রাধাকুণ্ড ও শ্যামকুণ্ড আবির্ভাব রহস্য

0
37

একবার কংস একটি অসুরকে ব্রজে পাঠালেন- যার নাম ছিল অরিষ্টাসুর। এই ষাঁড়রূপী অসুর ছিল অত্যন্ত ভয়ানক। সে সকল ব্রজবাসীকে ভয়ে সন্ত্রস্ত করে তুলল। তখন শ্রীকৃষ্ণ গিয়ে অনায়াসে অরিষ্টাসুরকে বধ করলেন। সেই রাত্রে শ্রীকৃষ্ণ গোপিকাদের আকর্ষণ করে তাদের সাথে রাসনৃত্য উপভোগ করার জন্য তাঁর মোহন বংশীটি বাজালেন। যখন শ্রীমতি রাধারানী, ললিতা এবং অন্যান্য সখীগণ বংশীধ্বনি অনুসরণ করে শ্রীকৃষ্ণের কাছে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে এভাবে বাক্যালাপ করতে লাগলেন, “ব্রজরাজ নন্দের পুত্র আজ একটি ষাঁড়কে নিধন করেছে। এইভাবে সে একটি পাপ করেছে। শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাজা যদি পাপ করে, তবে প্রজাদের সেই পাপের ভাগী হতে হয়। এই নীতি অনুসারে ব্রজরাজ-তনয় কৃষ্ণ গো-বধ করে যে পাপ করেছে, নিশ্চয় সেই পাপ আমাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। আমরা অবশ্যই ভগবতী পৌর্ণমাসীর সাথে এবিষয়ে পরামর্শ করব, তাঁকে জিজ্ঞাসা করব-এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের কি করতে হবে।” এভাবে বাক্যালাপ করতে করতে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে এলেন। তাঁরা যথেষ্ট উচ্চঃস্বরে বলছিলেন, যাতে শ্রীকৃষ্ণ তা শুনতে পান। শ্রীমতি রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “ হে ষাঁড় নিধনকারী! আজ তুমি আমাদের স্পর্শ করবে না।” শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, “মূর্খ গোপীগণ! ওটা আসলে কোনো ষাঁড় ছিল না। ওটা ছিল একটা অসুর, ষাঁড়ের রূপ ধরে সে ব্রজবাসীদের ক্ষতিসাধন করতে এসেছিল।”
শ্রীমতি রাধারানী বললেন, “হে কৃষ্ণ! ওটা একটা অসুর হলেও সে ষাঁড়ের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। বৃত্রাসুরও একটি অসুর ছিল, কিন্তু তাঁকে হত্যা করায় ইন্দ্রের ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়েছিলো। একইভাবে, এই অরিষ্টাসুর একটি অসুর হলেও যেহেতু সে ষাঁড়ের রূপ গ্রহণ করেছিল, সেজন্য তোমার অবশ্যই পাপ হয়েছে।” শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধারানীর এই ব্যাখ্যা শুনলেন, তিনি কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। তিনি লজ্জাবিনম্র মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তিনি শ্রীমতি রাধারাণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার যদি পাপ হয়ে থাকে, তবে তার সমাধান কি? শ্রীমতি রাধারাণী ও তাঁর সখীরা বললেন, “আমরা পৌর্ণমাসী এবং গর্গাচার্যের কন্যা গার্গীর কাছ থেকে শুনেছি যে, এই ধরনের পাপ হলে সমস্ত পবিত্র তীর্থে গিয়ে স্নান করতে হয়। তবেই ষাঁড় হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব।”
শ্রীকৃষ্ণ যখন শ্রীমতি রাধারণীর কাছ থেকে প্রায়শ্চিত্তের এই বিধান শুনলেন, তিনি তাঁর বিনয় ত্যাগ করে বললেন, “ও, তবে তোমরা ভাবছ বুঝি আমাকে এখন সর্বতীর্থে স্নান করার জন্য ত্রিভুবনের সর্বত্র যেতে হবে? দেখ, তোমাদের চোখের সামনেই আমি এখানে সর্বতীর্থকে নিয়ে আসছি।” তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বামপদের গোড়ালি দিয়ে ভূমিতে আঘাত করলে সেখানে একটি গর্তের সৃষ্টি হলো এবং তৎক্ষণাৎ পাতাললোক হতে ভাগবতী গঙ্গা সেখানে আবির্ভূত হলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ সেই জলে সর্বতীর্থকে আহ্বান করলেন। তাঁর আদেশক্রমে সকল তীর্থ সেখানে আবির্র্ভূত হয়ে ঐ কুণ্ডজলে প্রবেশ করলেন। সেখানে অবগাহনের পর শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “যাতে সর্বতীর্থের পবিত্র জলপূর্ণ এই কুণ্ড এখানে নিত্য বিরাজ করে, আমি তার ব্যবস্থা করব।” “তিনি শ্রীমতি রাধারাণী ও তাঁর সখীদের বললেন, “এখন আমি এই কুণ্ড-জলে স্নান করে পাপমুক্ত হয়েছি। কিন্তু তোমাদের কি হবে? তোমরা তো এ জীবনে কোনো পুণ্যকর্ম করনি। তবে কিভাবে তোমরা সর্বতীর্থজলে স্নান করবে?
