শ্রীজগন্নাথের পাঁচ অহৈতুকী কৃপা

0
52
ভারতের ওড়িষ্যায় অবস্থিত জগন্নাথ পুরী ও ভগবান শ্রীজগন্নাথ সারা বিশ্বে যেভাবে বিখ্যাত।

অমরনাথ দাস


ভগবান শ্রীজগন্নাথের অপরিসীম কৃপাময় লীলাবিলাস রয়েছে। এই প্রতিবেদনে ভগবানের কৃপার পাঁচটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো রথযাত্রা উৎসব।
সমগ্র জগতে জগন্নাথই হল একমাত্র ভগবান যিনি জনসমক্ষে রথে চড়ে আনন্দ উপভোগ করেন। এমন কি সনাতন ধর্মে কোথাও এ ধরনের উদযাপনের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আপনি কখনো দেখবেন না যে, শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীরামচন্দ্র রথযাত্রা করছেন। জগন্নাথ শুধু নিজেই বের হন না, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও কনিষ্ঠ ভগ্নীকেও সাথে নিয়ে বের হন। এক জনৈক ভক্ত বলছিলেন, আপনি অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যান। কিন্তু ডাক্তারের কাছে যেতে অক্ষম হলে তখন ডাক্তার স্বয়ং আপনার গৃহে আগমন করে। তদ্রুপ যাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা রয়েছে কিংবা যারা জড়বিষয়ী ব্যক্তি তারা পরম ডাক্তার ভগবানকে দর্শন করার বা রোগ নিরাময়ের জন্য ভগবানের কাছে যান। কিন্তু যারা ভবরোগে এতই আক্রান্ত যে, তারা মন্দিরে ভগবানকে দর্শন করতে যায় না, তখন ভগবান স্বয়ং তাদের দর্শনের জন্য মন্দির থেকে বের হন। উড়িষ্যার জগন্নাথ পুরীতে জগন্নাথকে দর্শনের জন্য কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোকেরা সেখানে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু, জগন্নাথ হলেন সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি, তবে কেন শুধুমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই জগন্নাথকে দর্শন করতে পারবে? এটি একটি পরস্পর বিরোধী বিষয় তখন ভগবান বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরে যাবে, আর আমি স্বয়ং মন্দির থেকে বের হয়ে সবাইকে দর্শন দিব। এই হলেন কৃপাময় ভগবান।

ভগবানের আঁখি যুগল

দ্বিতীয়ত ভগবানের অদ্ভুত গোলাকার আঁখিযুগল। তিনিই একমাত্র ভগবান যিনি কখনো নিদ্রা যান না। জগন্নাথপুরীর গর্ভ মন্দিরের দ্বার মাত্র দু’ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়। সাধারণত বিভিন্ন মন্দিরে দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত গর্ভমন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকে। কিছু কিছু মন্দিরে আবার ১২.৩০ থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এরপর রাত্র ৮.৩০ টার দিকে দ্বার বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ঐ সময় ভগবান বিশ্রামে থাকেন। কিন্তু জগন্নাথ পুরীতে যে কোনো সময় এমন কি রাত ১২টা বা ১টার দিকে গেলেও ভগবানকে দর্শন করা যায়।
উল্লেখ্য, ২ ঘণ্টা দ্বার বন্ধকালীন জগন্নাথ বিশ্রাম নেন না বরং বিভিন্ন গ্রহলোক থেকে আগত দেব-দেবীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। অর্থাৎ ২২ ঘণ্টা ধরে মর্ত্যলোকবাসীরা ভগবানকে দর্শন করে এবং বাকী ২ ঘণ্টা বিশেষভাবে দেব-দেবীদের দৰ্শন দেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে ঐ ২ ঘণ্টা যে জগন্নাথ নিদ্রা যান না তার প্রমাণ কি? এর প্রাথমিক প্রমাণ হলো জগন্নাথের চোখের কোনো পলক নেই। তিনিই হলেন একমাত্র ভগবান যিনি পলকবিহীনভাবে সর্বদা তার ভক্তদের দর্শন করতে চান। যখন কৃষ্ণ বৃন্দাবন প্রস্থান করেন তখন গোপীরা ব্রহ্মাকে তিরস্কার করেছিলেন, “আপনি কি রকম সৃষ্টিকর্তা যে, আপনি চোখের পলক সৃষ্টি করেছেন? কৃষ্ণ যখন উপস্থিত থাকেন, তখন চোখের পলক উন্মোচন থাকে আর সেটা যখন বন্ধ হয় তখন কৃষ্ণ থাকে না বা কৃষ্ণকে দর্শন করতে পারি না। এভাবে চোখের পলক পড়ার মাধ্যমে কৃষ্ণকে দর্শন করতে না পারার মুহূর্তগুলো একত্রিত করলে তা অনেক সময় এবং আমরা ঐ সময় পর্যন্ত কৃষ্ণকে দর্শন করতে পারছি না। এ কেমন ত্রুটিপূর্ণ সৃষ্টি? পক্ষান্তরে জগন্নাথ এমনই কৃপাময় যে, তিনি তাঁর ভক্তদের দর্শনের জন্য চোখের পলকই রাখেন নি। তিনি প্রত্যেক জীবকে দর্শন করতে চান। জগন্নাথের আঁখিযুগল গোলাকার হওয়ায়, তিনি ভক্তদের সর্বদা চতুর্দিকে দর্শন করেন। ভগবানের আঁখি যুগল অনেকটা আতশি কাঁচের মতো যার মাধ্যমে তিনি ভক্তের অত্যন্ত ক্ষুদ্র গুণাবলীও বৃহৎ রূপে দর্শন করেন।

