৫০ দিয়ে নতুন ৫০ শুরু

0
108

লন্ডনের সোহোতে এবং ভক্তিবেদান্ত মেনরে গত জুলাই মাসে মহা সমারোহে।
উদ্‌যাপিত হয়ে গেল ইস্‌কনের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব।

সর্বানন্দ দাস


নাটকের মাধ্যমে ব্রিটেন জয়ের সূচনা

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অর্থাৎ ২ জুলাই একটি মঞ্চ নাটক প্রদর্শনীর মাধ্যমে শুরু হয় এই উদ্‌যাপন। লন্ডনের বিশেষ একটি ভক্তদের দল শ্রীল প্রভুপাদের পাশ্চ্যত্য গমনের ঘটনাটি মঞ্চায়িত করে। হারো আর্ট সেন্টারের ৬৫ জন ব্যক্তি এই ঘটনাটি খুব সুন্দরভাবে মঞ্চায়িত করে। এই মহাকাব্যিক কাহিনি তুলে ধরা হয় কলকাতায় শ্রীল প্রভুপাদের বাল্য জীবন, যুবক বয়সে তাঁর গুরুদেবের সান্নিধ্য লাভ, জলদূত জাহাজে করে আমেরিকার উদ্দেশ্যে দুঃসাহসিক সেই যাত্রা এবং নিউইয়র্কে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠা। শুধু তাই নয় কিভাবে এই কৃষ্ণভাবনামৃত দ্রুত সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং কিভাবে তিনি মহিমান্বিত ভাবে অপ্রকট হন সেই লীলা কাহিনিগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। সেই মঞ্চ নাটক উপভোগ করেন ৪০০ জন দর্শক এবং শ্রীল প্রভুপাদ রূপে মিলান পারমার-এর অভিনয় ও তার চার পাশের অন্যান্য অভিনেতাদের অভিনয় সবাইকে অশ্রুসিক্ত করে। মঞ্চ নাটকটির পরিচালক অভিষেক যোশিলেন, “নাটকটির যে রকম সাড়া মেলেছে তা অত্যন্ত উৎসাহপ্রদ। শ্রীল প্রভুপাদ যেরকমটি বলেছিলেন এটি মাত্র সবে নতুন একটি যুগের আরম্ভ যা ব্রিটেনকে নাটকের মাধ্যমে জয় করবে। পারমার্থিক কোনো কিছুর এটি হলো সবে মাত্র শুরু।”

৫০টি হরে কৃষ্ণ সুর

পরবর্তীতে অর্থাৎ ৯ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত লন্ডনের সোহো সেন্টের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় “লন্ডন মেলোস” নামে এক কীর্তন মেলা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সারাদেশ থেকে আগত ৫০০ জন অংশগ্রহণকারীর সম্মিলিত হরিনাম কীর্তনের মাধ্যমে এক জমকালো পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ইস্‌কন ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রেকর্ড করা হয় ৫০টি হরেকৃষ্ণ সুর। এটি দ্বৈত অ্যালবাম হিসেবে উদ্বোধন করা হবে আগামী নভেম্বরে শ্রীশ্রী রাধালন্ডনেশ্বর বিগ্রহের ৪৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে।
কীর্তনীয়াদের মধ্যে ছিলেন জয়দেব দাস যিনি শ্রোতাদেরকে ‘মন্ত্র কয়ের’ নামে এক ধরনের একটি কৌশলের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ অন্য একটি স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিখ্যাত, রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ জয়নিতাই দাস যিনি ৭০ এর দশকে শ্রীল প্রভুপাদের গাওয়া হরে কৃষ্ণ সুর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন; রেকর্ডিং শিল্পী আনন্দ মোনেট; জাহ্নবী হ্যারিসন এবং স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত রাধা লন্ডনেশ্বর দাস।
অনেক পরিবারের শিশুরাও এই কীর্তনমেলায় হৃদয় উজাড় করে কীর্তন করেন। আর এই কীর্তন মেলাকে আরো রসদ জোগাতে সংযোজন করা হয় ইলেকট্রনিক ড্রাম লুবস, বেইজ গিটার, স্প্যানিশ গিটার ও স্যাক্সোফোন। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা ধরে শ্রীশ্রী রাধা লন্ডনেশ্বর ও শ্রীল প্রভুপাদের উদ্দেশ্যে নিরবচ্ছিন্ন এই কীর্তন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। যা ইস্‌কনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করে।

