এই পোস্টটি 111 বার দেখা হয়েছে
শ্রীমৎ মুকুন্দ গোস্বামী মহারাজ
পারমার্থিক জগতের পরম মঙ্গলময় পথ হল ভক্তিযোগ। আমরা ভাগ্যবান যে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য, ভগবানের শুদ্ধভক্ত ও আমাদের পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ভগবানের দিব্য নামের ধ্বনির মাধ্যমে আমাদের ভক্তিযোগের সহজ পথটির সন্ধান দিয়েছেন। জগতের সকল মহান মুনি ঋষিদের এই একই আচরণ। তাঁরা এই জগতে আসেন আমাদের পরম মঙ্গলময় পথটি প্রদর্শন করতে এবং কি করতে হবে আর কিভাবে করতে হবে তা বলে দিতে। যে কেউই এই সকল মহাত্মাগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের নিজ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনের পথে অগ্রসর হতে পারেন।
সারা পৃথিবী আজ পাশ্চাত্য দেশগুলির ভোগবাদী নীতিকে অনুসরণ করে সুখী হতে চাইছে। যদিও সুখী হতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু এই ভ্রান্ত নীতি অনুসরনের ফলে মানুষের মধ্যে সমস্ত সদ্গুণগুলির বিলুপ্তি হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে, এমনকি এই দেশ ভারতেও পাশ্চাত্য সভ্যতা তার কুপ্রভাবগুলিই বিস্তার করছে। শ্রীল প্রভুপাদ তাই ভারতের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি, ভগবদ্ভক্তির সহজ পথের সন্ধান, পাশ্চাত্য জগতের মানুষদের কাছে প্রদান করেছেন এবং প্রচার করেছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই নির্দেশ ‘যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ উপদেশ।’ কেন এই নির্দেশ? কেননা প্রত্যেকের উচিত অন্য সকলের জন্য জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যসাধক পথ নির্দেশটি প্রদান করা। প্রথমে সেটি উপযুক্ত ব্যক্তির থেকে জানতে হবে, তারপর সেটি অন্যকে জানাতে হবে। এই দায় ও দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের উপর বর্তায়।
জীব যখনই এই জগতে জন্মগ্রহণ করে, সে নানা প্রকার দায় ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। মহান মুনি ঋষিদের প্রতি দায়, পিতা মাতার প্রতি দায়, পরিবার পরিজনদের প্রতি দায় এবং সকল জীবের প্রতি দায়। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে যে বিশেষ দায়ের বর্ণনা করা হয়েছে সেটি চরম সিদ্ধিদায়ক, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যা আত্মার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। আত্মোপলব্ধি। এই জ্ঞানই সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ। এই জ্ঞানের ফলে ভববন্ধন মোচন হয়। আমরা যদি সেই পারমার্থিক জ্ঞান বা চেতনা লাভ করতে চাই, তাহলে আমাদের জড়া প্রকৃতির গুণের উর্ধ্বে উঠতে হবে। জড়া প্রকৃতির গুণগুলি সর্বদাই মিশ্র থাকে। যেমন, শ্রীল প্রভুপাদ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন, শীতল জল তৃষ্ণার পক্ষে স্নানের পক্ষে খুবই আনন্দদায়ক, কিন্তু যখন খুব শীত হয়, তখন সেই জলই কষ্টদায়ক হয়ে উঠে। যখন কারো পুত্রের জন্ম হয়, সেটি তার জন্য অতীব আনন্দের বিষয়। কিন্তু যদি সেই পুত্র মা বাবার অবাধ্য হয়ে দুরাচারী, বেপরোয়া হয়ে উঠে তখন তা হয়ে উঠে যন্ত্রণাদায়ক। অথবা সেই প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের মৃত্যু হলে তখন সেই পুত্রই শোকের কারণ হয়ে উঠে। এ বিষয়ে আমরা চিত্রকেতুর পুত্রের জন্য শোকের কাহিনী অবগত। যে কোন জিনিস তা যত ভালই হোক না কেন, তার চরম শেষ আছেই, কেননা জড় জগৎটাকেইতো একদিন শেষ হতে হবে। যাই হোক, আমরা যদি প্রকৃতির গুণের উর্ধ্বে না উঠি, তবে মায়া প্রকৃতি আমাদের ক্রমাগতই আক্রমণ করতে থাকবে এবং সেই মায়ার বন্ধনে আমরা হাত পা বাঁধা থাকার মতো অসহায় অবস্থায় এই জড় জগতে পড়ে থাকব।
