জড় সমস্যা

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 102 বার দেখা হয়েছে

জড় সমস্যা

ভুল-কেন আমরা করি?

গৌরাঙ্গ দাস: ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে….’ প্রচলিত বাক্যটি সম্পর্কে সবাই অবগত। এটির সঙ্গে আমরা আরও তিনটি ত্রুটি যোগ করতে পারি। তা হল মানুষের প্রবণতা রয়েছে মায়ার দ্বারা মোহিত হওয়ার, প্রতারণা করার এবং রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ইন্দ্রিয়। একজন বদ্ধ আত্মা এ তিনটি ত্রুটির দ্বারা আবদ্ধ। কিন্তু এই প্রবন্ধে আমি আলোকপাত করব মানুষের ভুল করার প্রবণতা প্রসঙ্গে। আমরা সবাই ভুল করি। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন যে, ভুল করাটা ভুল নয়, বরং ভুল করার পর তা থেকে শিক্ষা না নিলে সেটিই তখন ভুল। এ প্রসঙ্গে একটি সুন্দর কাহিনী রয়েছে। কাহিনীটি শ্রীমৎ ভক্তি তীর্থ মহারাজের জীবন কাহিনী Black Lotus গ্রন্থ থেকে নেয়া। শ্রীমৎ ভক্তি তীর্থ মহারাজও লাইব্রেরি পার্টিতে ভক্তদের সঙ্গে কিছু সমস্যা হচ্ছিল। সে সময় তিনি ভারতে অবস্থানরত শ্রীল প্রভুপাদের সান্নিধ্যে পান। একদিন শ্রীল প্রভুপাদ তার হাতে খানিকটা আঘাতপ্রাপ্ত হন। তখন তিনি ভক্তি তীর্থ স্বামীকে ডাকলেন এবং তার ক্ষতস্থানে নিম ঔষধ লেপে দিতে বললেন। যখন ভক্তি তীর্থ স্বামী এটি করছিলেন তখন নার্ভাস বশত তার হাত কাঁপতে লাগল এবং সেই নিমের তৈরি ঔষধটি তখন প্রভুপাদের ধুতি এবং কুর্তাসহ সবখানে ছিটকে পড়তে শুরু করল। তিনি ভাবলেন, ‘এখন হয়ত প্রভুপাদ আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে বকা দিয়ে আমাকে এখান থেকে বের করে দিবেন।’ কিন্তু তিনি দেখলেন শ্রীল প্রভুপাদ কিছু বলছেন না বরং মৃদু হাসছেন। তখন তিনি উপলব্ধি করলেন। ১) এমনকি যদি আমি ভুল করিও, শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে ভালবাসবেন এবং আমাকে প্রত্যাখ্যান করবেন না। ২) কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আমি ভুল ক্রমাগত করতেই থাকব, আমাকে সেই ভুলগুলো থেকে শেখা উচিত এবং যতদূর সম্ভব সে ভুল পুণরায় না করে শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। তিনি লিখেছেন, “এটি আমাকে অনেক আশান্বিত করল এবং আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি ভক্তদের সঙ্গে থাকলে হয়ত অনেক ভুল করতে পারি, কিন্তু আমার উচিত সেই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজেকে পরিবর্তন করা।”

আমাদের পারমার্থিক জীবনধারায় এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ, কেননা আমরা সাধন ভক্তির পথে রয়েছে। সাধন ভক্তি মানে হল অনুশীলন, এবং অনুশীলন করতে গিয়ে ভুল হতেই পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে কতটা আমরা নিজেদেরকে পরিবর্তিত করছি, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কেন আমরা ভুল করি?