পরবর্তী ৫০ বছরের সূচনা এখন থেকেই

১০ জুলাই ভক্তিবেদান্ত মেনরের একটি নতুন ভবন উদ্বোধন কালে উপস্থিত ছিলেন সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেবিড ক্যামেরন। তিনি এক বক্তৃতায় শ্রীল প্রভুপাদ ও ইস্‌কনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “এটি একটি বিশেষ সময়। ৫০ বছর পূর্বে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী, প্রভুপাদ ইস্‌কন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ৭০ বছর বয়সে। তিনি ভারত থেকে বোষ্টনের উদ্দেশ্যে জাহাজে করে। পাড়ি দেন। যাত্রা পথে তিনি দু’বার হৃদরোগের শিকার হন। তিনি কপর্দকহীনভাবে একাকি আমেরিকায় এসে পৌঁছান। তিনি সারা বিশ্ব ভ্রমণ করে তাঁর বার্তা প্রদানের মাধ্যমে এই বৈশ্বিক মিশনকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মিশনটি একশ’টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে, ৬৫০টি মন্দির, কেন্দ্র ও স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রতিদিন ভারতে ১.২ মিলিয়ন (১২ লক্ষ) দরিদ্র শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে সেবা করে চলেছে। চলুন আমরা সেই আশ্চর্যকর অর্জনগুলোর কথা শ্রবণ করি। যদি তিনি প্রকট থাকতেন তবে তিনি দেখতেন যে, মেনরে কি রকম পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যেটি একসময় অসাধারণ একজন ব্যক্তি বিটলসের জর্জ হ্যারিসন দান করেছিলেন। যেটি এখন ভগবানের আরাধনা, উৎসব উদ্‌যাপনের একটি গৃহ হিসেবে সেবিত হচ্ছে। বৃটিশরা এর চেয়ে অধিক কি করতে পারে যেখানে দশকের পর দশক ধরে আপনারা এই অনুশীলনের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন যা মন্দির ছাড়িয়ে গৃহে গৃহে পৌঁছে গেছে। যারা লন্ডন জুড়ে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মাঝে তিন বেলা অপ্রকৃত কৃষ্ণ প্রসাদ সরবরাহ করছেন। যাদের পূর্ণ সহযোগীতা প্রয়োজন তাদের পূর্ণ সহায়তা প্রদান করছেন। আমি ফিরে তাকাই গত ৫০ বছরে কত কিছু অর্জন করেছেন এবং আমি জানি আপনার পরবর্তী ৫০ বছরে আরো কত কিছু অর্জন করবেন। আসলে পরবর্তী ৫০ বছরের সূচনা ঠিক এখন থেকেই হয়েছে। কেননা আমরা এই মাত্র একটি পারমার্থিক গৃহ ‘দ্যা কৃষ্ণ হ্যাবেলি’ উদ্বোধন করলাম। আমি অনেক জায়গায় গৃহ উদ্বোধনের জন্য অনেক কোদাল ধরেছি কিন্তু তাবুর অভ্যন্তরে কখনো এই রকম উদ্বোধন ইতোপূর্বে করিনি। প্রথমবার আমি এটি করেছি এবং এটি করতে আমি রোমাঞ্চিত অনুভব করছি। আপনারা গত ৫০ বছরে এই মেনরে যা কিছু অর্জন করেছেন এই সবকিছুর জন্য আমি আপনাদের স্বাগত জানাই। এই রকম অসাধারণ একটি কার্য সাধন করে আপনারা আমাদেরও বলতে দিন যে, কিভাবে বৈশ্বিক শান্তি অর্জনের পূর্বে আভ্যন্তরীন শান্তি অর্জন করার প্রয়োজন রয়েছে। এই অসাধারণ কার্যগুলি আপনারা অব্যাহত রাখুন। আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও হরেকৃষ্ণ।
উল্লেখ্য, উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী, শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী, শ্রীমৎ শিবরাম স্বামী, শ্রীমৎ ইন্দ্রদুম্ন্য স্বামীসহ ইস্‌কনের বহু নেতৃস্থানীয় ভক্ত।

