‘শচীসূত’ রাখতে চাই। যাতে করে সারা জীবন শচীসূতকে স্মরণ করতে পারি। তাই কৃষ্ণের ব্যবস্থাপনায় দয়ানবিশের সাথে বৈদিক বিবাহ হয়। আমাদের বিয়ে হয় ১৮মে ১৯৮৮তে। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ তে আমাদের একটি পুত্র সন্তান হয় যার নাম রাখি ‘শচীসূত’।
একদিন ব্রহ্মানন্দ পুরী আমার কাছে একটি টেপ রেকর্ডার নিয়ে আসে। ভক্তরা যখন জর্জিয়াতে হরিনাম সংকীর্তন করছিল তখন আচমকা একজন লোক এসে বলল, সে জেলে আমাদের ভক্তদের সঙ্গে ছিল। সে তখন বিস্তারিত বর্ণনা করছিল। ভক্তরা তখন তার কথা টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করছিল। পরে তিনি বলেছিলেন শেষ তিন মাস প্রিজন হাসপাতালে এমন একজন ভক্তের সান্নিধ্য লাভ করেন যা তিনি কখনো ভুলবেন না। তিনি প্রকৃতপক্ষে শচীসূতের কথাই বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, শচীসূত কতটা বিনয়ী ও সুন্দর গুণাবলীর অধিকারী ছিল। এরপর তিনি প্রিজন হাসপাতালের সেই দিনগুলি এবং শচীসূতের মৃত্যুর ঘটনা বর্ননা করছিলেন, “শচীসূত খুব অসুস্থ ছিল এবং তার শারী
রিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে খুব কমই বাথরুমে যেতেন। কিন্তু ঐরকম অবস্থায়ও প্রতিদিন তিনি ১৬ মালা জপ করতেন এবং সবসময় কৃষ্ণ কথা বলতেন। শচীসূতের একটি অদ্বিতীয় গুণ ছিল যে, যে কোন কথাকেই তিনি কৃষ্ণকথায় রূপান্তর করতে পারতেন। শুধুমাত্র আমরা দুজনই একই সেলে থাকতাম এবং শীঘ্রই দুজনে খুব ভাল বন্ধু হয়ে উঠলাম। এমনিতেই আমি কখনো ভগবানকে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু তার সঙ্গ করার পর আমি কৃষ্ণের উপর বিশ্বাস করতে শুরু করি এবং তাকে এ সম্পর্কে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতাম। সে ছিল একজন মহান ভক্ত এবং একজন প্রকৃত কৃষ্ণভক্ত। কিন্তু দিনের পর দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে লাগল এবং কদাচ কোন কিছু খেত। সে সবসময় গার্ডকে বলত প্রতিদিন তাকে শুধুমাত্র একগ্লাস দুধ এবং কয়েকটি সিদ্ধ আলু দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা তাকে সেটিও দিতে অগ্রাহ্য করল। যদিও এটি হাসপাতালের একটি নিয়ম যে, রোগীকে সুষম খাবার দেয়া, গার্ডরা যখন রুটি নিয়ে আসত তাও মাছের সংস্পর্শ লাগত; তাই শচীসূত তা খেতো না এবং সেগুলো আমাকে দিয়ে দিত। আমি তখন খুব লজ্জিত বোধ করতাম যে, তাকে দেওয়া রুটিগুলো আমি খাচ্ছি। যদিও আমি ভালো করে জানতাম তাকে যদি জোরও করি সে খাবে না। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে খেতে হত আর ও অভুক্ত থাকত।
“যে কোনভাবেই হোক সে সবসময় আনন্দে থাকত এবং মোটেই তার শরীরের ব্যথা ও কষ্টগুলো অনুভব করত না। অন্ততপক্ষে সে কখনো দেখাতো না যে, সে কষ্টে আছে। যখনই আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘শরীরের অবস্থা কেমন?’ সে আমাকে প্রচার করা শুরু করত যে আত্মা ও জড় শরীর ভিন্ন। মাঝে মাঝে আমরা একসাথে সেলে মহামন্ত্র গাইতাম। আমি তখন তাকে খুব উৎফুল্ল দেখতাম। তার চোখগুলি অন্য এক ভাব প্রদর্শন করত।
“একদিন সকালে তার একটু ভাল লাগছিল, তখন আমাকে অনুরোধ করল তার মাথা কামানোর জন্য এবং পেছনে এক গুচ্ছ চুল রাখার জন্য। আমি তার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে কোন কিছুই ব্যাখ্যা না করে বলে, “আমি যা বলছি তা দয়া করে কর।”
