এই পোস্টটি 119 বার দেখা হয়েছে
সল্টেড ব্রেড অবলম্বনে কাহিনীর বক্তা: জ্যাজিক বুনিয়াটিয়ান
জেল থেকে বের হওয়ার এক মাস আগে তারা আমার চুল বড় করার অনুমোদন দিল। আমি ক্যালেন্ডারে প্রতিদিন তারিখ ফুটো করতে লাগলাম। তারা যেকোন কারণবশতঃ নির্ধারিত সময়ের দু’দিন আগে আমাকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করল। মুক্তির দিন (জানুয়ারি ২২,১৯৮৮) সকালে আমি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এই কালো বদ্ধ স্থান থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। জেলের সবাই আমাকে এসে অভিনন্দন জানতে লাগল। ‘হরে কৃষ্ণ’ বলে আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। অবশেষে তারা আমার নাম স্পীকারে ডাকলে আমি এ ভয়ংকর স্থান চিরদিনের জন্য ছাড়তে প্রস্তুত হলাম। আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমি মুক্ত হতে যাচ্ছি। অফিসে পৌছে তারা আমার পুরাতন কাপড় চোপড় দিল ও সঙ্গে কিছু টাকাও দিল। গার্ডরা সবাই মৃদু হাসছিল এবং বলছিল” এখানো আর কখনো ফিরে আসবে না”। বের হওয়ার সময়ে আমার অনুভূতি কেমন ছিল আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। নিজেকে তখন সাত বছরের ছেলে মনে হচ্ছিল। বের হয়ে খুব দৌড়াতে থাকলাম, চারদিকের বরফে লাথি মারছিলাম, এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিলাম চিৎকার করে হাসছিলাম আর কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে চিৎকার করছিলাম।
কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, “হে কৃষ্ণ, আমি এখন মুক্ত এবং আমি চিরকাল তোমার সেবা করব কেননা তুমিই হলে আমার একমাত্র প্রভু। তুমি আমার প্রতি কিরকম কঠোর হয়েছিলে সেটি কোন ব্যাপার নয়। তবুও আমি তোমার সেবক। তোমাকে ধন্যবাদ, কৃষ্ণ আমাকে রক্ষা করার জন্য ও প্রতিপালন করার জন্য, হরে কৃষ্ণ। কিন্তু কৃষ্ণ অনুগ্রহ করে আমাকে আর এই নরকে নিয়ে এসো না।
আমি ক্যাম্পের পাশেই একটি হোটেলে দু’দিনের জন্য উঠলাম প্রতিদিন সেই হোটেল থেকে ক্যাম্পের সেই ভয়ংকর কালো দেয়ালগুলো দেখতাম। কী ভয়ানক ছিল সেই দিনগুলি। আমার তখন বিশ্বাসই করতে কষ্ট হত যে, আমি বাইরে থেকে ঐ ভয়ানক স্থানটি দেখছি, যেখানে কয়েকদিন আগেও আমি কাটিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে ভয় হত যে, যদি তাদের মন পরিবর্তন করে আমাকে আবার খোঁজ করে। একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে চিৎকার করে তখন বলতে ইচ্ছে করে, হে মানুষ, জীবন অনেক কষ্টের কিন্তু তবুও তো তোমরা মুক্ত, এটিকেই গ্রহণ কর। পরে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। আমাকে দেখে বাবা- মা, আত্মীয় স্বজনদের সে যে কি আনন্দ, তাদের প্রতি আমার প্রথম প্রশ্নবোধক বাক্যটি ছিল “শচীসূত জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সে কোথায় তারা সে বিষয়ে কিছু জানে কিনা?” তারা বিষয়টি এড়িয়ে চলল, যা আমার কাছে কেন জানি অদ্ভুদ মনে হল।
মা আমাকে প্রতিদিন ইচ্ছেমত সবজি ভিটামিনসহ অনেক খাবার খাওয়াতে লাগল আমার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু অনেকদিন অভুক্ত থাকতে থাকতে আমার পাকস্থলী ছোট হয়ে গিয়েছিল তাই এসব খাবার খুবই অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নাছোড়বান্দা মা আমার উপর রীতিমত জোরই খাটাতে লাগল। কয়েকদিন শচীসূতকে বিভিন্ন জায়গায় খোজ করার পর একদিন শচীসূতের বাড়িতে ফোন করতে চাইলে মা বাধা দেয়। টেনে নিয়ে একটি কক্ষে বসায়। মা তখন কাঁদতে শুরু ককরে। বাবা তাকে থামানোর চেষ্টা করে। কিছু বুঝতে পারছিলাম মা তখন কাঁদছিল কেন? আমার খুব নার্ভাস লাগছিল।