শ্রীমদ্ভাগবত এবং চৈতন্য চরিতামৃতে মহান মহান লোকদের ভুল প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা রয়েছে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এসব অনর্থসমূহ যে কারো বুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করে। এসমস্ত অনর্থসমূহের প্রভাবে কেউ এসব কর্মে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয় যা হয়ত সে সেই কর্ম করতে চায় না। শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধে মহারাজ উত্থানপাদের কাহিনী থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, কিভাবে কাম আমাদেরকে ভুল করতে বাধ্য করে। রাজা উত্তানপাদের দুই রাণী সুনীতি এবং সুরুচি। সুরুচি ছিল রাজার সবচেয়ে প্রিয় রাণী; সুনীতি তার প্রিয় রাণী ছিলেন না। সুনীতির পুত্র ছিলেন ধ্রুব। একদিন যখন সুরুচির পুত্র উত্তম রাজার কোলে বসে ছিল তখন ধ্রুবও চাইছিল পিতার কোলে বসার জন্য। সে সময় সুরুচি কর্কশ কণ্ঠে ধ্রুবকে ধমক দিল। এমনকি যদিও মহারাজ উত্থানপাদ দেখল, এটি ধ্রুবের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কিন্তু তবুও তিনি চুপ থাকলেন। এ ঘটনা ধ্রুব মহারাজকে এত বেশি আঘাত করল যে, তিনি গৃহ ত্যাগ করে বনে চলে গেলেন। একটি ছোট ভুল-ঐ সময় উত্থানপাদের নিরবতা, ছোট ধ্রুবের হৃদয়ে আঘাত করল। যখন পুত্র চলে গেলেন, তখন পিতা উত্থানপাদ নারদ মুনির সম্মুখে অনুতাপ করতে লাগলেন যে, তিনি কাম বাসনার দাস হয়ে রয়েছিলেন, যার ফলে তিনি তার পুত্রের দেখাশোনা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যখন উত্থানপাদ মহারাজ নিজেকে এভাবে দোষারোপ করতে লাগলেন, তখন নারদ মুনি মৃদু হাসলেন, “আপনার পুত্র সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছে। আপনি আপনার পুত্রকে অসন্তুষ্ট করেছিলেন, কিন্তু তার ফলে আপনার পুত্র বনে গিয়ে পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করেন।’ শ্রীল প্রভুপাদ বলেন যে, কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করা খুবই কঠিন কাজ, এমনকি দেবদেবীদের জন্যেও, কিন্তু যেটি দেবদেবীরা অর্জন করতে পারে না, সেটি ধ্রুব মহারাজ তার ভক্তিপূর্ণ সেবার শক্তির দ্বারা সহজেই অর্জন করতে পেরেছিলেন। এভাবে যেটি ভুল দিয়ে শুরু হয়েছিল সেটি ভক্তিমূলক সেবার সংস্পর্শে আপনা আপনিই একটি মহৎ কার্যের দিকে পরিচালিত হয়েছিল।

একই ক্রিয়া, ভিন্ন প্রতিক্রিয়া

অন্য আরেকটি ভুলের দৃষ্টান্ত হল অজামিলের কামের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা। একজন বেশ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অজামিল তার যুবতী স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এবং বৃদ্ধ পিতামাতাকে পরিত্যাগ করেছিলেন এবং সেই বেশ্যাকে বিয়ে করে একটি পাপময় জীবন গ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুশয্যায় যখন তিনি দেখলেন যে, মৃত্যুদূতরা তার দিকে আসছে, তিনি স্নেহবশত চিৎকার করে তার প্রিয় সন্তানের নাম ‘নারায়ণ’ বলে ডাকলেন। ভগবান নারায়ণের নাম শ্রবণ করে তখন সে সময় বিষ্ণুদূতগণ আগমন করেন এবং যমদূতগণের হাত থেকে তাকে রক্ষা করেন। যখন তিনি বিষ্ণুদূতগণের কাছ থেকে তার পূর্বকৃত ভুল সম্পর্কে অবগত হন, তখন তিনি অনুতাপ করতে থাকেন এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন যে, কখনো এ ভুল পুনরায় করবেন না। তিনি তার দ্বিতীয় জীবন সদ্ব্যবহার করে হরিদ্বারে গেলেন এবং সেখানে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করলেন। অজান্তে ভুল করাটা অন্যায় নয়। পরিবর্তনের সুযোগ গ্রহণ করে এবং পাপ পুনরায় না করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আবার দিতির একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। দিতি কাম বাসনায় প্রভাবিত হয়ে তার পতি কশ্যপ মুনির কাছে সন্ধ্যা লগ্নে মিলিত হওয়ার প্রার্থনা জানালেন। কশ্যপ মুনি এর আপত্তি জানালেন, কেননা সেটা অনুপযুক্ত সময় ছিল। কিন্তু দিতি তাকে বাধ্য করেছিলেন। এর ফলে তিনি তার স্বামী এবং একজন মহান সাধুর কাছে, দেবদেবীদের কাছে অপরাধ করেছিলেন। যার ফলে হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু নামক দুই অসুরের জন্ম হয় যারা সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্যই একট ভীতি হয়ে দাড়িয়েছিল। এখানে একটি অতি অদ্ভুদ আদর্শ বিদ্যমান। অজামিল এবং দিতি উভয়ই কাম বাসনায় পতিত হয়েছিলেন। কিন্তু দিতির সেই বিপথে গমনের ফলাফল সমগ্র ত্রিভুবনের জন্যই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অপরদিকে অজামিলের বিপথে গমন শুধুমাত্র তার পরিবারকে ছাড়া আর কারোর উপর প্রভাব পড়েনি। দিতির কার্যের ফলাফল ছিল অধিক ক্ষতিকর কেননা তিনি তার পতি কশ্যপ মুনির সরাসরি নির্দেশ অমান্য করেছিলেন। যিনি সাধু, গুরু, শাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে তাকে পরিচালনা করেছিলেন। কশ্যপ মুনির মত এমন একজন মহাত্মার সঙ্গে দিতির সান্নিধ্যের কারণে দিতির করণীয় ছিল যে, কশ্যপমুনির সঙ্গে যথাযথভাবে আচরণ করা এবং কামের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা। তাই, যারা মহাত্মার সান্নিধ্যে থেকে ভুল করে সেগুলো অনেক বড় ভুল এবং অধিক ভয়ংকর। সেটি ব্যক্তিগত হোক কিংবা সমষ্টিগতভাবে হোক। সুবিধাসমূহের সাথে সাথে দায়িত্ব আসে এবং কোন ভুল না করে নিজ দায়িত্ব সম্পন্ন করা আরো বড়, যখন একজন ব্যক্তি খুবই ঘনিষ্টভাবে অন্যান্য ভক্তদের সঙ্গ করে। তাই ভক্ত সঙ্গের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ সতর্ক হতে হবে।

