এই পোস্টটি 213 বার দেখা হয়েছে
দাবানল কুণ্ড
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দাবানল লীলা সংগঠিত হয়েছিল ভান্ডির বন নামক স্থানে। কথিত আছে শ্রীকৃষ্ণ দাবানল গ্রাসের পর এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন। তাই এটি দাবানল কুণ্ড নামে প্রসিদ্ধ হয়। এখনো ব্রজমণ্ডল পরিদর্শনকালে এই লীলাস্থান দর্শন করা যায়। শ্রীকৃষ্ণ যখন কালীয় হ্রদ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন যমুনার তীর থেকে তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা তাঁকে দেখতে পেলেন। তাঁরা দেখলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ অপূর্ব সজ্জায় সজ্জিত, বহুমূল্য মণিমাণিক্যে তিনি বিভূষিত এবং তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর সমস্ত শরীর যেন সুবর্ণমণ্ডিত। বৃন্দাবনের সমস্ত অধিবাসীরা, গোপ এবং গোপবালকেরা, মা যশোদা, নন্দ মহারাজ, সমস্ত গাভী এবং গোবৎসরা যখন দেখলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ যমুনা থেকে উঠে আসছেন, তখন তাঁদের মনে হল যে, তাঁরা যেন তাঁদের জীবন ফিরে পেলেন। কেউ যখন তার জীবন ফিরে পায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে অত্যন্ত আনন্দিত হয়। সেই আনন্দে মগ্ন হয়ে তাঁরা সকলেই একে একে শ্রীকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন এবং স্বস্তি অনুভব করলেন। মা যশোদা, মা রোহিণী, নন্দ মহারাজ এবং সমস্ত সাপেরা এত আনন্দিত হয়েছিলেন যে, কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে তাঁদের মনে হয়েছিল যে, তাঁদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য সাধিত হল।
বলরামও কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন, কিন্তু তিনি মৃদু মৃদু হাসছিলেন, কেননা তিনি জানতেন, সকলেই যখন উৎকণ্ঠায় এইভাবে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল, তখন কৃষ্ণ কি করছিলেন। যমুনার তীরবর্তী সব ক’টি বৃক্ষ, সমস্ত গাভী, গোবৎস সকলেই কৃষ্ণের আগমনে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। বৃন্দাবনের ব্রাহ্মণেরা কৃষ্ণ এবং তাঁর পরিবারের সকলকে অভিনন্দন জানাবার জন্য সস্ত্রীক এসে উপস্থিত হলেন। ব্রাহ্মণেরা হচ্ছেন সমাজের গুরু। তাঁরা কৃষ্ণের এই বিপদ-মুক্তির জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সকলকে আশীর্বাদ করলেন। এই উপলক্ষে তাঁরা নন্দ মহারাজকে দান করবার জন্য অনুরোধ করলেন। কৃষ্ণের পুনরাগমনে নন্দ মহারাজ এত খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি ব্রাহ্মণদের বহু গাভী এবং স্বর্ণ উপহার দিলেন। নন্দ মহারাজ যখন এইভাবে দান করতে ব্যস্ত ছিলেন, মা যশোদা তখন কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে অবিশ্রান্ত ধারায় কাঁদতে লাগলেন।
রাত্রি হয়ে এসেছিল, গাভী এবং গোবৎস সহ বৃন্দাবনের অধিবাসীরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাই তাঁরা যমুনার তীরেই বিশ্রাম করতে মনস্থ করলেন। মধ্যরাত্রে সকলেই এখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, তখন হঠাৎ সেই বনে দাবানল জ্বলে উঠল এবং মনে হল যে, সে আগুন যেন অচিরেই সমস্ত ব্রজবাসীদের গ্রাস করবে। যখন তাঁরা সেই আগুনের তাপ অনুভব করলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁরা গোপশিশুরূপে লীলাবিলাস পরায়ণ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, “হে প্রিয় কৃষ্ণ! হে পরমেশ্বর ভগবান! সমস্ত বলের উৎস হে বলরাম! এই সর্বগ্রাসী দাবানল থেকে তোমরা আমাদের রক্ষা কর। তোমরা ছাড়া আমাদের আর কোনও আশ্রয় নেই। এই আগুন আমাদের সকলকে গ্রাস করবে!” এইভাবে তাঁরা কৃষ্ণ এবং বলরামের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন যে, তাঁদের শ্রীচরণারবিন্দ ছাড়া তাঁদের আর কোন আশ্রয় নেই। তাঁর প্রতিবেশীদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে শ্রীকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ সেই দাবানল গ্রাস করে ফেললেন এবং তাঁদের রক্ষা করলেন। শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে সেটা মোটেই অসম্ভব ছিল না, কেননা তিনি হচ্ছেন অনন্ত। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে যা ইচ্ছা তাই করার মতো অনন্ত শক্তি তাঁর রয়েছে।
ভগবানের অনন্ত শক্তিমত্তার প্রদর্শন স্বরূপ এই দাবানল কুণ্ড দর্শন করে আপনি আপনার মনুষ্যজীবন সার্থক করুন।
হরে কৃষ্ণ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ , ডিসেম্বর – ২০১০ ইং
