লক্ষ্মীপতির ঐশ্বর্যধাম (শেষ পর্ব)

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩ | ১:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৩ | ১:২০ অপরাহ্ণ

এই পোস্টটি 86 বার দেখা হয়েছে

লক্ষ্মীপতির ঐশ্বর্যধাম (শেষ পর্ব)

পৃথিবীর অন্যতম ঐশ্বর্যশালী তিরুপতি ধামের আবির্ভাব রহস্য!
চন্দনযাত্রা দাস


পদ্মাবতী ও শ্রীনিবাসের সাক্ষাৎ ও বিবাহ

সেই বেদবতী পরবর্তীতে পদ্মাবর্তীরূপে আবির্ভূত হলেন। তিনি তাঁর পিতামাতা কর্তৃক পালিত হলেন এবং তিনি ছিলেন সর্বগুণসম্পন্না। শীঘ্রই তাঁর বিবাহের সময় উপস্থিত হল। সেই সময়ে ১৪ বছর বয়সে কোনো নারীর বিবাহ না হলে পিতা-মাতা নিজেদের ব্যর্থতা বলে মানতেন। তাই আকাশরাজ ও ধারিণী দেবী তাদের কন্যার জন্য যোগ্য পাত্রের সন্ধান করছিলেন। তারা পৃথিবীর নানা রাজ্যে দূত পাঠান। তাদের বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা কন্যার যোগ্য পাত্র খুঁজে পেলেন না।
সেই সময় নারদমুনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ  ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদে আসলেন এবং পদ্মাবতীর হাত গণনা করে তিনি জানালেন, “আপনি হলেন সৌভাগ্যর অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী এবং আপনি খুব শীঘ্রই ভগবান বিষ্ণুকে বিবাহ করতে যাচ্ছেন।” কিন্তু তিনি এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিলেন না। সেই রাজ্যের নাম ছিল নারায়ণপুর ।
একবার যখন তিনি তার সখীদের নিয়ে বাগানে ক্রীড়ারত ছিলেন, সেই দিন ভগবান শ্রীনিবাস তাঁর মাতা বকুলাদেবীকে তাঁর বনে গমনের অভিলাষের কথা জানালেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বন্য প্রাণীদের ভয় দেখিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেওয়া। বকুলা দেবী অত্যন্ত বিপজ্জনক বিধায় তাকে নিরস্ত করতে চাইলেন কিন্তু শ্রীনিবাস মাকে অভয় প্রদান করলেন এবং অনুমতি নিলেন। বকুলাদেবী তাঁর জন্য সুস্বাদু ভোগ রান্না করলেন এবং তা নিয়ে শ্রীনিবাস সুখেই বনে গমন করলেন।
বনে একসময় যখন তিনি একটি হস্তী দর্শন করলেন তৎক্ষণাৎ তাকে ধাওয়া করলেন। তখন সেই বন্য হাতি সেই বাগানে প্রবেশ করল যেখানে পদ্মাবতী ও তার সখীরা ক্রীড়ারত ছিলেন। সেই বন্য হাতির অকস্মাৎ আবির্ভাবে তারা খুবই ভয় পেলেন। শ্রীনিবাস খুব দ্রুত সেই হাতিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন এবং তখনই তিনি পদ্মাবতীকে দর্শন করলেন। তৎক্ষণাৎ ভগবান ও তাঁর শক্তির মধ্যকার স্বাভাবিক ভালোবাসার সম্পর্ক জেগে উঠল । তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শ্রীনিবাস তখন পদ্মাবতীর সম্মুখবর্তী হয়ে তার পরিচয় দিলেন এবং বললেন, “আমার মনে হয় হয় আপনি ঊর্ধ্বলোক থেকে এই মর্তলোকে অবতরণ করছেন। আমি আপনাকে বিবাহ করতে চাই।” যখন শ্রীনিবাস ও পদ্মাবতী বার্তালাপ করছিলেন তখন সখীদের নজরে এলে তারা সমালোচনা করে শ্রীনিবাসকে বললেন, “কিন্তু আপনি একজন শিকারী। একজন রাজকুমারীকে বিবাহের প্রস্তাব প্রদানের যোগ্যতা কি আপনার আছে?” এরপর তারা শ্রীনিবাসকে সেই স্থান পরিত্যাগ করতে বললেন। সখীদের সেই ক্লেশমিশ্রিত বক্তব্য শ্রবণ করার পর শ্রীনিবাস সেই স্থান পরিত্যাগ করলেন ।
