হেল্পলাইন ১৬৩২

0
34

যেকোনো সময় যেকোনো প্রয়োজনে
হেল্পলাইন ১৬৩২
মৃগনয়না গোপী দেবী দাসী

আমরা আধুনিক সভ্যতার যুগে বাস করছি। জীবনকে সহজ, গতিশীল ও সুস্বাস্থ্যময় করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করছি। আমরা তবুও যেন জীবনের স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছি না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পৃথিবী ভারাক্রান্ত, মানুষের হৃদয়েও যেন শান্তির লেশ নেই। আমরা মানুষেরা শুধু সভ্যতার উন্নয়ন করতেই ব্যস্ত, কিন্তু নিজেদের মানবিক উন্নয়নের দিকে আমরা যেন পুরোটাই অমনোযোগী ও অজ্ঞ। ফলে, আমরা বিভিন্ন অসামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছি মানুষের মানবিকতায় এবং মূল্যবোধে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের এবং প্রতিটি জীবের সাথে মানুষের আচরণে। অকারণে হিংস্র স্বভাব যত্ন করে লালন করছি আমরা। তার উদাহরণ প্রভাব ফেলছে জীব বৈচিত্র্যে— প্রকৃতিতে ও মানব সমাজে। এছাড়াও মানুষ যেন মানবিকতার নাম শুধু বহন করে বেড়াচ্ছে। প্রকৃত মানবিকতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মানবজাতির থেকে। যেসকল মানুষ এমন হীন আচরণ করছে, তাদের প্রভাবে ভালো আচরণসম্পন্ন মানুষের প্রভাবও পরিবর্তন হচ্ছে। এর ফল দেখা যাচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কগুলোতে সন্তানের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক শুধু যেন দেয়া আর নেয়ায় পরিণত হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই পিতামাতা যেন তাদের বাধ্যগত সেবকে পরিণত হচ্ছেন। আর বড় হয়ে সেই সন্তানেরা স্বার্থপর আচরণ করছে তাদের পিতা মাতার সাথে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।
মানুষের পারিবারিক সম্পর্কের মূল্যবোধ নিম্নগামী হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর আচরণের দ্বারা। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে ভাঙ্গন ধরছে, সন্তানেরা বিপথগামী হচ্ছে। মাদকাসক্তের হার বাড়ছে, ধর্ষন, খুন, আত্মহত্যার প্রবণতা সমাজে দিন দিন বেড়েই চলছে। সামাজিক এসব বিপর্যয়ের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির সাথে যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বন্ধন এবং এই জগৎ পরিচালনার যে মূলতত্ত্ব তা কেবল মানবজাতির পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব।
যেকোনো নতুন দেশে গেলে কাউকে অবশ্যই সে দেশের আবহাওয়া, পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং দেশের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অবহিত হয়ে চলতে হবে। নিয়মের বহির্ভূত কোনো কাজ করলে তাকে অবশ্যই অপরাধী বলে গণ্য করা হবে এবং শাস্তি প্রদান করা হবে। ঠিক তেমনি, এই পৃথিবীতে এসে আমাদের জানতে হবে এটি কীভাবে, কার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং এখানে আমাদের কী করণীয়-অকরণীয় রয়েছে। এসমস্ত কিছুই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যিনি সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনি ভগবদ্গীতায় উল্লেখ করেছেন। গীতার জ্ঞান যখন কেউ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে তখন এ জগতের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন দক্ষ নাবিকের মত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।
উত্তাল সমুদ্রে পতিত মানুষকে আরেকজন ডুবন্ত মানুষ উদ্ধার করতে পারে না। যিনি নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন, তিনিই কেবল পারেন অন্যের নিরাপত্তা বিধান করতে। তেমনি, এজগতের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বিভিন্ন Helpline চালু আছে। শর্ট কোডের কয়েকটি নম্বর যদি আপনার জানা থাকে এবং যদি যোগাযোগ করার কোনো মাধ্যম, যেমন মোবাইল বা ইন্টারনেট বা টেলিফোন হাতের কাছে থাকে, তবে আপনি সাহায্যের জন্য কল করতে পারেন। যদি আপনি সঠিক নম্বরে ডায়াল করতে সমর্থ হন তবে অবশ্যই কিছু সময়ের মধ্যে আপনি সাহায্য পাবেন। অনেক উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি কেবল বাহ্যিক বিপদ মাত্র। প্রতিটি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বিপদে আছে। কারণ, ভগবান এই জগতকে ‘অশাশ্বতম্’ এবং ‘দুঃখালয়ম্’ করেই তৈরি করেছেন।