বিবিসি লন্ডন চ্যানেলে লক্ষ দর্শকের জোয়ার

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১৩ জুলাই, এদিনেই ইস্‌কন প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সাধিত হয়েছিল। ইস্‌কন লন্ডনও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে স্মরণ করে রাখার জন্য আয়োজন করল জমকালো সব অনুষ্ঠান। পুরো ভক্তিবেদান্ত মেনর রঙের আলোকে উদ্ভাসিত হলো। বিগ্রহের বেদী থেকে শুরু করে শ্রীল প্রভুপাদের ব্যাস আসন পর্যন্ত সবটুকুই পুষ্পসজ্জায় সজ্জিত। বিশেষত শ্রীল প্রভুপাদের ব্যাসাসনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইস্‌কনের ৭টি উদ্দেশ্য। সকালের উদ্‌যাপনে লন্ডন শহরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন স্বরূপ মধ্য লন্ডনের বিভিন্ন প্রধান প্রধান এলাকা জুড়ে ৫ হাজার কাপ কেক বিতরণ করা হয়। এটি একটি লন্ডনের প্রতি ধন্যবাদ প্রদর্শনের নিদর্শন। মন্দির অধ্যক্ষ জয় নিতাই দাস ও মন্দিরের সেক্রেটারি ভাবভক্তি দেবী দাসী একটি সুযোগ লাভ করেছিলেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খানকে এক বক্স কাপ কেক ও সাথে ইস্‌কন ৫০ উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিন উপহার হিসেবে প্রদানের জন্য। তিনি ইস্‌কনের এই বিশেষ মুহূর্তটির জন্য সাধুবাদ জানান।
বিকেলের সেশনে ইস্‌কনের ৭টি উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন ক্লাসের আয়োজন করা হয় এবং অবশেষে ৫০তম বার্থডে কেক কেটে উদ্‌যাপন করা হয়। এরপর ভক্তরা অক্সফোর্ড স্ট্রিটে গিয়ে এক মহা হরিনাম সংকীর্তনের আয়োজন করে। নৃত্য কীর্তনের সাথে সেই হরিনাম সংকীর্তনে বিতরণ করা হয় সুস্বাদু আমের তৈরি বিশেষ কেক। দেশটির বৃহৎ সংবাদ চ্যানেল বিবিসি লন্ডন দিবসটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কাভারেজ করে, যা লক্ষ লক্ষ লোক টিভিতে দর্শন করে, বিশেষত অনলাইনে দর্শকসংখ্যা ছিল আরো অধিক। অগণিত দর্শক ভক্তিবেদান্ত মেনরের আরতি দর্শন করে।

