এই পোস্টটি 96 বার দেখা হয়েছে
বিশাখা দেবী নাসীর প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র: “
জ্ঞানবান “যোগভ্রষ্ট পুরুষ যোগীগনের বংশে জন্মগ্রহণ করেন। এই প্রকার জন্ম এ জগতে অবশ্যই অত্যন্ত দুর্লভ।” গীতা ৬/৪২ এই শ্লোকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চয়তা দান করেছেন যে, একজন যোগী সর্বাবস্থাতে শুভ লক্ষনযুক্ত হন। এমনকি তিনি যদি যোগের পথ থেকে ঘটনাক্রমে বিচ্যুতও হয়, তবুও তিনি সৌভাগ্যের অধিকারী হন। তিনি পরবর্তী জন্মে জন্মলাভকরেন এমন এক পরিবারে যেটি হবে পরমার্থবাদী অথবা ভক্ত পরিবার। কৃষ্ণ বলেছেন সেই প্রকার জন্ম নিশ্চিতভাবেই বিরল।
কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তদের এ বিষয়টি এমনটি ভাবা উচিত নয় যে, “আমার ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই ভক্ত। তারা হয়ত পূর্বজন্মে কৃষ্ণভক্ত ছিল এবং এখন এখানে জন্মগ্রহণ করেছে।” ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ভক্তিজীবন পালনরত নিরুপমা দেবী দাসী বলছিলেন, “আমি মনে করি না যে আমার ছেলেমেয়েরা অন্য মায়েদের সন্তানের চেয়ে বিশেষ কিছু।” তিনি এবং তার স্বামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে কোন কিছু জানার পূর্বে, তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। শিশুটির জন্মের ঠিক পরের দিনই নিরুপমার স্বামী দূর থেকে কয়েক ঘন্টা তার সদ্য নবজাতক শিশুটিকে দেখছিলেন। পরে নিরুপমার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা এই শিশুটিকে নিয়ে কি করতে যাচ্ছি? আমরা যা কিছু পেয়েছি তার চেয়েও বেশি কিছু তাকে দিতে হবে। আমরা তাকে এমন জীবন দিতে পারি না যেটির কোন তাৎপর্য নেই।”
নিরুপমা তাতে সম্মত হয়েছিলেন। তিনি একটি পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন এবং তাতে তিনি যে অভিজ্ঞতা পাচ্ছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত কলুষময়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার ছেলেমেয়েকে এরকম জাগতিক প্রথাগত কলুষময় শিক্ষা পদ্ধতিতে জড়াবে না। যখন তাদের প্রথম কন্যা সন্তানের বয়স ছয় বছর হয়, নিরুপমা এবং তার স্বামী একজন ভক্তের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং হরে কৃষ্ণ মন্ত্র জপ শুরু করেন। কিছুকাল পর তারা দীক্ষা লাভ করেন এবং নিরুপমার স্বামী বহুদক দাস ভানকুবার হরে কৃষ্ণ সেন্টারে অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন। প্রথম দিকের বছরগুলোতে তাদের প্রথম সন্তানের কয়েকজন। মাত্র খেলার সাথী ছিল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে যখন হরেকৃষ্ণ গোষ্ঠী সম্প্রসারিত হচ্ছিল তখন অবস্থা পাল্টাল। বার্নাবিতে আট একর জুড়ে একটি প্রাইভেট ইলিমেন্টারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যাতে পঞ্চাশ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। যেটি ভানকুবার থেকে প্রায় ১১ মাইল পথ। নিরুপমা বলছিলেন, “আমার শিশুরা খুবই ভাগ্যবান, কারণ তারা জীবনের শুরু থেকেই ভক্তিমূলক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে ভগবানকে ভালোবাসার একটি শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।” তিনি আরো বলছিলেন, “তার অর্থ এই নয় যে, তাদের জন্য আমরা গর্বিত অনুভব করব। এটা আমরা চাই না, কেননা যদিও তারা এখন ভাগ্যবান, কিন্তু তাদের সঠিক তত্ত্বাবধানে না রাখলে তারা পারমার্থিক জীবনের প্রতি বাসনা হারাবে, ফলে তারা দুর্ভাগ্যবান হয়ে উঠতে পারে। আমরা তাদের প্রতি মনোযোগী এবং দায়িত্বশীল শুধুমাত্র তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বা নৈতিক শিক্ষা দেয়ার জন্যই নয় বরং তাদের পারমার্থিক প্রেক্ষাপট থেকে কতটা উন্নত হচ্ছে সে বিষয়টিও দেখার জন্য।”