পারমার্থিক জ্ঞান আমরা উপযুক্ত সকলের থেকেই আহরণ করতে পারি। এমনকি পুত্রের কাছ থেকেও সেই জ্ঞান আহরিত হতে পারে। ভগবান কপিলদেব এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মাতা দেবহুতি পুত্র কপিলদেবের কাছ থেকে পারমার্থিক জ্ঞান আহরণ করেছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ প্রায়ই চাণক্য পণ্ডিতের উদ্ধৃতি প্রদান করতেন। এই ভারতের চাণক্য পণ্ডিত ছিলেন পৃথিবীর সর্বকালীন সেরা কূটনীতিবিদ। সেই চাণক্য পণ্ডিত বলেছেন, ‘কেউ কোন জ্ঞান সমৃদ্ধ কথা বললেই তার থেকে কিছু শেখা উচিত। ঠিক যেমন উচ্চ বংশজাত না হলেও যদি কোনও নারী উপযুক্ত গুণসম্পন্ন হয়, তবে তাকে পত্নী হিসাবে গ্রহণ করা যায়। সোনা যদি জঞ্জালে পড়ে থাকে, তবু তা গ্রহণযোগ্য। বৈদিক শাস্ত্রেও মানুষের শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে মানুষের গুণ অনুসারে। বংশ পরম্পরা অনুযায়ী নয়। ব্রাহ্মণের সন্তান যদি ব্রাহ্মণোচিত গুণের অধিকারী না হয় তবে তাকে ব্রাহ্মণ বলে গণ্য করা যায় না। অপরপক্ষে যদি কোন শূদ্রের সন্তান ব্রাহ্মণোচিত গুণাবলীর অধিকারী হয়, তবে তাকে ব্রাহ্মণ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আজকাল সবকিছু ভুলভাবে অনুসৃত হচ্ছে। কেউই প্রকৃত শিক্ষাটি অনুসরণ করছে না। এখনকার পৃথিবীতে মানুষ ভোগবাদ ও এক ধরনের সুবিধাবাদের ভ্রান্ত ফাঁদে আটকে পড়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ এখনকার সমাজের সমগ্র পদ্ধতিটির প্রসঙ্গেই বলেছিলেন সরকারি মানসিকতা, জনগণের যান্ত্রিকতা, সেইসঙ্গে দার্শনিকগণ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতারা, বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠি-সকলেই মানুষকে ভুলপথে চালিত করছে। সেইজন্য শ্রীল প্রভুপাদ মানুষকে এই ভুলপথে থেকে বাঁচাতে ভবিষ্যতের কয়েক দশকের অগ্রিম পরিকল্পনা করেছিলেন–কিভাবে পৃথিবীকে দ্রুত কৃষ্ণভাবনায় রূপান্তরিত করা যায়।
প্রতিদিন প্রাতঃভ্রমণের সময় শ্রীল প্রভুপাদ তাই তাঁর ভক্তদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন–সাধারণ প্রসঙ্গ, সাম্প্রতিক ভক্ত সমাজের আলোচ্য বিষয়ের প্রসঙ্গ, চন্দ্রাভিযান ইত্যাদি। যখনই উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা ঘটত, তিনি ভক্তদের কৃষ্ণভাবনামৃতের আলোকে সেই চিন্তায় অংশগ্রহণ করাতেন বা সে বিষয়ে ভাবনায় নিযুক্ত করতেন–‘তোমরা কি এই নিয়ে কিছু ভেবেছ, কিছু করছ কি, এসব বিষয়ে, যা সারা বিশ্বকে একের পর এক আলোড়িত করছে তোমাদের এই বিষয়ে কোন চিন্তাধারা বা পরিকল্পনা আছে কি? এভাবে শ্রীল প্রভুপাদ সমস্ত জগৎটাকে উদ্ধারের কথা চিন্তা করতেন। কৃষ্ণভাবনামৃতের সহজ পন্থার মাধ্যমে জগতের মানুষ যাতে প্রকৃত সুখের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থভাবে অত্যন্ত আগ্রহী। প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের জীবনের ব্রত, যে ব্রতসাধনে আমাদের সকলকে তিনি আজ নিযুক্ত করে গেছেন।
বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাসে কেউ কখনও শ্রীল প্রভুপাদের মতো সারা জগতকে নিয়ে কাজে নামেননি। তার প্রদত্ত সেইসব নির্দেশ ও কাজের মাধ্যমে, কৃষ্ণভাবনামৃতের সঠিক আলোক ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিকল্পনামাফিক পদ্ধতিতে, জাগতিক উন্নতির প্রচেষ্টায় রত ভ্রান্ত পথে চলা মানুষকে যাতে তার জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্যসাধক সঠিক পথে নিয়োজিত করা যায় এবং তাদের সদ্গুণগুলিকে মায়ার কবল থেকে রক্ষা করে পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানে যথাযথভাবে নিয়োজিত করা যেতে পারে। সেই দায়িত্বই সদ্গুরু পরম্পরাক্রমে শ্রীল প্রভুপাদের কাছ থেকে ইস্কন লাভ করেছে। হরে কৃষ্ণ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, এপ্রিল – ২০১১ইং
