কিভাবে কৃষ্ণভক্ত হলাম

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 96 বার দেখা হয়েছে

কিভাবে কৃষ্ণভক্ত হলাম

দানবীর দাস

১৯৪৯ সালে নস্ এঞ্জেলেসে আমার জন্ম হয়। আমার পিতা-মাতা ছিলেন দক্ষ ভলিবল খেলোয়াড়। বাবা ছিলেন আমেরিকার সেরা আর মা ছিলেন গোটা আমেরিকার মধ্যে তৃতীয় দলের। আমিও চার বছর বয়সে বলিবন খেলতে শুরু করি। অতি সহজেই আমি স্কুলের গড়ি ছাড়িয়ে যাই। খেলাধুলার মাধ্যমেই আমার অবকাশ সময় কাটতে থাকে এবং স্বভাবতই সুখে কাটে আমার শৈশব কালটা। তারপর অনেক খেলাধুলার ভেতর দিয়ে শৈশব পেরিয়ে এলো যৌবন, আমি তখন উক্লা (UCLA) ডলারশিপ নিয়ে হাইস্কুল ত্যাগ করলাম।
আমার কলেজ জীবনও ছিল ‘সাফল্যপূর্ণ’। বলতে গেলে তখন আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্যটাই ছিল জীবনকে সাধারণভাবেই উপভোগ করা। আমার পিতামহ আমাকে একসময় বলেছিলেন, ‘অর্থই ভগবান’। তখন এ সম্পর্কে আমার নিশ্চিত ধারণা যেমন ছিল না, অপরদিকে তেমনি ভগবান সম্বন্ধেও আমার কোন দৃঢ় প্রত্যয় ছিল না। অজ্ঞতার অন্ধকারেই আমি ছিলাম। ১৯৭০ সালের ৯ই জুনের এক শুক্রবারের ঘটনা। আমি গ্রামের অভন্তরে ভবঘুরের মত ইতঃস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। সেই সময় হঠাৎ কাউকে আমার নাম ধরে ডাকতে শুনলাম। চারপাশে তাকালাম, কিন্তু পরিচিত কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি চলতে লাগলাম, কিন্তু আবার কেউ আমাকে ডাকন। এবার আওয়াজের সম্ভাব্য উৎসস্থল লক্ষ্য করে তাকালাম-গৈরিক 16 OCL বদন, মুণ্ডিত মস্তক প্রায় আমারই সমবয়সী এক সৌম্য ব্যক্তি রেস্টুরেন্ট ও সিনেমা হলেও মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন।

একটু ইতঃস্তুত করে বললাম, “আমি”?
সে বলল, “আমাকে চিনতে পারলে না?”

বেশ ভালোভাবে দেখে নিয়ে তবে তাকে চিনতে পারলাম। চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘বিয়ার্ড: বিয়ার্ড, সত্যিই তুমি?” শান্ত গলায় সে বলল, “হ্যাঁ আমি বিয়ার্ড।”
তার আসল নাম বৰ সেৱাইট। উল্লা-র ভলিবল খেলোয়াড়ের জীনে অসাধারণ লম্বা কান্যে দাড়ির জন্য তার ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল বিয়ার্ড। কলেজে যেবার আমার তৃতীয় বর্ষ শেষ হল, ঠিক তার আগের বছরে সে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক হয়। এর জীবনের ধরণ আমার মতই ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, ওকে শেষবার আমি দেখেছি মাস ছয়েক আগে-দুজন বান্ধবীর সাথে সমুদ্রের ধারে।
ওকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এপথে কিভাবে এলে?”
সে বলল, “তিন মাস আগে আমি হরেকৃষ্ণ আন্দোলনে যোগ দিয়েছি।”
“ও ভগবান, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। হরেকৃষ্ণ জীবনে অনুপ্রবেশের আগে অনধি আমার জীবন হিন ‘শ্রবণ কর’ সুরলহরীর হত। কখনো কখনো আমি ছোলিউড বলিভার্ডে সংকীর্তনরত ভরুদ্দলের সান্নিধ্যে যেতাম। খোল-করতাল বাজিয়ে সংকীর্তন করতে করতে ভক্তরা যখন যেত, তখন অনেকেই তা দেখে তাদের ড্রয়ারে অভিজ্ঞতার চেয়ে ধূপবাতি পোড়ানো বড় আনন্দের ভেবে মুখ টিপে হাসত।

