যে জগতে আমরা বাস করি

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 6 বার দেখা হয়েছে

যে জগতে আমরা বাস করি
বিশাখা দেবী দাসী 
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে যথার্থ শিক্ষক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তার যথার্থ ছাত্র অর্জুন অনুরোধ করেছিলেন, এই ঘটনাবহুল জড় জগতকে বিশ্লেষণ করার জন্য। জড় এবং চেতনের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণের উদ্দেশ্যে, জড় প্রকৃতি সম্বন্ধীয় এরূপ জ্ঞান ‘সাংখ্য দর্শন’ নামে পরিচিত। অর্জুনের অনুরোধে তখন ভগবান ২৪টি উপাদান সম্বলিত জড় জগত সম্পর্কে ব্যাখ্যা করলেন। এ সমস্ত উপাদান ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তিজাত, কিন্তু সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভাবে শাশ্বতরূপে বিরাজমান। আমাদের এ জড় জগত এ সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের অস্থায়ী মিলনের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেগুলো ভগবানের সুব্যবস্থাপনায় নিজে নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। কেননা এ উপাদানগুলি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবং প্রতিপালনের জন্য সরবরাহ করে থাকে পরিপূর্ণ সম্পদ। অতএব কেউ যদি এ সমস্ত উপাদান তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে। তবে কেউ নিজেকে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট জড় শক্তির চেয়ে উৎকৃষ্ট চিন্ময় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে এবং কেউ বিজ্ঞানসম্মতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে উভয় শক্তিরই পরম উৎস হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যখন আমাদের চেতনা এই শুদ্ধ স্তরে উপনীত হয়, তখন আমরা এই বিষয়গুলি অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের দূরদর্শিতা এখন মিথ্যা অহংকারের মেঘ দ্বারা আচ্ছাদিত। মিথ্যা অহংকার মানে হল এই দেহকে আমাদের প্রকৃত স্বরূপ বলে মনে করা। এই দেহগত সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আমরা চিহ্নিত করি আমেরিকান, রাশিয়ান, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ; যেগুলি মিথ্যা অহঙ্কারেরই প্রকাশ। আমাদের প্রকৃত অহঙ্কার হল আমরা স্বরূপে চিন্ময়, পরমেশ্বর ভগবানের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু আমরা প্রকৃতপক্ষে চিন্ময় আত্মা, তাই আমাদের সঙ্গে এ জড় শরীর এবং মনের সম্পর্ক এ জড় জগতে স্থায়ী হয় বড়জোর পঞ্চাশ কি একশ বছর। ভগবদ্গীতায় এ জড় দৃশ্যমান শরীরকে তুলনা করা হয়েছে একটি কোটের সঙ্গে এবং মন ও বুদ্ধি নিয়ে গঠিত সূক্ষ্ম শরীরকে তুলনা করা হয়েছে একটি শার্টের সঙ্গে। কিন্তু প্রকৃত ব্যক্তিটি এ দেহগত শার্ট এবং কোট থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জড় দেহকে তার স্বরূপ বলে মনে করাকেই মিথ্যা অহংকার বলা হয় এবং মিথ্যা অহংকার থেকে সৃষ্ট কলুষতার প্রভাবে সে মনে করে যে, জাগতিক সমস্ত আয়োজন এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে সে সুখী হবে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, আমাদের শরীরটি হল সমস্ত বাসনা এবং কার্যক্ষমতার লক্ষণস্বরূপ। এই কারণ হেতু আমরা কাউকে দেখেই তার সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে পারি। বলা হয় যে, মুখ হচ্ছে মনের আয়না। আমরা ভুলে গেছি যে, পূর্বে আমাদের অন্য একটি শরীর ছিল, বর্তমানে এ শরীরটি পেয়েছি এবং বর্তমানের এ শরীরটির বিনাশ হলে আমাদেরকে আরেকটি শরীর গ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে। অন্য কথায় আমাদের বর্তমান শরীরটি এবং কর্মক্ষেত্র হল পূর্ব শরীর এবং কর্মক্ষেত্রেরই প্রতিফলন। যিনি কোন রকম বাছ-বিচার ছাড়াই খাদ্য গ্রহণ করেন পরবর্তীতে তিনি একটি শুকরের দেহ প্রাপ্ত হবেন। কেননা শুকরও অনুরূপভাবে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। যার চেতনা দেবগুণাবলীর দ্বারা ভূষিত, তিনি একজন দেবতার শরীর পাবেন এবং যিনি কৃষ্ণভাবনাময় তিনি পরবর্তীতে কৃষ্ণের আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়ে ভগবানের নিত্য সাহচর্য লাভ করতে পারেন। মৃত্যুর সময়কালীন চেতনা অনুসারে আমাদেরকে পরবর্তী শরীরটি গ্রহণ করতে হয়। আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত পরমাত্মা আমাদের এ সমস্ত কৃতকর্মের সাক্ষীৰূপে রয়েছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “জীব এভাবে অন্য একটি স্থূল শরীর গ্রহণ করে, চক্ষু, কর্ণ, ত্বক, জিহ্বা, নাসিকা ও মনকে আশ্রয় করে ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ উপভোগ করে। (ভ. গীতা-১৫/৯) মনের দিক নির্দেশনার অধীন পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, ত্বক, জিহ্বা, নাসিকা) এবং পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (বাক, হস্ত, পদ, উপস্থ ও পায়ু) পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের বিষয় (রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ) এর সাথে সম্পর্কিত হয়। ফলে ইন্দ্রিয়ের সাথে স্ব বিষয়ের সংস্পর্শের প্রভাবে বাসনা, ঘৃণা, আনন্দ অথবা বেদনা ইত্যাদি অনুভূত হয়। এভাবে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, কেন একজনের খাদ্য, অন্যের জন্য বিষস্বরূপ। মল-মূত্র আমাদের খাদ্য নয়, কিন্তু একটি শুকরের জন্য তা প্রিয় ভোজন। দেহগত এবং মনগত সম্পর্কের কারণে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার আত্মীয়দের সাথে যুদ্ধ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। এজন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে ভগবদ্গীতায় শিক্ষা দিয়েছিলেন চরম সুখ, চিন্ময় সম্পর্ক এবং ২৪টি জড় উপাদানের ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে। যদিও আত্মা সর্বদাই শুদ্ধ, কিন্তু একটি জড় শরীর গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণের ফাঁদে পড়ে যায়। কেননা এই দেহটি ২৪টি জড় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় জীব প্রকৃতির আইনানুসারে আচরণ করে। প্রকৃতিই ঐ উপাদানগুলোর পরিচালক। বদ্ধ জীবের ঐ সমস্ত আইন পরিবর্তন করার কোন শক্তি নেই। ধরুন, জীব যদি একটি কুকুরের শরীর প্রাপ্ত হয় তবে তাকে অবশ্যই একটি কুকুরের মত আচরণ করতে হবে, তাকে অবশ্যই তার ভোকাল কর্ড দিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে হবে, তাকে একটি কুকুরের উপযুক্ত খাবার খেতে হবে। একইভাবে মনুষ্য জীবও মনের দিকনির্দেশনার অধীনে, বাধ্য করা হয় প্রকৃতির আইনানুসারে ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলোকে গ্রহণ করা অথবা প্রত্যাখ্যান করা। পশু এবং মানুষের মধ্যে তফাৎ হল যে, মানুষের রয়েছে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা, যার মাধ্যমে আমাদের স্বরূপ হল চিন্ময় আত্মা, ভগবানের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ এ উপলব্ধি হবে। আমরা এ জড় জগতের সকল প্রকার বিষম পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে পারে যখন যে আন্তরিকতার সাথে ভগবান কৃষ্ণের একনিষ্ঠ প্রতিনিধির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং তা অনুসরণ করতে পারে। এই হল কৃষ্ণভাবনা দর্শনের সারাতিসার তত্ত্ব। কৃষ্ণ স্বয়ং তা প্রতিপন্ন করেছেন যে, “আমার এই দেবী শক্তি (জড়া শক্তি) অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু যারা আমাতে প্রপত্তি করেন তাঁরাই এটি খুব সহজেই উত্তীর্ণ হতে পারেন।” (ভগবদ্গীতা-৭/১৪)