প্রসাদের মহিমা

তৃতীয়ত জগন্নাথের প্রসাদ। ভগবৎ অনুশীলনের জন্য অনেক বৈদিক নিয়ম রয়েছে, যেমন-যজ্ঞ, ধ্যান, বিগ্রহ অৰ্চন ইত্যাদি। মহাপ্রভুআত্ম উপলব্ধির পন্থা হিসেবে মহামন্ত্র নিয়ে এসেছেন, কিন্তু মহাপ্রভুর এই কৃপাও আমরা গ্রহণে অসমর্থ। এজন্যে যেটি সবচেয়ে সহজসাধ্য সেই মহাপ্রসাদই জগন্নাথ আমাদের জন্য সুলভ করেছেন। তাই জগন্নাথকে বলা হয় আন্নাব্রহ্মানি, অর্থাৎ, তিনিই একমাত্র ভগবান যিনি প্রসাদের মাধ্যমে কৃপা বিতরণ করেন। বৃন্দাবনের কৃপা লাভ করা যায় ব্রজের ধূলায় গড়াগড়ি দেওয়ার মাধ্যমে, মায়াপুর ধামের কৃপা লাভ করা যায় গঙ্গায় স্নান করার মাধ্যমে। কিন্তু পুরীধামের কৃপা লাভ করা যায় জগন্নাথের মহাপ্রসাদ আস্বাদনের মাধ্যমে। শাস্ত্রমতে, জগন্নাথের প্রসাদ এত পবিত্র যে, এমনকি একজন ব্রাহ্মণ জগন্নাথের প্রসাদ কুকুরের মুখ থেকে নিয়েও খেতে পারবে, এতে উচ্ছিষ্টের কোনো বালাই নেই।
চৈতন্য মঙ্গল গ্রন্থে লোচন দাস ঠাকুর বর্ণনা করেছেন কিভাবে জগন্নাথের মহাপ্রসাদ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে।
একদা নারদ মুনি বৈকুণ্ঠে গিয়ে লক্ষ্মীদেবীর সেবা করলে লক্ষ্মীদেবী অত্য ন্ত প্রসন্ন হয়ে মুনিবরকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। মুনি বললেন, “হে মাতা, আপনি প্রতিশ্রুতি দিন, আমি যে বর প্রার্থনা করব, আপনি তাই দেবেন।” লক্ষ্মীদেবী প্রতিশ্রুতি দিলেন। তখন মহান ঋষি নারদ ব্যক্ত করলেন, লক্ষ্মীদেবী যেন তাঁকে শ্রীনারায়ণের ভুক্তাবশেষ মহাপ্রসাদ প্রদান করেন। একথা শ্রবণমাত্র লক্ষ্মীদেবী উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, “হে নারদ, প্রভুর প্রসাদ ছাড়া আমার কাছে অন্য কিছু চাও”, তিনি অনুনয় করে বললেন, “কয়েকদিন পূর্বে প্রভু কাউকে তাঁর প্রসাদ প্রদান না করার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তোমাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, আমি পতির আজ্ঞা লঙ্ঘন করতে পারি না।” নারদ মুনিও তাঁর সঙ্কল্পে অনড় থেকে বিনীতভাবে বললেন, মাতা, আপনি প্রভুর প্রিয় ভার্যা, যে কোনো উপায়ে আমি প্রভুর ভুক্তাবশেষ চাই ।”
সেদিন মধ্যাহ্ণ ভোজ পরিবেশনের সময় শ্রীনারায়ণ প্রিয়তমা ভার্যার বিষণ্ন ও নিষ্প্রভ মুখমণ্ডল দেখে প্রশ্ন করলে, লক্ষ্মীদেবী পতির চরণকমলে পতিত হয়ে তাঁর অবস্থার কথা জানালেন। শ্রীনারায়ণ করুণাপূর্ণচিত্তে ক্রন্দনরতা দয়িতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “কেবল আজকের জন্য আমি নিয়মটি শিথিল করছি। তবে তুমি আমার অগোচরে ভোজন পাত্রটি সরিয়ে নিয়ে তাকে প্রসাদ দিবে।”
লক্ষ্মীদেবী সানন্দে পাত্র থেকে মহাপ্রসাদ নারদমুনিকে অর্পণ করলেন। নারদ মুনি প্রসাদ পেয়ে আনন্দ উল্লাসে নৃত্য করতে করতে সেই প্রসাদ গ্রহণ করলেন। তিনি যখন প্রসাদ আস্বাদন করছিলেন, তখন তিনি ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন ও মহানন্দে বিরতিহীন নৃত্য করতে লাগলেন । মুনিবর তাঁর বীণা হস্তে উন্মত্তের মতো ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র ভ্রমণ করতে লাগলেন। অবশেষে তিনি মহাদেব শিবের আবাসস্থান কৈলাসে পৌছলেন। নারদ মুনির আনন্দোল্লাস ও নৃত্য দেখে শিবও বিস্ময়াভিভূত হলেন। বিষ্ণুভক্তির সাগরতরঙ্গে সন্তরণরত নারদমুনি শিবকে দেখতেই পাননি।
শিব দিব্য ভাবাবিষ্ট নারদ মুনির এরকম আনন্দের হেতু জানতে চাইলে মুনি বিশদ জানালেন।
শ্রীশিব করজোড়ে মুনিকে বললেন, “হে নারদ! তুমি মহাসৌভাগ্যবান।” শিবশম্ভু আশান্বিত চিত্তে স্মিত হেসে বললেন, “প্রিয় নারদ, আমার জন্য কোনো প্রসাদ নিয়ে এসেছ কি?”
নারদ মুনি দুঃখিত চিত্তে শ্রীশিবের সামনে অধোবদনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন তিনি লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর আঙুলের নখাগ্রে এক কণা প্রসাদ লেগে রয়েছে। নারদ মুনি শিবের মুখে তাঁর হাতের আঙুল প্রবেশ করালেন। সেই ক্ষুদ্র প্রসাদ-কণা মহাদেবের জিহ্বার স্পর্শ হওয়া মাত্র তিনি মহাসুখ ও প্রবল প্রেমোচ্ছ্বাসে নৃত্য-ব -কীর্তন করতে শুরু করলেন এবং উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পেতে লাগল । এভাবে তাঁর নৃত্য-উন্মাদনা এতই প্রবল হয়ে উঠল যে, তিনি প্রলয়কালীন তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলেন। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড কম্পিত হতে শুরু করলে প্রতিটি জীবেরা ভয়ার্ত হয়ে উঠল।