কিছু লোক মনে করে ভক্তগৃহে জন্ম নেয়া এসব ছেলেমেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করা বা পারমার্থিক জ্ঞান দেওয়ায় তারা একটা সময়ে গিয়ে জীবনের কোন পথটি গ্রহণযোগ্য হবে তা বাছাইয়ের সুযোগ পায় না। সেক্ষেত্রে তারা দুর্ভাগ্যবান। মত কিন্তু অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের ইন্টারন্যাশনাল বেটসেলার বেবী এন্ড চাইল্ড কেয়ার এর লেখক ড. বেঞ্জামিন স্পক এ বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে দ্বিমত পোষণ করেন। তার একটি গ্রন্থে ড. স্পক লিখেন, “কোন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই বিজ্ঞানটি (পারমার্থিক) গ্রহনের পূর্বে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেক ব্যক্তিই অনুভব করেন যে, তাদের প্রধান কাজ হল ভগবানের সেবা করা। যেটি বাস্তবিকভাবে প্রকাশিত হয় নির্দিষ্ট ধর্মের মাধ্যমে। তাই সেসমস্ত মা-বাবা অনেক ভাগ্যবান যাদের রয়েছে ভগবানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস।” ড. স্পক সিদ্ধান্ত দেন যে, “এ সমস্ত পিতামাতার ছেলেমেয়েরা জীবনের সকল ক্ষেত্রে একটি প্রশান্তি অনুভব করে। তাদের এরকম কোন বদ্ধ ধারণা নেই যে, জীবন মানে জাগতিক কিছু তথাকথিত বাসনাগুলো পূর্ণ করা। বরঞ্চ তারা জড় জগতের এ বদ্ধ তথাকথিত প্রকৃতি অতিক্রম করে ভগবানকে সর্ববস্থাতে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা করো।”
তিনি আরো উল্লেখ করেন, “সৃজনশীলতা, আদর্শতা এবং পারমার্থিকতা নিহিত রয়েছে সব ছেলেমেয়ের হৃদয়ে। যদি পিতামাতারা জাগতিক বিষয়সমূহের প্রয়োজনীয়তার দিকে গুরুত্ব দিয়ে পারমার্থিককে অবহেলা করা হয়, তখন তাদের ছেলেমেয়েরা বিপর্যস্ত হবে। কেননা তারা জীবনের শুরু থেকেই তাদের পিতা-মাতাকে অনুকরণ করতে করতে বেড়ে উঠে। ফলে এক সময় পারমার্থিক ভাবধারা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্পক আরো উল্লেখ করেন, “আজকালকার লোকেরা যাদের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নেই তারা নিঃসন্দেহে বঞ্চিত। কেননা সে সমস্ত লোকেদের অন্য লোকের প্রতি ঠিক ততটা বিশ্বাস থাকে না।”
কৃষ্ণভাবনা, ছেলেমেয়ে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক উভয়ের জন্যই প্রদান করছে সর্বোচ্চ পর্যায়, যার মাধ্যমে সবকিছুই আপনা-আপনিই অর্জিত হয়, যেটি একটি বাস্তবিক প্রক্রিয়া। যেহেতু ভক্ত মা-বাবারা একটি উচ্চ লক্ষ্য (ভগবানের সেবা) নিয়ে অগ্রসর হয়, তাই তাদের ছেলেমেয়েরা এর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়। ড. স্পক যেটিকে বর্ণনা করেছেন, এ সমস্ত ছেলেমেয়েরা একসময় পুষ্পের ন্যায় প্রস্ফুটিত হবে।
যদিও ভক্ত পিতা-মাতারা তাদের ছেলেমেয়েদের একটি বিরল জন্ম নেয়া বিশেষ আত্মা হিসেবে দেখে না কিন্তু অন্যরা তা উপলব্ধি করতে পারে। ভানুকুবারে দু’জন শিক্ষক বলছিলেন, যখন এ সমস্ত ভক্ত ছেলেমেয়েরা নিকটবর্তী পার্কে খেলতে যায় তখন তাদের স্বাভাবিক সুখময় ও উচ্ছ্বসিত প্রবৃত্তি দর্শন করে বাইরের জাগতিক লোকেরাও খুব আনন্দ লাভ করে। কেননা তাদের দর্শনে এটি অনুভূত হয় যে, তারা সত্যিই শুদ্ধ অন্তরে অধিষ্ঠিত থাকে এবং নিষ্কলুষ আনন্দ লাভ করে। ভক্ত পরিবারে জন্ম নেয়া এসব ছেলেমেয়েরা সত্যিই সৌভাগ্যবান। তারা শুধু ভক্ত পিতা-মাতাই পায় না বরং তাদের রয়েছে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতও। যার মাধ্যমে তাদের জীবনের একটি শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের (৪৩-৪৫নং) শ্লোকে বলছেন, “সেই প্রকার জন্মগ্রহণ করার ফলে তিনি পুনরায় তার পূর্ব জন্মকৃত পারমার্থিক চেতনার বুদ্ধিসংযোগ লাভ করে সিদ্ধি লাভের জন্য পুনরায় যত্নবান হন। তিনি পূর্ব জন্মের অভ্যাস বশে যেন অবশ হয়ে যোগ সাধনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রকার যোগশাস্ত্রের বিজ্ঞাসু পুরুষ বেদোক্ত সকাম কর্মমার্গকে অতিক্রম করেন, অর্থাৎ সকাম কর্মমার্গে যে ফল নির্দিষ্ট আছে,
তার থেকে উৎকৃষ্ট ফল লাভ করেন। যোগী ইহজন্মে পূর্বজন্মকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিকতর যত্ন করে পাপ মুক্ত হয়ে পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধন সঞ্চিত সংস্কার দ্বারা সিদ্ধি লাভ করে পরম গতি লাভ করেন।” হরে কৃষ্ণ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন – ২০১১ইং