যখন তিনি গৃহে ফিরে এলেন তখন বকুলাদেবী পুত্রকে খুবই বিষন্ন এবং তার সমগ্র শরীরে তছিন্ন দেখলেন। তিনি তাকে সকল ঘটনা ব্যক্ত করতে অনুরোধ করলেন। তখন শ্রীনিবাস মাতাকে সবকিছু জানালেন এবং সেই রাজকুমারীকে বিবাহ করতে মায়ের সাহায্য চাইলেন । এছাড়াও ভগবান শ্রীনিবাস বকুলাদেবীকে জানালেন, তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যিনি শুধুমাত্র পূর্বার্তন জন্মের বেদবদীকে (পদ্মাবতী) বিবাহ করার জন্য এই সময়ে আবির্ভূত হয়েছেন। বকুলাদেবী প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি অবশ্যই রাজার কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাবেন।
পদ্মাবতীর পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার পথে বকুলাদেবী দেখলেন পদ্মাবতীর সখীরা অত্যন্ত কাতরভাবে ভগবান শিবের আরাধনা করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা জানাল তাদের প্রিয় রাজকুমারী অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং বিশেষত যখনই তিনি একজন শিকারীকে দর্শন করছেন, এরপর তিনি কোনো কিছু ভক্ষণ, পান করতে পারছেন না এমনকী নিদ্রাও যেতে পারছেন না। রাজা পদ্মাবতীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের ব্যবস্থা করলেন এমনকী বহু মুনি-ঋষি এল কিন্তু কেউই পদ্মাবতীর রোগমুক্তি করতে পারলেন না। সব শ্রবণ করে স্বয়ং বকুলাদেবীও মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানালেন। অবশেষে শ্রীনিবাস চাইলেন পদ্মাবতীকে সাহায্য করার জন্য তাই তিনি একজন যাযাবর জ্যোতিষি নারী রূপে নারায়ণপুর গমন করলেন ।
নারায়ণপুরের জনগণ রাণীমাতাকে জানালেন, হয়তোবা এই জ্যোতিষি নারী পদ্মাবতীকে সহায়তা করতে পারবেন। রাণীমাতা তৎক্ষণাৎ সেই নারীরূপী শ্রীনিবাসকে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। শ্রীনিবাস তখন রাণীমাতাকে সর্ব প্রকারের পূজার সামগ্রীসহ পদ্মাবতীকে উপস্থিত হওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। যখনই পদ্মাবতী সেই জ্যোতিষির সম্মুখে বসলেন তিনি তৎক্ষণাৎ তার প্রতি আকর্ষিত হলেন এবং উপলব্ধি করলেন, ইনিই তার অভিলাষিত ভগবান। তখন সেই নারী জ্যোতিষি সমাধিতে উপবেশন করে বলতে লাগলেন, “পদ্মাবতী হলেন প্রকৃতপক্ষে দেবী লক্ষ্মী। কিছুদিন পূর্বে যখন একজন শিকারী পদ্মাবতীর সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিল। সেই শিকারী হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু। পদ্মাবতী তাঁর ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন তিনি চিরতরের জন্য তাঁকে হারালেন, কিন্তু তিনি জানেন না সেই শিকারী পদ্মাবতীর বিরহে নিশিদিন ক্রন্দন করছে আর বিলাপ করছে। কেবলমাত্র শীঘ্রই বিবাহের মাধ্যমে সেই দুঃখের বিনাশ সম্ভব। এবং ভগবানের মাতা খুব শীঘ্রই বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এখানে উপস্থিত হবেন।” সেই জ্যোতিষির কথা শ্রবণ করে রাণী হতভম্ব হলেন। শ্রীনিবাস সেই স্থান পরিত্যাগ করা মাত্রই বকুলাদেবী সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর ও মহিমান্বিত, তাই রাণী তাকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক প্রাসাদে অভ্যর্থনা জানালেন । বকুলাদেবী তখন রাণীকে জানালেন, “আমি একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন এবং তিনি বর্তমানে ভেঙ্কটাদ্রী পর্বতে অবস্থান করছেন। যদিও তিনি একটি বাল্মীক প্রাসাদে অবস্থান করছেন তথাপিও তিনি হলেন সমগ্র বিশ্বজগতের স্থপতি। তিনি আপনাদের কন্যা পদ্মাবতীর পাণিপ্রার্থী। দয়া করে এই প্রস্তাব স্বীকার করুন।” ধারিণী দেবী জানালেন, “আমি আমার স্বামী, রাজার সাথে আলোচনা করে আপনাকে জানাব।” পরে রাণী, রাজাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার কি মনে হয়, পরমেশ্বর ভগবান এই শেষাদ্রী পর্বতে আবির্ভূত হয়েছেন? আমরা ইতোপূর্বে তা কখনোই শ্রবণ করিনি।”
পরে মন্ত্রীদের পরামর্শে রাণী ঋষি শুরু মহর্ষির কাছে সত্যতা জানতে চাইলেন। তখন রাজা মহর্ষির কাছে গমন করে সবকিছু জানালে তিনি বলেন, “শ্রীনিবাস হলেন বৈকুণ্ঠপতি। তিনি এই মর্ত্যলোকে আবির্ভূত হয়েছেন। আপনার উচিত খুব শীঘ্রই আপনার কন্যাকে তার হস্তে সমর্পণ করা।” অবশেষে রাজা আকাশরাজ, রাণী ধারিণী দেবী এবং সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হলেন, পদ্মাবতীর জন্য যোগ্য পাত্র পাওয়া গেছে। শুক মুনি স্বয়ং পদ্মাবতীকে বিবাহের অনুরোধসূচক একটি তালপত্রে লেখা নিমন্ত্রনপত্র নিয়ে এলেন এবং বকুলাদেবী ও শ্রীনিবাসকে দেখালেন। পত্রের কথা শ্রবণ করে বকুলাদেবী অপ্রাকৃত আনন্দে ভাসলেন। কেননা এটি ছিল তার এই অবতারের একমাত্র উদ্দেশ্য। শ্রীনিবাস তখন বিবাহে সম্মত হয়ে একটি চিঠি পাঠালেন । শ্রীনিবাস গরুড়দেব ও অনন্তশেষকে আহ্বান করলেন এবং তাদের সমগ্রবিশ্বের সকল দেব- দেবী, ঋষিদের আমন্ত্রন জানানোর সেবা প্রদান করলেন। সমস্ত দেব-দেবী শেষাদ্রী পর্বতে এসে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সেবা ভাগ করে নিয়ে ভগবানের বিবাহ আয়োজনে সহায়তা করলেন। ব্রহ্মাজী একসময় দেখলেন ভগবান শ্রীনিবাসকে খুবই মর্মাহত দেখাচ্ছে। তখন তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করায় ভগবান জানালেন, “আমার কোনো সম্পদ নেই। আমি কিভাবে অসীম ভক্তসমাজ যারা এখানে আসবেন তাদের সকলকে খাবারের ব্যয়ভার বহন করব? কিভাবে তাদের সকলের পুষ্পমাল্য প্রদান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করব?” তখন ব্ৰহ্মা সেখানে উপস্থিত ধনপতি যক্ষরাজ কুবের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন।
তখন ব্রহ্মা কুবেরকে ঋণের ব্যাপারে জানালে তিনি বললেন, “তিনি আমার ভগবান, তিনি সবকিছুই আদি উৎস। আমি এই দিনে স্বর্গের সমস্ত ধন-সম্পত্তি সংগ্রহ করে আপনার চরণে উৎসর্গ করতে চাই।” ভগবান শ্রীনিবাস জানালেন, “না, আমি সকল সম্পদ তোমার নিকট গচ্ছিত রেখেছি, এগুলো আমার নয়। যেহেতু আমি পৃথিবীতে আছি, তাই আমাকে পৃথিবীর রীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে। তাই আমাকে ঋণ প্রদান করুন এবং আমি সেই ঋণ সুদ সহ পরিশোধ করব। এই কলিযুগের শেষ অবধি আমি আপনার ঋণের সুদ ও আসলসমূহ পরিশোধ করতে থাকব।” তখন ব্রহ্মার উপস্থিতিতে চুক্তি স্থাপিত হল এবং সেখানে শ্রীনিবাস ও অন্যান্য সাক্ষিগণ স্বাক্ষর করলেন।

