ভারত থেকে আলেকজান্ডারের শিক্ষা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২২ | ৯:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২২ | ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 141 বার দেখা হয়েছে

ভারত থেকে আলেকজান্ডারের শিক্ষা
কলিযুগের বিষাক্ত প্রভাবে যতই কাল মার্কস, ডারউইন, হিউম প্রমুখ নাস্তিকদের ভোগবাদী দর্শন প্রবেশ করুক না কেন, এই পুণ্যভূমির অন্তরাত্মাকে তা কখনোই স্পর্শ করতে পারবে না।

ড: প্রেমাঞ্জন দাস


আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জয় করতে করতে পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে প্রবেশ করলেন। ক্ষত্রিয় সম্রাট পুরুকে প্রশ্ন করলেন, “আমার কাছে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশা কর।” পুরু উত্তর দিলেন, “রাজার প্রতি রাজার মতো আচরণ।” বিশ্বের কোথাও এরকম বীরত্ব তিনি দর্শন করেননি।
একদিন এক চোর আলেকজান্ডারের শিবিরে প্রবেশ করেই ধরা পড়ল। সে দু’চার খানা থালা বাসন নিয়ে পালাচ্ছিল। আলেকজান্ডার চোরকে শাস্তি দিতে চাইলেন। চোর বলল “আমি তো দু’চারটা বাসন চুরি করেছি। আপনি যে আমাদের দেশের মাটি চুরি করেছেন ডাকাতের মতো? আপনার কী শাস্তি হওয়া উচিত ?” মহান বীর আলেকজান্ডার লক্ষ্য করতে লাগলেন, ভারতবর্ষ এক অদ্ভুত দেশ। এখানকার চোরও তত্ত্বকথা বলে । একদিন আলেকজান্ডার দেখলেন, দুজন লোক একটি ট্রাঙ্কের পাশে বসে কলহ করছেন। কী ব্যাপার? প্রথম লোকটি হচ্ছেন একখণ্ড জমির ক্রেতা যার উপর তাঁরা বসেছিলেন। আর দ্বিতীয় লোকটি ছিল সেই জমির বিক্রেতা। মাত্র এক সপ্তাহ আগে উক্ত বিক্রেতা এই জমিটি প্রথম লোকটির কাছে বিক্রি করেছিলেন। একদিন প্রথম লোকটি ঐ জমির উপর কূয়ো খনন করতে গিয়ে ট্রাঙ্কভর্তি স্বর্ণমুদ্রার সন্ধান পেলেন । সঙ্গে সঙ্গে তিনি জমি বিক্রেতাকে ডেকে পাঠালেন।
ক্রেতা: “দেখুন, আপনার জমির নীচ থেকে আমি ট্রাঙ্কভর্তি স্বর্ণমুদ্রা পেলাম। এগুলি নিশ্চয়ই আপনার পূর্ব পুরুষেরা মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। সুতরাং এগুলি আপনার স্বর্ণমুদ্রা। দয়া করে আপনি এগুলি গ্রহণ করুন। যদিও আমি জমিটি আপনার কাছ থেকে ক্রয় করেছি কিন্তু, এসব স্বর্ণমুদ্রা তো আমি ক্রয় করিনি।”
বিক্রেতা: “যে মুহূর্তে আমি আপনার কাছে জমি বিক্রি করি, সেই মুহূর্ত থেকে এই জমির ঘাস, লতা-পাতা, বৃক্ষ, জল, তেল, খনিজ, সোনা সবই আপনার । দয়া করে আপনার সোনার ট্রাঙ্ক আপনি গ্রহণ করুন।”
