দণ্ড মহোৎসবের রহস্য

0
41

শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ

পারমার্থিক জগতের দণ্ড হচ্ছে একপ্রকার কৃপাস্বরূপ এবং ভগবানের সেবা করা সর্বদাই মঙ্গলময় ফল আনয়ন করে।


ভারতীয় উৎসবের সময় অনুযায়ী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহান্তে আটলান্টাতে এই উৎসবটি পালিত হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে নিউইয়র্ক রথযাত্রা আছে। তারপরে সেখানে অন্যান্য আরও অনুষ্ঠান আছে। আমাদের এখানকার চিড়া-দধি মহোৎসবের তারিখটি প্রকৃত তিথি থেকে ভিন্ন। আমরা ভগবানকে প্রার্থনা করি তাঁরা যেন কৃপাপূর্বক এই দিনে আমাদের নিউ-পানিহাটি উৎসবটি স্বীকার করেন। অস্ট্রেলিয়াতে ভক্তরা এই উৎসবটি ডিসেম্বর মাসে পালন করে থাকেন কারণ তখন তাদের ওখানে গ্রীষ্মকাল। লন্ডনেও তারা এটি জুন মাসে পালন করে থাকেন।

“নিকটে না আইস, চোরা, ভাগ’ দূরে দূরে।
আজি লাগ্ পাঞাছি, দণ্ডিমু তোমারে॥”

চৈ.চ.অন্ত: ৬/৫০

“তুই ঠিক একটা চোরের মতো, আমার কাছে না এসে দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াস্। আজ আমি তোর নাগাল পেয়েছি, তাই আমি তোকে দণ্ড দেব।”
এই উৎসবের অপর একটি নাম হচ্ছে ‘দণ্ড-মহোৎসব’। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীকে তাঁর শাস্তি প্রদান করেছিলেন। রঘুনাথ দাস গোস্বামী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পুনরাবৃত্ত অনুষ্ঠানগুলিতে যোগদান করতে চেষ্টা করতেন, এমনকি তিনি যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সাক্ষাৎ দর্শন করতে গিয়েছিলেন তখন তাঁকে বলা হয়েছিল তিনি যেন অবশ্যই তাঁর আশ্রমেই অবস্থান করেন এবং আন্তরিকভাবে ভগবানের বিরহ অনুভব করেন। ‘ঠিক যেমন প্রাচীন কালে যদি একজন মহিলার নিজের স্বামী ছাড়াও অন্য একজন প্রেমিক থাকত এবং সে তা খুবই গোপন রাখত এবং কাউকে তা জানতে না দিয়ে সে নিখুঁতভাবে গৃহস্থলীর সমস্ত কাজ করত। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে পরামর্শ প্রদান করলেন যে তিনি যেন ঠিক তেমন ভাবেই জড়জাগতিক ক্রিয়াকলাপগুলি সম্পাদন করেন, কিন্তু নিজের মনকে যেন সর্বদা কৃষ্ণের প্রতি নিযুক্ত রাখেন।
অতএব আমরা জানি যে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমীপবর্তী হতে গেলে আমাদের শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীর কৃপা লাভের প্রয়োজন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা পেলেন ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে যোগদান করতে সমর্থ হলেন না। এইবার তিনি শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর নিকটে এলেন, তিনি তাঁকে অসাধারণ উজ্জ্বল কান্তি নিয়ে পানিহাটিতে একটি বট বৃক্ষের তলায় ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবগণের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে উপবিষ্ট থাকতে দেখলেন।
রঘুনাথ দাস গোস্বামী দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করলেন, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর সচিবদের মধ্যে একজন সেটি লক্ষ্য করলেন। তখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু উপরোক্ত মন্তব্যটি করলেন যে, তিনি একটি চোরের মতো নিজেকে সবসময় দূরে রাখেন, অন্য কথায় তিনি এটি বলতে চাইলেন যে, রঘুনাথ দাস গোস্বামী কোন গুরুদেবের মাধ্যম বা শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে না গিয়ে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা চুরি করতে চেষ্টা করছিলেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হলেন আদি গুরু, তাঁর প্রতিটি প্রচেষ্টায় রঘুনাথ দাস গোস্বামী ব্যর্থ হচ্ছিলেন। তাই শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “আমি তোকে দণ্ড দিতে চলেছি” আর সেই দণ্ডটি ছিল এক মহত্তম কৃপা কারণ, সেই দণ্ডের দ্বারা তিনি ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
“পারমার্থিক জগতে দণ্ড হচ্ছে একপ্রকার কৃপাস্বরূপ এবং ভগবানের সেবা করা সর্বদাই মঙ্গলময় ফল প্রদান করে। সুতরাং এইভাবে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে দণ্ড বা শাস্তি প্রদান করলেন- শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-অন্ত লীলা ৬/৫১

