সুপার হিরো: বাস্তব না কল্পনা?

0
33

বৈদিক সাহিত্য আমাদের অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার শক্তির বাইরে এক অনন্য জগৎ আমাদের উপস্থাপন করেছে।

শ্রীমতি নিকুঞ্জ বিলাসিনী দেবী দাসী


ভিন্ন জগতের অদ্ভুত প্রাণীসমূহ, দেবতা, সুপার হিরো, পরী, জীন, জাদুকর, ড্রাগন এরা পৃথিবীকে আক্রমণ করেছে। এসব হল কল্পনা প্রবণ চলচিত্রকার, লেখক এবং শিল্পীদের সৃষ্টি কর্ম। যেখান থেকে প্রতি বছর বহু ব্লকবাস্টার মুভি মুক্তি পাচ্ছে। তাদের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা এসেছে বিভিন্ন পৌরাণিক কথা, আঞ্চলিক গল্প ও ধর্মীয় শাস্ত্র থেকে, যা মানুষদের হাজার হাজার বছর ধরে রোমাঞ্চিত করছে।
এটি বিস্ময়কর যে, বর্তমান জগতের মানুষ উদ্ভট এই বিষয়গুলোকে বাস্তবের সাথে মিলানোর চেষ্টা করে। আমরা অতীন্দ্রিয় বিষয়সমূহ নিয়ে সন্দেহে থাকি। কিন্তু বিভিন্ন উপকথা, জাদুময় ও রোমাঞ্চিত গল্পসমূহ পড়ে আমরা এইসব অতীন্দ্রিয় বিষয়সমূহের প্রতি অত্যন্ত আকর্ষিত হয়ে পড়ি। শত শত বছর ধরে মানুষ তার অভিজ্ঞতার বাইরে অনেক কিছুর অস্তিত্ব সম্বন্ধে কল্পনা করে এসেছে। জাদুময় জগৎ সম্পর্কিত যেকোনো অভিজ্ঞতা আমাদের রোমাঞ্চিত করে। আমাদের এই ভুল প্রবণতা সম্পর্কে ভাল অভিজ্ঞতা লাভের জন্য ব্যাঙের কূপ মণ্ডুক ন্যায় দৃষ্টান্তটি দেওয়া যায়— এক ব্যাঙ একটি কূপের মধ্যে বসবাস করতো। একবার তাকে দেখতে তার এক বন্ধু এল। সেই বন্ধু তাকে সমুদ্র সম্পর্কে বলল, ব্যাঙ তার সারা জীবন কূপের দেওয়ালের অভ্যন্তরে ছিল। সে সমুদ্র সম্পর্কে তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, সমুদ্রের আয়তন কি আমার কূপের দ্বিগুণ? তিনগুণ?
বন্ধু ব্যাঙটি হেসে বলল, সমুদ্রের আয়তন অসীম। তা সত্ত্বেও কূপ ব্যাঙ সমুদ্রের বিশালত্ব উপলব্ধি না করতে পেরে তার ক্ষুদ্র কূপ দিয়ে সমুদ্রের আয়তন পরিমাপ করার চেষ্টা করে। অবশেষে সে এই ভ্রান্ত ধারণা পরিত্যাগ করল কেননা সত্যিকার অর্থে সমুদ্র সম্পর্কে তার বাস্তবিক কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কূপের ব্যাঙের মতোই আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছি। এই মহাবিশ্ব এবং অন্যান্য বস্তু সম্পর্কিত জ্ঞান আমাদের সীমিত ইন্দ্রিয় উপলব্ধি ও অনুমান সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ তাই আমাদের উচিত, আরো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জ্ঞান অন্বেষণ করা। বৈদিক ঐতিহ্য অনুযায়ী এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এবং সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর ভগবান সম্পর্কে জানার একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হল শব্দ । শব্দকে সর্বোৎকৃষ্ট ও শক্তিশালী বলে বিবেচনা করা হয়। কেননা শব্দ হল ভগবানের প্রকাশ। শব্দ পরম্পরা ধারায় পারমার্থিক শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় এবং কোনো ধরনের বিকৃত না হয়ে বৈদিক সাহিত্যে লিপিবদ্ধ হয়। যেহেতু মানুষের ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধিমত্তা ভ্রমাত্মক ও ত্রুটিপূর্ণ, তাই পারমার্থিক জ্ঞান অন্বেষণকারীগণ শব্দ ব্রহ্মের মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করেন যা নিখুঁত এবং সঠিক উপায়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শাস্ত্রসমূহ সত্যকে, ভগবানের সৃষ্টি, তার শুদ্ধভক্ত এবং ভগবান সম্পর্কে নানা জ্ঞানের প্রকাশ ঘটিয়েছে। তাই আমরা সরাসরিভাবে সেই জ্ঞান লাভ করতে পারি। শুধুমাত্র যে ব্যক্তি পৃথিবীর কূপ সদৃশ বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারেন তিনিই পৃথিবীর বাইরের প্রকৃতি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন।