চৈতন্য সন্দেশ অ্যাপ ডাউনলোড করুন :https://play.google.com/store/apps/details?id=com.differentcoder.csbtg

লক্ষ্যণীয়: যেহেতু ভগবান তাঁর সকল ভক্তদের অনুরোধ করেছেন দর্শনান্তে, তাঁরা যেন কুবেরের ঋণ পরিশোধে তাঁকে সহায়তা করে। তাই এই মন্দির পৃথিবীর অন্যতম ঐশ্বর্যশালী মন্দির। এখানে কোনো দান বাক্স নেই রয়েছে হুন্ডি (সাদা কাপড়ে জড়ানো বিশালাকার থলে সদৃশ। এখানে ভক্তগণ তাদের মূল্যবান হীরা, স্বর্ণালংকার, অর্থ ও অন্যান্য বস্তু বালাজীর উদ্দেশ্য নিবেদন করে)। দিন শেষে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি হলে সমস্ত প্রণামীসমূহ সংগ্রহ করে গণনা করা হয়। সেখানে থাকে পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ, আংটি, অর্থ এবং এগুলো উন্মুক্তভাবে গণনা করা হয়। এটি এই মন্দিরের একটি ঐতিহ্য।
সব আয়োজন সমাপ্ত হলেও ব্রহ্মাজী লক্ষ্য করলেন এখনো ভগবানের মন ভারাক্রান্ত । তাই তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে শ্রীনিবাস জানালেন, “আমার হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত কেননা আমি লক্ষ্মীর বিরহ অনুভব করছি, যিনি কোলাপুরে তপস্যা করছেন।” ব্রহ্মাজী তখন লক্ষ্মীদেবীকে সেখানে নিয়ে আসার জন্য ভগবানকে অনুরোধ করলে তখন ভগবান একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। তিনি কোলাপুরে একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে লক্ষ্মীদেবীকে একটি পত্র পাঠালেন, “আপনার পতি ভগবান শেষাদ্রি পর্বতে অবস্থান করছেন এবং তিনি অত্যন্ত অসুস্থ, তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি আপনাকে এখনি দর্শন করতে উদগ্রিব ।”
পত্র পাঠের সাথে সাথে লক্ষ্মীদেবী বার্তাবাহককে জানালেন দ্রুত তাঁকে শ্রীনিবাসের কাছে নিয়ে যেতে। লক্ষ্মীদেবী যখন শেষাদ্রি পর্বতে লক্ষ লক্ষ দেব দেবী, মুনি-ঋষিদের দেখলেন তখন তিনি ভাবলেন ভগবান অত্যন্ত অসুস্থ বলে সকলেই তার সেবা করতে এসেছে। তিনি ভগবানের সেবা করার জন্য সকলের শেষে আসলেন বলে নিজেকে অপরাধী ভাবলেন ।
অসুস্থ হওয়ার ভান ধরে ভগবান শ্রীনিবাস তাকে কাঁধে নেওয়া ও হাঁটতে সহায়তা করার জন্য দুইজন দেবতাকে অনুরোধ জানালেন । লক্ষ্মীদেবী এতে অত্যন্ত ব্যতীত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার ভগবান, আপনার কি হয়েছে? আমি বিলম্বে আসায় আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?” ভগবান উত্তরে বললেন, তিনি অসুস্থ নন এবং কোনো সংশয়মূলক ঘটনা ঘটে নি। এত বিপুল পরিমাণ অতিথি দর্শন করে পরিশেষে লক্ষ্মীদেবী বুঝতে সক্ষম হলেন যে, ভগবান বেদবতীর প্রতি তাঁর পূর্ববর্তী প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে চলেছেন। “সকলেই এখানে