শিবজীকে সেই প্রলয়নৃত্য হতে নিবৃত্ত করার সাহস কারো হলো না। তখন দেবগণ মাতা পার্বতীর কাছে অনুরোধ করলেন প্রভুকে নিবৃত্ত করার জন্য, নতুবা ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে। মাতা পার্বতী তখন অকুস্থলে আবির্ভূতা হয়ে দেখলেন শ্রীশিব অমেয় ভাবোল্লাসে নৃত্য করতে লাগলেন। শিবের বাহ্যচেতনা ফিরে এলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে প্রিয় পতি! কেন আপনি এমন নৃত্য করছেন?”
শিবজী বললেন, “তিনি নারদ মুনির নিকট থেকে শ্রীনারায়ণের মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেছেন।” পার্বতীদেবী বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পতি, আমি আপনার অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে সামান্যতম প্রসাদ অবশ্যই পাওয়ার অধিকারী। আমার প্রাপ্যভাগ রেখেছেন তো?” শিবজী নিরাশ করলেন। পার্বতী তার প্রাপ্য প্রসাদ না পেয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। সেই ক্রোধাগ্নিতে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড অসহ্য উত্তপ্ত হতে লাগল। নিম্নলোক থেকে উর্ধ্বলোক পর্যন্ত ত্রিভুবনের সকলেই সেই তাপ অনুভব করতে লাগল। সাধু-ঋষিগণ অনুভব করলেন যে মাতা পার্বতীর ক্রোধাগ্নিতে সর্বস্ব ধ্বংস হতে চলেছে। কেউ তাঁর ক্রোধ প্রশমিত করতে পারলেন না।
অবশেষে ব্রহ্মার নেতৃত্বে সকল দেবগণ ভগবান শ্রীবিষ্ণুকে সব কিছু জানাতে ত্রস্তভাবে বৈকুণ্ঠে গমন করলেন। জটিল পরিস্থিতি দেখে ভগবান শ্রীবিষ্ণু গরুড়ের পিঠে আরোহণ করে অবিলম্বে কৈলাসে উপনীত হলেন। যখনই পার্বতী দেবী শ্রীনারায়ণকে দর্শন করলেন, তিনি তাঁকে প্রণিপাত করতে এগিয়ে এলেন। শ্রীনারায়ণ তাঁর ভক্তকে আশীর্বাদ করে বললেন, “আমি তোমাকে প্রচুর মহাপ্রসাদ দেব। তুমি ক্রোধ সংবরণ করে শান্ত হও। নতুবা তোমার সকল সন্তান বিনাশ হবে।”
মাতা পার্বতী প্রতিবাদ করে বললেন, “আপনার মহাপ্রসাদ না পেয়ে আমি যেরকম কষ্ট পেয়েছি, আমি চাই না সকল জীবগণ এভাবে কষ্ট ভোগ করুক। তাই কেবল আমি নই, সকলের জন্য মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা করতে হবে এমনকি ১টি কুকুরও যাতে প্রসাদ ভোজন করতে পারে।”
শ্রীনারায়ণ স্মিত হেসে বললেন, “তথাস্তু। হে পার্বতী, তোমার অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য আমি নীলাচল ধামে আবির্ভূত হব। আমার মন্দিরের প্রসাদ বিতরণের জন্য ভুবনে প্রসিদ্ধ হবে। যে-ই আমার প্রসাদ গ্রহণ করবে সেই মুক্তি লাভ করবে। আমার সকল প্রসাদ প্রথমে তোমাকে নিবেদিত হবে। তখন সেই ভুক্তাবশেষ মহাপ্রসাদে পরিণত হবে। এই মহাপ্রসাদ সকলকে বিতরণ করা হবে। মন্দিরে আমার সন্নিকটে তোমার অবস্থিতি হবে। মন্দির অঙ্গনের অভ্যন্তর ভাগে আমার মন্দিরের পিছনেই তোমার মন্দির থাকবে । শ্রীশিব তোমাকে মহাপ্রসাদ দানে উপেক্ষা করার জন্য কিছুটা দূরে অবস্থান করবেন। তাঁর মন্দির থাকবে অঙ্গনের বাইরে।”
ভগবান পুরীতে জগন্নাথরূপে প্রকটিত হলেন। পার্বতীদেবী সেখানে বিমলাদেবী নামে খ্যাত হয়ে পার্শ্ববর্তী মন্দিরে বিরাজিত।
আরেকবার জগন্নাথ ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজকে একটি বর দিয়েছিলেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজ যখন পুরী মন্দিরটি তৈরি করেন তখন জগন্নাথের কাছ থেকে একটি বর প্রার্থনা করেন, হাত শুকাতে না শুকাতেই আপনাকে পুণরায় ভোগ আস্বাদন করতে হবে। এভাবে জগন্নাথকে ভক্তরা ভোগ নিবেদনে ব্যস্ত থাকে। অনেক লোক হয়তো পুরী মন্দিরে প্রবেশও করতে পারে না এবং প্রসাদ আস্বাদন করতে পারে না। কিন্তু জগন্নাথ মন্দির থেকে বের হয়ে সর্বসাধারণের মাঝেও তার প্রসাদ বিতরণ করেন। এই হলো জগন্নাথের আরেকটি বিশেষ কৃপা।