উচ্চতর আয়তনের মহাবিশ্ব

রিচার্ড এল থম্পসন (সদাপূত দাস) তার গ্রন্থ বৈদিক কসমোগ্রাফী এবং অ্যাস্ট্রনোমীতে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন মহাবিশ্বের কিছু গোলক ধাঁধার কথা যা আমাদের থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক দর্শন দিয়ে উপলব্ধি সম্ভব নয়। এটাকে বলা যায় এইচ.ডি (উচ্চতর মাত্রা) উপলব্ধি যা এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ ও প্রাণীসমূহকে দর্শন করে, এর জন্য প্রয়োজন উচ্চতর দৃষ্টি, যা সাধারণ মানুষের নেই। কিন্তু কিছু কিছু অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এই ধরনের দর্শন লাভ করেছেন বিশেষ ধরনের যৌগপন্থায় ও অন্যান্য পারমার্থিক পন্থায়। এই ধরনের উচ্চতর চেতনা তারা পৃথিবীর অভ্যন্তরে এবং বাইরের অদৃশ্যমান সকল বস্তুকে দর্শন করতে পারে। প্রাচীন যুগে এই ধরনের অনুশীলন ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। বৈদিক যুগে সাধারণ মানুষ ভগবানকে কেন্দ্র করে তাদের জীবন অতিবাহিত করতেন। এই মহাবিশ্বের উচ্চতর দৃশ্যমান বস্তুসমূহের নিত্য দর্শন তাদের জন্য ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ধীরে ধীরে পৃথিবীর মানুষের পারমার্থিক চেতনা হ্রাস পেতে থাকে। মানুষ তার ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে পড়ে এবং তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট জীবন যাপনের পন্থা অবলম্বন করে। জড়-জাগতিক বাসনা এবং দূষিত অভ্যাসসমূহ চর্চার কারণে তারা পূর্বের উচ্চতর উপলব্ধি এবং যাদুকরি শক্তি হারিয়ে ফেলে।
সমগ্র বৈদিক সাহিত্য সুপক্ক ফল সদৃশ শ্রীমদ্ভাগবত এই ধরনের আট রকমের অদ্ভূত ক্ষমতার কথা বর্ণিত আছে।
শ্রীমদ্ভাগবতে ১১/১৫/৪-৮ শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে, “আট প্রকারের মুখ্য সিদ্ধির মধ্যে, তিনটির দ্বারা নিজের শরীরকে পরিবর্তিত করা যায়; যেমন, অণিমা বা ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র হওয়া; মহিমা বা বৃহত্তম অপেক্ষা বৃহৎ হওয়া; আর লঘিমা বা সর্বাপেক্ষা হাল্কা অপেক্ষা হাল্কা হওয়া। প্রাপ্তি সিদ্ধির মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা-ই প্রাপ্ত হওয়া যায়, আর প্রাকাম্য সিদ্ধির মাধ্যমে তিনি যে কোন ভোগ্য বস্তুর অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। ঈশিতা সিদ্ধির মাধ্যমে মায়ার আনুসঙ্গিক শক্তিগুলিকে ইচ্ছা মতো প্রয়োগ করা যায়, আর নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি, যাকে বলে বশিতা-সিদ্ধি, তার দ্বারা তিনি জড়া প্রকৃতির গুণগুলির দ্বারা বিঘ্নিত কোনও স্থান থেকে লাভ করতে পারেন। প্রিয় উদ্ধব, এই অষ্ট সিদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই এখানে রয়েছে বলে মনে করা হয় এবং এগুলি এই বিশ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জড়া প্রকৃতির গুণজাত দশটি গৌণ অলৌকিক সিদ্ধি হচ্ছে, নিজেকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং অন্যান্য দৈহিক উপদ্রব থেকে মুক্ত করা, বহু দূরের বস্তু দর্শন করার ক্ষমতা, সুদূরবর্তী কোনো কথা শ্রবণ করার ক্ষমতা, মনের বেগে শরীরকে চালিত করা, ইচ্ছামতো রূপ পরিগ্রহ করা, অন্যদের শরীরে প্রবেশ করা, ইচ্ছামৃত্যু এবং স্বর্গীয় যুবতী অপ্সরাদের লীলা দর্শন করা, নিজের সঙ্কল্প সম্পূর্ণ রূপে সম্পাদন করা এবং প্রদত্ত আদেশ নির্বিঘ্নে পূর্ণরূপে পালিত হওয়া। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জানার ক্ষমতা; শীত, উষ্ণ এবং অন্যান্য দ্বন্দ্বগুলি সহ্য করার ক্ষমতা; অন্যদের মনের কথা জানতে পারা; অগ্নি, সূর্য, জল ইত্যাদির প্রভাব পরীক্ষা করার ক্ষমতা; এবং অন্যদের দ্বারা অপরাজিত থাকা- এই পাঁচটি হচ্ছে যোগ এবং ধ্যানের সিদ্ধি।”
বর্তমান দিনের কল্পনা প্রসূত সুপার হিরোদের শক্তি বৈদিক যুগের সাধারণ মানুষের শক্তির তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। সেই সময়কার মানুষের ঐশ্বর্য এবং শক্তিমত্তা আমাদের দৃশ্যমান কোনো কিছুর চাইতে অনেক বেশি। তাদের জীবনটা মনে হয় যেন নিত্যকালের, সময় যেন নিত্য বর্তমান এবং তারা হাজারো বছর বেঁচে থাকতো। যদিও তখন কোনো রোগব্যাধি ও বৃদ্ধ অবস্থা ছিল না কিন্তু তথাপিও এই জীবনটা ছিল ক্ষণস্থায়ী । তখনো মৃত্যু সবার জীবনেই আসতো তাই এই মৃত্যুর সাগরে ভেসে ভেসে অসীম ক্ষমতার প্রদর্শন কিংবা জাদুকরী শক্তি প্রয়োগ করে ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন করা ছিল সবচেয়ে নিরর্থক। কিন্তু এই তীব্র জড় জগতের বাসনা ভগবানের প্রতি ইন্দ্রিয় অর্পণের মাধ্যমে দূরীভূত হয় এবং মানুষকে অসীম জন্ম-মুত্যর চক্র থেকে উদ্ধার করে।
এমন কোনো স্থান কি আছে যেখানে আমাদের আত্মা সর্বদাই সন্তুষ্ট থাকে? হ্যাঁ, পারমার্থিক জগৎ— যেটি জড় অভিজ্ঞতার বাইরে অবস্থিত। এটি সেই স্থান যা প্রতিটি জীবের প্রকৃত আলয়। যেসব আত্মা সে জগতে প্রবেশ করে তারা ভগবানের সাথে শুদ্ধভক্তির সম্পর্কে নিবিষ্ট থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তার শুদ্ধভক্তদের মধ্যে শুদ্ধ ভালোবাসা বিদ্যমান।
বেদে উল্লেখ আছে, পৃথিবীতে অনেক অদৃশ্যমান জগতের অস্তিত্ব আছে। তবে কি পৃথিবীতে পারমার্থিক জগতের অস্থিত্ব রয়েছে? শাস্ত্র বলছে, অন্যান্য উচ্চতর লোকের অস্থিত্ব এই পৃথিবীতে রয়েছে তবে তা অদৃশ্যমান। কৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্তরাই অদৃশ্য লোকসমূহ দর্শন করতে পারেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ভূমি বৃন্দাবন সেই ধরনের একটি ধাম। যদিও জড় চক্ষু দিয়ে এই লোকের একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল দৃশ্যমান হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কয়েকজন পার্ষদ যাদের ভগবানের প্রতি প্রেমময় প্রীতি ও ভালবাসা ছিল তারা বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের বহু লীলাস্থান আবিষ্কার করেছিলেন।
১৫২৪ খ্রিস্টাব্দের কার্তিক মাসে স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লুপ্ত হয়ে যাওয়া দু’টি অদ্বিতীয় কুণ্ড আবিষ্কার করেন। চৈতন্য মহাপ্রভু যিনি রাধাভাব অঙ্গীকার করেছেন তিনি সর্বত্র কৃষ্ণকে অন্বেষন করছিলেন। যখন তিনি গোবর্ধন তটে কৃষ্ণকে অনুসন্ধান করছিলেন তখন তিনি অরিষ্টা গ্রামে উপনীত হন। তিনি সেখানকার বাসিন্দাদের