ঠিক সে সময় আমার ছোট ভাই সস্ত্রীক মাকে সান্ত্বনা দিয়ে সব খুলে বলতে বলল। মা তখন ধীরে ধীরে বলছিল, এক মাস আগে শচীসূত জেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং সে জেলে মারা যায়”। এটি শোনার পর ঐ সময় আমার কি হয়েছিল ঠিক মনে নেই। কিন্তু সোফাতে আমি অচেতন হয়ে পড়ে রইলাম। যখন আমার মুখে কিছু জল ছিটকে দেয়ার পর আমি চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। সবাই যার যার মত চেষ্টা করছিল আমাকে থামাতে কিন্তু আমি তখন ভিন্ন এক জগতে চলে গেলাম। যে জগতটি ছিল প্রচণ্ড ব্যাথা, কষ্টের আর বিচ্ছেদ বিরহের। কিছুক্ষণ পর চেতনা ফিরে এলে আবারও বিরতিহীনভাবে প্রচণ্ড কান্না করছিলাম। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার বন্ধু আর নেই। KGB এর কাছ থেকে এটি সবচেয়ে ব্যাথাজনক লাথি। সে দিন থেকে। আমার সেসব ঘৃণ্য লোকদের জন্য ক্রোধ আর বিষে পূর্ণ হল। আমার মনে হচ্ছিল KGB যেন আমার বুকে বুলেট বিদ্ধ করেছে।
বাকুর জেলে শচীসূতের সঙ্গে পৃথক হওয়ার দৃশ্য সহ তার সঙ্গে শেষ দিনগুলোর কথা খুব মনে হচ্ছিল। আমি তার মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। বার বার বলছিলাম,” এর মানে ওরা আমার ভাইকে (শচীসূত) মেরে ফেলেছে। ওরা আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। ওরা আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে মেরে ফেলেছে! আমি তাকে আর কখনো দেখবো না। ওহ! কি ভয়ানক।”
কিছুক্ষণ পর আমি তার বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটে গেলাম, সাথে আমার মা-বাবারাও সেখানে যায়। সেখানে পৌঁছতেই দেখি দরজার সামনে কালো পতাকা। কেউ মারা গেলে এটি ঝুলানো হয়। দরজা খুলতেই পরস্পরকে দেখে সে প্রচণ্ড কান্না। আমি ওদের কালো পোশাক দেখে দরজার সামনেই জ্ঞান হারালাম। পরে চেতনা ফিরেই শুনি শচীসূতের মারা যাওয়ার কাহিনী। ক্যাম্পের হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল শচীসূতকে দেখতে যাওয়ার জন্য কেননা সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
তার বাবা- মা সেখানে গেলে তাকে অনেক জোর করে কিছু খাওয়ার জন্য কিন্তু শচীসূত তাদের বলল সে পাকস্থলীর ক্রনিক (Chronic) সমস্যায় ভুগছে সে কিছু খেতে চাইল না। সে তখন যক্ষ্মা, সারা রাত কাঁশি ইত্যাদি রোগে ভুগছিল। তিন দিন পর তারা হাসপাতাল থেকে শচীসূতের আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। পরে ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ তার মৃত্যু হয়। তার ছাড়া পাওয়ার সময় ছিল ২২জানুয়ারি। মাত্র ২৩দিন আগেই তার করুন মৃত্যু হল।
শচীসূতের এ মৃত্যু বুকে যে কি প্রচন্ড যন্ত্রণা, ব্যথা হচ্ছিল তা কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। হরে কৃষ্ণ!
[ আগামী সংখ্যায় শচীসূতের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ কাহিনী প্রকাশ করা হবে ]
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, এপ্রীল – ২০১১ইং
