এই পোস্টটি 39 বার দেখা হয়েছে
(গত সংখ্যার পর) মাইকেল এ ক্রেমো পুরাণ মতে, বর্তমানে আমরা ৭ম মন্বন্তরের ২৮তম চক্রযুগে অবস্থান করছি (ব্রহ্মার ১দিন) সুতরাং এতে দেখা যায় যে, বর্তমান পৃথিবীর বয়স ২.৩ বিলিয়ন বছর। এখানে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে কানাডায় আবিষ্কৃত সর্বাধিক প্রাচীন শৈবাল ফসিলের মেয়াদও ঠিক একই সময়ের। ব্রহ্মার জন্ম থেকে এখন পর্যন্ত ৪৫৩ চক্রযুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রতিটি চক্রযুগের শুরুতে পারমার্থিক স্বর্ণযুগ অতিক্রান্ত হয়ে শেষের দিকে অত্যন্ত জঘন্য কলিযুগে পর্যবসিত হয়। প্রতিটি কলিযুগের শেষে পৃথিবীর জনসংখ্যা শূন্য হয়। চক্রযুগ অতিক্রান্ত হওয়া কালে, মানব এবং অন্যান্য মানব আকৃতির জীবের সহবস্থান দেখা যায়। যেমন-ভাগবত পুরাণ (৯/১০/২০) মতে, ভগবানের অবতার রামচন্দ্র রাবণের রাজ্য লঙ্কা বিজয়কালে
বনে বসবাসরত মানবাকৃতির বানরের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়, যারা রামচন্দ্রকে লঙ্কা বিজয়ে সহায়তা করেছিল। বৈদিক শাস্ত্রের এই যুগচক্রের ধারণায়, প্রত্যেক মন্বন্তরের শেষে ব্রহ্মাণ্ডে আংশিক প্রলয় ঘটে এবং পুনরায় মানুষসহ অন্যান্য প্রজাতির সহবস্থানে একটি ব্রহ্মাণ্ডে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বৈদিক কালচক্রের এই তথ্যগুলোর কোন প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যতা আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে আমাদের ফসিল রেকর্ডের কথা মনে রাখতে হবে। মানব ফসিল খুঁজে পাওয়া খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। এছাড়া পৃথিবীর উপরের স্তরের ক্রমাগত ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন সাধনের ফলে এক্ষেত্রে গবেষণা খুবই কঠিন ব্যাপার।
এই সমস্ত সমস্যাসংকুল ধারণা মাথায় রেখে, আমরা পুরাণের সময়সংক্রান্ত ধারণার বাস্তব প্রায়োগিক গবেষণা খতিয়ে দেখতে পারি। দেখেপৃথিবীর অনেক স্থানেই, দশ বা একশত বছর এমনকি একশত মিলিয়ন বছরেরও পূর্বের ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে। মিলিয়ন বিলিয়ন বছর পূর্বের স্থাপত্য, পাথরের তৈরি যন্ত্র এবং বিভিন্ন শিল্পকর্ম আবিস্কার করার পর বিজ্ঞানীরা আশ্চর্য হয়েছেন প্রাচীন মানুষদের জ্ঞান এবং দক্ষতা। বিগত ১৫০ বছর যাবৎ প্রত্নতত্ত্ববিদগণের বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ফসিল রেকর্ড মোতাবেক মানব উৎপত্তির সঠিক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভ হচ্ছে না। কেননা ক্রমাগত প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর ফসিলের সন্ধান আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা নবতর গবেষনার পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বাস্তবিকপক্ষে আমি (মাইকেল এ ক্রেমো) এবং রিচার্ড থম্পসন যখন বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক রিপোর্ট এবং প্রমাণপত্রাদি নিয়ে গবেষণা করি, তখন আমরা বৈদিক সময়ের ধারণার সত্যতা আবিস্কার করি, যা আমাদের লিখিত গবেষণা গ্রন্থ “ফরবিডেন আর্কিয়োলজি” তে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ‘বেক টু গডহেড’ পত্রিকার মে/জুন ১৯৯৩ সংখ্যায় ও গবেষণালব্ধ তথ্যাদি প্রকাশিত হয়। এখন আমরা কিছু উদাহরণ পর্যবেক্ষন করার মাধ্যমে উক্ত বিষয়ের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারি। প্রমাণাদিগুলোকে আমরা কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি।
ক্যালিফোর্নিয়ার টেবল মাউন্টেনের পাশে দেখা যাচ্ছে কাল রঙের লাভা অংশের নীচে তীক্ষ্ম নুড়িপাথরে স্থাপিত খনি। সময়ের পরিবর্তনে এগুলো অবস্থানের পরিবর্তন হয়, ফলে কোন জীবাশ্মর সঠিক অস্তিত্ব বা সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।”