একটি বিশেষ বাগান

১৪ জুলাই BAPS স্বামী নারায়ণ, লন্ডনের ইন্টারফেয়ার নেটওয়ার্ক, ব্রিটিশ জিউসের বোর্ড অব ডেপুটিস ও লন্ডনের বিভিন্ন গীর্জা থেকে আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সমবেত হন শ্রীপ প্রভুপাদ থিয়েটারে। সেখানে খ্রিস্টিয়ান ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যে ভক্তি সম্পর্কে বিশেষ একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৬ জুলাই শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন স্বরূপ লন্ডনের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তবৃন্দ ও সারা বিশ্ব থেকে শ্রীল প্রভুপাদের প্রত্যক্ষ শিষ্যগণ সমবেত হন। তারা সবাই পশ্চিমা বিশ্বের শ্রীল প্রভুপাদের ভ্রমণ এবং সে সাথে হাজার হাজার লোকেদের জীবন পাল্টে দেয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদের অনুভূতি বিনিময় করেন। মন্দির কক্ষে শ্রীল প্রভুপাদের অভিষেক সম্পন্ন হওয়ার পর শ্রীল প্রভুপাদের বিগ্রহকে মেনরের বাগানে নিয়ে আসা হয়। সেখানে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন যোগেশ্বর দাস। তিনি এ বাগানটি শ্রীল প্রভুপাদ ও তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে নিবেদন প্রসঙ্গে প্রবচন দেন। তিনি উল্লেখ করেন, সুদক্ষ মালিরা যেমন বাগান পরিচর্যার জন্য সর্বদা মনোযোগী, দূরদর্শী আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, কঠোর পরিশ্রমী এবং ধৈর্যশীল ঠিক তেমনি শ্রীল প্রভুপাদ ও তার শিষ্যরা এই সমস্ত গুণাবলীর অধিকারী। যদিও তারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওপর নির্ভরশীল। কৃপাময় দাস বাগানের উপযোগীতা সম্পর্কে ব্যক্ত করেন। তিনি ইস্‌কনকে বাগানের অবস্থিত একটি সিকোয়া বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেন। যার বীজটি বপন করেছিলেন শ্রীল প্রভুপাদ স্বয়ং এবং তাঁর শিষ্যরা হলেন সেই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা যারা সারা বিশ্বে কৃষ্ণভাবনার দর্শন প্রচার করেছেন। গৌরদাস নামে একজন ভক্ত জর্জ হ্যারিসনের সহধর্মিনী অলিভিয়া হ্যারিসনের সাথে এক কথোপকথন বলেন, জর্জ হ্যারিসন বাগানটিকে ভালোবাসবে। কেননা এটি অনেক লোককে মন্দিরে নিয়ে এসে কৃষ্ণভাবনামৃত বিষয়ে শিক্ষা লাভ করাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি শিক্ষালাভ করতে পারবে তা হলো, গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার সম্পর্ক। কেননা এটি আমাদেরকে জড় জগতের ঊর্ধ্বে উপনীত করে ভগবদ্ধামের উদ্দেশ্যে পরিচালিত করবে। শ্রীল প্রভুপাদ ও তার শিষ্যদের মধ্যকার সম্পর্কের কারণে সারাবিশ্ব জুড়ে কৃষ্ণভাবনা বিস্তৃত। এই সম্পর্কটি নিদর্শন স্বরূপ বাগানের চার পাশে খোদাইকৃত নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে।
ঐ দিন শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য যোগেশ্বর দাসের রচিত শ্রীল প্রভুপাদের জীবন সম্বন্ধে নতুন একটি গ্রন্থ Swami in a strange lord এর মোড়ক উন্মোচিত হয়।

