ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম কিভাবে দর্শন করতে হয়?

0
114

শ্রীমদ্ভাগবতের বিভিন্ন শ্লোকের তাৎপর্যে যেখানে শ্রীল প্রভুপাদ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের মহিমা কীর্তন করেছেন

সর্বাত্মা দাস


ভগবানের শ্রীবিগ্রহের দর্শন শুরু করতে হয় তাঁর শ্রীপাদপদ্ম থেকে, তারপর ধীরে ধীরে তাঁর জানুদেশ, কঠিদেশ, বক্ষদেশ এবং মুখমণ্ডল দর্শন করতে হয়। ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম দর্শন না করে তাঁর মুখমণ্ডল দর্শন করার চেষ্টা করা উচিত নয়। (শ্রীমদ্ভাগবত-১/৮/২২ তাৎপর্য)

পরম সম্পদ

শিব এই জন্যই মহিমান্বিত যে, তিনি তাঁর মস্তকে পবিত্র গঙ্গাকে ধারণ করেছেন, যার উদ্ভব হয়েছে ভগবান বিষ্ণুর চরণ প্রক্ষালন নিঃসৃত জল থেকে। হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে শ্রীল সনাতন গোস্বামী বলেছেন যে, পরমেশ্বর ভগবানকে যারা শিব ব্রহ্মা আদি দেবতাদের সম স্তরে স্থাপন করে, তারা তৎক্ষণাৎ পাষণ্ডী বা নাস্তিক হয়ে যায়। কখনই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু এবং দেবতাদের সমান বলে করা উচিত নয়। (শ্রীমদ্ভাগবত-৩/২৮/২২ তাৎপর্য)

অনতিক্রম্য সৌন্দর্য

ভগবানের চরণ-কমলের সৌন্দর্যের উপমা শরৎকালের পদ্মপলাশের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রকৃতির নিয়মে শরৎকালে নদী ও সরোবরের ঘোলাটে অথবা কর্দমাক্ত জল স্বচ্ছ হয়ে যায়। সেই সময় যে পদ্ম ফোটে তা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সুন্দর বলে প্রতিভাত হয়। পদ্মফুলের তুলনা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সঙ্গে করা হয় এবং সেই পদ্মদলের তুলনা করা হয়, ভগবানের পায়ের নখের সঙ্গে। ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের নখ অত্যন্ত উজ্জ্বল, যা ব্রহ্মসংহিতায় প্রতিপন্ন হয়েছে। (শ্রীমদ্ভাগবত-৪/২৪/৫২ তাৎপর্য)

কেন শ্রীপাদপদ্ম বলা হয়?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যধাম গোলোক বৃন্দাবনের আকৃতি একটি পদ্মের কোরকের মতো। ভগবান যখনই এই জড় জগতে অবতরণ করেন, তখনই তাঁর সঙ্গে তাঁর ধামও যথাযথরূপে প্রকাশিত হন। তাই তাঁর শ্রীপাদপদ্ম সর্বদাই সেই বিশাল পদ্মের কোরকের ওপরেই থাকে। তাঁর পদদ্বয় পদ্মের মতো সুন্দর। তাই বলা হয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদ পদ্মসদৃশ । (শ্রীমদ্ভাগবত-১/১৬/৭ তাৎপর্য)

শুদ্ধ ভক্তরা শ্রীপাদপদ্মের প্রতি আসক্ত

“শুদ্ধ ভক্তেরা সর্বদাই ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম লাভের জন্য লালায়িত থাকেন। পদ্মে এক প্রকার মধু হয়, যার অপ্রাকৃত স্বাদ ভক্তগণ আস্বাদন করেন। ভক্তগণ সর্বদাই মধুলোলুপ ভ্রমরের মতো। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আচার্য মহাভাগবত শ্রীল রূপ গোস্বামী নিজেকে এক ভ্রমরের সঙ্গে তুলনা করে সেই পদ্ম-মধুর সম্বন্ধে একটি গান গেয়েছেন – (সংস্কৃতের অনুবাদ প্রদত্ত হল)
“হে দেব! (কৃষ্ণ) তোমাকে বন্দনা করি। আমার মানস-মধুকরকে নিজ পাদপদ্মের মকরন্দে (মধুতে) অর্পণ কর। যদিও ব্রহ্মা সমাধিযোগে তোমার নখাগ্রকিরণ পর্যন্ত দর্শনে অক্ষম, তথাপি হে অচ্যুত! তোমার অদ্ভুত কৃপাতরঙ্গ শ্রবণ করে এই ইচ্ছা করছি। হে মাধব! যদিও তোমাতে আমার তিলমাত্রও ভক্তির উদয় হয়নি, তথাপি তোমাতে অঘটনঘটনকারিণী পরমেশ্বরতা বিদ্যমান বলে কৃপা পাবার আশা করি। হে সনাতন! তোমার পাদপদ্ম অমৃতকেও নিন্দা করছে, অতএব আমার মানস মধুকর মকরন্দ-পানে লুব্ধ হয়ে মাধুর্যসার প্রাপ্তির জন্য তোমার পাদপদ্মে নিশ্চলরূপে বাস করুক; এটি আমার প্রার্থনা।”
ভক্তের ভগবানের শ্রীপাদপদে অবস্থিত হয়েই পূর্ণরূপে তৃপ্ত হন, ভগবানের সর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত মুখমণ্ডল দর্শন করার উচ্ছাভিলাষ অথবা ভগবানের বলিষ্ঠ বাহুযুগলের দ্বারা সুরক্ষিত হওয়ার বাসনা তাঁরা করেন না। তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই বিনম্র এবং ভগবান সর্বদাই এই প্রকার বিনীত ভক্তদের প্রতি অনুরক্ত। (শ্রীমদ্ভাগবত-১/১১/২৬ তাৎপর্য)