জগন্নাথের সেবা

৪র্থ বিষয়টি হলো জগন্নাথের সেবা। বাইরের অন্যান্য মন্দিরে দেখা যায় শুধুমাত্র বড় বড় পূজারী, ব্রাহ্মণগণ ভগবানের পূজা করে থাকেন। কিন্তু পুরীতে জগন্নাথের যারা সেবা করেন তারা শবর শ্রেণীভুক্ত। শবরগণ শূদ্র শ্রেণীরও অধম। তাদেরকে প্রায়ই অস্পৃশ্য বা অপবিত্র হিসেবেও অবহিত করা হয়। অথচ, জগন্নাথ তাঁর ব্যক্তিগত সেবক হিসেবে এই সমস্ত ভক্তদেরই নিয়োজিত করেছেন।
শুধু তাই নয় রথযাত্রার সময় জগন্নাথকে মন্দির থেকে বের করে আনার সময় সেবকদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়। দক্ষিণ ভারতে অনেক মন্দিরে রয়েছে ছোট্ট অর্চা বিগ্রহ এবং মন্দির থেকে সাধারণত বিগ্রহ বের হয় না। কিন্তু জগন্নাথের বিগ্রহ এত বৃহৎ যে, সেবকগণ জগন্নাথের শরীরকে দড়ি দিয়ে বন্ধন করেন এবং দড়ি দিয়ে টানতে টানতে জগন্নাথকে বের করে আনেন। ভগবানের কোনো বিগ্রহকে এভাবে নিয়ে আসার ঘটনা চিন্তারও অতীত। অথচ, এভাবেই জগন্নাথকে রথে আরোহন করানো হয়।
জগন্নাথ যখন রথে আরোহন করেন তখন যে কেউ জগন্নাথকে আলিঙ্গন করতে পারে। অথচ অন্য কোনো মন্দিরে বিগ্রহকে যে কেউ আলিঙ্গন করা অসম্ভব। এমনকি ব্রাহ্মণরাও মন্দিরের বিগ্রহকে এভাবে আলিঙ্গন করতে পারে না। পুরীর রথযাত্রায় যেকোনো অস্পৃশ্য ব্যক্তিও খুব সহজেই জগন্নাথের বিগ্রহকে আলিঙ্গন করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারে।
মুম্বাইয়ে আমার একজন ভক্ত বন্ধু রয়েছে, তিনি শুনেছিলেন যে, কেউ যদি জগন্নাথের কর্ণে গিয়ে তার বাসনার কথা চুপিচুপি ব্যক্ত করেন, জগন্নাথ তার বাসনা পূর্ণ করেন। তার অনেক বছর ধরে কোন সন্তান ছিল না। কোনো ঔষধ, চিকিৎসা তার স্ত্রীর জন্য কাজ করছিল না। তখন তিনি একদিন জগন্নাথ পুরী যান, রথযাত্রার সময় রথে উপবিষ্ট জগন্নাথ আলিঙ্গন করে। জগন্নাথের কর্ণে তার বাসনার কথা ব্যক্ত করেন। অলৌকিকভাবে ঐ বছরই তিনি সন্তান লাভ করেন এবং তাই সন্তানের নাম দেন “নীলমাধব”। কেননা জগন্নাথের আরেক নাম ‘নীলমাধব’।

