ভক্তরা জানেন তাঁদের মৃত্যু নেই

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০১৮ | ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৮ | ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 1085 বার দেখা হয়েছে

ভক্তরা জানেন তাঁদের মৃত্যু নেই
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ

                                              শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ
                        শ্রীমায়াপুর-চন্দ্রোদয় মন্দির কক্ষে প্রদত্ত ভাগবত প্রবচন থেকে সংকলিত
শ্রীকৃষ্ণকে তত্ত্বত জানার পর, কৃষ্ণলোকে প্রবেশ করে তার সঙ্গ করার যোগ্যতা লাভ হয়। এই প্রকার অতি উচ্চ পদ প্রাপ্ত হওয়ার কারণও হচ্ছে মন। মনের দ্বারা কেউ কুকুর বা শূকরের শরীর প্রাপ্ত হতে পারে, আবার ভগবানের নিত্য পার্ষদের শরীর লাভ করতে পারে। তাই মনকে সর্বদা কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন রাখাই মানব-জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্ধি।
শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বর্ণিত এই তাৎপর্য বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, এই জীবনে আমরা যা কিছু করি, তা সবই পরের জীবনে আমাদের উৎপত্তির কারণ। যেমন, ছাত্র জীবনে যে নিজেকে যত ভাল ভাবে প্রস্তুত করে, সেইভাবেই তার ক্যারিয়ার গড়ে উঠে।
ঠিক এই ভাবেই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মৃত্যুকালে আমরা যা চিন্তা করি, পরজন্মে তাই আমাদের জীবনে হয়। কোনও পুরুষ যদি মরণকাল পর্যন্ত কেবলই নারীর চিন্তা করতে থাকে, বৈদিক শাস্ত্রের জন্মান্তরবাদ তত্ত্বে বলা হয়েছে পরজন্মে সে নারীজন্ম পেতে পারে। বাস্তবিকই, আমাদের ইহজীবনেও এখন যা অভ্যাস করছি , পরবর্তী বয়সকালে তেমনই জীবনধারা লাভ হয় এই কথা অনস্বীকার্য সত্য। তেমনি, যাঁরা চিন্ময়ানন্দে পরিপূর্ণ চিরনবীন গোলোকে বৃন্দাবনের দিব্য গ্রহলোকে যাঁরা ফিরে যেতে চান, তাঁদের মন এখন থেকে তৈরি করতে হবে। অর্থ্য গোলোক বৃন্দাবনের অধিপতি পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাকথায় সদাসর্বদা মন ভরিয়ে রাখতে হবে, যাতে মরণোন্মুখ হলেও কৃষ্ণচিন্তা থেকে মন বিরূপ হতে পারবে না এবং তেমন কৃষ্ণোন্মুখ মনের যিনি অধিকারী, সচ্চিদান্দময় নিত্য গোলোক বৃন্দাবন ধামে পরজন্ম অতিবাহিত করার সৌভাগ্যও তাঁর অর্জিত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা থেকে। কারণ কৃষ্ণচিন্তার মধ্যমে তাঁর ব্রহ্মতত্ত জ্ঞান অন্তিমকালেও মনে থাকবে–যে জ্ঞান গোলোক ধাম প্রাপ্তির একমাত্র পাথেয়।
কাঁচা বাঁশ সহজে বাঁকানো যায়, কিন্তু পাকা বাঁশ বাঁকাতে গেলে ভেঙে যায়। তেমনি, ছোট বয়স থেকে কৃষ্ণকথা শ্রবণ ও কীর্তনের অভ্যাস করাতে পারলে শেষ বয়সে আনা হতেই কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের দিব্য রুচি সৃষ্টি হতে পারে। এই জন্য পাঁচ বছর বয়স থেকেই শিশু সন্তানদের কৃষ্ণভাবনাময় পরিবেশ কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের সুযোগ সুবিধা করে দিতে হয়– তাদের কৃষ্ণমন্দিরে নিয়মিত নিয়ে যেতে হয়, গৃহপরিবেশ কৃষ্ণভজনা, কৃষ্ণলীলা আলোচনা- পর্যালোচনার নিয়মিত আয়োজন করতে হয়, কৃষ্ণনাম ভজন-কীর্তনের ব্যবস্থা করতে হয়। তাতে মানুষের জীবনে শুদ্ধ-সাত্ত্বিক মানসিকতার সৃষ্টি হয় এবং সেই ধরনের মানসিকতাই ভগবদ্ভক্তি অনুকূল হয়।