তাদের মধ্যে কি নিয়ে কলহ হচ্ছে, তা জানতে আলেকজান্ডারের কৌতূহল হল তিনি অনুসন্ধান করে যখন সব বুঝতে পারলেন, তখন অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। আজ থেকে প্রায় দু’হাজার তিনশ পঁয়ত্রিশ বছর আগে এই ছিল পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের অবস্থা। ভারতবর্ষে তখন মুখের কথায় জমি বিক্রি হত, দলিল হত না সব শুনে মহামতি আলেকজান্ডার তখন তাঁর অন্তরঙ্গ সেনা নায়কদের বলেছিলেন, “সমগ্র বিশ্বকে জয় করতে পারলেও, আমি কখনও এই পুণ্যভূমি ভারতের মতো ধর্মপ্রাণ মানুষ আর কোথাও দেখিনি।…সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!” অশ্রুসিক্ত নয়নে, শ্রদ্ধাবনত হয়ে পুণ্যভূমি ভারত আর তাঁর দেবদুর্লভ মানুষদের প্রণাম জানিয়ে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারত থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ এরকম বহু ঘটনা প্রায়ই বলতেন। তিনি এক ব্যবসায়ীর কাহিনী শুনিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেরা হিসাবের খাতা নেড়ে দেখলেন, তাদের পরলোকগত পিতা অন্য এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক মোটা অঙ্কের টাকা ধার নিয়েছিলেন। সন্তানেরা অনুসন্ধান করে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। সন্তান: “আমার বাবা আপনার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করেছিলেন, অনুগ্রহ করে আপনি তা গ্রহণ করুন।” ব্যবসায়ী: “কিন্তু আমার হিসাব খাতায় কোনও ধারের উল্লেখ নেই।” সন্তান; “হয়তো ভুলে সেটা আপনার হিসাব খাতায় তোলা হয়নি। কিন্তু আমাদের হিসাব খাতায় স্পষ্টভাবে তার উল্লেখ আছে।” ব্যবসায়ী: “তা হোক, যেহেতু আমার হিসাব খাতায় তার উল্লেখ নেই, আমি তা নিতে পারব না।”
আমি যখন আগরতলায় ছিলাম, তখন সেখানকার তৎকালীন মন্দির অধ্যক্ষ শ্রীরামানুজ প্রভু আগরতলার মন্দিরের জন্য কিছু ঋণ করেছিলেন কৃষ্ণভক্ত শ্রীকৃষ্ণ কুমার বসাকের কাছ থেকে রামানুজ প্রভুর দেহত্যাগের পর আমি তা জানতে পারি উনার জামাতার কাছ থেকে।
জামাতা এক গুচ্ছ টাকা নিয়ে আপনি কৃষ্ণকুমার বসাকের কাছে যান এবং ঋণ পরিশোধ করুন। আমি টাকা নিয়ে কৃষ্ণকুমার বসাকের কাছে গেলাম। সব শুনে তিনি বললেন, “রামানুজ প্ৰভু চলে গেছেন। আমিও চলে যাব। কৃষ্ণের টাকা তাই কৃষ্ণের কাছেই থাকুন।”
এই সেই ভারতবর্ষ সেখানে রামের ভাই ভরত রামচন্দ্রকে বনবাস থেকে ফিরিয়ে নিয়ে রাজ সিংহাসন অর্পণ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। এই সেই ভারতবর্ষে যেখানে সীতা এবং দ্রৌপদীর মতো ধর্মপত্নীরা স্বামীর সঙ্গে বনবাস পর্যন্ত ভোগ করেছেন, যদিও তাঁরা সসম্মানে শশুরালয়ে থাকতে পারতেন। এই সেই ভারতবর্ষ যেখানে লালাবাবু তাঁর জমিদারী ত্যাগ করে শত্রু গৃহে ভিক্ষা করেছিলেন। এই সেই পুণ্যভুমি যেখানে মহারাজ দশরথ শুধু তাঁর বাক্য রক্ষার জন্য নিজের প্রাণ ত্যাগ করেও প্রাণাধিক পুত্রকে বনবাস পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মহারাজ যুধিষ্ঠর প্রমুখ পঞ্চপাণ্ডবের ক্ষত্রিয়নীতি রক্ষার জন্য বার বছর বনে বনে ঘুরে বেড়িয়েছেন। অজ্ঞাতবাসে দাস-দাসী হয়ে জীবন কাটিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে লালাবাবুর কাহিনীটি খুবই শিক্ষামূলক। লালাবাবুর ছিলেন এক ধনী এবং প্রখ্যাত জমিদার। এক খন্ড জমি নিয়ে তাঁর মামলা চলছিল। তাঁর প্রতিবেশী জমিদার জগৎ শেঠের সঙ্গে। বাদী-বিবাদী কেউ হার মানবেন না। যাকে বলে প্রেসটিজ ফাইট। মামলা সুদীর্ঘ বছর ধরে দুজনেই যৌবনের দরজা পেরিয়ে বার্ধক্যের সীমানায় প্রবেশ করলেন। একদিন বিকাল বেলায় লালাবাবু গ্রামের পথে হেঁটে চলেছেন এক কুমোর বাড়ির পাশ দিয়ে। কুমোরেরা যে খড়ের গদায় আগুন দিয়ে হাড়ি পোড়ায়, তাকে বলে বাসনা। কুমোরের ছোট মেয়েটি বাবাকে ডেকে ডেকে বলছে, “ও বাবা, বেলা বয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাসনায় আগুন দাও।” ছোট্ট মেয়েটির সুধাকণ্ঠ লালাবাবুর হৃদয় স্পর্শ করল। লালাবাবু অর্থ বুঝলেন, “জীবনের বেলা তো বয়ে গেল, কামনা বাসনায় এবার আগুন দাও। আর মামলা নয়। এবার বৈরাগ্যের পালা।” লালাবাবু আর ঘরে ফিরে গেলেন না। সেই কুমোরের বাড়ির কাছ থেকেই গৃহত্যাগ করে সর্বত্যাগী বৈষ্ণবে পরিণত হলেন । পাঁচ ঘর ভিক্ষা করে যা পেতেন, তা শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করে জীবন ধারণ করতেন। একদিন ভিক্ষা করতে করতে তিনি তাঁর বিবাদী জমিদারের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে প্রবেশ করলেন বিবাদী জমিদার জগৎ শেঠের বৈঠক খানায়। লালাবাবু বিনীতভাবে ভিক্ষা চাইলেন। আজীবনের শত্রু জগৎ শেঠ হাতে চাল নিয়ে এসে লালাবাবুর ঝুলিতে ঢেলে দিলেন। চোখে তাঁর প্রেমাশ্রু। আবেগ আপুত হয়ে বললেন, “প্রিয় লালাবাবু, সারাজীবন মামলা করেও আপনি আমাকে হার মানাতে পারেননি। কিন্তু আজ যে আপনি ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে চির শত্রুর ঘরে ভিক্ষা নিতে এলেন, তাতে আমি একশভাগ হার মেনে গেলাম। এই বৈরাগ্যের মামলায় আমি হেরে গেলাম। আপনিই বিজয় লাভ করলেন।” একথা বলে জগৎ শেঠ লুটিয়ে পড়লেন লালাবাবুর চরণতলে। এই সেই পূণ্যভুমি ভারতবর্ষ। তাই যুগে যুগে ভগবান এই পুণ্যভুমিকেই নির্ণয় করেছেন তাঁর সমস্ত অবতারে। শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা ভারতবর্ষের প্রতিটি স্নায়ুর সঙ্গে মিশে আছে। কলিযুগের বিষাক্ত প্রভাবে যতই কার্ল মার্কস, ডারউইন, হিউন প্রমুখ নাস্তিকদের ভোগবাদী দর্শন প্রবেশ করুক না কেন, এই পুণ্যভুমির অন্তরাত্মাকে তা কখনোই স্পর্শ করতে পারবে না।
পারমার্থিক জ্ঞান ও শুদ্ধ প্রেমভক্তির উত্তাল আনন্দ তরঙ্গে ভারত পুনর্জাগরিত হবেই। ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেবে। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ তথা ইস্‌কন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রীল প্রভুপাদ ইতিমধ্যেই ভারতের এই শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বের দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।