বৈদিক ধর্ম অনুসারে চললে পাপকর্ম থেকে দূরে থাকা সম্ভব। প্রায়শ্চিত্ত হল স্বেচ্ছায় তপস্যাময় জীবন গ্রহণ করা যাতে পাপ কর্ম থেকে মুক্ত থাকা চায়। ঠিক যেমন একজন কয়েদী সাজা মওকুফের জন্য পূর্বেই শরণাগত হয়। কিন্তু প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে আমরা রোগের উপসর্গ থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছি মাত্র কিন্তু পুরোপুরি রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে না।


জিজ্ঞেসা করলেন, রাধাকুণ্ড কোথায়? তারপর তিনি নিজেই চারদিক দর্শন করতে লাগলেন। একসময় তিনি হঠাৎ দৌড় দিলে গ্রামবাসীরা মহাপ্রভুর এই কার্যকলাপ বুঝতে পারলেন না। তারা দেখলেন একটি ধানক্ষেতের মাঝখানে দু’টি ক্ষুদ্র জলাশয় মহাপ্রভুকে অত্যন্ত আবেগ তাড়িত করেছে। তারা আশ্চর্য হয়ে গেল যে তিনি সেই ক্ষুদ্র জলাশয়ে স্নান করছেন এবং অঙ্গে জলাশয়ের মাটি লেপন করছেন। তিনি অবশেষে রাধাকুণ্ড ও শ্যামকুণ্ডের সন্ধান পেলেন যা আমাদের কাছে এখনো পরম আশীর্বাদ রূপে বিরাজিত। চৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী পরবর্তীতে এই কুণ্ডসমূহ খনন করে বর্ধিত করেন। খনন কার্য চলার সময় পঞ্চ পাণ্ডবদের অন্যতম যুধিষ্ঠির মহারাজ রঘুনাথের স্বপ্নে আবির্ভূত হন এবং শ্যামকুণ্ডের চারদিকে বৃক্ষ নিধন না করার জন্য অনুরোধ জানান। কেননা তারা পাঁচ ভাই বৃক্ষরূপে এই কুণ্ডের চারদিকে অবস্থান করছেন এবং রাধাকৃষ্ণের নিত্য আরাধনা করছেন।