আবার ভগবদ্গীতায় এটিও বলা হয়েছে-

উৎক্রামন্তং স্থিতং বাপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্।
বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ ॥
অনুবাদ : মূঢ় লোকেরা দেখতে পায় না কিভাবে জীব দেহ ত্যাগ করে অথবা প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিভাবে তার পরবর্তী শরীর সে উপভোগ করে। কিন্তু জ্ঞান চক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তিগণ সমস্ত বিষয় দেখতে পান। শ্রীল প্রভুপাদ এর তাৎপর্যে ব্যাখ্যা করেছেন,- “প্রতিটি জীবই কোন বিশেষ অবস্থায় তার শরীর ত্যাগ করছে। কোন বিশেষ অবস্থায় সে জীবন ধারণ করছে এবং জড়া প্রকৃতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সে বিশেষ অবস্থায় ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার চেষ্টা করছে এবং পরিণামে সে নানা রকমের সুখ ও দুঃখ ভোগ করছে। যারা অনন্তকাল ধরে কাম ও বাসনার দ্বারা মোহিত হয়ে আছে, তারা কেন এক বিশেষ দেহে অবস্থান করছে এবং কেনই বা সেই দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহে দেহান্তরিত হচ্ছে তা উপলব্ধি করার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলে। সেটি তাদের বোধগম্য হয় না। কিন্তু যাঁর হৃদয়ে দিব্যজ্ঞানের প্রকাশ হয়েছে, তিনি দর্শন করতে পারেন যে, আত্মা দেহ থেকে ভিন্ন এবং সর্বদাই তাঁর দেহের পরিবর্তন হচ্ছে এবং চিন্ময় স্বরূপে তাঁর আত্মা নিত্য আনন্দ অনুভব করছে। এই জ্ঞান যিনি প্রাপ্ত হয়েছেন, তিনিই বুঝতে পারেন, কিভাবে বদ্ধ জীব এই জড় জগতে দুর্দশা ভোগ করছে। সুতরাং, কৃষ্ণভাবনায় উন্নতি সাধনের ফলে যাদের চেতনা খুব উন্নত হয়েছে, তাঁরা জনসাধারণকে এই জ্ঞান দান করার জন্য যথাযোগ্য চেষ্টা করেন, কারণ বদ্ধ জীবের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা দেখে তাঁরা মর্মাহত হন। বদ্ধ জীবের অবস্থা অত্যন্ত ক্লেশদায়ক, তাই তাদের কর্তব্য হচ্ছে এই বদ্ধ অবস্থা অতিক্রম করে কৃষ্ণচেতনা লাভ করা এবং জড় জগতের বন্ধন থেকে নিজেদের মুক্ত করে অপ্রাকৃত জগতে প্রত্যাবর্তন করা।
হরে কৃষ্ণ।

মাসিক চৈনত্য সন্দেশ-অক্টোবর-২০১১ ইং

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।