বিজ্ঞানের যুগে আজ নানা রকমের যন্ত্রপাতি আর কলকব্জা সৃষ্টি হয়েছে বলে লোকে মনে করে ঐসব যন্ত্রের আনুকুল্যে তারা অফুরন্ত সুখ- শান্তির অধিকারী হতে পারবে। তা কিন্তু বাস্তবিক সত্য নয়। বিজ্ঞানের কল্যাণে সমাজে যতই উন্নতি হোক, জরা-ব্যাধি-মৃত্যু থেকে কারও পরিত্রাণ নেই। আজকাল অনেক রকমের নতুন রোগ-ব্যাধি হচ্ছে, যা আগে দেখা যেত না। লোকে জানে না—ভবিষ্যতে আরও কত ব্যাধির প্রকোপ দেখা দেবে, মানুষ তাতে কষ্ট পাবে, মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে বাধ্য হবে।
এই জন্য প্রত্যেক মানুষেরই স্পষ্টভাবে জানবার চেষ্টা করা উচিত-জন্ম কী, মৃত্যু কী, জীবন কী? পশুরা সকল বিষয়ে ভয় পায়, কারণ তারা এইসব তত্ত্ব জানে না। কিন্তু মানুষ ভয় করে না, কারণ সে এইসকল পারমার্থিক বিষয়ে যুগ যুগ ধরে আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে পরমতত্ত্ব আহরণ করতে পেরেছে। দুর্লভ মানব জীবনে তাই বুদ্ধিমান মানুস জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধির রহস্য জানতে আগ্রহী হয়। এই রহস্যের মহাসিন্ধু পার হওয়াই মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে তত্ত্বজ্ঞ মহাপুরুষেরা যুগে যুগে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এইজন্য বৈষ্ণব মহাজনেরা গেয়েছেন-
দুর্লভ মানব জনমে সৎসঙ্গে
তরহ এ ভবসিন্ধু রে।
বর্তমান মানব-সভ্যতার কারী শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই বিষয়ে অভয় দিয়েছেন- -কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদন করলে দুর্গম ভবসিন্ধু পার হওয়া সহজ হবে এবং জন্ম-মৃত্যু -জরা –ব্যাধির আবর্ত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতা উত্তম কুমার অসুস্থ হয়েছিলেন, ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন তিনি বেশিদিন থাকবে না, তাঁকে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। উত্তম কুমার বলেন, আমাকে আর কিছুদিন বাঁচতে দিন, বাঁচতে চাই। ডাক্তার ভেবেছিলেন, তাঁকে চিকিৎসায় উত্তম কুমার আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবেন। উত্তম কুমার তবু হঠাৎ একদিন মারা গেলেন। ডাক্তার বললেন, অনেকবার ওকে তো বাঁচিয়েছি এই একবারই ফেল হয়ে গেল। জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধির অমোঘ বিধির কাছে এরকম সব ডাক্তারকেই ফেল করতে হয়। ভগবদ্ভক্তরা জানেন –তাঁদের মৃত্যু হবে না। কারণ তাঁরা গীতা অনুধ্যান করে আন্তরিকভাবেই উপলদ্ধি করেছেন যে, তাঁরা চিন্ময় জীবাত্মা – ন হন্যতে হন্যমানে- কেউ সেই আত্মাকে বধ করতে পারে না। ভক্ত তাঁর শরীর পরিত্যাগ করেন, নতুন জীবন লাভ করেন তাঁর নিত্য ধামে ফিরে যান। তাঁর ভয়ের কি কারণ ?
বাস্তবিকই গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়টি মনযোগ সহকারে পড়লে যেকোনও প্রকৃত বুদ্ধিমান মানুষ উপলদ্ধি করতে পারে যে, মৃত্যর কোনও ভয় নেই–কোনও জীবাত্মার মৃত্যু হয় না। হরে কৃষ্ণ!

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকা এপ্রিল ২০১১ সালে প্রকাশিত

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।