আপনার বিবাহের উদ্দেশ্য আগমন করেছে এবং আপনি শীঘ্রই বেদবতীকে বিবাহ করছেন যিনি পদ্মাবতী নামে অবতরিত হয়েছেন। আমি এতে অত্যন্ত আনন্দিত হচ্ছি কেননা তিনি আপনার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিল, যখন আমি সীতারূপে ছিলাম তখন তাকে বিবাহ করার জন্য আমি আপনাকে সর্বাত্মক সমর্থন জ্ঞাপন করছি। আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাঁকে নিজের ভগ্নিরূপে গ্রহণ করছি। এমনকি আমি আপনার বিবাহের সকল শুভ কর্মে আপনাকে সহায়তা করব।”
লক্ষ্মীদেবীকে উৎফুল্ল দেখে সকলেই খুব আনন্দিত হল। লক্ষ্মী ও পার্বতী ভগবানের অভিষেক সম্পন্ন করলেন এবং ভগবানকে মূল্যবান রত্ন ও পোষাকে সজ্জিত করালেন । সমগ্র অনুষ্ঠানের প্রধান পাচক ছিলেন অগ্নিদেব ও বরুনদেব। তারা লক্ষ লক্ষ অতিথিদের জন্য রান্না করলেন এবং বায়ুদেব প্রসাদ বিতরণ সেবা মুখ্য সেবাভার নিলেন। ভগবান যখন রাশি রাশি প্রস্তুতকৃত ভোগ দর্শন করলেন তখন তিনি এই ভোগসমূহ নিবেদন করতে বললেন। ব্রহ্মা জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে এইসকল ভোগ নিবেদন করা উচিত?” ভগবান শ্রীনিবাস উত্তরে বললেন, “ভোগ অবশ্যই ভগবান নৃসিংহদেবকে নিবেদন করতে হবে।” কথিত আছে যে, তখন সমস্ত ভোগ অহোভিলামে অবস্থিত অহভিলাম নৃসিংহদেবকে নিবেদন করা হয়েছিল ।
লক্ষণীয় : অহভিলাম ও তিরুপতির মধ্যে একটি বিশেষ সংযোগ রয়েছে। এমনকি এখনো প্রতিবছর শ্রীনিবাস ও পদ্মাবতীর বিবাহ দিবসে, ভেঙ্কটেশ্বর তথা বালাজী মন্দির থেকে অহভিলাম নৃসিংহ মন্দিরে এক বিশাল দানীয় উপহার প্রেরণ করা হয় শুধুমাত্র ভগবানের বিয়ের দিনে নিবেদিত ভোগ গ্রহণ করার কৃতজ্ঞতা উদযাপনের উদ্দেশ্য।
ভগবান নৃসিংহদেব ভোগ গ্রহণের পর মহাপ্রসাদে পরিণত করলেন এবং সেই মহাপ্রসাদ লক্ষ লক্ষ দেবতা ও অতিথিদের মাঝে অত্যন্ত দক্ষভাবে এবং সুন্দরভাবে বিতরণ করলেন বায়ুদেব। ৭টি পর্বত সম্পূর্ণটিই ভক্তদের আগমণে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।
এরপর সকলে মিলে নারায়ণপুরের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। রাজা আকাশরাজ ও তার ভ্রাতা বসুধাম ও থোনডামান; শ্রীনিবাস ও বর পক্ষের উপস্থিত সকলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর ধারিণী দেবী পদ্মাবতীকে নিয়ে এলেন। এরপর বর-কনে মালা বিতরণ হল এবং বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল। এই উৎসব পালিত হয়েছিল ১১ দিন যাবৎ ।
বকুলাদেবী এরপর ভগবানকে জানালেন এবার ফেরার সময় হয়েছে। কিন্তু যেহেতু ভগবান একটি বাল্মিক পীঠে অবস্থান করেন তাই এটি পদ্মাবতীর থাকার পক্ষে উপযুক্ত স্থান নয়। তাই তারা অগস্ত্য মুনির আশ্রমে অবস্থানের স্বীধান্ত নিলেন, যেটি তীরশুমালার একটি পর্বতে অবস্থিত।

