এই পোস্টটি 156 বার দেখা হয়েছে
মুরারী গুপ্ত দাসের Who will win the world cup?
ভারতীয় ক্রিকেট তারকা শচীন টেন্ডুলকারের জনপ্রিয়তা এত বেশি যে, সে দেশের বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে এমনও লেখা হয়: ‘ক্রিকেট আমাদের ধর্ম এবং শচীন হল আমাদের ভগবান’। সে দেশের জনগণ এই সুপারস্টারকে এতটাই ভালোবাসে যে কখনো কখনো শচীনকে ভগবানের আসনেও বসানো হয়। ক্রিকেটে যারা জয়ী হয় তাদেরকে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বে মাতামাতি হয়। তখন কোটি কোটি অর্থ লাভের সুবর্ণ সুযোগও চলে আসে। এ মাস থেকে শুরু হওয়া ফুটবলের পর জনপ্রিয় ক্রিকেট বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চলছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তুমুল উত্তেজনা। মিডিয়াগুলো জোড়েসোরে এর উত্তেজনা বৃদ্ধি করে চলেছে। ভারতের এখন সর্বোচ্চ আলোচিত গুঞ্জনটি হল কপিল দেবের অধীনে বিশ্বকাপ জয়ের মত সেই ১৯৮৩ আবারও ফিরে আসবে কি?
সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ, জড় জগতে এটি হল উভয়সঙ্কট অবস্থা। যেখানে কষ্টার্জিত জয়ও বেশীদিন স্থায়ী থাকে না। যেখানে প্রতিদিন অনেক অনেক নতুন স্টার জন্ম নিচ্ছে আবার তারা মৃত্যুর মাধ্যমে হারিয়েও যাচ্ছে। একটি খেলায় জেতার পর আবারও চলে আসে নতুন উদ্বিগ্নতা ‘পরবর্তী খেলায় জিতব তো?’
আমরা যদি জড়জগতের স্পোর্টস চ্যানেলগুলো বন্ধ করে একটু শ্রীমদ্ভাগবতের পৃষ্ঠা উল্টাই তখন দেখব চিন্ময় জগতে বিভিন্ন চিন্ময় খেলাধুলা রয়েছে। ভগবান কৃষ্ণ তার অন্তরঙ্গ সেবকদের সঙ্গে নিজ খেলায় মজে থাকেন। তিনি লুকোচুরি, রেসলিং বা কুস্তি, দৌড় প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, দোলনা প্রতিযোগিতা, জল ক্রীড়া, পাশা খেলা, রঙ ছোড়াছুড়ি ইত্যাদি অনেকপ্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেসব খেলায় এ জড়জগতের মত নেই কোন ঈর্ষা, স্বার্থপরতা কিংবা প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার উদ্বিগ্নতা। জয়ে যেমন আনন্দ তেমনি হেরেও অফুরন্ত চিন্ময় আনন্দ লাভ হয়। মাঝে মাঝে যখন কৃষ্ণ হেরে যায় তার সখারা তাকে কাঁধে নিয়ে হৈ হুলুর করে। আবার যখন তিনি শ্রীমতী রাধারাণী বা গোপীদের কাছে হেরে যায় তখন তিনি তাদের দাস হয়ে পড়েন। এভাবে প্রত্যেকেই চিন্ময় আনন্দের সাথে দিন শেষ করেন।
পক্ষান্তরে জড়জগতের পরিস্থিতি হল একজনের জন্য যা আশীর্বাদস্বরূপ অন্যজনের জন্য তা তিক্ততা। এক দেশের জন্য ‘হল অফ ফেম’ হলে অন্য দেশের জন্য তা ‘হল অফ শেম’। যে হারে সে চাপা ক্ষোভে থাকে কখন হারের প্রতিশোধ নেবে? সুযোগ নিয়ে বিপরীত দলকে হারালেও সেও কি চিরস্থায়ী স্বস্তি অনুভব করে? নিশ্চয়ই না। কেননা তাকে হারানোর জন্য অন্য দলও প্রস্তুত। যখন সে জয়ী হয় তখন তার কাছে লক্ষ টাকার হাতছানি থাকলেও সে দেশের জনগণের অতিরিক্ত চাহিদা এবং আরো আরো খেলার উত্তেজনার কারণে প্রচণ্ড চাপ সে অনুভব করে। তাহলে ফলটা কি দাড়াল? যেইমাত্র সেই জয়ী ব্যক্তি ফর্ম হারিয়ে ফেলে তখন তার জনপ্রিয়তাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাকে ইতিহাসের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা হয়।
বিপরীত দলকে হারালেও সেও কি চিরস্থায়ী স্বস্তি অনুভব করে? নিশ্চয়ই না। কেননা তাকে হারানোর জন্য অন্য দলও প্রস্তুত। যখন সে জয়ী হয় তখন তার কাছে লক্ষ টাকার হাতছানি থাকলেও সে দেশের জনগণের অতিরিক্ত চাহিদা এবং আরো আরো খেলার উত্তেজনার কারণে প্রচণ্ড চাপ সে অনুভব করে। তাহলে ফলটা কি দাড়াল? যেইমাত্র সেই জয়ী ব্যক্তি ফর্ম হারিয়ে ফেলে তখন তার জনপ্রিয়তাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাকে ইতিহাসের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা হয়।