কুণ্ডের আবির্ভাব

একবার মথুরার রাজা কংস অরিষ্টাসুর নামে একটি অসুরকে ব্রজে পাঠালেন কৃষ্ণকে হত্যা করতে। এই ষাড়রূপী অসুর ছিল অত্যন্ত ভয়ানক, সকল ব্রজবাসীকে সে ভয়ে সন্ত্রস্ত করে তুলল। পরিশেষে শ্রীকৃষ্ণ গিয়ে অনায়াসে অরিষ্টাসুরকে বধ করলেন। সেই রাত্রে কৃষ্ণ গোপিকাদের আকর্ষণ করে তাদের সাথে রাসনৃত্য উপভোগ করার জন্য তাঁর মোহন বংশীটি বাজালেন।
যখন রাধারাণী, ললিতা এবং অন্যান্য সখীগণ বংশীধ্বনি অনুসরণ করে কৃষ্ণের কাছে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে এভাবে বাক্যালাপ করতে লাগলেন, “ব্রজরাজ নন্দ পুত্র আজ একটি ষাঁড়কে নিধন করেছে। রাধারাণী বললেন, “হে ষাড় নিধনকারী! আজ তুমি আমাদের স্পর্শ করবে না।”
কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, “হে গোপীগণ! ওটা আসলে কোনো ষাঁড় ছিল না। ওটা ছিল একটা অসুর, ষাঁড়ের রূপ ধরে সে ব্রজবাসীদের ক্ষতিসাধন করতে এসেছিল।”
রাধারাণী বললেন, “হে কৃষ্ণ! ওটা একটা অসুর হলেও সে ষাঁড়ের রূপ পরিগ্রহ করেছিল । বৃত্রাসুরও একটি অসুর ছিল, কিন্তু তাঁকে হত্যা করায় ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়েছিল। একইভাবে, এই অরিষ্টাসুর একটি অসুর হলেও যেহেতু সে ষাঁড়ের রূপ গ্রহণ করেছিল, সেজন্য তোমার অবশ্যই পাপ হয়েছে।”
কৃষ্ণ রাধারাণীর এই ব্যাখ্যা শুনে কোনো উত্তর না দিয়ে লজ্জাবিনম্র মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তিনি রাধারাণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার পাপের প্রায়শ্চিত কিভাবে হবে?
রাধারাণী ও তাঁর সখীরা বললেন, “এই ধরনের পাপ হলে সমস্ত পবিত্র তীর্থে গিয়ে স্নান করতে হয়। তবেই ষাঁড় হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব।”
কৃষ্ণ রাধারাণীর কাছ থেকে প্রায়শ্চিত্তের এই বিধান শুনে তৎক্ষণাৎ তাঁর বামপদের গোড়ালি দিয়ে ভূমিতে আঘাত করলে সেখানে একটি গর্তের সৃষ্টি হলো এবং তৎক্ষণাৎ পাতাললোক হতে ভাগবতী গঙ্গা সেখানে আবির্ভূত হলেন। তখন কৃষ্ণ সেই জলে সর্বতীর্থকে আহ্বান করলেন। তাঁর আদেশক্রমে সকল তীর্থ আবির্ভূত হয়ে ঐ কুণ্ডজলে প্রবেশ করলেন ।
সেখানে অবগাহনের পর কৃষ্ণ বললেন, “সর্বতীর্থের পবিত্র জল যাতে এই কুণ্ডে নিত্য বিরাজ করে, আমি তার ব্যবস্থা করব।” তিনি রাধারাণী ও তাঁর সখীদের বললেন, “এখন আমি এই কুণ্ড জলে স্নান করে পাপমুক্ত হয়েছি। কিন্তু তোমাদের কি হবে? তোমরা তো এ জীবনে কোনো পুণ্যকর্ম করনি। তবে কিভাবে তোমরা সর্বতীর্থজলে স্নান করবে?”
গোপীগণ বললেন, “হে কৃষ্ণ! তোমার বুদ্ধিমত্তা কে বুঝবে? কিভাবে তুমি এত গর্ব করে বলছ যে, এই কুণ্ডের জল সর্বতীর্থের? তোমার কথা আমরা বিশ্বাস করি না!”
গোপিকাদের এই কথা শুনে কৃষ্ণের আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সর্বতীর্থ তাঁদের নিজ নিজ রূপে রাধারাণীর সামনে আবির্ভূত হয়।
কৃষ্ণ গোপিগণকে বললেন, “এখন তোমাদের সন্দেহ করার আর সুযোগ নেই। এখন তোমাদের সবাইকে এই কুণ্ড জলে স্নান করে পাপমুক্ত হতে হবে। নচেৎ তোমরা দূষিত রয়ে যাবে।”