গোপীগণ বললেন, “হে কৃষ্ণ! তোমার বুদ্ধিমত্তা কে বুঝবে? এই কুণ্ডের জল সাধারণ জলের মতো। কিভাবে তুমি এত গর্ব করে বলছ যে, এই কুণ্ডের জল সর্বতীর্থের? তোমার কথা আমরা বিশ্বাস করি না!”
গোপিকাদের একথা শুনে শ্রীকৃষ্ণের আহ্বানে তৎক্ষণাৎ সর্বতীর্থ তাঁদের নিজ নিজ রূপে শ্রীমতি রাধারানীর সামনে আবির্ভূত হয়। একের পর এক তাঁরা নিজ নিজ পরিচয় প্রদান করলেন- “আমি লবণ সমুদ্র, আমি সুরদীর্ঘিকা, আমি শোন্, আমি সিন্ধু নদ, আমি তাম্রপর্ণী, আমি পুষ্কর, আমি সরস্বতী, আমি যমুনা নদী, আমি কাবেরী, আমি তীর্থরাজ প্রয়াগ। এখন আমরা সকলে বারিরূপে এই কুণ্ডে প্রবেশ করছি।”
শ্রীকৃষ্ণ গোপীগণকে বললেন, “এখন তোমাদের সন্দেহ করার আর সুযোগ নেই। আমি সর্বতীর্থজলে স্নান করেছি, ফলে আমি সর্বপাপ হতে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু তোমাদের সকলের এবার কি হবে? ব্রজের অধিবাসী হওয়ায় তোমাদের সকলকেই পাপকলুষ সংস্পর্শ করেছে। এখন তোমাদের সবাইকে এই কুণ্ড জলে স্নান করে পাপমুক্ত হতে হবে। নচেৎ তোমরা দূষিত রয়ে যাবে।” শ্রীমতি রাধারাণী বললেন, “হে সখীগণ! কৃষ্ণ পদাঘাত করে এই কুণ্ড সৃষ্টি করেছে। এমন সূচনা শুভপ্রদ নয়। তাছাড়া, কৃষ্ণ এই জলে স্নান করাতে সমস্ত জল দূষিত হয়ে গেছে। আমরা এই কুণ্ডে স্নান না করে নিজেরা কূপ খনন করে সেখানে স্নান করব।”
শ্রীকৃষ্ণের সৃষ্ট কুণ্ডের পশ্চিম দিকে শ্রীমতি রাধারাণী একটি স্থান দেখলেন, যেখানে অরিষ্টাসুরের খুরের আঘাতে একটি গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল।
রাধারাণী তাঁর হাতের কঙ্কন খুলে সেখানে খুঁড়তে শুরু করলেন, তাঁর সহচারীরাও তাঁকে একাজে সাহায্য করতে লাগল। সেখানে এতো গোপিকা ছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি বড় পুকুর তৈরি হলো। যেহেতু এই কুণ্ডটি শ্রীমতি রাধারাণীর কঙ্কন দিয়ে খনন করা হয়েছিল, সেজন্য এই কুণ্ডের নাম হল ‘কঙ্কন কুণ্ড’; পরবর্তীতে এই কুণ্ডটি রাধাকুণ্ড নামে খ্যাত হয়। এভাবে শ্রীমতি রাধারাণী খুব শীঘ্রই শ্যামকুণ্ডের পাশেই একটি সুন্দর রম্য কুণ্ড সৃষ্টি করলেন। কৃষ্ণ এটি দেখে বিস্মিত হলেন। তিনি শ্রীমতি রাধারাণীকে বললেন, “হে কমলাক্ষী! তুমি এখানে একটি সুন্দর গর্ত তৈরি করেছো। যদি জল না থাকে, তবে এই শুষ্ক কুণ্ড কি কাজে আসবে? যা হোক, আমি তোমাদেরকে আমার কুণ্ড হতে জল নিয়ে তোমাদের কুণ্ড, জলপূর্ণ করার অনুমতি দিতে পারি।”
শ্রীকৃষ্ণের একথা শুনে শ্রীমতি রাধারানী মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “ঐ জল তোমার পাপে দূষিত হয়ে গেছে। আমার সখীদের সহায়তায় আমি মানসীগঙ্গা থেকে এখানে জল নিয়ে আসব। এভাবে আমি এ জগতে আমার কুণ্ডের অনবদ্য মহিমা প্রতিষ্ঠা করব!” শ্রীকৃষ্ণ ভাবলেন, এটি শ্রীমতি রাধারাণী ও তাঁর সখীগণের পক্ষে অনেক শ্রমসাধ্য হবে, সেজন্য তিনি সকল তীর্থবর্গকে নির্দেশ দিলেন শ্রীমতি রাধিকার সেবা করতে। তৎক্ষণাৎ তীর্থগণ তাঁদের স্ব-স্ব রূপে শ্রীমতী রাধারাণীর সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে প্রণতি নিবেদন করে বললেন, “হে দেবী! আপনার মহিমার অন্ত বেদেরও অগোচর। ব্রহ্মা, শিব, নারদও আপনার মহিমার অন্ত পায় না। শ্রীউদ্ধব সর্বদাই আপনার অসীম মহিমার ধ্যান করেছেন। আপনার চরণকমলের প্রান্তভাগের দ্যুতিময় সৌন্দর্যচ্ছটা এমনকি লক্ষ্মীদেবীরও অভিলাষিত। একমাত্র একজন সম্পূর্ণভাবে আপনার মহিমা অবগত আছেন। তিনি হচ্ছেন ব্রজেন্দ্রনন্দন, যিনি আপনার প্রতি প্রেমবশতঃ দিব্যতনুর স্বেদবিন্দু নির্মন্থন করে থাকেন। তিনি মূল্যবান রত্নমণিশোভিত নূপুর দিয়ে সুন্দরভাবে আপনার পদকমল অতি রমণীয়ভাবে বিভূষিত করে থাকেন।