দধি, চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।
শুনি আনন্দিত হইল রঘুনাথ মনে॥

আজ তোকে আমার নিজ জনদের দধি চিড়া খাওয়াতে হবে। সেই কথা শুনে রঘুনাথ দাস অত্যন্ত আনন্দিত হলেন।
দণ্ডটি হলো এই যে, তোকে আমার সহচরদের চিড়া দধি এবং ফল-ফলাদি ভোজন করাতে হবে। এইভাবে শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী খুবই খুশি হলেন। গত রাত্রে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, তাঁর পরিবারটি ছিল আরবপতি। তাঁর কাকা এক কোটি কুড়ি লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা কর প্রদান করতেন। তা হলে এবার আপনারা হিসাব করে দেখুন যে একটি স্বর্ণ মুদ্রা কত দামী এবং তিনি কর প্রদানের জন্য আরও অর্থ উপার্জন করেছিলেন। সুতরাং তাঁর পক্ষে একটি ফলভোজন অনুষ্ঠান করাটি কোন বড় ব্যাপার নয়। আমরা কেবল শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীকে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সেবা প্রদান করার লীলাতে সহযোগিতা করছি মাত্র। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বলেছিলেন যে তাঁর কাছে চিড়া-দধির সাতটি ভান্ড আছে। আমরা ৮০টি ভান্ড প্রদান করছি কারণ, আমরা হচ্ছি অধিক পতিত। সেই সংবাদ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল যে, সেখানে একটি মহোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সমস্ত ব্রাহ্মণ এবং বৈষ্ণবগণ সেই অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন।


আমরা কিছু অপরাধ করেছি। তাই রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে এই “দণ্ড মহোৎসব” উদ্‌যাপন করতে সহযোগিতা করার দ্বারা আশাকরি আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। রঘুনাথ দাস গোস্বামী হলেন ষড় গোস্বামীদের মধ্যে একজন উচ্চস্তরের ভক্ত এবং তিনি ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা লাভ করেছিলেন। অতএব এখন আমরা তাঁর সেবা করছি।


এইভাবে শ্রীনিত্যান্দ প্রভুর গোচারণ ক্ষেত্রে তাদের সকলকে গ্রহণ করা হয়েছিল। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “আমি একজন রাখাল বালক, আমি বনের মধ্যে পুলিনভোজন করতে চাই।” শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, তিনি কৃষ্ণের লীলাস্থলী সৃষ্টি করবেন। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-অন্তলীলা ৬/৭৩-৭৫

প্রভুরে কহে, -“তোমা লাগি’ ভোগ লাগাইল।
তুমি ইঁহা উৎসব কর, ঘরে প্রসাদ রহিল।”

রাঘব পণ্ডিত শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে বললেন, “তোমার জন্য আমি আমার গৃহে ভোগ নিবেদন করেছি, আর তুমি এখানে উৎসব করছ, আর এদিকে আমার ঘরে প্রসাদ রয়েছে।”

প্রভু কহে,-“এ-দ্রব্য দিনে করিয়ে ভোজন।
রাত্রে তোমার ঘরে প্রসাদ করিমু ভক্ষণ॥

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু উত্তর দিলেন, “এইসব দ্রব্য আমি দিনের বেলায় ভোজন করব, আর রাত্রে তোমার ঘরে প্রসাদ ভক্ষণ করব।