পরবর্তীতে কশ্যপ মুনি তার স্ত্রীকে বলল, “এরকম অসময়ে সঙ্গের ফলে তুমি অসুরপুত্র পেতে যাচ্ছ, যারা প্রত্যেককে ধ্বংস করতে যাবে। পরিশেষে তারা পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক হত হবে।” এটি শুনে দিতি প্রথমে বিচলিত হলেও পরে শেষ উক্তিটি তাকে কিছুটা হলেও সান্তনা দেয়। দিতি উত্তর দেয়-“আমি এটি জেনে খুশি যে, আমরা পুত্ররা পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক হত হবে, যার দুই বাহু অত্যন্ত উদার। এর মানে তাদের মুক্তি অবধারিত, কিন্তু আমি শুধুমাত্র এটিই প্রার্থনা করি যে, আমার পুত্ররা যেন ভক্তদের ক্রোধ কর্তৃক হত না হয়।”

শ্রীল প্রভুপাদ এর তাৎপর্যে লিখেছেন, “ভগবান আবির্ভূত হন না যখন ব্রাহ্মণরা কারোর প্রতি ক্রোধান্বিত হন, কেননা ব্রাহ্মণের ক্রোধই এর জন্য যথেষ্ট।”
তাই দিতি প্রাধান্য দেন যে, তার ভুলের ফলাফল স্বরূপ ভগবানের আবির্ভাব ঘটবে, কিন্তু এই নয় যে, এটি ভক্তদের অসন্তোষ করবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নীতি: একটি ভুলের ভয়াবহতা ভিন্ন হয়, কতটা অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে তার উপর। এই সমস্ত অনর্থগুলোর নিয়ন্ত্রণে ভক্তদের সঙ্গে কিভাবে আমরা কথা বলি এবং কিভাবে আমরা আচরণ করি তার জন্য সতর্ক হতে হবে।
এখানে, কশ্যপ মুনি দিতিকে বলছিলেন, তার কোন্টা করা উচিত কোটি নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে বাসনার বেগ এতটাই প্রবল হয়ে উঠে যে, এটি আমাদের বিচার বিবেচনাকে বিভ্রান্ত করে এবং আমরা তখন কার মাধ্যমে কি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেসব অগ্রাহ্য করি। শোনা, জানা, পড়া, আলোচনা করা, এমনকি এসমস্ত দৃষ্টান্ত দর্শন করা সত্ত্বেও কেউ এরকম শিকারে পতিত হতে পারি। অর্জুনও এই প্রশ্নটি কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “মানুষ কার দ্বারা চালিত হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হয়ে পাপাচরণে প্রবৃত্ত হয়?” তখন ভগবান কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, “হে অর্জুন। কামের প্রভাবই মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্তি করে।” (ভ. গীতা-৩/৩৬-৩৭) চলবে…

আগামী সংখ্যায় ভুল কেন আমরা করি? এর অন্যান্য কারণগুলো আলোচনা করা হবে এবং এর সমাধান কি? তাও তুলে ধরে হবে। হরে কৃষ্ণ।

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।