কৃষ্ণভাবনামৃতের কল্যাণ

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 54 বার দেখা হয়েছে

কৃষ্ণভাবনামৃতের কল্যাণ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

হিরণ্যকশিপু অমর হতে চেয়েছিল। তাই সে কঠোর তপস্যা করেছিল। এমন কঠিন তপস্যা যে, সারা ব্রহ্মাণ্ড কেঁপে উঠেছিল। তখন ব্রহ্মাজী তাকে শান্ত করার জন্য তার কাছে এসে বললেন, “তুমি কি চাও?” হিরণ্যকশিপু অমর হতে চাইল। তখন ব্রহ্মা বললেন, “আমাকেও তো মৃত্যুবরণ করতে হবে।” ভগবদগীতায় (৮/১৭) ব্রহ্মাজীর জীবনের আয়ু সম্বন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে

সহস্রযুগপর্যন্তমহর্ষ ব্রহ্মণে বিদুঃ।

সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি এই চারটি যুগের মিলিত মোট সময় হচ্ছে তেতাল্লিশ লক্ষ বৎসর। এই সংখ্যাকে এবার এক হাজার দিয়ে গুণ করুন। যে সময়ের হিসাবের সংখ্যাটি বার হবে সেটি হচ্ছে ব্রহ্মার একটি দিনের মাত্র অর্ধেক (আমাদের যেমন ১২ ঘন্টা) সময়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি বৎসর যার আয়ু তাকেও মৃত্যুবরণ করতে হয়। 

ভগবদগীতায় (১৩/৯) বলা হয়েছে- জন্মমৃত্যুজরাব্যাধিদুঃখদোষানুদর্শনম্। 

এই জড় জগতের যেখানেই আপনি যান না কেন, তা সে ব্রহ্মলোকই হোক আর পাতাল লোকই হোক, আপনাকে মরতেই হবে। এটি হল একটি সমস্যা। কৃষ্ণ ভগবদগীতায় বলছেন, “প্রকৃত সমস্যাটি হল জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধি।” হিরণ্যকশিপু এই সমস্যাটির একটি জাগতিক সমাধান করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটি সম্ভব নয়। তাই নঞর্থকভাবে চেয়েছিল আমি মরব না।” যিনি কৃষ্ণের বিনীত সেবকরূপে অবস্থান করেন তাঁর কোন ভয় থাকে না। এমনকি যদি তাঁর বিপদ আসেও তবুও সে রক্ষা পাবে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় (৯/৩১) বলেছেন, কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি। “অর্জুন, একথা তুমি সারা জগতে ঘোষণা করতে পার, যে একবার আমার পাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করে আমার ভক্ত হয়েছে তার কখনও বিনাশ হবে না।

” অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা সূচঃ

(গীতা (১৮/৬৬)। এই হল নিশ্চয়তা। কিন্তু হিরণ্যকশিপুর মতো নাস্তিক শ্রেণীর লোকেরা এটা বুঝতে পারে না। সেটাই তাদের ত্রুটি বা দোষ। তারা সবসময়ে ভগবানকে প্রতিদ্বন্দিতায় আহ্বান করে।

হিরণ্যকশিপু ও প্রহ্লাদ মহারাজ- পিতা ও পুত্রের মধ্যে বিরোধটি হচ্ছে যে, পুত্র ভগবৎ বিশ্বাসী বা কৃষ্ণে বিশ্বাসী কিন্তু পিতা তা নয়। তাই অন্তিমে পিতা মৃত্যুরুপে ভগবানকে দর্শন করলেন। সেই সময়ে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। এটিই হচ্ছে নাস্তিক আর আস্তিকদের মধ্যে পার্থক্য। নাস্তিকরা সর্বদা চ্যালেঞ্জ জানায়, “কোথায় ভগবান দেখবে। এখন নয়। তোমার সকল পাপ-কর্ম পরিণতি লাভ করার পর, যখন মৃত্যু আসবে, তাঁকে তুমি দেখবে। প্রহ্লাদ মহারাজ আমাদের অন্যতম গুরুবর্গের একজন। দ্বাদশ গুরু বা দ্বাদশ মহাজন রয়েছেন।

