ব্রহ্মসংহিতা

প্রকাশ: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১২:৫১ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৩ | ১০:১১ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 101 বার দেখা হয়েছে

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্ ॥১॥

সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ গোবিন্দ কৃষ্ণই পরমেশ্বর। তিনি অনাদি, সকলেরই আদি এবং সকল কারণের কারণ।
ঈশ্বর পরমঃ কৃষ্ণঃ- শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর। ভগবানের অসংখ্য অবতার আছে। সেই অবতারদেরও ঈশ্বর বা ভগবান বলা হয়। কিন্তু সমস্ত ঈশ্বরের ঈশ্বর বা পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। সমস্ত অবতারদের উৎস বা অবতারী হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। নিত্য নাম, নিত্য রূপ, নিত্য গুণ ও নিত্য লীলা বিশিষ্ট শ্রীকৃষ্ণই সর্বোপরি বিরাজমান পরম তত্ত্ব। ঈশ্বর পরমঃ পরমেশ্বর। তাঁর নাম কৃষ্ণ। তিনি সবাইকেই আকর্ষণ করেন। সর্বাকর্ষক। ‘কৃষ্ণ’ নামটি তাঁর প্রেমাকর্ষণ লক্ষণ সমন্বিত নিত্য নাম। “ঈশ্বর পরমঃ কৃষ্ণঃ”। অসংখ্য অবতার থাকলেও পরম ঈশ্বর হচ্ছেন কৃষ্ণ, যাঁর থেকে সমস্ত অবতার উৎপত্তি হয়েছেন।
সচ্চিদানন্দ বিগ্রহঃ-সৎ-চিৎ-আনন্দময় দ্বিভূজ শ্যামসুন্দর মুরলীধর রূপই তাঁর নিত্য রূপ। তাঁর রূপটি চিরন্তন। ক্ষণিকের জন্য নয়। সৎ বা নিত্য রূপ। কোনও জড় জাগতিক রূপ নয়। চিন্ময় রূপ। জ্ঞানময় রূপ। চিৎ বা জ্ঞানময়। তিনি কোনও বিমর্ষ বা দুঃখী রূপে প্রকাশিত নন। তিনি নিরানন্দময় নন। আনন্দময়। সচ্চিদানন্দ বিগ্রহঃ। আমরা যেমন চিৎকণা আত্মা যেটি দেখা যায় না। আমরা যে স্থুল দেহটি ধারণ করেছি সেটি জড় এবং অনিত্য। আমাদের যে সূক্ষ্ম দেহ বা মন-বুদ্ধি-অহংকার যুক্ত দেহটি রয়েছে, তা হর্ষ বিমর্ষ দুঃখ সমন্বিত। আমাদের নাম, আমাদের দেহের রূপ ও আমাদের আত্মার রূপ আলাদা কিন্তু কৃষ্ণের দেহ ও আত্মা এক। সর্বানন্দময়। যারা নির্বিশেষবাদী, তারা বলে যে, ভগবানের কোনও রূপ নেই, আকার নেই। তা ব্রহ্মজ্যোতি মাত্র। বলা হয়, সেই ব্রহ্মজ্যোতি হচ্ছে রূপময় শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গপ্রভা মাত্র।
অনাদিরাদিঃ-  তিনি অনাদি, সকলেরই আদি, তিনি গোবিন্দ। কৃষ্ণ স্বয়ংরূপে অনাদি। যখন কিছুই ছিল না, তখন তিনিই ছিলেন। যখন কিছুই থাকবে না, তখন তিনিই থাকবেন। কৃষ্ণ অনাদি। তাঁর থেকেই সবকিছু উৎপত্তি। অহং সর্বস্য প্রভবঃ, (গীতা)। যখন কিছুই  ছিল না, তখন তিনি ছিলেন। তাই তিনি অনাদি। সব কিছুরই আদি আছে, অন্ত আছে। কিন্তু কৃষ্ণের আদি বা অন্ত নেই। তাই কৃষ্ণ অনাদি ও অনন্ত। কৃষ্ণ আদি রহিত, অনাদি। ব্রহ্মজ্যোতি এবং পরমাত্মা যাঁর থেকে উৎপত্তি তিনি সবার আদি স্বয়ংরূপে অনাদি এবং তিনি ব্রহ্মজ্যোতি ও পরমাত্মার আদি। অনাদিরাদিঃ। গোবিন্দঃ তিনি গোবিন্দ। গো-অর্থে জ্ঞান, ইন্দ্রিয়, গাভী, জগৎ বোঝায় এবং বিন্দ-অর্থে সমন্বিত, আনন্দ, তুষ্টিসাধন ও পালন বোঝায়। তিনি সমস্ত জ্ঞান সমন্বিত, সর্ব ইন্দ্রিয়ের আনন্দ স্বরূপ, সুরভী আদি গাভীদের পালনকর্তা, জগতের পোষণ কর্তা। তিনি লীলা লক্ষণ লক্ষিত, গোপতি, গোপপতি, গোপীপতি, গোকুলপতি ও গোলোকপতি গোবিন্দ। আমাদের একাদশ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সেব্য অভিধেয় অধিদেব গোবিন্দ।
সর্বকারণ কারণম্ঃ– তিনি সমস্ত কারণেরও কারণ। সমগ্র জগতের মূল হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। আমরা কিছু করতে চাই, কিছু পেতে চাই। তার কারণ কি? কারণ হলো আমাদের কিছু অভাব আছে, যা পেলে সুখী হবো। কিন্তু ভগবানের অভাব নেই। তিনি ভাবময় ব্যক্তিত্ব। তিনি চান ‘বহু স্যাম্ ভব’ আমি নিজেকে বিস্তার করব এবং আমার ইচ্ছা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাব অনুসারে চলবে, আমাকে সমাদর করবে, কিংবা নিজ নিজ ইচ্ছায় আমাকে সমাদর না করেও চলতে পারে। কৃষ্ণ যে সর্বকারণের মহান স্রষ্টা কারণোদকশায়ী ভগবানেরও কারণ, সেই কথা মাতা দেবকী কৃষ্ণের স্তব করে বলছেন-
যস্যাংশাংশাংশভাগেন বিশ্বোৎপত্তিলয়োদয়াঃ।
ভবন্তি কিল বিশ্বাত্মংস্তং ত্বাদ্যাহং গতিং গতা॥ 
হে আদিপুরুষ (আদ্য), নিখিল-অন্তর্যামী (বিশ্বাত্মা), যাঁর অংশ হচ্ছেন মহাবিষ্ণু (যস্যাংশ), তাঁর অংশ হচ্ছেন প্রকৃতি বা মায়া, মায়ার অংশ পরমাণু (যস্যাংশাংশাংশ ভাগেন) দ্বারা এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার ক্রিয়া (বিশ্বোৎপত্তিলয়োদয়াঃ) সাধিত হয় (ভবন্তি), হে পরমেশ্বর সেই আপনাকে আমি আশ্রয় করেছি (ত্বাং গতিং গতা)।

চিন্তামণিপ্রকরসদ্মসু কল্পবৃক্ষ-
লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম্।
লক্ষ্মীসহস্রশসন্ত্রমসেব্যমানং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥২৯॥

লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষে আবৃত, চিন্তামণি দ্বারা গঠিত গৃহ সমূহে সুরভী বা কামধেনুদেরকে যিনি পালন করছেন এবং শতসহস্র লক্ষ্মীগণ কর্তৃক যিনি সাদরে পরিসেবিত হচ্ছেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।
চিন্তামণি প্রকরসদ্মসু- গোলোক ধামের গৃহগুলি চিন্ময় রত্ন দিয়ে গঠিত। চিন্তামণি হচ্ছে অভীষ্ট ফলপ্রদ রত্ন বিশেষ। যা যেরকম চিন্তা করা হবে সেই মণি সেইরকম অভীষ্ট পূরণ করবে। মায়াশক্তি যেরকম জড় পঞ্চভূত (মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ) দিয়ে জড় জগৎ গঠন করেন, চিৎশক্তি সেইরকম চিন্তামণি দিয়ে চিজগৎ রচনা করেন। গোলোকে ভগবানের আবাস যে চিন্তামণি দিয়ে গঠিত, সাধারণ চিন্তামণি অপেক্ষা সেই চিন্তামণি অধিকতর দুর্লভ ও উপাদেয়। জড়জগতে ঘর বানাতে হলে উপযুক্ত জড় উপাদান লাগবে। ভালো মিস্ত্রী লাগবে। যন্ত্রপাতি লাগবে। সময় লাগবে। অর্থকড়ি লাগবে। তবুও মনের মতো গৃহ না তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ভগবদ্ধামে চিন্তন মাত্রই মনোরম অসংখ্য গৃহ প্রকাশিত হয়ে থাকে। কল্পবৃক্ষ লঙ্কাবৃতেষু- গোলোকের মনোরম গৃহগুলো লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষে ঘেরা। সাধারণ কল্পবৃক্ষ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ রূপ ফল প্রদান করে। আর, শ্রীকৃষ্ণের আবাসে কল্পবৃক্ষগণ প্রেমবৈচিত্র্য রূপ অনন্ত ফল দিয়ে থাকেন।
সুরভীরভিপালয়ন্তম- কামধেনুগণকে কৃষ্ণ সর্বতোভাবে পালন করছেন। সাধারণ কামধেনুগণ দোহন করা মাত্র প্রচুর দুধ দেয়। আর, গোলোকের কামধেনুগণ শুদ্ধ ভক্তজীবদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণের জন্য চিদানন্দ স্রাবী দুধ-সমুদ্র সর্বদা ক্ষরণ করে। সেই দুধ পান করা মাত্র হৃদয়ে প্রেমানন্দ উথলে ওঠে।