একটি বৃক্ষ থেকে শিক্ষা

কৃপাময় দাস

আপনি এই সিকোয়া বৃক্ষের দিকে তাকালে দেখবেন এটি অন্তত শতফুট উঁচু যার জন্ম হয়েছিল ১৮৮০ সালের দিকে। এই বৃক্ষটি হল ভক্তিবেদান্ত মেনরে অবস্থিত ১৮৩টি বৃক্ষের মধ্যে অন্যতম।
বৃক্ষটি ২০০ থেকে ৩০০ ফুট উঁচু হতে পারে এবং সিকোয়া হচ্ছে সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ যেটি ৩ হাজারেরও অধিক বছর বেঁচে থাকতে পারে। সিকোয়া ফলের বীজ মাত্র ৫ মিলিমিটার লম্বা। অথচ এই ছোট্ট একটি বীজের মধ্যে রয়েছে সমগ্র বৃক্ষটির শক্তি। একটু ভাবুন তো একটি ছোট্ট বীজের মধ্যে একটি বৃহদাকার বৃক্ষ রয়েছে যেটি ৩ হাজার বছর জীবিত থাকতে পারে। বীজগুলোর ভিতরে রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর অংশ যেগুলো হল রিবোসোম, মাইটোকেন্ড্রিয়া, বেকিয়োলেস ও  এনডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম।
মানব জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে যখন কেউ কোনো বিষয়ের জন্য প্রচেষ্টা করে সে একটি বীজ রোপন করে। তার দৃঢ়তার ফলেই সে একটি বীজ রোপন করে এবং যদি পারিপার্শ্বিক ঠিক থাকে তবে তা বেড়ে উঠে।
পারমার্থিক আন্দোলনের বৃদ্ধি নির্ভর করে চিন্ময় উৎস থেকে কৃপা সঞ্চালনের মাধ্যমে এবং পারমার্থিক অনুসন্ধানকারীদের মাঝে সেই শক্তি প্রবাহিত হয়। বলা হয়ে থাকে যে, ভগবান আত্মার নিকট নিম্নে অবতরণ করেন আর আত্মা ভগবানের নিকট ঊর্ধ্বদিকে গমন করে এবং তাদের সংযোগস্থলী হলেন একজন গুরু। গুরু ও শিষ্যের মধ্যে একটি পারমার্থিক শক্তির সঞ্চার ঘটে একনিষ্ঠভাবে অনুসন্ধান ও সেবার মাধ্যমে, গুরুর কৃপাময় দিক নির্দেশনার মাধ্যমে এবং নিজেকে গুরুর দিব্যজ্ঞান ও কৃপার একমাত্র পাত্র হিসেবে শিষ্য ঊর্ধ্ব দিকে বেড়ে উঠা শুরু করে। কিন্তু শিষ্যদের মাধ্যমেই শুরু বেড়ে উঠে। শিষ্যরা গুরুর সক্ষমতাকে বহুগুণে বর্ধিত করে কৃষ্ণের কাছে প্রদান করে। এইভাবে শুরু ও শিষ্য একত্রে একটি পারমার্থিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। একটি বৃক্ষের ক্ষেত্রে শুরুতে মাটিতে পুঁতে দেয়া হয়। ধীরে ধীরে মাটিতে পোতানো সেই বীজটি বেড়ে উঠে বৃহদাকার বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। পারমার্থিক ক্ষেত্রে আকাঙ্ক্ষিত আরো অনেক অনুসারীদের আকর্ষণ করে এবং তখন শিষ্যদের একটি ছোটদল একটি আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
সিকোয়ার ছোট্ট বীজটি ৩০০ ফুট উচ্চ বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়ে যেরকম হাজার হাজার বছর ধরে অবস্থান করতে পারে ঠিক তেমনি শ্রীল প্রভুপাদ ইস্‌কন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে বীজটি রোপন করেছিলেন তা বহু শতাব্দি ধরে অবস্থান করবে। ৫০ বছর পূর্বে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ সেই বীজটি বপন করেছিলেন। ইস্‌কনের জন্মলগ্নে অনুসারীদের কাছে নামটি কিছুটা বিভ্রান্তমূলক মনে হলেও সংস্থাটির নাম দেয়া হয়েছিল আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)। এরকম একটি নাম প্রদান করার ক্ষেত্রে বলতে গেলে কোনো সম্পদই ছিল না। তবুও শ্রীল প্রভুপাদ সেই প্রতিষ্ঠার ফরমে স্বাক্ষর দিলেন যেটি হলো ভবিষ্যৎ সংস্থার জন্য বীজ রোপন। শ্রীল প্রভুপাদ ভবিষ্যতে এর বেড়ে উঠার জন্য সমস্ত নিয়ম-কানুন প্রদান করলেন (যেরকম সিকোয়া বীজের অভ্যন্তরে সমস্ত নিয়ম-কানুন প্রদান করা হয়েছে)। তার শিষ্যদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় তাঁর নির্দেশ পালনে শিষ্যদের উৎসাহ উদ্দীপনা এবং তাঁর দৈনন্দিন শিক্ষা সতর্ক তত্ত্বাবধান এই সবকিছুই সংস্থাটির বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছিল।

৫০ তম বছরে ৪৮ তম রথযাত্রা

১৭ জুলাই, রবিবার কেন্দ্রীয় লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে ৪৮ তম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। লন্ডনের সমস্ত এলাকা থেকে ভক্তরা এই বৃহৎ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। যাদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমৎ আত্মা নিবেদন স্বামী, শ্রীমৎ ভক্তি রসামৃত স্বামী, শ্রীমৎ জনানন্দ গোস্বামী, শ্রীমৎ কদম্বকানন স্বামী, শ্রীমৎ মহাবিষ্ণু স্বামী, শ্রীমৎ প্রবোধানন্দ সরস্বতী স্বামী এবং ইউরোপ থেকে শ্রীল প্রভুপাদের অনেক জ্যেষ্ঠ শিষ্য। শহরের আই কনিক ট্রাফলগার স্কয়ার নামক স্থানে রঙিন উৎসবে রাঙিয়ে যায়। উৎসবটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে ইস্‌কনের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবকে ঘিরে ৫০ তম স্টলে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় যেখানে ৫ হাজার বছর পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতি রাধারাণীর আবির্ভাব থেকে শুরু করে ৫০০ বছর পূর্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব এবং অতঃপর ৫০ বছর পূর্বে পশ্চিমা বিশ্বে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের আবির্ভাবের কাহিনি প্রদর্শন করা হয়। ইস্‌কনের ৫০ বছরের সমস্ত অর্জন নিয়ে তথ্য সম্ভার সম্বলিত একটি আয়োজন ছিল। ভক্তিবেদান্ত মেনরের উদ্যোগে ২০ হাজার থালা সুস্বাদু কৃষ্ণ প্রসাদ বিতরণ করা হয়। হরেকৃষ্ণ উৎসবের ভক্তবৃন্দদের নিয়ে একটি উদ্দণ্ড নৃত্য কীর্তনের মধ্যে দিয়ে উৎসবটি সমাপ্ত হয়।