গোপ জাতি আমি বহু গোপগণ সঙ্গে।
আমি সুখ পাই এই পুলিনভোজন-রঙ্গে॥

“জাতিতে আমি গোপ এবং তাই গোপদের সঙ্গে নিয়ে এইভাবে নদীর তীরে পুলিনভোজন করতে আমার খুব আনন্দ হয়।”
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁর শ্রীবৃন্দাবন ধামে লীলা স্মরণ করছেন। আমরা সকলে জানি যে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হলেন স্বয়ং বলরাম।

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য রাধা-কৃষ্ণ নহে অন্য
বলরাম হইল নিতাই।

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু পরোক্ষভাবে বলরাম রূপে তাঁর পরিচয় এবং ব্রজবাসী রাখাল বালকদের জন্য তাঁর মমতা প্রকাশ করছিলেন। সেখানে বৃন্দাবনে তিনি বালুকাময় যমুনা নদীর তীরে ছিলেন আর এখানে নবদ্বীপে তিনি গঙ্গা নদীর তীরে ছিলেন। তিনি বললেন, “আজ দিনের বেলায় আমাকে এই প্রসাদ পেতে দাও এবং রাত্রিতে আমি তোমার গৃহে গিয়ে প্রসাদ পাবো।” অতএব দিনের বেলায় আমাদের কাছে চিরাচরিতভাবে চিড়া দধির ব্যঞ্জন এবং বিভিন্ন ধরণের ফল-ফলাদি থাকে এবং যেহেতু পাশ্চাত্যের ভক্তরা স্যালাডের প্রতি খুবই অনুরক্ত তাই যথারীতি কিছু স্যালাড মিশ্রণ করা হয়েছে। আমরা কিছু অপরাধ করেছি। তাই রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে এই “দণ্ড মহোৎসব” উদ্‌যাপন করতে সহযোগিতা করার দ্বারা আশাকরি আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। রঘুনাথ দাস গোস্বামী হলেন ষড় গোস্বামীদের মধ্যে একজন উচ্চস্তরের ভক্ত এবং তিনি ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা লাভ করেছিলেন। অতএব এখন আমরা তাঁর সেবা করছি। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ভক্তবৃন্দের সাথে পুলিনভোজন করতে পছন্দ করেন- শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন তিনি বিভিন্ন লীলাভূমির নবরূপ দান করতে চান। এটি হচ্ছে ইস্‌কনের সাতটি উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি। তাই এই নিউ-পানিহাটিতে আমাদের কাছে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর লীলায় নিমগ্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভগবানের বিরহ লীলা তাঁর প্রকটিত লীলা থেকে অভিন্ন কারণ, এই সকল লীলা পরম পূর্ণ স্তরে অধিষ্ঠিত। আমরা যখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে সেবা করার ভাবে থাকি তখন আমরা সেখানে তাঁর সঙ্গেই অবস্থান করি।
এই ঘটনাটি আমাকে নদীয়ার শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈত গোঁসাইর গৃহে উদ্‌যাপিত শ্রীপাদ মাধবেন্দ্রপুরীর তিরোভাব তিথির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন যে, এই তিরোভাব তিথিতে যে ব্যক্তি এখানে প্রসাদ গ্রহণ করবে তারই শ্রীগোবিন্দের শুদ্ধ ভক্তি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে।
অতএব এই উৎসবের বিভিন্ন অংশে অভিনিবেশ করা, কীর্তন করা, প্রবচন শ্রবণ করা, শাক-সবজী ও ফল-ফলাদি অমান্য করে (দ্বিতীয় দীক্ষা প্রাপ্ত ভক্তরা) তা মিশ্রণ করা, সজ্জিত করা এবং ভোগ নিবেদন করা এবং পরিশেষে আপনাদের সেই প্রসাদ গ্রহণ করা প্রয়োজন কারণ, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁর ভক্তদের সাথে পুলিন ভোজন করতে চান। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু কতই না করুণাময়! স্বল্পক্ষণ এই চিন্তা করার মাধ্যমে, আমরা সেই বিশেষ কৃপার সামান্য কিছু অংশ লাভ করতে পারি। হৃদয়স্পর্শী উৎসবÑ শ্রীল প্রভুপাদ এখানে এসেছিলেন এবং আমাদেরকে ‘পানিহাটি’ উৎসব পালন করতে বলেছিলেন। তিনি এই স্থানটিকে “নিউ-পানিহাটি ধাম” (নব পানিহাটি ধাম) নামে আখ্যায়িত করেন, যাতে করে আমরা এই লীলাতে আরও বেশি করে নিমজ্জিত হতে এবং তা অনুভব করতে পারি।
অনেক উৎসব আসে এবং যায়, কিন্তু পানিহাটি উৎসবটি আপনাদের হৃদয়ে স্পর্শ করা উচিত। কোলকাতার নিকটবর্তী পানিহাটি উৎসবে প্রচুর জনসমাগম হয় এবং উৎসব প্রাঙ্গনটি লোকারণ্যে ভরে ওঠে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে আমি প্রথমবার সেখানে গিয়েছিলাম এবং কয়েক বছর পরেও আমি সেখানে গিয়েছি। এটি একটি প্রকাণ্ড ময়দান এবং সেখানে সহস্র মানুষের সমাগম হয়; কিন্তু একশত বছর পূর্বে সেই স্থানটিতে জনসমাগমের ক্ষমতা নিশ্চয়ই আরও অধিক ছিল। তখন সেখানে নিশ্চয়ই আরও বেশি লোক ধরত। যখন প্রথম বার সেখানে পানিহাটি উৎসবটি উদ্‌যাপিত হয়েছিল তখন লোকেরা জানত না যে তারা কোথায় দাঁড়াবে; তাই তারা গঙ্গার জলে নিমজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেউ বা গোড়ালি অবধি, কেউ বা হাটু অবধি, কেউ বা কোমর অবধি গভীর গঙ্গা নদীর জলে দাঁড়িয়েছিল। সম্পূর্ণ ময়দান এবং নদীর তীরের সমস্ত কিনারা এবং সর্বত্র লোকে লোকারণ্য ছিল এবং সেখানে কেবল একটিই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, “হরিবল! হরিবল! হরিবল! ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু কেবল মাত্র আমাদেরকে করুণা করার জন্য গোলোক ধাম থেকে আগমন করেছিলেন। কে যোগ্য বা কে অযোগ্য তিনি তা বিবেচনা করে থেমে যাননি। তাঁরা বিশ্বের সকলকেই তাঁদের কৃপা প্রদান করতে পারেন।