সব কিছুর উৎস

ভগবানের শ্রীপাদপদ্মকে বলা হয় মহৎ-পদম; অর্থাৎ, সমগ্ৰ জড় জগতের উৎস হচ্ছে ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম। ভগবদ্‌গীতায় (১০/৮) সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছে, অহং সর্বস্য প্রভবঃ- সব কিছু ভগবান থেকে উদ্ভুত হয়েছে। এই জড় জগৎ, যার তুলনা অজ্ঞানের সমুদ্রের সঙ্গে করা হয়, তাও ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে আশ্রিত। কিন্তু অজ্ঞানের এই মহাসমুদ্র ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের প্রভাবে সংকীর্ণ হয়ে যায়। যিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তাঁকে আর এই সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে হয় না, কারণ তিনি ইতোমধ্যেই ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে স্থিত হওয়ার ফলে, তা উত্তীর্ণ হয়ে গেছেন। ভগবান ও ভগবানের ভক্তের মহিমা শ্রবণ ও কীর্তনের ফলে, ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবায় দৃঢ়রূপে স্থির হওয়া যায়। (শ্রীমদ্ভাগবত-৪/২৩/৩৯ তাৎপর্য)
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদ থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে গঙ্গা দেব-দেবী সমেত ত্রিভুবনকে পবিত্র করে। শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুতত্ত্বের উৎস, এবং তাই তাঁর শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় সকলকে সমস্ত পাপ থেকে, এমন কি ব্রাহ্মণের প্রতি কোনও রাজার অপরাধ থেকেও যুক্ত করতে পারে।
মহারাজ পরীক্ষিৎ তাই স্থির করেছিলেন মুকুন্দ বা মুক্তিদাতা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করতে। গঙ্গা অথবা যমুনার তীর নিরন্তর ভগবানের কথা স্মরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। মহারাজ পরীক্ষিৎ নিজেকে সব রকম জড় আসক্তি থেকে মুক্ত করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করেছিলেন। সেইটিই হচ্ছে মুক্তিলাভের পন্থা। সব রকম জড় সঙ্গ থেকে মুক্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে আরও পাপ করা থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত হওয়া। ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করার ফলে পূর্বকৃত সমস্ত পাপের ফল থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
জড় জগতের অবস্থা এমনই যে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে পাপ আচরণ হয়ে যায়, এবং তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে নিষ্পাপ এবং পুণ্যবান রাজা পরীক্ষিৎ মহারাজ স্বয়ং। কোন দোষ না করতে চাইলেও তিনি এক অপরাধের শিকার হয়ে পড়েছিলেন। সেজন্য তিনি শাপগ্রস্ত হলেও ভগবানের ভক্ত হওয়াতে প্রতিকূলতাও অনুকূল হয়ে উঠেছিল। সিদ্ধান্ত হচ্ছে, স্বেচ্ছায় বা জ্ঞাতসারে জীবনে কোন পাপ করা উচিত নয় এবং সর্বদা অবিচলিতভাবে পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করা কর্তব্য। এই প্রকার মনোভাব অবলম্বন করতে পারলেই ভগবদ্ভক্ত মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য ভগবানের কৃপা লাভ করবে এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্ম প্রাপ্ত হবেন। (শ্রীমদ্ভাগবত-১/১৯/৭ তাৎপর্য)