স্বয়ম্ভুর্নারদঃ শম্ভু কুমারঃ কপিলো মনুঃ।

প্রহ্লাদো জনকো ভীষ্ম বলিবৈয়াসকিবয়ম্।

প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি পারমার্থিক জীবনে অগ্রসর লাভ করতে চাই তাহলে আমাদের এই মহাত্মাগণ, দ্বাদশ মহাজনদের অনুসরণ করতে হবে। শাস্ত্রে এ কথার উল্লেখ রয়েছে। ব্রহ্মা পিতা মাতা ব্যতিরেকে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তাই তাঁর নাম স্বয়ম্ভু। অবশ্যই নারায়ণ তাঁর পিতা। কিন্তু সেটি স্বাভাবিকভাবে নয়। নারদ মুনিও মহাজনগণের একজন। সেভাবে শিব এবং দেবহুতি পুত্র কপিলদেব এবং প্রহ্লাদ মহারাজও। গুরুপরম্পরাক্রমেও প্রহ্লাদ মহারাজ আমাদের গুরু ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা (শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১৭/১৮৬)। ধর্মের পথ কি তা নিয়ে আমরা কোন পরিকল্পনা করতে পারি না। এটি খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন কেননা বিভিন্ন শাস্ত্র রয়েছে এবং অসংখ্য দার্শনিক রয়েছেন। নাসৌ মুনিৰ্যস্য মতং ন ভিন্নম্ (মহাভারত, বন পর্ব, ৩১৩/১১৭) প্রতিটি দার্শনিকের বিভিন্ন মত। তাহলে প্রকৃত ধর্মের পথ কিভাবে পাওয়া যাবে? সেটি শাস্ত্রে এইভাবে নির্দেশিত হয়েছে যে মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ। কেবল মহাজনগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। আর প্রহ্লাদ মহারাজ সেই মহাজনগণের একজন। প্রহ্লাদ মহারাজের জন্ম হয়েছিল দৈত্য-কুলে। তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপু ছিল একজন দানব। প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর পিতাকে অসুরবর্য অর্থাৎ ‘অসুরশ্রেষ্ঠ’ রূপে সম্বোধন করতেন। তিনি কখনই বলেননি, “প্রিয় পিতৃদেব”।

একদিন হিরণ্যকশিপু আদর করে তার পুত্রকে বললেন, “প্রিয় পুত্র, তুমি যে শ্রেষ্ঠ বস্তু শিক্ষা লাভ করেছ, তা আমাকে বল।”

প্রহ্লাদ মহারাজ উত্তর দিলেন-

তৎ সাধু মন্যেহসুরবর্য

দেহিনাং সদা সমুদ্বিগ্নধিয়ামসহাৎ।

হিত্বাত্নপাতং গৃহমন্ধকূপং

বনং গতো যদ্ধরিমাশ্রয়েত ॥

“হে অসুরশ্রেষ্ঠ দৈত্যরাজ, এই জাগতিক জীবন, জড়জাগতিক জীবন ঠিক যেন অন্ধকূপে পড়ে আত্মহত্যার মতো। তাই তা পরিত্যাগ করা উচিত এবং বনে গমন করে কৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। সেটিই জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ।” এই কথা শ্রবণ করে তাঁর পিতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। ঠিক যেমন নাস্তিক ও আস্তিকদের মধ্যে কখনও মতের মিল হয় না, কিন্তু আস্তিকগণ কখনই নাস্তিকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। এটিই হচ্ছে নীতি। প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর পিতার দ্বারা কত দুর্দশা, কত যন্ত্রণার মধ্যে পতিত হয়েছিলেন কিন্তু কখনই ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ জপ করতে ভোলেন নি। তিনি কখনই বিস্মৃত হন নি। তাই এই কাহিনী থেকে আমাদের এই শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, এমনকি ভয়ঙ্কর অবস্থাতেও আমাদের কৃষ্ণকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। কৃষ্ণ আমাদের রক্ষা করবেন সে কথা ভগবদ্গীতায় (৬/২০-২৩) বলা হয়েছে-

যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।

যস্মিন স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে

কৃষ্ণভাবনামৃত এই সুন্দর যে যদি কেউ কৃষ্ণভাবনামৃত লাভ করে যং লব্ধা চ অপরং লাভং-অন্য কোন কল্যাণ বা লাভ কখনও বিবেচ্য নয়। এটি এতই সুন্দর। ঠিক প্রহ্লাদ মহারাজের মতো। ভগবান নৃসিংহদেব তাঁকে সকল বর প্রদান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রহাদ মহারাজ নিজের জন্য কিছুই চাইলেন না। বরং তিনি এতই দয়ালু যে পাষণ্ড পিতা কর্তৃক নির্মম নির্যাতন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি নৃসিংহদেবের কাছে পিতার মুক্তি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু নৃসিংহদেব তাঁকে জানালেন যে, “তোমার চৌদ্দ পুরুষের সকলেই এই পরিবারে তোমার মতো এক পুত্র থাকার জন্য মুক্তি লাভ করেছে।” যদি কোন বংশের কোন পুত্র শুদ্ধ বৈষ্ণব হন, ভক্ত হন, তাহলে তিনি তাঁর চৌদ্দ পুরুষকে উদ্ধার করেন। কৃষ্ণভাবনামৃতের এই হচ্ছে কল্যাণ।

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।