লক্ষ্মীদেবীর সাথে পুনর্মিলন

কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পদ্মাবতী লক্ষ্য করলেন ভগবানকে ছিলেন বিমর্ষিত। তিনি এর কারণ উপলব্ধি করে শ্রীনিবাসকে জানালেন, “হে আমার ভগবান, আমি জানি আপনি লক্ষ্মীদেবীর বিরহে কষ্ট পাচ্ছেন, যিনি একাকী কোলপুরে অবস্থান করছেন। আপনি এখনিই তাকে এখানে নিয়ে আসুন। আমরা সকলেই একত্রে বসবাস করব।” ভগবান জানালেন, “যেহেতু তিনি রাগান্বিত ছিলেন, তাই আমি জানি না তিনি এখানে আসতে রাজি হবেন কিনা।”
এরপর পদ্মাবতী ভগবান শ্রীনিবাসের নিকট জ্ঞানগর্ভ বিষয় আলোচনা করলেন। তিনি জানালেন, “নারীরা সাধারণ শিশুর মতই। তারা এমন কাউকে অভিলাষ করে যিনি তাকে সন্তুষ্ট করবেন এবং তাকে পরম স্নেহ প্রদান করবেন । এটি তাদের কোনো ত্রুটি নয়। এটি তাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আপনি তাকে শান্ত করুন, তাকে সন্তুষ্ট করুন এবং তাকে স্নেহ প্রদান করুন এবং এতে তিনি আনন্দিত হয়ে অবশ্যই ফিরে আসবেন। তিনি একাকী কোলপুরে অবস্থান করছেন বিধায় আমিও অত্যন্ত দুঃখিত।”
তখনই পদ্মাবতী ভগবান শ্রীনিবাসকে কোলপুরে গিয়ে লক্ষ্মীদেবীকে নিয়ে আসার আহবান জানালেন। ভগবান কোলপুরের উদ্দেশ্য গমন করলেন। যখন লক্ষ্মীদেবী জানতে পারলেন ভগবান তাঁকে নিতে আসছেন, তৎক্ষণাৎ তিনি সেই স্থান পরিত্যাগ করে কপিল মুনির আশ্রমে আশ্রয় নিলেন। ভগবান সমগ্র কোলপুর অনুসন্ধান করেও তাকে খুঁজে পেলেন না। পরিশেষে, তিনি একটি বড় পদ্মফুলে আবৃত এক পুষ্করিণীর সম্মুখে বসে ভাবলেন লক্ষ্মীদেবী ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি এখানে তপস্যা করবেন। তিনি সেখানে এমন কঠোর তপস্যা করেন যে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রও তাকে চিনতে পারেননি। ইন্দ্র ভাবলেন হয়তো কোনো ঋষি ইন্দ্ৰলোক দখল করার জন্য কঠোর তপস্যা করছে। এই ধরনের কোনো সম্ভাবনা নাকচ করার জন্য ইন্দ্র তার তপস্যায় বিঘ্ন ঘটানোর জন্য কয়েকজন অল্পরা পাঠালেন।
যখন ভগবান দেখলেন অপ্সরাগণ তার সম্মুখে নৃত্য করছে, হাস্যরসে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে। তখন ভগবান নিজেদের সর্বোত্তম সৌন্দর্যে প্রকাশ করলেন এবং তার সৌন্দর্য ও তেজ দর্শন করে অপ্সরাগণ উপলব্ধি করলেন তিনি পরমেশ্বর ভগবান এবং এতে তারা লজ্জিত হলেন। তারা এই ঘটনা ইন্দ্রকে অভিহিত করলে ইন্দ্ৰ ভগবানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ভগবান ইন্দ্রকে ক্ষমা করলেন এবং আরো কঠোরভাবে তপস্যায় নিমগ্ন হলেন। তপস্যার ব্যাপকতায় তার চতুর্পাশ্বে অসহ্য পারমার্থিক বাহ্যশিখা প্রকাশিত হল এবং লক্ষ্মীদেবী স্বয়ং তার তপস্যার সেই পারমার্থিক প্রভাব উপলব্ধি করছিলেন।