শ্রীপাদপদ্মের ধ্যানে অপ্রাকৃত আনন্দ

ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যানে এমনই দিব্য আনন্দ রয়েছে যে, তার ফলে ভগবানের চিন্ময় রূপ ব্যতীত অন্য আর কোন কিছুর কথাই তখন আর মনে থাকে না। (শ্রীমদ্ভাগবত-৪/৪/২৭ তাৎপর্য)
ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, ধ্বজ এবং বজ্র আদি চিহ্নের দ্বারা সুশোভিত। শ্রীকৃষ্ণ যখন এই পৃথিবীতে অথবা স্বর্গলোকে বিচরণ করেন, তখন তাঁর পায়ের এই চিহ্নগুলি দেখা যায় । বৃন্দাবনধাম চিন্ময়, কারণ শ্রীকৃষ্ণ সেখানে প্রায়ই বিচরণ করেন। বৃন্দাবনবাসীরা সৌভাগ্যবান, কারণ তাঁরা সেখানে এই চিহ্নগুলি দর্শন করেন। অক্রুর যখন কংসের উৎসবে কৃষ্ণ এবং বলরামকে নিয়ে আসার জন্য বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন, তখন বৃন্দাবনের ভূমিতে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের সেই চিহ্নগুলি দর্শন করে, তিনি দিব্য আনন্দে আপ্লুত হয়ে ভগবানের স্তব করেছিলেন। ভগবানের অহৈতুকী কৃপাপ্রাপ্ত ভক্তরা এই চিহ্নগুলি দর্শন করতে পারেন। ভগবানের আবির্ভাবের ফলে পৃথিবীর ভারস্বরূপ অসুরদের বিনাশ হবে বলেই দেবতারা কেবল আনন্দিত হননি, ভূমিতে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের চিহ্নগুলি দর্শন করবেন বলেও তাঁরা আনন্দিত হয়েছিলেন। গোপীরা সর্বদা গোচরণে বিচরণশীল শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করতেন, এবং পূর্ববর্তী শ্লোকে বর্ণিত হয়েছে যে, কেবল ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করে গোপীরা দিব্য আনন্দে মগ্ন হতেন (আবিষ্টচেতা ন ভবায় কল্পতে)। গোপীদের মতো যাঁরা সর্বদা ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকেন, তাঁরা আর এই জড় জগতে থাকেন না-তাঁরা জড়া প্রকৃতির অতীত। তাই আমাদের কর্তব্য, সর্বদা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের কথা শ্রবণ করা, কীর্তন করা এবং ধ্যান করা। যে সমস্ত বৈষ্ণবরা শ্রীধাম বৃন্দাবনে বাস করতে মনস্থ করেছেন, তাঁরা সর্বদাই, দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টা ভগবানের কথা চিন্তা করেন । (শ্রীমদ্ভাগবত-১০/২/৩৮ তাৎপর্য)

কৃষ্ণও তার পদাঙ্গুষ্ঠ চুষতে চান

প্রলয়ের সময় ভগবান কখনও কখনও একটি শিশুরূপে একটি বটপাতায় শয়ন করে প্রলয় বারিতে ভাসতে থাকেন। তাই দেবহুতি বলেছেন, “আমার মতো একজন সাধারণ নারীর গর্ভে আপনার শয়ন করা ততটা আশ্চর্যজনক নয়। আপনি একটি শিশুরূপে একটি বটপাতায় শয়ন করে প্রলয়-বারিতে ভাসতে পারেন। তাই, আপনি যে আমার উদরে শয়ন করতে পারেন, তা ততটা আশ্চর্যজনক নয় । আপনি শিক্ষা দেন যে, যারা এই জগতে শিশুদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, এবং তাই সন্তান লাভ করে পারিবারিক জীবনের সুখ উপভোগ করার জন্য বিবাহ করেন, তাঁরাও পরমেশ্বর ভগবানকে তাঁদের সন্তানরূপে প্রাপ্ত হতে পারেন, এবং সব চাইতে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে, ভগবান একটি শিশুর মতো তাঁর পদাঙ্গুষ্ঠ চোষেন।” যেহেতু সমস্ত মহর্ষি এবং ভক্তরা তাঁদের সমস্ত শক্তি ও কার্যের ফল পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবায় নিয়োগ করেন, তাই পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে নিশ্চয়ই কোন চিন্ময় আনন্দ রয়েছে। তাঁর ভক্তেরা সর্বদা যে অমৃত আস্বাদনের বাসনা করে, তার স্বাদ কেমন তা জানার জন্য ভগবান তাঁর পদাঙ্গুষ্ঠ চোষেন। কখনও কখনও পরমেশ্বর ভগবানও ভাবেন যে, তাঁর মধ্যে কি পরিমাণ চিন্ময় আনন্দ রয়েছে, এবং তাঁর নিজের সেই মাধুর্য আস্বাদন করার জন্য তিনি কখনও কখনও আস্বাদকের ভূমিকা অবলম্বন করেন। (শ্রীমদ্ভাগবত-৩/৩৩/৪ তাৎপর্য)


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here