জগন্নাথের লীলাবিলাস

৫ম বিষয়টি হলো জগন্নাথের অপ্রাকৃত লীলাবিলাস।
মূলত জগন্নাথের তিন ধরনের লীলাবিলাস রয়েছে :
১। গর্বগঞ্জন-মিথ্যা অহংকার বা গর্ব বিনাশ করেন।
২। পতিতপাবন-পতিত জীবদের উদ্ধার করেন।
৩। ভক্তমনোরঞ্জন -ভক্তদের মনোরঞ্জন করেন।

গর্বগঞ্জন লীলাবিলাস :

একদা জগৎশেঠ নামে দক্ষিণ ভারতের এক এক ধনী ব্যক্তি জগন্নাথ পুরীতে এসেছিলেন। তখনকার দিনে সামান্য অর্থ দিয়েও অনেক কিছু ক্রয় করা যেত। অহংকারী ধনী ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিলেন জগতের পতি জগন্নাথকে ১০০ হাজার রুপী অর্থ প্রদান করবেন। কিন্তু শর্ত হলো সেবকগণ যেন এ অর্থ জগন্নাথের এক দিনের সেবায় ব্যবহার করেন। যদি শর্ত ভঙ্গ হয় তবে সেই অর্থ ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তা শুনে জগন্নাথের সেবকগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এত বিশাল পরিমাণ অর্থ কিভাবে জগন্নাথকে ভোগ নিবেদনে ব্যবহার করা যাবে? জগৎশেঠ বললেন, “আমি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সকলের জানা উচিত যে, আমি এত বিশাল পরিমাণ অর্থ দান করেছি। যদি এই পরিমাণ অর্থ তার সেবায় ব্যবহার করা না যায় তবে তিনি কেমন সমগ্র জগতের প্রভু? তিনি মাত্র সামান্য অর্থের পুষ্প ও ফলমূল গ্রহণ করেন।

এ কেমন জগতের প্রভু?

সেদিন রাতে জগন্নাথ প্রধান পুজারীর স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “ঐ ব্যক্তিকে বলবে, বিশেষ উপাদান সহকারে শুধুমাত্র একটি পান দিতে। যাতে থাকবে অতি দুষ্প্রাপ্য গজমতি চূর্ণ।”
উল্লেখ্য, শত সহস্র হাতি বধ করলে তার মধ্যে মাত্র ২/১টি হাতির মস্তকে ঐ বিশেষ গজমতি চূর্ণ পাওয়া যেতে পারে। দুষ্প্রাপ্য হেতু এটির মূল্য কোটি কোটি টাকা। পরদিন ঐ ব্যবসায়ীকে মন্দিরের প্রধান পূজারী ভগবান জগন্নাথের অভিলাষ ব্যক্ত করেন। অবশেষে সেই অহংকারী ব্যবসায়ী উপলব্ধি করতে পারেন যে, জগন্নাথ তার দর্প চূর্ণ করেছেন। তিনি তখন জগন্নাথের শরণাপন্ন হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করে তাঁর কাছে ঐ অৰ্থ অহৈতুকীভাবে অর্পণ করেন ।