সুন্দরভাবে বাখ্যা করল, কিভাবে ও উচ্চতর জ্ঞানের অভিজ্ঞতা লাভকরে জড়-জাগতিক মোহ, মাংসাহার ত্যাগ, মাদকদ্রব্য পরিহার, অবৈধ স্ত্রীসংসর্গ এবং তাস-পাশা-জুয়ার মত ক্ষতিকর বস্তুগুলি পরিত্যাগ করেছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে বিয়ার্ড এসব কথা বলছে। চ্যালেঞ্জ করে বসলাম ওর নতুন ত্যাগের, বিশেষ করে যৌন বিধি-নিষেধ মেনে চলা জীবনকে। আমি বুলেটের মত প্রশ্নবান ছুড়তে থাকলাম ওর দিকে, ও কিন্তু সবকিছুরই ভদ্রোচিত জবাবে আমার দৃঢ় ধারণার ভিত্তিমূল ধ্বংস করে দিল। ববের সুরে মিষ্টত্ব ও প্রশান্তির ভাব ছিল। ওর এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটা ছিল মনে ছাপ ফেলার মত এবং আকর্ষণীয়।
সে তার বক্তব্যের সমর্থনে ‘ভগবদ্গীতা যথাযথ’ ও অন্যান্য প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেয়। সে বলে যে, বহু বৈদিক ঋষি কৃষ্ণকে ভগবান বলে মেনে নিয়েছেন।
আমরা সকলেই কৃষ্ণের নিত্যদাস এবং আমরা যদি ভক্তিযোগ বা পারমার্থিক সেবার দ্বারা তার সাথে ভুলে যাওয়ার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করি, তাহলে আমরা লাভ করবো আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ মহত্তম স্থানটি। সে আমাকে বলল, কিভাবে পাঁচশো বছর আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে এসেছিলেন এ যুগের আত্মোপলব্ধির পন্থা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র শিক্ষা দিতে হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
“আমরা এই দেহ নই, দেহস্থিত আত্মাই হচ্ছে শাশ্বত। তাই আমাদের লব্ধ সকল জাগতিক সুখ হল মূল্যহীন।
আমি জিজ্ঞেস করি, “ভলিবলও?”
ও উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, কেবলই সময়ের অপচয় মাত্র।
তার সাথে একঘন্টা আলোচনার পর আমি স্থির করলাম, তার বর্ণিত চারটি নীতি গর্হিত পাপাচরণ থেকে নিজেকে মুক্ত করব। যদিও আমি ছিলাম উদ্ধত, তবুও আমি জয়ী হলাম এ ব্যাপারে। এতে আমি সুখী হলাম এবং শ্রীল প্রভুপাদের ‘শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা যথাযথ’ কিনলাম। এছাড়াও বক্ আমাকে ‘ব্যাক টু গডহেড’ পত্রিকার একটা কপি ও এক প্যাকেট সুগন্ধি ধূপবাতি দিল।
হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরে গেলাম। দেখলাম, সেখানে কয়েক ডজন ভক্ত হরেকৃষ্ণ মন্ত্র কীর্তন ও নৃত্য করছে। অভিভূত হয়ে গেলাম আমি। তারপর আমিও ওদের সাথে যোগ দিয়ে ওদের মতো দু-বাহু তুলে কীর্তন করতে শুরু করলাম। ওরা বেশ অবাক হল। ওরা আমাকে রবিবারের প্রসাদ-ভোজে মন্দিরে আসতে আমন্ত্রণ জানাল। আমিও আসার প্রতিশ্রুতি দিলাম।

 