প্রথমটি হচ্ছে মানুষের হাতে নকশা করা বিভিন্ন প্রাণীর হাঁড়। এই প্রকারের অধিকাংশ হাঁড়ে পাথর দিয়ে কেটে তৈরি বিভিন্ন নকশা থাক যা মূলত মানুষেরই তৈরি। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা এই প্রকারের অজস্র হাঁড়ের সন্ধান পেয়েছেন যেগুলোর উৎপত্তিকাল কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন বছর পূর্বের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাঁড়ের শিল্পকর্মগুলো ছিল খুবই উন্নত। যেমন-১৮৮১ সালে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ হেনরী স্টোপস একটি শঙ্খ আবিস্কার করেন যার গায়ে সুন্দর মানব চেহারা খোদাই করা ছিল। শঙ্খটি ২ মিলিয়ন বছর পূর্বের বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
২য় প্রকৃতির আবিস্কারগুলো হল পাথরের তৈরি অস্ত্র এবং অন্যান্য শিল্পকর্ম। সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রচুর প্রাচীন পাথরের তৈরি অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে যার মধ্যে অনেকগুলো উন্নত প্রকৃতির বলে উল্লেখ করেছেন অনেক বিজ্ঞানী। উদাহরণস্বরূপ ১৮৪৪ সালে স্যার ডেভিড ব্রিউস্টার ইংল্যান্ড বালুকাময় পাথরে আটকানো একটি তীর আবিস্কার করেন। পাথরটি ৩৬০ মিলিয়ন বছর পূর্বের ডেভোনিয়ান সভ্যতার সময়কাল বলে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া কয়লার প্রাচীন এক স্তূপ থেকে ৩০০ বছরেরও পুরাতন সময়কালীন স্বর্ণের চেইন, লোহার পাত্র এবং কারুকার্যময় খোদাই করা পাথর আবিষ্কৃত হয়।
৩য় প্রকৃতির প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কার হচ্ছে স্বয়ং প্রাচীন মানব কঙ্কাল। কোটি কোটি বছর পূর্বের প্রচুর মানব খুলি আবিষ্কৃত হয় বিভিন্ন দেশে যার মধ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর পূর্বের সম্পূর্ণ মানব কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয় ইলিনোয়িস কয়লা খনি থেকে। এছাড়া একই সময়কার মানব পদচিহ্ন আবিস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি স্টেটের পক্ষ থেকে।
যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী ১ লক্ষ বছর পূর্বে মানবাকৃতির নিম্নতর জ্ঞানের প্রাণী থেকে আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয়েছে, সেখানে উপরের প্রমাণাদিগুলো এই তথ্যকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছে। রিচার্ড থম্পসন এবং আমি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে উপলব্ধি করলাম যে বিজ্ঞানী যে সব বিষয়ে মতের মিল খুঁজে পেয়েছেন সেগুলো গ্রহণ করেছেন আর যে সমস্ত আবিষ্কারে তাঁদের মতের মিল ছিল না, তা তাঁরা পরিত্যাগ করেছেন। ১৮৫০ সালে একবার ক্যালিফোর্নিয়াতে গুপ্তধন খোঁজে অনেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা শুরু করে।
ক্যালিফোর্নিয়ার টেবল মাউন্টেইন এর প্রাচীন লাভা নির্গমন পথে অনেকেই প্রচুর আধুনিক মানুষের কঙ্কাল আবিস্কার করেন। আধুনিক ভূ-তত্ত্ববিদগণের মতে কমপক্ষে ৫৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঐ আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা নির্গমন স্থগিত হয়েছিল। এখানে আবিষ্কৃত রেকর্ডের তথ্যাদি নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ভূ-তত্ত্ববিদ ‘জে. ডি. হুইটনি’ ‘দি ওয়ার্ল্ড অব সাইন্স’ এ পেশ করেন যা পরবর্তীতে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। হুইটনির তথ্য মতে আবিষ্কৃত মানব ফসিলগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল যে, বর্তমান সময়ের মানুষের মতই মিলিয়ন, বিলিয়ন বছর পূর্বের মানুষের সম আকৃতি ও অবস্থান ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন উন্নত গবেষণা হয়নি। এজন্য শিক্ষার্থী স্টোইন এবং রো তাদের কলেজ টেস্টবুক দেখে বলেছিল যে, “বৈজ্ঞনিক বিবৃতিকে কখনো চরম সত্য বলে ভাবা উচিত নয়।”
সুতরাং, বিজ্ঞানীদের অবহেলা করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফসিল রেকর্ড অনুযায়ী, পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান বহু পূর্বের বৈদিক যুগের বলে ধারণা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভবের রহস্য খুঁজে পাওয়া বিজ্ঞানের পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু পুরাণসমূহে থাকা সময়ের ধারণা যে সঠিক তা উক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কারগুলো প্রমাণ করছে। এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আপনারা ‘ফরবিডেন আর্কিয়োলজী’ গ্রন্থটি পড়তে পারেন। হরে কৃষ্ণ।
সেপ্টেম্বর ২০১১