তখন লক্ষ্মীদেবী ভগবান কপিলদেবকে জিজ্ঞেস করলেন ঐ মুহূর্তে তার কর্তব্য সম্পর্কে। ভগবান কপিলদেব তাকে ফিরে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, “ভৃগু মুনি তার বক্ষে পদাঘাত করে হয়তোবা অপরাধ কর্ম করেছে। কিন্তু তার ফলাফল হিসেবে, সমগ্র জগতে ভগবান বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তিনি যে দেবতাদেরও আরাধ্য এবং একমাত্র আরাধনার লক্ষ্য তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
এরপর লক্ষ্মীদেবী সেই পদ্মফুলের নিম্নাংশে প্রবেশ করলেন। তিনি কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পদ্মের উপরে উঠে আসলেন এবং ভগবানের সম্মুখে বসলেন। যখন দেবতাগণ লক্ষ্মী নারায়ণকে পদ্মের উপর পাশাপাশি অবস্থান করতে দেখলে, তখন তারা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং তাদের আরাধনা করতে লাগলেন ।
নারদ মুনি ভৃগু মুনিকে আদেশ করলেন মাতা লক্ষ্মীদেবীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা জানানোর জন্য । এইবার ভৃগু মুনি মাতা লক্ষ্মীদেবীর চরণতলে পতিত হয়ে ক্রন্দন করতে লাগলেন। তিনি বললেন, “আমি আপনার চরণকমলে ক্ষমা ভিক্ষা করছি, আমার অপরাধের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ভগবানের বক্ষে পদাঘাত করে আপনার হৃদয়ে অসীম কষ্ট প্রদান করেছি, আমি মূর্খ, আমি শঠ ব্যক্তি, কৃপাপূর্বক আমাকে ক্ষমা করুন।” লক্ষ্মীদেবী উত্তরে বললেন, “না, না, আপনি কোনো অপরাধ করেননি। সবকিছুই হয়েছে ভগবানের একটি মহৎ উদ্দেশ্য পরিপূরণের লক্ষ্যে। এটি ছিল একটি অপ্রাকৃত লীলা। আপনাকে ক্ষমা করলাম। এবার সুখী হন।” সেই মুহূর্তে পরমেশ্বর ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর লক্ষ্মীদেবী তার বক্ষস্থলে স্থান দিলেন এবং লক্ষ্মী- নারায়ণ সেই স্থান পরিত্যাগ করে অগস্ত্য মুনির আশ্রমে গমন করলেন, যেখানে বকুলাদেবী ও পদ্মাবতী তাদের অভ্যর্থনা জানালেন । এভাবে তিরুমালা পর্বতে তারা বহুকাল সুখে বসবাস করলেন । ভগবান শ্রীনিবাস রাজা আকাশরাজের ভ্রাতা থোনডামানকে তার জন্য একটি মন্দির স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। মন্দিরটি স্থাপিত হল এবং সেখানে সমস্ত দেব-দেবী ও সাধুসন্তগণ প্রতিদিন আসতে লাগলেন ভগবানের আরাধনার উদ্দেশ্য। কিন্তু ভগবান সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বৈকুণ্ঠ প্রত্যাবর্তন করবেন। তখন সমস্ত ভক্ত ও দেবদেবীদের অনুরোধে ভগবান সকলের সম্মুখে শ্রীভেঙ্কটেশ্বর বিগ্রহরূপে আবির্ভূত হলেন। সেই ঘটনার হাজার হাজার বছর অতিবাহিত হলেও এখনো সেখানে ভক্তগণের দ্বারা ভগবান আজ অবধি ভক্তিপূর্ণভাবে সেবিত হচ্ছেন।