রাধারাণী বললেন, “হে সখীগণ! কৃষ্ণ পদাঘাত করে এই কুণ্ড সৃষ্টি করেছে। এমন সূচনা শুভপ্রদ নয় । তাছাড়া, কৃষ্ণ এই জলে স্নান করাতে সমস্ত জল দূষিত হয়ে গেছে। আমরা কূপ খনন করে সেখানে স্নান করব।”
কৃষ্ণের সৃষ্ট কুণ্ডের পশ্চিমে রাধারাণী একটি স্থান দেখলেন, যেখানে অরিষ্টাসুরের খুরের আঘাতে একটি গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। রাধারাণী ও তার সখীরা হাতের কঙ্কন খুলে সেখানে খুঁড়তে শুরু করলেন। যেহেতু এই কুণ্ডটি রাধারাণীর কঙ্কন দিয়ে খনন করা হয়েছিল, সেজন্য এই কুণ্ডের নাম হল কঙ্কন কুণ্ড; পরবর্তীতে এই কুণ্ডটি রাধাকুণ্ড নামে খ্যাত হয়।
এভাবে রাধারাণী খুব শীঘ্রই কৃষ্ণ-কুণ্ড বা শ্যামকুণ্ডের পাশেই একটি কুণ্ড সৃষ্টি করলেন। কৃষ্ণ এটি দেখে বিস্মিত হলেন। তিনি রাধারাণীকে বললেন, “হে কমলাক্ষী! জল ছাড়া এই শুষ্ক কুণ্ড ব্যর্থ। তোমরা ইচ্ছে করলে আমার কুণ্ড হতে জল নিতে পার।” কৃষ্ণের এই কথা শুনে রাধারাণী মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “ঐ জল তোমার পাপে দূষিত হয়ে গেছে। আমার সখীদের সহায়তায় আমি মানসীগঙ্গা থেকে এখানে জল নিয়ে আসব। এভাবে আমি এ জগতে আমার কুণ্ডের অনবদ্য মহিমা প্রতিষ্ঠা করব!”
কৃষ্ণ ভাবলেন, এটি রাধারাণী ও তাঁর সখীগণের পক্ষে অনেক শ্রমসাধ্য হবে, সেজন্য তিনি সকল তীর্থবর্গকে নির্দেশ দিলেন শ্রীমতি রাধিকার সেবা করতে। তৎক্ষণাৎ তীর্থগণ তাঁদের স্ব-স্ব রূপে শ্রীমতী রাধারাণীর সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে প্রণতি নিবেদন করে বললেন, “হে দেবী! আপনার সদয় দৃষ্টিপাতে অনুগ্রহ করে আমাদের গ্রহণ করুন! এই কুণ্ডে আমাদের সর্বদা বিরাজ করতে দিন, যাতে আমরা কৃষ্ণের সাথে আপনাদের মাধুর্যপূর্ণ লীলা দর্শন করতে পারি। এভাবে আমাদের সকল অভিলাষ পূর্ণ হবে।”
মূর্তিমান তীর্থসকলের এসব প্রার্থনা শুনে রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “হে তীর্থসকল, আমি তোমাদের প্রার্থনায় প্রীত হয়েছি। তোমরা আমার কুণ্ডে প্রবেশ করতে পার।”
রাধারাণীর এই কৃপাপূর্ণ আদেশ উচ্চারিত হওয়া মাত্রই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বংশীধ্বনির সাহায্যে দুটি কুণ্ডের মধ্যবর্তী বিভাজক বাঁধটি ভেঙে দিলে শ্যামকুণ্ডের জল রাধাকুণ্ডে প্রবেশ করল।
শ্রীমতী রাধারাণী তাঁর কুণ্ডে প্রবেশ করেন কার্তিক পূর্ণিমার দিনে (কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা বহুলাষ্টমী তিথি) কৃষ্ণ যখন রাধাকুণ্ডকে জলে পূর্ণ হয়ে যেতে দেখলেন, তখন তিনিও সেখানে স্নান করে রাধারাণীকে বললেন, “হে প্রিয়তমা! তোমার তৈরী এই কুণ্ডে আমি প্রতিদিন জলকেলি করব। তোমার মতো এই কুণ্ডও আজ থেকে আমার প্রিয় হবে।”
প্রতি বছর সহস্র সহস্র ভক্ত এই তিথিতে রাধাকুণ্ডের এই আবির্ভাব মুহূর্তে এই কুণ্ডে স্নান করেন—জীবনে পরম সার্থকতা লাভের অভিলাষে।
এখনো রাধাকুণ্ডের অভ্যন্তরে কঙ্কন কুণ্ড রয়েছে। এটির আয়তন ২০ বর্গফুট এবং এটি ১৬ ফুট গভীর। ভক্তরা যখন রাধাকুণ্ড পরিচ্ছন্ন করার উদ্দেশ্যে কুণ্ড জলশূন্য করেন, তখন কঙ্কনকুণ্ড দেখা যায় ।