সুখের উৎস এবং একটি বাধা

সুখের উৎস হচ্ছে চারটি বিধি-নিষেধকে মেনে চলা। এগুলি ভঙ্গ করাটিই হচ্ছে পাপপূর্ণ। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অধিকাংশ পার্ষদ ছিলেন গৃহস্থ। একজন গৃহস্থ হয়ে স্বামী/স্ত্রী কোন প্রকারের পাপ বা অপকর্ম না করাটি হচ্ছে মঙ্গলজনক। তারাই হচ্ছে পাপী যারা বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে তাদের ভোগ্য বস্তু হিসাবে দেখে এবং সেটি হচ্ছে পারমার্থিক জীবনের একটি বাধা স্বরূপ। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন যে নিজের পত্নী ব্যতীত অন্যান্য সকল মহিলাদেরকে আমাদের মাতৃসম দেখা উচিত।

শিশুদের যত্ন নেওয়া মানে কৃষ্ণের প্রতি বাৎসল্য সেবা নিবেদন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে তিনি কাম যা বৈদিক নিয়মের বিরুদ্ধ নয়। আমরা বহু সুন্দর সুন্দর শিশুদের দেখি তারা সকলেই পিতামাতার ভালোবাসা এবং যত্ন পাওয়ার যোগ্য। মায়াপুরে সি.পি.টি (চাইল্ড প্রোটেকশন টিম) অর্থাৎ শিশু সুরক্ষা বাহিনী রয়েছে। তারা প্রতি মাসে তথ্যাবলী পায়। একজন ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলেছিলেন যে সেখানে সূক্ষ্ম নির্যাতন হয়। তিনি (স্ত্রী) বলেন যে, অভিভাবকরা ঠিক মতো তাদের শিশুদের যত্ন নিচ্ছেন না, এটি লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের গৃহস্থদের এটি বোঝা উচিত যে তাদের শিশুদের যত্ন নেওয়াটি কিন্তু মায়া নয়; সেটি হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাদের সেবা। এটি অন্য কিছু নয়। একটি শিশু যদি কৃষ্ণভাবনাময় হয় তবে তার চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার প্রাপ্ত হয়।