আদিশেষ ও বায়ুদেবের মধ্যকার প্রতিযোগীতা

দ্বাপরযুগে বায়ুদেব একবার ভগবান বিষ্ণুকে প্রণতি নিবেদন করার জন্য বৈকুণ্ঠে গমন করলেন। তখন ভগবান লক্ষ্মীদেবীর সেবা গ্রহণ করছিলেন। আদিশেষ (পর্বত) তখন বৈকুণ্ঠের দ্বার পাহাড়া দিচ্ছিলেন। বায়ুদেব বিষ্ণুনিবাসে প্রবেশ করতে চাইলে আদিশেষ তখন তাকে বাধা প্রদান করলেন। এতে বায়ুদেব রাগান্বিত হলেন। তখন আদিশেষ ও বায়ুদেবের মধ্যকার যুদ্ধ বেঁধে গেল। যখন বিষ্ণু সেই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলেন তখন প্রত্যেকে নিজেদের বীরত্ব প্রকাশ করলেন। তখন ভগবান তাদের বীরত্বের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। ভগবান তখন উত্তরদিকে মেরু পর্বতের শিকড়ে অবস্থিত আনন্দ পর্বতকে বেষ্ঠন করে আকড়ে ধরতে বললেন আদিশেষ পর্বতকে। আর বায়ুদেবের কাজ হলো সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আদিশেষকে আলাদা করা। কিন্তু সেই শক্তি পরীক্ষায় সমগ্র জগৎ প্রকম্পিত হওয়ায় ব্রহ্মা, ইন্দ্র এবং অন্যান্য দেবতাগণ আদিশেষকে অনুরোধ জানালেন সমগ্র জগতের কল্যাণে বায়ুদেবের সম্মুখে হার মেনে নিতে। তাদের অনুরোধ রক্ষা করে আদিশেষ নিজের সাথে আনন্দ পর্বতের বন্ধন মুক্ত করে দিলেন। এর ফলে বায়ুর আঘাতে আদিশেষ ও আনন্দ পর্বত স্বর্ণামুখী নদীর সম্মুখে পতিত হল। আদিশেষ এই হারের কারণে বিমর্ষ হয়ে উঠলে তখন ব্রহ্মা জানালেন আদিশেষ পরিশেষে ভেঙ্কটাদ্রি পর্বতের সাথে যুক্ত হবে এবং ভগবান বিষ্ণু তার উপর অবস্থান করবেন। এরপর আদিশেষ নিজেকে বর্ধিত করে বিশাল শেষাদ্রি পর্বতে রূপান্তরিত হলেন এবং তার ফণা ভেঙ্কটাদ্রি পর্বতে পরিণত হয় এবং শ্রীভেঙ্কটেশ্বরকে ধারণ করে এবং তার মধ্যম অংশ অহোভিলাম শ্রীনৃসিংহদেবকে ধারণ করে এবং তার লেজ যেটি শ্রীসাইলাম নামে পরিচিত সেটি ভগবান মল্লিকার্জুনকে (শিব) ধারণ করে । চলুন আমরাও এই দিব্য মন্দির ও ভগবান বালাজী দর্শনের অভিলাষে তিরুপতি গমন করি এবং ভগবানের দিব্য আবির্ভাব লীলা সম্বলিত তীর্থস্থানসমূহ দর্শন করে আমাদের মানব জীবন সার্থক করি।


 

ব্যাক টু গডহেড, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৮ হতে প্রকাশিত

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।