পতিতপাবন লীলাবিলাস

একসময় রামচন্দ্রদেব নামে এক মহান রাজা ছিলেন। তিনি জগন্নাথ পুরী অঞ্চলটি শাসন করতেন। সময়টি ছিল মুগলদের শাসনামল এক মুগল সম্রাট জগন্নাথ পুরী আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন। রামচন্দ্রদেব এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং দুর্ভাগ্যবশত যুদ্ধে হেরে যান। তখনকার দিনে নিয়ম ছিল বিজয়ী রাজা পরাজিত রাজাকে দাস হিসেবে পরিণত করেন। তাকি খান নামে ঐ মুগল সম্রাট রামচন্দ্রদেবকে বন্দী করে নিজের দাসে পরিণত করেন। প্রকৃতপক্ষে মুগল সম্রাটের একটি অভিসন্ধি ছিল। যেহেতুপুরীতে অনেক দর্শনার্থী আসে এবং তারা দান হিসেবে অনেক অর্থ প্রদান করে, তাই কোনোভাবে যদি রামচন্দ্রদেবকে নিজের মিত্র হিসেবে পরিণত করা যায় তবে তিনি পুরীর ঐশ্বর্য ভোগ করতে পারবেন। এজন্য তিনি তার কন্যাকে রামচন্দ্রদেবের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার কু-মতলব করেন। কিন্তু রামচন্দ্রদেব বলেন, “এটি অসম্ভব, কেননা যদি আমি কোনো যবন কন্যাকে বিবাহ করি তবে আমি আর পুরী মন্দিরে প্রবেশ করতে পারব না। কেননা অহিন্দুদের জন্য পুরী মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
তাকি খান বললেন, “যদি আপনি আমার প্রস্তাবে রাজী না হন তবে আমি পুরী মন্দির ধ্বংস করে দেব।” তিনি রামচন্দ্রদেবকে এক দিন সময় দেন এ বিষয়ে ভাবার জন্য।
সেই রাতে রাজকন্যা রামচন্দ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অন্তত জগন্নাথপুরী রক্ষার স্বার্থে হলেও এই প্রস্তাবে রাজী হতে বলেন অবশেষে রামচন্দ্রদেব সেই কন্যাকে বিবাহ করলে তাকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। পুরীর জনগণ তাকে পরিত্যাগ করেছিল এই ভেবে যে, তিনি হলেন কামুক ব্যক্তি, অস্পৃশ্য যবন। তাকে জগন্নাথ দর্শনে থেকেও বঞ্চিত করা হলো। পুরী রাজার সুরক্ষার জন্য প্রতি একাদশীতে একটি ঘৃত প্রদীপ উত্তোলন করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করা হতো যাতে রাজা দীর্ঘায়ু লাভ করেন। এই ঘটনায় তারা সেটি উত্তোলনও পরিত্যাগ করলেন। এভাবে সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভাগা ও দুর্দশাগ্রস্থ ভাবতে লাগলেন। তিনি ভগবানের কাছে ক্রমাগত প্রার্থনা করতে লাগলেন, “হে জগন্নাথ আমি আপনাকে দর্শন বিনা এক মুহূর্ত থাকতে পারছি না। কৃপাপূর্বক আপনি আমাকে দর্শন দিন। জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী, নয়নপথগামী ভবতুমে।” তিনি এভাবে পুরী মন্দিরের সিংহদ্বারে প্রার্থনা করেন এবং সেই প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে একসময় জগন্নাথ গর্ভমন্দির থেকে বের হয়ে সিংহদ্বারে পৌঁছে তার চতুর্ভুজরূপ রামচন্দ্রদেবকে দর্শন করান। রাজা সেই রূপ দর্শন করে আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন । প্রতি সন্ধ্যায় বা রাতে জগন্নাথকে এভাবে প্রার্থনা করলে তাকে দর্শন দানের জন্য জগন্নাথ গর্ভমন্দির থেকে সবার অলক্ষ্যে সিংহদ্বারে ছুটে আসেন।
এদিকে পাণ্ডারা প্রত্যুষে দ্বার খুলে দেখেন গর্ভমন্দিরে চারদিকে পুষ্প ছড়িয়ে থাকে কিছুটা এলোমেলো অবস্থায়। তারা এ বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করলে একসময় জগন্নাথ প্রধান পুজারীর স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে সবকিছু প্রকাশ করলেন। জগন্নাথ বলেন, “এই রাজা আমার বিশেষ একজন ভক্ত। আমি তার জন্যই ঐ স্থানে গমন করতাম এবং আমি সর্বদা ঐ স্থানে আবির্ভূত হব এবং আমি পতিতপাবন নামে পরিচিত হবো। আজও সিংহদ্বারের ডান পার্শ্বে পতিতপাবন নামে একটি বিগ্রহ রয়েছে, যারা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না তারা এই বিগ্রহ ও মন্দিরের চূড়ায় অবস্থিত সুদর্শন চক্রকে দর্শন করলে পূর্ণ জগন্নাথ দর্শনের ফল লাভ করতে পারেন।

