এই পোস্টটি 94 বার দেখা হয়েছে
শরৎকালে রাত্রির চন্দ্রকিরণ অতি উজ্জ্বল। মহাপ্রভু সেই রমণীয় রাত্রিতে তাঁর ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে ভাগবত শ্লোক। পড়তে পড়তে উদ্যানে উদ্যানে ভ্রমণ করছিলেন। এভাবে ভ্রমণ করতে করতে সেই জ্যোৎস্না রাতে তিনি হঠাৎ আইটোটা থেকে সমুদ্র দেখলেন। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় সমুদ্রের তরঙ্গ ঝলমল করায় মন প্রফুল্লিত হচ্ছিল। মহাপ্রভু সেই সময় ভাবাবেশে সমুদ্রকে যমুনা নদী বলে ভুল করে সকলের অলক্ষ্যে ছুটে গিয়ে সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিলেন। সমুদ্রে পড়া মাত্রই তিনি মূর্ছিত হলেন। তাঁর সমুদ্রে এ প্রকার অবস্থার এক মাধুর্যময় বর্ণনা প্রদান করে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী তাঁর প্রতি শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে অন্ত্যলীলায় বর্ণনা করেছেন-
চন্দ্রকানেত্য উছলিত তরঙ্গ উজ্জ্বল।
ঝলমল করে, যেন ‘যমুনার জল’ ।
যমুনার ভ্রমে প্রভু ধাঞা চলিলা।
অলক্ষিতে যাই’ সিন্ধু জলে ঝাঁপ দিলা ॥
পড়িতেই হৈল মূর্ছা, কিছুই না জানে।
কভু ডুবায়, কভু ভাসায় তরঙ্গের গণে।
তরঙ্গে বহিয়া ফিরে, যেন শুষ্ক কাষ্ঠ।
কে বুঝিতে পারে ঐ চৈতন্যের নাট?
-(চৈ, চ. অন্ত্য ১৮/২৭-৩)এভাবে মূর্ছিত অবস্থায় তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে কোণার্ক অভিমুখে চললেন।
এদিকে স্বরূপ দামোদর প্রমুখ ভক্তরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখতে না পেয়ে ইতস্তত ভ্রমণ করতে করতে তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে রাত্রি শেষ হয়ে গেল কিন্তু কোথাও তাঁকে পেলেন না। তখ সবাই তাঁর অন্তর্ধানের কথা চিন্তা করলেন। তাঁরা মহাপ্রভুর বিচ্ছেদ সহ্য করতে না পেরে পুনর্বার খুঁজতে লাগলেন। এমন সময় স্বরূপ দামেদার দেখতে পেলেন যে, একটি জেলে কাঁধে জাল নিয়ে অদ্ভুত ভাবাবেশে ‘হরি, হরি’ বলে নাচতে নাচতে আসছে। জেলেটির ঐরকম ভাবাবেশ অবস্থা দেখে স্বরূপ দামোদর গোস্বামী তাকে তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
সেই জেলেটি তখন উত্তর দিলো, “আমি যখন জলে জাল ফেলেছিলাম তখন একটি মৃতদেহ আমার জালে ধরা পড়ে। আমি তাঁকে একটি বড় মাছ ধরা পড়েছে বলে মনে করে অনেক যত্ন সহকারে জাল টেনে তুললাম, কিন্তু যখন সেই মৃতদেহটিকে জাল থেকে ছাড়াচ্ছিলাম তখন আমার তাঁর অঙ্গ স্পর্শ হওয়া মাত্রেই সেই মৃতদেহটি ভূতরূপে আমার হৃদয়ে প্রবশ করল। সেজন্যে আমার শরীরে এই সমস্ত অশ্রু কম্পাদি বিকার হয়েছে। সেই ভূতটি গোঁ-গোঁ শব্দ করছে। আবার সেই জেলেটি আরও বলতে লাগলেন, “আমি যদি মরে যাই, তাহলে আমার স্ত্রী-পুত্র বাঁচবে কেমন করে? তাই আমি ওঝার কাছে যাচ্ছি ভূত ছাড়াবার জন্যে। আমি প্রতি রাতে মাছ ধরার জন্য একা নির্জন স্থানে ঘুরে বেড়াই, নৃসিংহদেবকে স্মরণ করার ফলে ভূত-প্রেত আমার কিছু করতে পারে না। কিন্তু কি আশ্চর্য। এই ভূতটি নৃসিংহ-মন্ত্র উচ্চারণ করলে দ্বিগুণ শক্তিতে চেপে ধরে। আমি আপনাদের নিষেধ করছি, আপনারা ওদিকে যাবেন না। জেলের মুখে সেকথা শুনে স্বরূপ দামোদর গোস্বামী সব কিছু বুঝতে পারলেন এবং তখন তিনি সুমধুর স্বরে সেই জেলেটিকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, “আমি একজন খুব বড় ওঝা। কি করে ভূত তাড়াতে হয় তা আমি জানি। তুমি ভয় পেয়ো না। তুমি যাঁকে ভূত বলে মনে করছ, তিনি ভূত নন। তিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু। প্রেমাবিষ্ট হয়ে তিনি সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং তুমি তাঁকে তোমার জাল দিয়ে ধরে জল থেকে উঠিয়েছ। কেবল তাঁর স্পর্শের ফলে তোমার সুপ্ত কৃষ্ণপ্রেম জাগরিত হয়েছিল।
চৈতন্য সন্দেশ জুলাই ২০১১ইং
