এই পোস্টটি 85 বার দেখা হয়েছে
শ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় শ্রীজগন্নাথদেবকে যেভাবে দর্শন করতে হয় তা শ্রীমন্ মহাপ্রভু শিক্ষা দিয়েছেন। একজন শুদ্ধভক্ত কেমন করে ভক্তিভাবে ভাবিত হয়ে শ্রীজগন্নাথ দেবকে স্তুতি করেন, তাঁর গুণগান করেন, তা শ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় শ্রীমন্ মহাপ্রভু শিক্ষা দিয়েছেন। রথের উপর শ্রীজগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাকে দর্শন করে শ্রীমন্ মহাপ্রভু বহু স্তুতি করলেন। শ্রীজগন্নাথ যেহেতু ভাই ও বোনের সঙ্গে ছিলেন, সেহেতু শ্রীমন্ মহাপ্রভু তাঁকে কেবল বৃন্দাবনস্থিত কৃষ্ণ স্বরূপে দর্শন করেননি, গোপীভাবে ভাবিত হয়ে শ্রীমন্ গৌরাঙ্গ শীমন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথকে তাঁর মৌলিক রূপ যা শ্রীবৃন্দাবনস্থিত ত্রিভঙ্গ বঙ্কিম রূপে দর্শন করার জন্য আকাঙ্খা করতেন। তা ঠিক শ্রীমন্ উদ্ধবের সামনে কৃষ্ণবিরহে শ্রীমতী রাধারাণীর ভ্রমরের সঙ্গে অব্যবস্থিত চিত্তে বার্তালাপের মতো ছিল। শ্রীমন্ মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথের ভাবে উন্মত্ত এবং দিনরাত তিনি অস্থির মতিতে থাকতেন।
শ্রীমন্ মহাপ্রভু স্বরূপদামোদরকে গান করার জন্য আদেশ দিলেন। স্বরূপ দামোদর প্রভুর মনের ভাব জেনে নিম্নলিখিতভাবে গান করতে লাগলেন-
সেইত পরাণ নাথ পাইনু।
যাহা লাগি’ মদন দহনে ঝুরি’গেনু
॥”-(চৈ.চ.ম. ১/৫৫)
অর্থাৎ-“যাঁর অনুপস্থিতিতে আমি কাম বাণে দন্ধীভূত হয়ে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিলাম। সেই প্রাণনাথকে এখন আমি পেয়েছি।” এই সঙ্গীতটি পবিত্র কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শ্রীমতী রাধারাণীর মিলনের সূচনা প্রদান করছে। এক সময় সূর্যপরাগের সময় ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বড় ভাই ও ছোট বোনের সঙ্গে কুরুক্ষেত্রে যান এবং ব্রজপুর হতে গোপগোপীরাও সব পূণ্যভূমি কুরুক্ষেত্রে এসেছিলেন, কারণ সূর্যপরাগের সময় পুণ্যতীর্থ ভূমিতে দান, হোম, পরিক্রমা করাই হচ্ছে শাস্ত্রের নির্দেশ। সেই কুরুক্ষেত্রে শ্রীমতী রাধারাণীর সঙ্গে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সেই সময় শ্রীমতী রাধারাণী বৃন্দাবনের লীলা স্মরণ করে উপরোক্ত পদটি গান করেছিলেন। এখন আমি আমার প্রাণনাথকে পেয়েছি, তাঁর বিরহে আমি কন্দর্পবাণে দগ্ধীভূত হয়ে বিরহব্যথা অনুভব করে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিলাম, এখন আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি।
শ্রীস্বরূপ দামোদর খুব উচ্চৈঃস্বরে উক্ত পদটি গান করছিলেন। সেই সময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবার দিব্য আনন্দে বিভাবিত হয়ে তালে তালে নাচতে লাগলেন। ধীরে ধীরে শ্রীজগন্নাথের রথ এগিয়ে চলল, আর সেই সাথে সাথে শ্রীশচীনন্দন গৌরহরি রথাগ্রে নৃত্য করতে করতে চললেন। শ্রীজগন্নাথের উপর তাকিয়ে সমস্ত ভক্তরা নৃত্য ও কীর্তন করছিলেন। সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কীর্তনীয়াদের সঙ্গে শোভাযাত্রার পিছনে চলে গেলেন। শ্রীজগন্নাথের উপর নয়ন এবং হৃদয় নিবিষ্ট
করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজের হাতের ভঙ্গি দ্বারা সেই গীতের বিষয়বস্তু প্রদর্শন করতে লাগলেন। শ্রীমন্ চৈতন্য মহাপ্রভু নাটকীয় ভঙ্গীতে নৃত্যগীত পরিবেশ করার সময় মাঝে মাঝে শোভাযাত্রার পিছনে থেকে যাচ্ছিলেন, তখন শ্রীজগন্নাথদেব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন। আর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন আবার সামনে চলে আসছিলেন তখন শ্রীজগন্নাথদেবের রথ ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল। এভাবে আগে কে যাবেন, তার জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীজগন্নাথদেবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলল, কিন্তু মহাপ্রভু এতই শক্তিশালী ছিলেন যে, তিনি শ্রীজগন্নাথদেবকে তাঁর রথের উপর অধিষ্ঠিত রেখেছিলেন।বৃন্দাবাখের উপর অধিষ্ঠিত রেখেছিলেন।বৃন্দবনে ব্রজগোপিকাদের সঙ্গ ত্যাগ করে
নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দ্বারকা লীলাবিলাস করাতে গিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলদেব ও সুভদ্রা তথা দ্বারকার অন্যান্য অধিবাসীদের সঙ্গে কুরুক্ষেত্রে যান, তখন ব্রজবাসীদের সঙ্গে পুনরায় তাঁর সাক্ষাৎ হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন ‘রাধাভাবোদ্যুতি সুবলিত’, অর্থাৎ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে আস্বাদন করার জন্য শ্রীমতী রাধারাণীর ভাব ও অঙ্গকান্তি অঙ্গীকার করেছেন। শ্রীজগন্নাথদেব হচ্ছেন স্বয়ং কৃষ্ণ, আর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন শ্রীমতী রাধারাণী। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথদেবকে গুণ্ডিচা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া এবং শ্রীমতী রাধারাণী কৃষ্ণকে বৃন্দাবনে নিয়ে যাওয়ার লীলার সঙ্গে তুলনীয়। শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথপুরী-দ্বারকাপুরী রূপে বিবেচনা করা হয়েছে। সেখানে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পরম ঐশ্বর্য উপভোগ করেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীজগন্নাথদেবকে নীলাচল (দ্বারকাপুরী) হতে কৃষ্ণগতপ্রাণ গ্রামবাসীদের দ্বারা পরিপূর্ণ একটি সাধারণ পল্লী বৃন্দাবনে (সুন্দরাচলে) নিয়ে যাচ্ছিলেন। বৃন্দাবন যেমন মাধুর্য লীলার পীঠস্থান, তেমনি শ্রীক্ষেত্র হচ্ছে ঐশ্বর্য লীলার পীঠস্থান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে রথের পিছনে ফেলে চলে যাওয়া সূচিত করছিল যে, শ্রীজগন্নাথদেব (যিনি হচ্ছেন স্বয়ং কৃষ্ণ) ব্রজবাসীদের ভুলে গেছেন।কৃষ্ণ যদিও ব্রজবাসীদের এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি তাঁদের ভুলে যেতে পারেননি।
এভাবে অতুল ঐশ্বর্য-মণ্ডিত রথযাত্রায় তিনি বৃন্দাবন ধামে ফিরে যাচ্ছিলেন। শ্রীমতী রাধারাণীর ভূমিকায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পরীক্ষা করছিলেন, কৃষ্ণ এখনও ব্রজবাসীদের মনে রেখেছেন কি না! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন রথের পিছনে চলে যাচ্ছিলেন। তখন শ্রীজগন্নাথদেব শ্রীমতী রাধারাণীর মনোভাব বুঝতে পারছিলেন; তাই শ্রীজগন্নাথদেব, নৃত্যরত মহাপ্রভুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পড়ে শ্রীমতী রাধারাণীকে জানিয়ে দিচ্ছিলেন যে, তিনি তাদের ভুলে যাননি। এভাবে শ্রীজগন্নাথদেব তাদের রথের সামনে ফিরে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, শ্রীমতী রাধারাণীর প্রেম ব্যতীত তিনি তৃপ্ত হতে পারেন না। এভাবে শ্রীজগন্নাথদেব যখন দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন তখন রাধারাণীর ভাবে বিভাবিত মহাপ্রভু সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণের সামনে আসছিলেন। তখন জগন্নাথদেব আবার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করছিলেন। এটি ছিল রাধারাণীর সঙ্গে কৃষ্ণের প্রেমের প্রতিযোগীতা। শ্রীজগন্নাথদেবের প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রীতিভাব এবং শ্রীমতী রাধারাণীর প্রতি শ্রীজগন্নাথদেবের প্রীতিভাবের মধ্যে প্রতিযোগীতা চলছিল। এই প্রতিযোগীতায় রাধারাণীর ভাবে বিভাবিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জয় হয়েছিল।
