এই পোস্টটি 117 বার দেখা হয়েছে
গত দুই সংখ্যায় পর্যালোচনা করা হয়েছিল কিভাবে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করতে হবে সে বিষয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের আলোচ্য বিষয় হল ‘বিবাহ উৎসব’। অর্থাৎ, বিবাহ উৎসবটি বৈদিক পন্থা অনুসারে কিভাবে সম্পাদন করা উচিত?
বিবাহ উৎসব
বিজয় বেনুগোপাল দাস ও প্রেম পদ্মিনী দেবী দাসী
বিবাহ উৎসবটি কেবলমাত্র কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় যে, এটি করলাম আর হয়ে গেল। কিংবা পরিবার এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আশীর্বাদ বা অনুমোদন শুধুমাত্র এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহকে দেখা উচিত নয়। এটি একটি আনন্দঘন সামাজিক উৎসব নয় বরং আরো বিশেষ কিছু। এ পবিত্র বিয়ে উপলক্ষে যে যজ্ঞ সম্পাদন করা হয় সেসময় স্বয়ং ভগবান এবং সমস্ত দেবদেবীরা উপস্থিত থাকে। তারা তখন এ উৎসবে সাক্ষীরূপে উপস্থিত থেকে দম্পতিদ্বয়ের প্রতি আশীর্বাদ বর্ষন করে।
দম্পতিদ্বয় তখন উপস্থিত ভগবান এবং দেবদেবীদের সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করে যে, তারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি দায়িত্বপরায়ন ও বিশ্বাসী হবে এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা বিদ্যমান থাকবে। যাতে করে একে অপরকে সাহায্যের মাধ্যমে তারা তাদের মানব জন্মকে জাগতিক এবং পারমার্থিক উভয় চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সফলকামী করে তুলতে পারে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, বিবাহ কোন ইন্দ্রিয় তৃপ্তিজাত এবং রোমাস জাতীয় কিছু নয়। বিয়ের পর যখন একসময় রোমান্স এবং আনন্দ উভয়ই বিদূরিত হয় তখন আমরা আমাদের স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে পারি না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, সে উৎসবে আমরা কৃষ্ণকে সাক্ষী রূপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম এবং তিনি এ পবিত্র উৎসবে আমাদেরকে আশীর্বাদ করেছিলেন।
যখন আমরা জীবনের উচ্চতর উদ্দেশোর কথা ভুলে যায়, তখন আমরা জাগতিক আনন্দ এবং সুখের অনুসন্ধানে মনোযোগী হয়ে পড়ি। যার মাধ্যমে আমাদের অবনয়ন ঘটে এবং চরম দুঃখদুর্দশায় নিপতিত হই।
যদি আমরা আমাদের প্রকৃত স্বরূপ পারমার্থিকতার মধ্যে সুখের অনুসন্ধান শুরু করি, তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কৃষ্ণকে যুক্ত করার জন্য মনোযোগী হব। কৃষ্ণ জাগতিক উপভোগ্যতা মঞ্জুর করেন একটি নৈমিত্তিক উপায়ে, যার সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি মহৎ উদ্দেশ্য। যাতে করে আমরা ক্রমান্বয়ে আধ্যাত্মিক জীবনের পথে আরো অগ্রসর হতে পারি। কৃষ্ণভক্তরা সমস্ত জড়জাগতিক বিপদ এবং দুঃখদুর্দশা থেকে মুক্ত থাকে।
একটি বিবাহ উৎসব পরিচালনা করতে হয় যোগ্য ব্রাহ্মণ সাধুব্যক্তির মাধ্যমে যেটি বিবাহ উৎসব যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। যদি সম্ভব হয় এটি খুবই সৌভাগ্যের যে, যদি গুরু এবং ভক্তবৃন্দরা উক্ত উৎসবে উপস্থিত থাকে এবং তারা উৎসবের সময় বর কনেকে সাহায্য করে সার্বক্ষণিকভাবে কৃষ্ণকে স্মরণ করার জন্য। যদি ভক্তরা সে উৎসবে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ-কীর্তন করে, তখন দম্পতিদ্বয় একত্রে কৃষ্ণকে সেবা করার উপর ধ্যানশীল। হয়। কৃষ্ণ, যিনি হলেন একমাত্র তাদের ভালোবাসা, সুখ এবং সৌভাগ্যের উৎস।