সিদ্ধান্ত-শাস্ত্র নাহি ব্রহ্মসংহিতার সম।
গোবিন্দমহিমা জ্ঞানের পরম কারণ॥
অল্পাক্ষরে কহে সিদ্ধান্ত অপার।
সকল বৈষ্ণবশাস্ত্র মধ্যে অতি সার॥

(চৈ.চ. মধ্য ৯/ ২৩৯-২৪০)
ব্রহ্মসংহিতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র

গ্রন্থ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্রহ্মসংহিতার পঞ্চম অধ্যায় আদি কেশব মন্দির থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। এই পঞ্চম অধ্যায়ে অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে। এই অধ্যায়ে ভগবদ্ভক্তির পন্থা, অষ্টাদশাক্ষর মন্ত্র, আত্মা, পরমাত্মা, সকাম কর্ম, কামগায়ত্রী, কামবীজ, কারণোদকশায়ী বিষ্ণু, কৃষ্ণধামের চিৎবৈশিষ্ট্য, গণেশ, গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু, গায়ত্রীর উৎপত্তি, গোকুল, গোবিন্দের রূপ, স্বরূপতত্ত্ব ও ধাম, জীবতত্ত্ব, জীবের প্রাপ্য স্বরূপ, দুর্গা, তপঃ, পঞ্চভূত, প্রেম, ব্রহ্ম, ব্রহ্মার দীক্ষা, ভক্তিচক্ষু, ভক্তিসোপান, মন, মহাবিষ্ণু, যোগনিদ্রা, রমা, রাগমার্গীয় ভক্তি, রাম প্রভৃতি অবতার, শ্রীবিগ্রহ, বদ্ধজীব, তার সাধন, বিষ্ণুতত্ত্ব, বেদসার স্তব, শম্ভু, বৈদিক শাস্ত্র, স্বকীয়, পরকীয়, সদাচার, সূর্য ও হৈমাণ্ড প্রভৃতি বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে।
লক্ষ্মীসহস্রশতসন্ত্রমসেব্যমানংÑ অসংখ্য লক্ষ্মী অর্থাৎ গোপীগণ কর্তৃক সম্ভ্রম বা যত্ন সহকারে কৃষ্ণ পরিসেবিত হচ্ছেন। শতসহস্র লক্ষ্মী বলতে বোঝায় অসংখ্য গোপসুন্দরী। তাঁরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে শ্রীগোবিন্দের সেবা করছেন। সম্ভ্রম বলতে বোঝায় সাদরে বা প্রেমে আপ্লুত হয়ে। লক্ষ্মী-শব্দে বোঝায় গোপসুন্দরী।
গোবিন্দমাদিপুরুষংÑ আদিপুরুষ গোবিন্দ। আদিপুরুষ বলতে যিনি সকলেরই আদি ব্যক্তিত্ব গোবিন্দ।
তমহং ভজামিÑ তাঁকে আমি ভজনা করি। সৃষ্টির প্রথম জীব ব্রহ্মা। তিনি শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করছেন। কৃষ্ণের অংশ মহাবিষ্ণু, তাঁর অংশ গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু। তাঁর নাভিপদ্ম থেকে ব্রহ্মার জন্ম। ব্রহ্মা কর্তৃক শ্রীগোবিন্দের সুন্দর বন্দনা শ্রীশ্রীব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষিণভারত পর্যটনকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই প্রাচীন শাস্ত্র আবিষ্কার করেন। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মধ্যলীলা নবম পরিচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের পয়স্বিনী নদীতে স্নান করে তীরবর্তী মন্দিরে আদি কেশবকে দর্শন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রেমাবিষ্ট হলেন। সেই মন্দিরে ভক্তদের সঙ্গে ভগবৎ তত্ত্ব আলোচনা করলেন এবং সেখানেই তিনি ব্রহ্মসংহিতা গ্রন্থটি পেয়েছিলেন।


জানুয়ারি-২০২৩ প্রকাশিত

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।