লোকটি তখন বর্ণনা করছিল কিভাবে সে শচীসূতের মাথা মুড়িয়ে দিল। এরপর শচীসূত বাথরুমে গিয়ে স্নান করল। একটি পরিস্কার বিছানাকে ধুতির মত করে পড়ল। ম্যাগাজিনের কিছু ছেড়া রঙ্গিন পাতা দিয়ে সুতার সাহায্যে একটি মালা তৈরি করে সেটা গলায় পড়ল। টুথপেস্ট দিয়ে সারা অঙ্গে তিলক পড়ল। এরপর শচীসূত পদ্মযোগ আসনে উপবিষ্ট হয়ে রুটির তৈরি সে মালায় জপ করতে লাগল। তার বা হাঁতে ছিল তার গুরুদেব হরিকেশ স্বামীর ছোট একটি ছবি এবং শ্রী পঞ্চতত্ত্বের ছবি। সে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে আর জপ করছে।
তাকে দেখে মনে হচ্ছিল অন্যান্যদিনের চেয়েও আজকে সে খুব খুশি। তখন একজন গার্ড এসে আমাকে সেলের বাইরে নিয়ে গেল আমার দৈনন্দিন ইনজেকশন দেয়ার জন্য। সেখান থেকে সেলে ফিরতে আমার বড় জোড় ২০ মিনিট লেগেছিল। ফিরে এসে দেখি শচীসূত এখনও ঐ জায়গায় বসে আছে এবং মনে হচ্ছিল সে জপ করছিল। একটি ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে আমি তখন বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম সে জপ না করে শুধু মৃদুভাবে হাসছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন জপ না করে সে শুধু মৃদুভাবে হাসছে? কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না। আমি আবারও কয়েকবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম। এরপর তাকে অন্য প্রশ্ন করতে লাগলাম। কিন্তু তখনও সে নীরব। বিছানা থেকে দাড়িয়ে পড়লাম এবং তাকে কাছে এগিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে মৃদুভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “বন্ধু, তুমি কেন হাসছ আর কোন কথা বলছ না?”
তারপর আমি বুঝতে পারলাম সে আর তার শরীরে নেই। যখন সেটি বুঝলাম আমি চিৎকার করতে লাগলাম এবং দিগ্বিদিক কান্না করে চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলাম। আমার চোখ থেকে অনবরত জলের ধারা বেয়ে নামছে। আমি গার্ডকে চিৎকার করে বলছিলাম তারাই এরকম নিস্পাপ একটি ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আমি শচীসূতকে চিনতাম না এবং তোমরা হরেকৃষ্ণ ভক্তদেরকেও আমি চিনি না। ভগবানকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস না করলেও আমি আমার বন্ধু যেভাবে চোখের সামনে মৃত্যুবরণ করেছে আমিও তার মত এরকম মৃত্যু চাই। সে আমার কাছে এক মহান ব্যক্তিত্ব এবং বাকি জীবন আমি তাকেই স্মরণ করতে চাই, সারাটা জীবন সে আমার জন্য অনেক বড় মাপের মানুষ এবং শুদ্ধ ব্যক্তি। টেপ রেকর্ডারে রেকর্ডকৃত সে কথাগুলো শুনে আমি আর আমার স্ত্রী অজোরে কাঁদছিলাম। এই ঘটনার মাধ্যমে কোন সন্দেহ ছিল না যে, শচীসূত ছিল ভগবান কৃষ্ণের একজন মহান ভক্ত। সে জানত তার এ শরীরটি ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে তাই নিজে নিজেই তার জন্য শরীর, মন এবং আত্মাকে প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন। সে ভগবান কৃষ্ণ তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত নিয়েছিলেন। যারা যারা শচীসূতের এ ঘটনা শুনেছে প্রত্যেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। প্রত্যেকেই শচীসূতের ভগবান কৃষ্ণের প্রতি, শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি এবং তার গুরু ও পরম্পরার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও ভক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি নিশ্চিতবাবে ভগবান কৃষ্ণের একজন শুদ্ধ ভক্ত ছিলেন এবং কৃষ্ণ স্বয়ং তার দেখাশোনা করেছিলেন কেননা, তিনি ভগবদ্গীতায় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আমার ভক্তের বিনাশ নেই’। হরে কৃষ্ণ। আগামী সংখ্যায় সল্টেড ব্রেডের শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, মে – ২০১১ইং

