শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩:১৮ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩:২৩ অপরাহ্ণ

এই পোস্টটি 86 বার দেখা হয়েছে

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী

শ্রীমৎ গৌর গোবিন্দ স্বামী মহারাজ

১৯৯৩ সালের ৩১ আগস্ট সর্বত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব উৎসব পালন উপলক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে বহু লেখা বিভিন্ন খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময় উড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত সমাজ, নামক খবরের কাগজে এক বেদ অনুধ্যানের একজন সদস্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তার কিছু অংশ। এখানে ব্যক্ত করা হলো। উক্ত খবরের কাগজে তিনি লিখেছিলেন, ‘কৃষ্ণের জন্য ও কর্ম সম্বন্ধে যে সব কথা শাস্ত্রে লেখা আছে তা সব কল্পনা-প্রসূত, বাস্তব সত্য নয় ইত্যাদি। আহা! আধ্যক্ষিকদের কি বিচার।’ এ সব লেখা দেখে বাস্তবিকপক্ষে খুব দুঃখ লাগে। শ্রীমদ ভাগবতাদি শাস্ত্রগুলিতে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও কর্ম (লীলা) সম্বন্ধে যা লেখা আছে, তা সব বিশুদ্ধ সত্য। তাতে কিছু ভুলভ্রান্তি নেই। তা বিশুদ্ধ প্রমাণমূলক লেখা, তা কল্পনাপ্রসূত নয়। কিন্তু মূর্খ ব্যক্তি বা অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিরা সেই সব কথা বুঝতে পারে না।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন

নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়াসমাবৃতঃ।

মুঢ়োহয়ং নাভিজানাতি লোকো মামজমব্যয়ম্। (গী:৭/২৫)

অর্থাৎ “আমি নির্বোধ ও বুদ্ধিহীন ব্যক্তিদের কাছে কখনও প্রকাশিত হয় না। তাদের কাছে আমি আমার অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়ার দ্বারা আবৃত থাকি। তাই, তাঁরা আমার জন্ম মৃত্যুরহিত অব্যয় স্বরূপকে জানতে পারে না।” আবারও শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ভগবান বলেছেন-

অবজানন্তি মাং মুঢ়াঃ মানুষীং তনুমাশ্রিতম্।

পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্। (গীঃ৯/১১)

অর্থাৎ “আমি যখন মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হই, তখন মূর্খেরা আমাকে অবজ্ঞা। করে। তারা আমার পরম ভাব সম্বন্ধে অবগত নয় এবং তারা আমাকে সর্বভূতের মহেশ্বর বলে জানে না।”

মূর্খ ব্যক্তি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তার মতো একজন মানুষ বলে মনে করে থাকে। পূর্ব জন্মের পূণ্যকর্মের ফলস্বরূপ এ জন্মে সেই ব্যক্তি অর্থাৎ বেদ গবেষণাকারী পণ্ডিত অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করতে পারেন, কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে তার ধারণা স্বল্প জ্ঞানের পরিচায়ক। এজন্য ভগবান কৃষ্ণ তাকে মূঢ় বলে অভিহিত করেছেন, কারণ মূর্খরাই কেবল শ্রীকৃষ্ণকে একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে করে তাকে। তারা একথা জানে না যে, শ্রীকৃষ্ণের শরীর পূর্ণ জ্ঞান ও আনন্দের প্রতীক, তিনি সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মালিক এবং তিনি সকলকে মুক্তি প্রদান করতে পারেন। উপরন্তু তারা একথাও জানে না যে, পরম পুরুষ ভগবানের আবির্ভাব এ ভৌতিক জগতে কেবল তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির পরিপ্রকাশ। তিনি হচ্ছেন ভৌতিক শক্তির প্রভু। মূর্খরা একথাও বুঝতে পারে না যে, পরমপুরুষ ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ একজন সাধারণ মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হয়ে কেমন করে একটি ক্ষুদ্র অণু থেকে আরম্ভ করে বিরাট বিশ্বরূপের নিয়ন্ত্রণকারী হতে পারেন। সর্ববৃহৎ ও সর্বক্ষুদ্রের ধারণা মূর্খদের ধারণার বহির্ভূত। শ্রীকৃষ্ণ যখন এ ধরাধামেতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তিনি যে সকল আশ্চর্যজনক কার্যকলাপ প্রদর্শন করেছিলেন, তা কোনও মানবের পক্ষে প্রদর্শন করা কখনই সম্ভব নয়। যখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতামাতা বসুদেব ও দেবকীর সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তিনি চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কিন্তু পিতামাতার প্রার্থনা শোনার পর তিনি নিজেকে একজন সাধারণ শিশুরূপে পরিবর্তন করেছিলেন। এটা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব কি? যেহেতু সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব নয়, তাই আধ্যাক্ষিক (মূঢ়) রা বলে থাকে এটা কল্পনাপ্রসূত। তারা ভগবান ও তাঁর লীলা বুঝতে পারে না। ভগবান ও তাঁর লীলা কেমন করে তত্ত্ব বিচারানুসারে বুঝতে হয়, তা আমরা আলোচনা করবো।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৪/৯) ভগবান বলেছেন

-জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

ত্যত্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।

অর্থাৎ-“হে অর্জুন, যিনি আমার জন্ম (আবির্ভাব) ও কর্মের বিশুদ্ধভাবে যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর এ শরীর ত্যাগ করার পর পুনরায় এ ভৌতিক জগতে তিনি জন্মগ্রহণ করতে হয় না, আমার দিব্য শাশ্বতধাম প্রাপ্ত হন।”

যিনি পরমপুরুষ ভগবানের আবির্ভাব তত্ত্ব বুঝতে পারেন তিনি ভৌতিক বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে যান। বেদে বর্ণিত হয়েছে, “তম্ এব বিদিত্বাদি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।” কেবল পরমপুরুষ ভগবানকে জানতে পারলেই সে ব্যক্তি জন্ম-মৃত্যু চক্র থেকে মুক্ত হয়ে যান এবং মুক্তির সর্বোচ্চ স্তরে উপস্থিত হন। এ ছাড়া আর অন্য কোনও পন্থা নেই।যে ব্যক্তি কৃষ্ণকে পরম পুরুষ ভগবান হিসাবে জানে না সে নিশ্চিতভাবে তমোগুণাচ্ছন্ন হয়েছে বলে বুঝতে হবে। যার ফলে সে মুক্তিলাভকরতে পারে না। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (৪৯) শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যিনি আমার জন্ম ও কর্মের প্রকৃত তত্ত্ব জানতে পারেন কেবল তিনিই আমাকে বুঝতে পারেন ও মুক্তিলাভ করতে পারেন।

তবে প্রশ্ন হতে পারে ভগবৎ তত্ত্ব জানার বা ভগবানকে জানার উপায়টা কি?

শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব সম্বন্ধে বলা হয়েছে-ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেবকীর গর্ভে প্রবিষ্ট হওয়ার পূর্বে শ্রীবলদেব প্রথমে দেবকীর গর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/১/২৪) বলা হয়েছে-

বাসুদেবকলানন্তঃ সহস্রবদনঃ স্বরাষ্ট্র।

অগ্রতো ভবিতা দেবো হরেঃ প্রিয়চিকীর্ষয়া ॥

অর্থাৎ “ভগবান বাসুদেবের প্রথম অংশ (প্রকাশ বিগ্রহ) শ্রীসঙ্কর্ষণ, দেশ কাল ও সীমাদি রহিত বলে ‘অনন্ত’ নামে কীর্তিত; নানা অবতারসমূহের প্রকটকারী বলে যিনি অংশে শেষাখ্য সহস্রবদন, সেই স্বতঃপ্রকাশ স্বয়ং মূল সঙ্কর্ষণ বলদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবনেচ্ছায় আগেই আবির্ভূত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেবকীর গর্ভে প্রবিষ্ট হবেন বলে শ্রীবলদেব দেবকীর গর্ভে প্রবিষ্ট হয়ে শয্যাসন রূপ নিজের অংশ শেষকে সেখানে স্থাপন করে স্বয়ং নিজের মাতা দেবকীর গর্ভে প্রবিষ্ট হলেন।

উক্ত বিষয় হতে জানা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের কথা বুঝতে হলে প্রথমে শ্রীবলদেবকে জানতে হবে। শ্রীবলদেবের কৃপা ছাড়া কেউ শ্রীরাধাগোবিন্দের কৃপা লাভ করতে পারে না শ্রীরোহিনীনন্দন বলদেবই সাক্ষাৎ শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু আর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর অভিন্ন প্রকাশ বিগ্রহ হচ্ছেন গুরুদেব। সেই গুরু কৃপা ছাড়া হৃদয় কখনই নির্মল হয় না।শ্রীবলদেবই সন্ধিনী শক্তির ঈশ্বর রূপে জীবকে কৃষ্ণ-পাদপদ্মের সন্ধান প্রদান করেন। শ্রীবলদেবের কৃপাবল ছাড়া জীব নিজের শক্তিতে কখনই ‘দূরত্যয়া’ মায়াকে জয় করে মায়াধীশ কৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করতে পারে না।অতএব কৃষ্ণাবির্ভাব বিষয় শ্রীবলদেবের কৃপাই আমাদের একমাত্র সম্বল। শ্রীবলদেবের অভিন্ন প্রকাশ বিগ্রহ শ্রীগুরুদেবই হচ্ছেন সেই বলদেবকূপা প্রদাতা।ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন অখিল রসামৃত মূর্তি। তাঁর অপ্রাকৃত সেবারসের আশ্রয় বিগ্রহজনের (অর্থাৎ প্রেমিক ভক্ত বা শ্রীগুরুদেবের) আনুগত্য ব্যতীত কেউ কৃষ্ণ-পাদপদ্মের প্রকটোৎসবে যোগদানের সৌভাগ্য লাভ করতে পারে না। সুতরাং তাই আশ্রয় বিগ্রহের কৃপা (অর্থাৎ শ্রীগুরুদেবের কৃপা) আমাদের একমাত্র উপায়।

নিত্যলীলায় প্রবিষ্ট ইসকনের আচার্য শ্রীমৎ গৌরগোবিন্দ স্বামী মহারাজের প্রবচন থেকে অনুলিখিত।

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর অভিন্ন প্রকাশ বিগ্রহ হচ্ছেন শ্রীগুরুদেব। সেই গুরু কৃপা ব্যতীত হৃদয়ে কখনই দিব্যজ্ঞান প্রকাশ হয় না।

শ্রাবণ-ভাদ্র ১৪১৮ বাংলা
আগস্ট -২০১১ইং

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।