বিপরীতে, যদি তাদের মন কৃষ্ণ এবং কৃষ্ণ সেবার ভাবনা ছাড়া কেবলমাত্র এই ভাবনায় মগ্ন থাকে যে, কিভাবে তারা একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করবে। সেটি মনকে সীমাহীন ইন্দ্রিয় তৃপ্তির প্রতি আকুল করে তোলে। যেটি ক্রমান্বয়ে তার প্রকৃত পরিচয় বা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্দের সৃষ্টি করে তাকে হতাশ আর কলুষতার দিকে পরিচালিত করে। দেবহুতির উক্তি হল যে, “যেহেতু তিনি ইন্দ্রিয়তৃপ্তির উদ্দেশ্যে তার স্বামীর সাথে বাস করতে যুক্ত হয়েছিলেন যেটি জাগতিক বন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে পরিচালিত করে না। তাই তার জীবন ছিল শুধুমাত্র কালের অপচয় মাত্র।” (শ্রীমদ্ভাগবত
৩/২৩/৫৬)
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিবাহ উৎসবে অগ্নি যজ্ঞের সময় যে সমস্ত সংস্কৃত মন্ত্র তারা নিবেদন করে সেগুলোর অর্থ সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং এর প্রকৃত অর্থ অনুসন্ধান করা। যেটি তাদেরকে এ বিষয়ে আলোকিত করবে এবং সে মুহুর্তের গুরুত্বটা অনুধাবন করতে সহায়তা করবে। প্রেম রস দাস এবং সান্দিপনী মুনি দাসের The Book of Samskaras গ্রন্থ থেকে নিম্নের অনুচ্ছেদটি সংগৃহীত।:
গৃহসূত্রে বিবাহ উৎসব সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছেঃ
একজন অর্ধাঙ্গী তার স্বামীর বামপার্শ্বে অধিকারবশত অবস্থানের পূর্বে স্বামীর কাছ থেকে কিছু অঙ্গীকার লাভ করে যেগুলো হল:
▶ স্বামীর উচিত তার স্ত্রীকে সুরক্ষা প্রদান করা।
▶ স্বামীর উচিত তাকে সঙ্গে নিয়ে তীর্থস্থান ভ্রমণ করা।
▶ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের সময় স্বামীর উচিত তাকে তার পাশে রাখা।
▶ ধর্মীয় বিধিনিষেধগুলো উভয়ের মেনে চলা আবশ্যিক।
▶ স্ত্রীর সাথে গৃহস্থালীর কর্তব্যগুলোর ক্ষেত্রে সহায়তা করা উচিত।
▶ গৃহস্থালীর খরচাদির ক্ষেত্রে স্বামীর উচিত স্ত্রীকে বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করা।
▶ কারো সামনে স্ত্রীকে অবমাননা বা অপদস্ত করা স্বামীর অনুচিত।
▶ স্বামীর নিজেকে কোন পাপকর্মে জড়ানো অনুচিত এবং তার উচিত নৈমিত্তিক পারমার্থিক নীতি আদর্শগুলো মেনে চলা।
▶ তার উচিত স্ত্রীকে ছাড়া অন্য সমস্ত নারীদের মা হিসেবে দেখা।
▶ স্বামীর উচিত তার সামর্থ্য অনুসারে স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখা।
উপরোক্ত প্রতিজ্ঞাসমূহ পূরণ করতে একইভাবে পতিও স্ত্রীর কাছ থেকে কিছু অঙ্গীকার লাভ করে:
“হে প্রিয়ে! যদি তুমি আমার কাছে প্রতিজ্ঞা কর যে, একাকী কোথাও যাবে না। অন্য লোকের সঙ্গে কখনো একাকী থাকবে না, যদি তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও যে, তুমি একজন সুন্দর ব্যবস্থাপক, ক্ষমাশীল বা সহানুভূতিশীল, কোমল মনের অধিকারী হও, পবিত্র বৈবাহিক অঙ্গীকার রক্ষা কর, সবাইর প্রতি অনুরক্ত হও এবং গৃহস্থালী কর্তব্যগুলো ভালভাবে কর তবে আমি আমার বিবাহিত স্ত্রী হিসেবে তোমাকে স্বাগত জানাই।”
সপ্ত-পদি অনুষ্ঠানে বানের প্রতিজ্ঞা বহন করে তার প্রতিজ্ঞাসমূহ পূরণ করতে সম্মত হয়।
বৈদিক বিবাহের ক্ষেত্রে এটি একটি প্রথা যে, উভয় পরিবারের মা-বাবারা দম্পতিদ্বয়কে ভগবানের মন্দিরে নিয়ে যায় যাতে করে তারা ভগবানের আশ্রয় গ্রহন করেন এবং তাদের বৈবাহিক জীবন যাতে সফল হয় সেজন্যে তারা ভগবানের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, বিবাহ কৃষ্ণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভগবান হচ্ছেন তাদের সবসময়ের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং তাই তাকে সেবা করাই হচ্ছে এই যুগলের একমাত্র লক্ষ্য। হরে কৃষ্ণ।
আগামী সংখ্যায় বিবাহের পরে বৈবাহিক জীবন কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে তুলে ধরা হবে।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, মে – ২০১১ইং