বাড়ি মাথায় উঠলো। আমি ডুবে গেলাম গীতায়-লাইনের পর লাইন, পাতার পর পাতা হৃদয়ঙ্গম করে দিব্য অমৃতে অন্তর সিক্ত করলাম। গাইতে লাগলাম গান, “কখনো ভালোবাসায় ডুবলাম না, কি ধরনের বোকা আমি, কোথায় সেই নিরালা নিলয়, যেখানে সত্যি সত্যিই পূর্ণ হবে আমার রিক্ত হৃদয়? অবশ্য প্রকৃত প্রেমিকের অনুসন্ধানকালে আমি কখনো ভগবানের কথা চিন্তা করিনি। এখন জানলাম, আমাদের একমাত্র তাঁকেই ভালোবাসা উচিত। অপরাপর জাতিক সম্পর্কটা হচ্ছে ব্যক্তি বা বস্তুকেন্দ্রিক তা প্রকৃত ভালোবাসা নয়। ভগবানের ক্ষেত্রেই একমাত্র ভালোবাসার অনুকূল প্রতিফলন ঘটে। ইন্দ্রিয়গত কামনার ফলশ্রুতি হচ্ছে-হতাশা, কর্মফলের প্রতিক্রিয়া এবং এই জগতে বার বার জন্ম নিয়ে দুঃখ কষ্ট ভোগ। অপরদিকে পারমার্থিক জীবনের আত্ম-উপলব্ধি আনে অমরতা, আনে জ্ঞান এবং শান্তি। পরের রবিবারে চলে এলাম মন্দিরে। বাধা-

বিপত্তি সত্ত্বেও বাড়িতেই আমি ভগবান কৃষ্ণ এবং তাঁর ভক্তবৃন্দের সান্নিধ্য উপলব্ধি করতাম, যদিও আমার পিতা-মাতার আচরণ এ ব্যাপারে প্রতিকূল ছিল।
গীতাটি কয়েক ঘন্টা অধ্যয়নের পর আমি সত্যিই সত্যিই অন্য জগতে চলে গেলাম। ঘুম থেকে সকাল ৬টায় উঠে সানডিয়েগোতে ভলিবল বীচ চ্যাম্পিয়নশীপে অংশগ্রহনের জন্য রওনা হলাম। সানডিয়োগোর উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে সারা রাস্তায় শুধু হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র গাইতে লাগলাম।
আমার ভলিবল ক্যারিয়ার খুব সফল হয়েছিল। আমি NCAA (National Clegiate Athletic Association) কর্তৃক ১৯৭০ সালে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলাম। ইউ.এস অলিম্পিক দলের প্রধান ছিলাম। UCLA তে আমার পিতা এবং কোচ আমার ভলিবল সফলতায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। অপরদিকে আমার মা আমার শিক্ষাগত জীবনের সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আমি ভাবছিলাম কৃষ্ণের সন্তুষ্টির কথা।
যখন আমি প্রথম ম্যাচ কোর্টে পা রাখলাম, কৃষ্ণের সেই দিব্য বাণী আমার মাথায় ধ্বনি হতে লাগল।
“তুমি যা অনুষ্ঠান কর, যা আহার কর, যা হোম কর, যা দান কর এবং যা তপস্যা কর, সেই সমস্তই আমাকে সমর্পন কর।”
আমি বলটি নিলাম এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিলাম কিন্তু তখনও কৃষ্ণের বাক্য নাড়া দিচ্ছিল। অনেকদিন খেলার পর, আমি আমার দলের এক খেলোয়াড়কে বললাম, আমি খেলতে পারছি না এবং কৃষ্ণভাবনা গ্রহনের জন্য ভাবনার অন্তরালে সাড়া দিচ্ছে। অন্যরা তাতে রাজি না হলেও আমার সেই বন্ধু খেলোয়াড়টি রাজি হল।
কৃষ্ণভাবনা গ্রহনের পর যতই দিন যেতে লাগল আমার জাগতিক জিনিসের প্রতি আকর্ষন হারাতে থাকল। হরে কৃষ্ণ জপ শুরুর পর থেকে মদ্যপান ভলিবল এবং নারীর প্রতি আসক্তি লোপ পেল। কৃষ্ণ প্রসাদ আস্বাদনের মাধ্যমে অন্যান্য খাবারের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসল। এভাবে আমি কৃষ্ণভাবনাকে আমার জীবনে সর্বাঙ্গিনভাবে গ্রহন করলাম সারা জীবনের জন্য। আমার একটাই উদ্দেশ্য আমি যেন কৃষ্ণসেবা করে যেতে পারি। কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করতে পারি। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। হরে কষ্ণ |

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।