থেমস্ নদীতে দিব্বি রাণী

ইস্‌কন সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ইস্‌কন লন্ডনের সর্বশেষ আকর্ষনীয় উদ্‌যাপনটি ছিল ৩১ জুলাই রবিবার লন্ডনের বিখ্যাত থেমস্ নদীতে নৌকা উৎসব। ঐ দিন মধ্য দিবসে দিক্সি কুইন নামে একটি বিশেষ নৌকায় করে ছয় ঘণ্টা ধরে থেমস্ নদীতে ভ্রমণ করে। সে ভ্রমণে অংশগ্রহণ করেন পাঁচশরও বেশী অতিথি এবং তারা সবাই নিরবচ্ছিন্ন কীর্তনে অংশগ্রহণ করেন। উৎসবটির বিজ্ঞাপন ছিল শান্তির জন্য কীর্তন ক্যাম্প এবং বিষয়টি মিডিয়াতেও প্রচারিত হয়। দিক্সি কুইনে উঠার জন্য ভক্তরা প্রথমে ভূগর্ভস্থ পথে শহরের কেন্দ্রের দিকে ভ্রমণ করে। তখন স্থানীয় জনগণ ভক্তদের দর্শন করে উষ্ণ অভ্যর্থনা প্রদর্শন করেন। এই ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল যখন দিক্সি কুইন বিখ্যাত লন্ডন টাওয়ার ব্রিজের দিকে যাচ্ছিল তখন নৌকাটি এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিজটি খুলে দেওয়া হয়। ভক্তরা সেতু থেকে শান্তির জন্য কীর্তন লেখাগুলো নিয়ে দোলাচ্ছিল এবং অনেক লোক তা দর্শন করছিল। অনেক জ্যেষ্ঠ ভক্ত ও বিখ্যাত কীর্তনীয়ারা সেই নৌকায় উপস্থিত থেকে অপূর্ব সব কীর্তন প্রদর্শন করেন। রাধা লন্ডনেশ্বর দাস, শ্রীমৎ কদম্বকানন স্বামীর কীর্তনে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে। এদিকে এই কীর্তনে আরো রসদ যোগানোর জন্য জাহ্নবী দেবী দাসী ভায়োলিন নিয়ে, বরুন দাস মৃদঙ্গ নিয়ে মঞ্চ আলোকিত করেন। এদিকে মধ্যাহ্ন ভোজন শুরু হতে না হতেই আরেক বিখ্যাত ভক্ত দ্বীনবন্ধু দাস বৃন্দাবনের প্রচলিত সুরে কীর্তন প্রদর্শন করে আর উচ্চস্বরে রাধেশ্যাম, রাধে শ্যাম বলে প্রতিধ্বনি করতে থাকে। এরপর মহাত্মা দাস র‍্যাগ নৃত্যের সাথে কীর্তন প্রদর্শন করেন। অগ্নিদেব দাস গৌরাঙ্গ বলিতে হবে এই ভজনটি দিয়ে কীর্তন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেন। কেননা প্রভুপাদ তার শিষ্যদের জন্য সবকিছু করে গেছেন এবং এজন্য প্রভুপাদ লন্ডনের বিখ্যাত এই থেমস্ নদীতে নৌকা উৎসবে ভক্তদের দর্শন করে গর্বিত অনুভব করবেন। অবশেষে শ্রীমৎ ভক্তিবৃন্দ গোবিন্দ স্বামী মহারাজের সংক্ষিপ্ত প্রবচনের পর তার অপূর্ব কীর্তন প্রদর্শনের মাধ্যমে ইস্‌কন লন্ডনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি সফল উদ্‌যাপনের সমাপ্তি ঘটে।


 

অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here