আকাশে যখন একটা ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়- খুব সুন্দরভাবে বাতাসের গতির সাহায্যে উড়তে থাকে। আমরা সবাই সে ঘুড়ি দেখে আনন্দ পাই। উড়তে পারাই ঘুড়ির জীবনের স্বার্থকতা। যতক্ষণ ঘুড়ি তার নাটাইয়ের সাথে সূক্ষ্ম সুতার দ্বারা সংযুক্ত থাকে, ততক্ষণ সে সুন্দরভাবে উড়তে পারে। কিন্তু এই সুতাটা আকাশের সাথে মিশে থাকে বলে তা দেখা যায় না । কিন্তু যারা ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশল জানে, উড়ন্ত ঘুড়ি দূর থেকে দেখে তারাই কেবল বুঝতে পারে যে ঘুড়িটি একটি সুতা, নাটাই এবং কোনো মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়ে উড়ছে। যে কৌশলটা জানেনা, সে বুঝবে না ঘুড়ি কীভাবে উড়ছে। এই ঘুড়িটা যদি কোনো কারণে সুতা ছিঁড়ে গিয়ে নাটাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে সে তার স্বভাবগত উড়ন্ত অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথাও হারিয়ে যাবে— আর উড়তে পারবে না । হয়তো কোনো গাছে বা উঁচু জায়গায় আটকে থাকবে বিষণ্ণ হয়ে। তেমনি, অনেক মানুষই মনের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতিকূলতায় জীবন অতিবাহিত করছে। জীবনের অনেক সমস্যা এমন থাকে যে, ভালো করে কাউকে বুঝিয়ে অনেক সময় বলাও যায় না। আবার বেশিরভাগ সময়ই কেউ যথার্থভাবে পরিস্থিতিটা বুঝতে পারে না। তাই, যে অস্বস্তিকর প্রতিকূল মানসিক পরিবেশ দিন দিন লালন করতে করতে মানুষ তার স্বাভাবিক স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। এরই ফলে তার মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়। ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে আনন্দ লাভ করার প্রবণতা দেখা দেয়। একজন মানসিক অবসন্ন মানুষ জীবনকে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করে সমাজে ভালো কিছু দিতে পারে না। ঠিক যেন সুতা ছিঁড়ে যাওয়া ঘুড়িটার মতো বিষণ্নতায় ভরা জীবন। তাই যদি কেউ সুতার সাথে আবার ঘুড়িটাকে সংযুক্ত করে দিতো, তবে ঘুড়িটা আবার উড়তে পারতো। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অবশ্যই একটা হেল্পলাইন আবশ্যক।
পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সবার জন্য এমন একটি হেল্পলাইন দিয়ে রেখেছেন। ধরুন, একটা রোড এক্সিডেন্ট ঘটলো। যদি কেউ হেল্পলাইনে কল করে, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স এসে যাবে। অনেক লোক হাসপাতাল থেকে চলে আসবে কিন্তু যদি কেউ হেল্পলাইন নম্বর না জেনে থাকে, তবে দুর্ঘটনা ঘটলেও কল না করার ফলে সাহায্য আসতে দেরি হবে। ঠিক তেমনি, আমরা এজগতে মানসিকভাবে এবং বাহ্যিকভাবেও বিপদে আছি। বাইরের কিছু কিছু বিপদ তো মানসিকভাবে বিভিন্ন হেল্পলাইন দ্বারা উদ্ধার পাওয়া যায়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ের হাত থেকে উদ্ধার পেতে হলে অবশ্যই আমাদের ভগবানের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রতিটি জীবের হৃদয়ে অবস্থান করেও, তিনি সবকিছু জানার পরও কেন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন? কারণ, আমরা তাকে সাহায্যের জন্য কল করি না। বিভিন্ন হেল্পলাইন সবসময়ই Active থাকে। কিন্তু আপনি কল না করলে কেউ কি সাহায্যের জন্য আসে? ঠিক তেমনি, যখন আমরা ভগবানের নিকট শরণাগত হয়ে আকুল প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁকে ডাকবো, তিনি তৎক্ষণাৎ আমাদের সাড়া দিবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এই অপ্রাকৃত হেল্পলাইন কোড নম্বর হচ্ছে ১৬৩২ অর্থাৎ, ১৬ নাম ৩২ অক্ষর সমন্বিত “হরেকৃষ্ণ” মহামন্ত্র । এই কলিযুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই নামরূপে এসেছেন।
তাই “হরেকৃষ্ণ” মহামন্ত্র হৃদয় থেকে আকুল প্রার্থনার সহযোগে জপ করার মাধ্যমে আমরা জীবনের যেকোনো সমস্যার কথা তাঁকে জানাতে পারি, সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করতে পারি। তিনি অবশ্যই সাড়া প্রদান করবেন এবং সেই পরিস্থিতি থেকে আমাদের রক্ষা করবেন। অতীতের এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে— গজেন্দ্র হাতিকে তিনি রক্ষা করেছেন। দ্রৌপদীকে বস্ত্র দান করে রক্ষা করেছেন, প্রহ্লাদ মহারাজকে বহুবার রক্ষা করেছেন, রত্নাকর দস্যুকে হৃদয় পরিবর্তন করে বাল্মীকি মুনিতে রূপান্তর করেছেন এবং সম্প্রতি ভগবানের শুদ্ধভক্ত শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এবং তাঁর শিষ্যগণ বহু বিপথগামী, উদ্‌ভ্রান্ত, বিষণ্ণ মানুষের হৃদয় পরিবর্তন করে শুদ্ধ, সুন্দর, সুখী জীবন প্রদান করেছেন এই নামের শক্তিতে।
ভগবান এই জগৎ পরিচালনা করছেন- কখনো তিনি নিজে এসে এবং কখনো তাঁর প্রিয় ভক্তের বা ব্যক্তির বা জীবের মাধ্যমে তিনি বিপথগামী বিপদগ্রস্ত জীবকে সাহায্য করছেন। তাই এ সুবর্ণময় কলিযুগে অপূর্ব সুযোগ এই হেল্পলাইনের সুবিধা আমরা প্রত্যেকেই নিতে পারি। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ ও সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা। তাই এ জগতের সকল সমস্যার সমাধানই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণাশ্রয় করার মাধ্যমে সম্ভব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হবার শিক্ষা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান নিজেই বলেছেন-

সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

(ভ.গী. ১৮/৬৬)

এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। শ্রীকৃষ্ণের কাছে শরণাগত হবার সহজ উপায় আমাদের ব্যবহারিকভাবে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি নিজেই এই কলিযুগে ভক্তভাব অঙ্গীকার করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং সম্পূর্ণ শরণাগত হওয়ার সহজ-সরল এবং সর্বোত্তম পন্থা প্রদর্শন করেছেন “প্রভু বলে,-

“কহিলাঙ এই মহামন্ত্র ।
ইহা জপ গিয়া সবে করিয়া নিৰ্ব্বন্ধ ॥ ৭৭ ॥
ইহা হৈতে সৰ্ব্ব-সিদ্ধি হইবে সবার।
সৰ্ব্বক্ষণ বল’ ইথে বিধি নাহি আর ॥ ৭৮ ॥

(শ্রীচৈতন্য ভাগবত, মধ্যখণ্ড, ২৩/৭৭-৭৮)

এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র ভগবানের ১৬টি দিব্য নাম ও ৩২ অক্ষরযুক্ত। “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে৷” এই মহামন্ত্র জপ এবং কীর্তন করা মাত্রই আমরা শ্রীকৃষ্ণের সাথে তৎক্ষণাৎ যুক্ত করতে পারি। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ হেল্পলাইন। যা সব বিপদ থেকে রক্ষা করার উপায়। সমস্ত শাস্ত্র এবং পূর্বতন আচার্যবৃন্দের এই হচ্ছে শিক্ষা-

“জীবন অনিত্য জানহ সার, তাহে নানাবিধ বিপদ ভার।
নামাশ্রয় করে যতনে তুমি, থাকহ আপন কাজে ॥”


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here