ভক্তমনোরঞ্জন

পুরী থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বালিগ্রাম নামে এক গ্রামে দাসিয়া বাউরী নামে নিম্ন শ্রেণীর এক উপজাতি বাস করত। সে সদাচার ও পাপাচারের মধ্যে পার্থক্য বুঝত না। দরিদ্র দাসিয়া ছিল তাঁতী। তাঁতে বোনা কাপড় বিক্রি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করত।
দাসিয়া বিভিন্ন উৎসবে ব্রাহ্মণদের গৃহে গিয়ে ভগবানের মহিমাসূচক ভজন শুনত। একদা সে দীক্ষা নিয়ে ললাটে তিলক ও গলায় কণ্ঠিমালা ধারণ করল। সেসাথে সাধুসঙ্গে হরিকথা শ্রবণ করতে লাগল।
দাসিয়া ভগবান জগন্নাথের কথা শ্রবণ করে পুরী যেতে মনস্থ করল। পুরীতে রথযাত্রার সময় সে বড় দান্ডের (যে রাস্তায় রথযাত্রা হয়) ওপরে একটি স্থান খুঁজে নিল এবং রথযাত্রার সময় সে যথারীতি জগন্নাথকে দর্শন করে আনন্দে অভিভূত হলো। জগন্নাথকে দেখে দাসিয়া প্রার্থনা করল, “হে প্রভু জগন্নাথ, আমি পাপী, পতিত। আমাকে উদ্ধার করো।”
দাসিয়া তাঁর গৃহে পৌঁছলে পত্নী তাকে মধ্যা ভোজন করতে ডাকল। সেদিন পাতে ছিল অনু ও পালং শাক। গোলাকার মৃৎপাত্রে অন্নের ওপর পালংশাক দেখে জগন্নাথের নয়নের স্মৃতি মনে পড়ল দাসিয়ার। সে বলল, “ও! এটি তো আমার প্রভুর পদ্মনয়নের মতো! কেমন করে আমি এটি ভোজন করব?” শিহরিত দেহে, অশ্রুসিক্ত নয়নে সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। দাসিয়া যেন উন্মাদের মতো হয়ে হাতে তালি দিয়ে নৃত্য ও প্রলাপ বকতে লাগল। পরবর্তীতে অন্ন এবং পালং শাক আলাদা করে দিলে তবে দাসিয়া সেদিন ভোজন করে।
দাসিয়া দিবারাত্র ভগবানকে স্মরণ করতে লাগল। একদিন সে রাত্রে শয়নের পূর্বে প্রার্থনা করল, “ভগবান কি কৃপা করে আমাকে তাঁর চতুর্ভুজ রূপ দর্শন করাবেন?” দাসিয়ার মনের ভাব অবহিত হয়ে শ্রীজগন্নাথ দাসিয়ার সামনে উপস্থিত হলেন। দাসিয়া তৃপ্তিভরে ভগবানকে দর্শন করে বলল, “আমি রথের ওপর যেমন দেখেছি, সেই একই রূপ, এখন আমার সামনে বিদ্যমান। আমি সরাসরি স্বচক্ষে ভগবানকে প্রত্যক্ষ করছি। ব্রহ্মাসহ দেবগণ, যক্ষ, গন্ধর্ব, কিন্নর, সিদ্ধ, যোগী ও মুনিগণ ভগবান শ্রীহরির পদকমলযুগল নিরন্তর ধ্যান করেও যার দর্শন দুর্লভ। আমি অজ্ঞ ও নীচ জাতি। আমি কোন ভক্তিমূলক সেবাও করিনি। হে জগতের নাথ! আজ তুমি আমার জীর্ণ কুটিরে এসেছ!” পীতবসন পরিহিত ভগবান বললেন, “দাসিয়া, শোনো, আমার হৃদয় স্বর্গ বা মোক্ষে আকৃষ্ট নয় । যে ভক্তিসহকারে আমার উপাসনা করে, আমার চিত্ত তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তোমার ভক্তিভাবে আমি প্রসন্ন। প্রিয় ভক্ত, তুমি বর প্রার্থনা কর।”
দাসিয়া বলল, “হে প্রভু, আমি যেন নিরন্তর আপনার পাদপদ্ম স্মরণ করতে পারি। আমাকে এই কৃপাশিষ দিন যাতে যখনই আপনার ধ্যান করব তখনই যেন আপনার দর্শন পেতে পারি।”
একদিন দাসিয়া এক ব্রাহ্মণের গৃহে কিছু বস্তু বিক্রি করার জন্য গেলে গৃহস্থের গাছে একটি বড় নারকেল দেখল। সে ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি আমাকে এই নারকেলটি দিবেন? আমি এটি প্রভু জগন্নাথকে নিবেদন করতে চাই। এর মূল্য বস্ত্রের মূল্য থেকে বাদ দিন।” লোভী ব্রাহ্মণ বললেন, “আমি পুরো বস্ত্রের বিনিময়ে তোমাকে নারকেলটি দিতে পারি। বলাবাহুল্য জীবিকা নির্বাহের জন্য ঐ বস্তুটিই দাসিয়ার একমাত্র থাকলেও সে চিন্তিত হলো না। বস্ত্রের বিনিময়ে নারকেল নিয়ে গ্রামে ফিরে এল। সেদিনই এক ব্রাহ্মণ বিভিন্ন ফল ও দুধ নিয়ে পুরী যাচ্ছিলেন শ্রীজগন্নাথকে নিবেদন করার জন্য। এ সুযোগে দাসিয়া ঐ ব্রাহ্মণকে নারকেলটি দিয়ে জগন্নাথকে ভোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলল, “হে ব্রাহ্মণ, আপনি পুরীতে গিয়ে গরুড় স্তম্ভের পেছনে দাঁড়িয়ে শ্রীজগন্নাথকে বিনীতভাবে বলবেন, বালিগ্রামের দাসিয়া এই নারকেলটি আপনার জন্য পাঠিয়েছে, দয়া করে এটি গ্রহণ করুন। ভগবান যদি তাঁর শ্রীহস্ত বাড়িয়ে এটি গ্রহণ করেন, তবেই এটি দেবেন, নতুবা নারকেলটি ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।”
বলাবাহুল্য দাসিয়ার শেখানো পদ্ধতি মোতাবেক ঐ ব্রাহ্মণ বিধিপূর্বক ভগবান শ্রীজগন্নাথকে নিবেদন করলে জগন্নাথ স্বয়ং তা গ্রহণ করেন। শ্রীজগন্নাথের এই অলৌকিক লীলা ও ভক্ত পারবশ্যতা দর্শন করে ব্রাহ্মণ আনন্দবিহ্বল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি বললেন, “বালিগ্রাম দাসিয়া! তুমি, তোমার পিতা-মাতা ধন্য। তোমার গ্রাম ধন্য। ভগবান তোমার ওপর কতই না প্রসন্ন!” মন্দিরের মধ্যে এই ঘটনার খবর তড়িৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ল। প্রত্যেকেই বালিগ্রামের দাসিয়াকে তাঁর বিশুদ্ধ ভক্তির জন্য সাধুবাদ জানাতে লাগল।
একবার দাসিয়া পুরী যাওয়ার সময় খুব বড় বড় ৪০টি সুমিষ্ট আম নিয়ে গেল। যখন সে সিংহদ্বারে পৌছাল, তখন পাণ্ডারা তাকে অনুসরণ করতে লাগল এবং রীতিমত কাড়াকাড়ি লেগে গেল পাণ্ডাদের মধ্যে। দাসিয়া বলল, “এই আমগুলি এনেছি শ্রীজগন্নাথকে দেবার জন্য আপনাদের কাউকে আমার প্রয়োজন নেই।” দাসিয়ার এহেন আচরণ দেখে পাণ্ডারা দাসিয়াকে ভর্ৎসনা করতে লাগল ৷
দাসিয়া আমের ঝুড়িটি সন্তর্পণে ভূমিতে রেখে নীলচক্রের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করে বলল, “হে ভগবান, এই আমগুলি আপনার সম্পত্তি। কৃপা করে আপনি এগুলি আস্বাদন করুন। ব্রাহ্মণরা এগুলোর জন্য পরস্পর কলহ করছে।” এই বলে দাসিয়া দুটি আম হাতে নিয়ে নীলাচল চক্রকে দেখাল। অবিশ্বাস্যভাবে তৎক্ষণাৎ আম দুটি অদৃশ্য হয়ে গেল। ব্রাহ্মণগণসহ দর্শনার্থীরাও সরাসরি প্রত্যক্ষ করল দাসিয়ার হাত থেকে আমগুলি যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণগণ দাসিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে বলল, এ তোমার সম্মোহন, যাদুর কারসাজি, ভেলকিবাজি। দাসিয়া বলল, আপনারা মন্দিরে গিয়ে দেখুন।
বিস্ময়াভিভূত হয়ে পাণ্ডারা দেখলেন, গর্ভমন্দিরের চতুর্দিকে আমের আটি ও খোসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। লজ্জিত ব্রাহ্মণেরা দাসিয়াকে বললেন, “তুমি প্রভুর একজন মহান শুদ্ধভক্ত। তুমি তোমার অকৃত্রিম ভক্তির দ্বারা প্রভুকে বশ করেছ। তোমার তুলনায় আমরা কিছুই নই ৷ আমরা লজ্জিত।”
ব্রাহ্মণেরা দাসিয়াকে শ্রীজগন্নাথের মালা পরিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। দাসিয়া ব্রাহ্মণগণের চরণে লুটিয়ে পড়ে তাদের চরণধুলি নিয়ে সর্বাঙ্গে মাখল। তারপর দাসিয়া কড়জোড়ে ভগবানকে প্রণাম জানিয়ে বলল, “হে চক্রপাণি তোমার সকল রূপ আমাকে দেখাও যাতে আমি নির্মল ও পবিত্র হতে পারি।” শ্রীজগন্নাথ মন্দিরশীর্ষে নীলচক্রের ওপর আবির্ভূত হয়ে একের পর এক কুর্মাবতার থেকে কল্কি অবতার পর্যন্ত সকল রূপ প্রদর্শন করালেন।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here