অপরিণত সন্ন্যাস নিন্দনীয়

রঘুনাথ দাস গোস্বামী ছিলেন এক প্রচুর ধনৈশ্বর্যের মালিকানার উত্তরাধিকারী কিন্তু তা সত্ত্বে তিনি ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের প্রতি আসক্ত ছিলেন। তিনি ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে সময় অতিবাহিত করতে চাইতেন। কতই না বিশেষ সুযোগ! সাধারণভাবে, যদি না স্ত্রীর লিখিত অনুমতি থাকে তা হলে আমরা কাউকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিই না, কিন্তু আমি এইমাত্র শুনলাম যে, কারও একজন পত্নী খুবই ভীত হয়ে পড়েছেন একথা ভেবে যে, “আমার স্বামী হয়তো
যে কোনো সময় সন্ন্যাস গ্রহণ করতে পারে।”
ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অনুগামীদের ‘হরেকৃষ্ণ’ মহামন্ত্র কীর্তন করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে অকস্মাৎ তাদের আশ্রম পরিবর্তন করতে অনুপ্রাণিত করতেন না। এই প্রকারের কার্যপ্রণালী ‘মর্কট বৈরাগ্য’ ছাড়া কোন অংশে কম নয়। মর্কটদের খুব ত্যাগী বলে মনে হয় কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে মহা ইন্দ্রিয় ভোগী হয়। তাই অকস্মাৎ নিজের আশ্রম ত্যাগ করাটি ঠিক বাঁদরের বৈরাগ্যের মতো।
সেবা আমাদের আদর্শ, রন্ধনশালা বা কীর্তনের যে কোন সেবায় নিয়োজিত হোন! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু “পানিহাটি” উৎসব করেছিলেন। তাতে কোন বাচ বিচার নেই, কেউ গৃহস্থ অথবা ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসী যাই হোক না কেন। অধিকাংশ মানুষই বিবাহিত ছিলেন। কিন্তু তারা সর্বদাই হরিবল বলে কীর্তন করতেন এবং কৃষ্ণপ্রসাদ ভোজন করতেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা লাভ করার জন্য তারা কতই না পুণ্যকর্ম সম্পাদন করেছিলেন! আমি মনে করছিলাম যে আমরা শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করিনি। কিন্তু তখন তাঁরা ভবিষৎবাণী করেছিলেন যে তাঁরা একজন ভক্তকে প্রেরণ করবেন যিনি সমগ্র বিশ্বে তাঁদের বাণী প্রচার করবেন সেটি পুরাণেও উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ আগমন করলেন এবং আমাদেরকে এই হরিনাম এবং নিত্য লীলাসমূহ প্রদান করার জন্য কতই না তপশ্চর্যা করলেন। আমাদের হয়তো শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু বা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাতে তাঁদের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য নেই। যেভাবেই হোক, আমাদের কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণাবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের সান্নিধ্য লাভের সেই পবিত্র সুযোগ রয়েছে। আমাদের সেবা রন্ধনশালায় হোক, কীর্তন করায় হোক বা গ্রন্থ প্রচারের হোক, আমাদের আদর্শ হলো সেবা প্রদান করা।
লেখক পরিচিতি: শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী শ্রীল প্রভুপাদের একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী শিষ্য এবং তিনি ইস্‌কন দীক্ষাগুরু। বর্তমানে তিনি ইস্‌কন গভর্নিং বডির কমিশনার এবং তৎসহ ইস্‌কন-এর মায়াপুর, পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক প্রধান কার্যালয়ের সহ-নির্দেশক। তিনি মাত্র ১৯ বৎসর বয়সে ইস্‌কনে যোগদান করেন এবং বিগত ৫০ বৎসর ধরে সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রচার করছেন, অগণিত মানুষকে মার্গ প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি ব্রহ্মমধ্ব গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের সবচেয়ে প্রবীণতম সন্ন্যাসী যিনি ৫০ বছর সন্ন্যাস জীবনে গুরু গৌরাঙ্গের সেবায় রত ছিলেন।


 

এপ্রিল-জুন ২০২২ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here