আপনার দর্শন-রূপ কৃপা লাভ করে তিনি নিজেকে সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান বলে অনুভব করেন। তাঁর আদেশ ও কৃপায় আমরা তাঁর কুণ্ডে আবির্ভূত হয়েছি। হে শ্রীমতী রাধিকা! আপনার সদয় দৃষ্টিপাত করে অনুগ্রহ করে আমাদের গ্রহণ করুন! এই কুণ্ডে আমাদের সর্বদা বিরাজ করতে দিন, যাতে আমরা কৃষ্ণের সাথে আপনাদের মাধুর্যপূর্ণ লীলা দর্শন করতে পারি। এভাবে আমাদের সকল অভিলাষ পূর্ণ হবে।” মূর্তিমান তীর্থসকলের এসব প্রার্থনাগুলি শুনে শ্রীমতি রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনি বললেন, “হে তীর্থসকল! আমি তোমাদের প্রার্থনায় প্রীত হয়েছি। এখন ইচ্ছা করলে তোমরা আমার কুণ্ডে প্রবেশ করতে পার।” শ্রীমতি রাধারাণীর এই কৃপাপূর্ণ আদেশ উচ্চারিত হওয়া মাত্রই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাঁশির সাহায্যে দুটি কুণ্ডের মধ্যবর্তী বিভাজক বাঁধটি ভেঙে দিলেন, তার ফলে শ্যামকুণ্ডের জল রাধাকুণ্ডে প্রবেশ করলো।
শ্রীমতী রাধারাণী তাঁর কুণ্ডে প্রবেশ করেন কার্তিক পূর্ণিমার দিনে (বহুলাষ্টমী তিথি) শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকুণ্ডকে জলে পূর্ণ হয়ে যেতে দেখলেন, তখন তিনিও সেখানে স্নান করলেন। তিনি শ্রীমতি রাধারাণীকে বললেন, “হে প্রিয়তমা! তোমার তৈরী এই কুণ্ডে আমি প্রতিদিন জলকেলি করব। তোমার মতো এই কুণ্ডও আজ থেকে আমার প্রিয় হবে।” প্রতি বছর সহস্র সহস্র ভক্ত এই তিথিতে রাধাকুণ্ডের এই আবির্ভাব মুহূর্তে এই কুণ্ডে স্নান করেন, জীবনে পরম সার্থকতা লাভের অভিলাষে। এখনো রাধাকুণ্ডের অভ্যন্তরে কঙ্কন কুণ্ড রয়েছে। এটির আয়তন ২০ বর্গফুট এবং এটি ১৬ ফুট গভীর। ভক্তরা যখন রাধাকুণ্ড পরিচ্ছন্ন করার উদ্দেশ্যে কুণ্ড জলশূণ্য করেন, তখন কঙ্কনকুণ্ড দেখা যায়।
লেখক পরিচিতি: শ্রীমৎ ভক্তিপুরুষোত্তম স্বামী ১৯৫৭ সালে শ্রীজগন্নাথ পুরীধামে জন্মগ্রহণ করেন। কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নের সময় তিনি ইস্‌কনে যোগদান করেন ১৯৭৮ সালে। পরের বছর গৌরপূর্ণিমার সময়ে শ্রীধাম মায়াপুরে তিনি শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজের নিকট থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত উড়িষ্যা (তাঁর জন্মস্থান) ভুবনেশ্বরে মন্দিরের অধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন। তিনি জিবিসি জোনাল সেক্রেটারি পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ, কোরিয়া এবং নেপাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অনেক জায়গায় ভ্রমণ করে ভক্তদের আধ্যাত্মিক জীবনে অনুপ্রেরণা দেন কৃষ্ণ কথার মাধ্যমে। তিনি একাধিক গ্রন্থের রচয়িতা;

 


ব্যাক টু গডহেড অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২১ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here