খেলার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা
প্রায়ই দেখা যায়, যারা বিজয়ী হয় তাদেরকে ভক্তরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়। কিন্তু যদি হারে সেই ভক্তরাই খেলোয়াড়দের কুশপুত্তলিকা দাহ করে, তাদের ঘরে পাথর ছুড়ে মারে, হত্যার হুমকি দেয় ইত্যাদি। এরকম মিশ্র প্রতিক্রিয়া কেন হয়? কেন খেলায় পরাজয় একটি দেশকেও হতাশায় ডুবায়? এর কারণ হল আমাদের মিথ্যা অহঙ্কার। মিথ্যা অহঙ্কারের কারণেই আমরা এই জড় জগতে পতিত হয়েছি। আমরা কৃষ্ণকে ভুলে গিয়ে নাম, যশ, সম্মান, খ্যাতি ইত্যাদি চাই। আমরাই একমাত্র জড় জগতের কেন্দ্রবিন্দু হতে চাই। সবসময়ই জয়ী হতে চাই। তাই টিভিতে যখন খেলা দেখি তখন সেটি আর রিল্যাক্স মুডে খেলা দেখার মত স্বাভাবিক অবস্থা থাকে না। কেননা আমাদের একান্ত চাওয়া যে, আমার প্রিয় দলই জিতুক। মোট কথা, কেউই পরাজয় চায় না। তাই আধুনিক খেলাগুলো ক্ষতিকর নয় এমনটি মনে করা ঠিক নয়। আমাদের মনের কোণে ঠিকই এর পেছনে ঈর্ষা, গর্ব, কলুষতা, লোভ এবং মিথ্যা ইত্যাদি কাজ করে। তাই ভক্তরা এসব পরিহার করে। আর সেজন্যেই হরেকৃষ্ণ ভক্তের কোন নির্দিষ্ট ক্রিকেট দলও নেই।
এবং জয়ী তিনিই….
মিডিয়ার কল্যাণে প্রায় বিলিয়ন বিলিয়ন লোক এই খেলা উপভোগ করবে। ইতোমধ্যেই মিডিয়াগুলো নড়ে চড়ে বসেছে খেলার ফাঁকে বিজ্ঞাপন এর হুলস্থুল প্রচারের জন্য। প্রতি ম্যাচের পরিধি প্রায় ৮ ঘন্টা এবং ছয় বল অন্তর অন্তর বিরতির সুযোগে বিজ্ঞাপনদাতারাও তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করে নেয়। দর্শকরাও নজরকাড়া বিজ্ঞাপনগুলোর মাধ্যমে আকর্ষিত হয়। তাই খুব কম দর্শকই ক্রিকেট ছেড়ে অন্য চ্যানেলে যেতে চায়। সেজন্য অনেকের জন্যেই ক্রিকেট হল অর্থ আয়ের একটি সেরা উৎস আর তাই তারাও জোড়েসোরে ক্রিকেটের প্রচার বৃদ্ধি করে। তাই তো ক্রিকেট নিয়ে কত প্রোগ্রাম, প্রতিবেদন, হাইলাইটস, রিপ্লে, টক শো ইত্যাদি প্রতিনিয়ত সম্প্রচারিত হয়। এর ফলে লোকেরা শুধু ক্রিকেটই দেখে না, দেখে শত শত বিজ্ঞাপনও। যারা বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করে তাদের কোন মাথা ব্যাথাই নেই যে, কি জিতল আর কে হারল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য পণ্যটা দর্শকদের নজরে আসুক। বিশ্বকাপ শেষে কি হবে? জয়ী দলের ক্যাপ্টেন গর্বের সহিত তার টিমের প্রশংসা করবে। আর হারলে সু-কৌশলে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করবে। বিজয়ী দল বিশ্বকাপ জেতার পর স্টেডিয়ামের মাঠ জুড়ে দৌড়াবে আর সেলিব্রেট করবে। অনেক ভক্ত তাদের সঙ্গে এ বিজয় উদ্যাপন করবে। আর যারা তাদের ভক্ত নয় তারা ভাঙা হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে। পরদিন একজন ঝাড়দার এসে স্টেডিয়ামের চার, ছয়ের পোস্টারগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলবে। এভাবে এই খেলার সমাপ্তি ঘটবে।কিন্তু হরে কৃষ্ণ ভক্তদের ক্ষেত্রে এসব মেগা শো অত্যন্ত স্বাভাবিক। বরঞ্চ তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় খেলাসমূহের ধ্যান করতে করতে চিন্ময় আনন্দে তাদের হরিনাম জপ অনুশীলন করে যায়। যারা বলে ‘ক্রিকেট আমাদের ধর্ম, শচীন আমাদের ভগবান’ তাদের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণভক্তরা বলে ‘কৃষ্ণভক্তি হল আমাদের ধর্ম এবং শচীনন্দনই হল আমাদের ভগবান।’ তাই বিশ্বকাপে জন্য স্তুতি নয় বরঞ্চ বিম্ব পিতার কৃপার জন্য স্তুতি প্রার্থনায় আমাদের আনন্দ ও নিজ আলয় লাভকরার পরম সুযোেগ আসবে। পছন্দের স্বাধীনতা আপনারই, বিশ্বকাপ নাকি বিশ্বপিতা। হরে কৃষ্ণ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ , ফেব্রুয়ারি -২০১১ইং