অপ্রাকৃত দর্শন ক্ষমতা

বৈদিক শাস্ত্রে অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা রয়েছে যার মধ্যে বৃন্দাবনে সংঘটিত এক ঐতিহাসিক অপ্রাকৃত কৃষ্ণ লীলার কাহিনি আমরা জানতে পারি। মর্ত্যলোকের বৃন্দাবনে পারমার্থিক জগতের বৃন্দাবনের প্রতিবিম্ব। চিন্তামণি পাথর, কল্পবৃক্ষ, বাগান, অসংখ্য রত্ন খচিত তট সমৃদ্ধ রাধাকুণ্ডকে দর্শনের যোগ্যতা আমাদের হয়নি কিন্তু রাধাকুণ্ডের কৃপায় আমরা এই পৃথিবীতেও সেই অপ্রাকৃত দিব্য দর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি।
আমরা এখনো উপলব্ধি করতে পারি বৃন্দাবনের সেই জাদুকরি অদৃশ্যমান লীলাসমূহ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে কিন্তু এখানের সবকিছুর শুধুমাত্র কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার জন্যই।

ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।
যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ॥

অর্থাৎ, “সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আমার সেই পরম ধামকে আলোকিত করতে পারে না। সেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।” (গীতা ১৫/৬)
বৃন্দাবন একটি পদ্মফুলের মতো যার পাপড়ি কখনো খুলে আবার কখনো বন্ধ হয়। কেউ কৃষ্ণ ও গোপিকাদের আনুগত্যে তাদের প্রতি প্রেমময়ী সেবা বর্ধিত হলে পাপড়ি সদৃশ বৃন্দাবনে প্রবেশ করতে পারে। সেখানের গাভীসমূহ হল কামধেনু অর্থাৎ তারা সকলের আকাঙ্খা পূর্ণ করতে পারে এবং অসীম পরিমাণে দুগ্ধ প্রদান করতে পারে। সেখানের বৃক্ষসমূহ কল্পবৃক্ষ এবং সেখানকার ধূলিকণাও সকলের মনো বাসনা পূর্ণ করতে পারে। সেখানকার পশু-পাখি এমনকি যেকোনো বস্তুরই পূর্ণ চেতনা সম্পন্ন জীব এবং সকলেই বিশেষভাবে কৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। কৃষ্ণ এবং তার ভক্তগণ একই সময়ে বহু স্থানে নিজেদের বিস্তার করতে পারে। পৌর্ণমাসী এবং বৃন্দাদেবী হলেন বৃন্দাবনে কৃষ্ণের সকল লীলাসমূহের প্রধান পরিচালক। তারা বৃন্দাবনে একই সময়ে সমস্ত ঋতুর আবির্ভাব ঘটান এবং বৃন্দাবনে সর্বত্র সমস্ত রং ও সৌন্দর্যের প্রতিফলন ঘটান।
বৃন্দাবনে কৃষ্ণের অসাধারণ দিব্যলীলা শ্রবণ এবং পঠনের মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হই। কিন্তু জড় জাগতিক গল্প, কাহিনি ইত্যাদি আমাদেরকে জড় জগতে আবদ্ধ করে রাখে। পারমার্থিক লীলা আমাদের চেতনাকে ঊর্ধ্বমুখী করে এবং সেগুলো সর্বদা সজীব ও আমাদের হৃদয়ের সমস্ত কলুষতা দূর করে। যখন আমরা কৃষ্ণের নাম, রূপ, গুণ এবং লীলার সংস্পর্শে আসি তখন মূলত আমরা তার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হই। তখন আমাদের পারমার্থিক দৃষ্টি উন্মোচিত হয় তখন আমরা সকল অদৃশ্যমান বস্তু বা লোক দর্শন করতে পারি।
মায়া থেকে মুক্ত হলে আমরা জড় মন ও ইন্দ্রিয়ের কদর্যরূপ দেখতে পাই। যখন আমরা শুদ্ধভক্তি লাভ করি তখন কোনো অতি আশ্চর্যকর শক্তিও আমাদেরকে কৃষ্ণসেবা এবং কৃষ্ণভক্তি থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।
তাই যদি আপনি দিব্য হংস বিমানে আরোহণ করতে চান কিংবা সর্বোৎকৃষ্ট প্রকৃত সুপার হিরোদের সাথে সাক্ষাৎ করতে চান তাহলে আপনার কোনো অতি অদ্ভূত শক্তি কিংবা উচ্চতর ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র শ্রীমদ্ভাগবত, মহাভারত, রামায়ন আদি অন্যান্য কালজয়ী বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে আপনি ভগবান এবং শুদ্ধভক্তের এক বিস্ময়কর জগতে পৌঁছাতে পারবেন।


বৃন্দাবনে কৃষ্ণের অসাধারণ দিব্য লীলা শ্রবণ এবং পঠনের মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হই। কিন্তু জড় জাগতিক গল্প, কাহিনি ইত্যাদি আমাদেরকে জড় জগতে আবদ্ধ করে রাখে। পারমার্থিক লীলা আমাদের চেতনাকে ঊর্ধ্বমুখী করে এবং সেগুলো সর্বদা সজীব ও আমাদের হৃদয়ের সমস্ত কলুষতা দূর করে।


তাদের বিস্ময়কর ও জাদুকরী সত্যি ঘটনাসমূহ আপনার রোমাঞ্চকর এবং দুঃসাহসিকতার স্বাদকে পরিপূর্ণভাবে মেটাবে। সেসাথে আপনাকে পারমার্থিক বিচক্ষণতা ও জ্ঞান দান করবে যা আপনার আত্মাকে সন্তুষ্টি দিবে। কল্পনাপ্রসূত বৈজ্ঞানিক কাহিনি কিংবা অদ্ভূত যোগীদের কার্যকলাপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে আমাদের এই ভ্রমণ এ জগতে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ভক্তিযোগী হতে হবে যাতে এই জগৎ থেকে অসংখ্য গ্রহলোক পেরিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ স্তর অতিক্রম করে পারমার্থিক জগতের সুউচ্চ ধাম গোলক বৃন্দাবনের দিকে দুঃসাহসিক ও প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা শুরু করতে পারি।
(এই প্রতিবেদনটি লেখকের ওয়ার্ল্ডস অব ম্যাজিক, ওয়ার্ল্ডস অব ট্রুথ ইংরেজি প্রতিবেদনের সংকলিত রূপ ।)
লেখক পরিচিতি: শ্রীমতি নিকুঞ্জ বিলাসিনী দেবী দাসী গিরিরাজ স্বামী মহারাজের একজন শিষ্যা। তিনি তাঁর স্বামী ও দু’সন্তানসহ দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বাস করেন। তিনি একজন ফ্রিল্যান্স লেখক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here