এই পোস্টটি 11 বার দেখা হয়েছে
এক দর্শনার্থীকে মন্দিরে প্রায়ই আসার আমন্ত্রণ জানালে, সেই দর্শনার্থী প্রত্যুত্তরে বলেন, “গৃহই একটি মন্দির, সবার হৃদয়েও ভগবান রয়েছে। সুতরাং যে কোন পরিস্থিতিতে যে কোন স্থানে ভগবানকে ভক্তি ভরে ডাকলেই তিনি শোনেন। এখানে মন্দিরে আসার কোন প্রয়োজন পড়ে না……” নিম্নের প্রতিবেদনটি যথারীতি ব্যাক-টু-গডহেডের সহায়তায় প্রকাশিত হল। প্রতিবেদনটি মূলত দু’জন ব্যক্তির মধ্যে কথোপকথন। বিষয়বস্তু, ঐ দর্শনার্থীর উক্তির যথার্থতা কতটুকু তা পর্যালোচনা করা, অর্থাৎ, কেন মন্দির প্রয়োজন?
দর্শনার্থী, রঞ্জন গুপ্ত: প্রণাম, স্বামিজী (ইসকন মন্দিরে বিগ্রহ দর্শনের পর)
সনাতন স্বামী: হরে কৃষ্ণ, গুপ্তজী। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ আপনার উপর বর্ষিত হোক। আপনি অনেক ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের মন্দিরে এসেছেন সেজন্যে আমরা খুবই খুশি। ভগবানকে দর্শন করেছেন?
মি: গুপ্ত: হ্যাঁ, ভগবানকে এত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে! শুনেছি আপনি একটি নতুন মন্দির তৈরি করছেন।
স. স্বামী: হ্যাঁ কৃষ্ণের ইচ্ছা। মন্দিরটি দু’বছরের মধ্যেই গড়ে উঠবে, যদি ঠিক সময়ে অর্থ বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চলে আসে।
মি. গুপ্ত: আমার মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়। আমি কি সেটি জিজ্ঞেস করতে পারি ।
স. স্বামী: অবশ্যই।
মি. শুরু: এত অর্থ দিয়ে মন্দির তৈরি করার কি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? আমাদের চারপাশে অনেক অনেক লোক অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থানের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। এত অর্থ দিয়ে মন্দির তৈরি না করে ঐসব দরিদ্রদের সাহায্য করাটা কি জরুরী নয়?
স. স্বামী আমি Temple শব্দটিকে বিশ্লেষনের মাধ্যমে কিভাবে এটি সামাজিক সেবা কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখে তা বর্ণনা করব।
T Tranquility (প্রশান্তি), E Education (শিক্ষা), M- Meditation (ধ্যান), P-Puritication (শুদ্ধতা), L-Love (ভালবাসা), E Engagement (সেবায় নিযুক্ত হওয়া)
মি. গুপ্ত: বিশ্লেষণটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। স. জামী, দেহের মৌলিক চাহিদাগুলি হল খাদ্য, বস্তু এবং বাসস্থান এবং শান্তি হল মনের মৌলিক চাহিদা।
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা মনের ঐ মৌলিক চাহিদা সমাধানে ব্যর্থ। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে সাম্প্রতিক শতাব্দির সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল চ্যালেঞ্জ এইডস্ বা ক্যান্সার নয় বরং মানসিক সুস্বাস্থ্য সমস্যা। মন্দির হল সেরকম কিছু স্থান যেখানে অবস্থানের মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি গভীর মানসিক প্রশান্তি অনুভূত হয়।
মি. গুপ্ত (গভীর মনোযোগ সহকারে): যখন আমি মন্দিরে প্রবেশ করি তখন আমি অবাক হই যে, শহরের ব্যস্ততম গণ্ডগোল অশান্তির মধ্যেও, মন্দিরে কেমন জানি এক স্বর্গীয় শাস্তি অনুভূত হয়। কোথেকে এই প্রশান্তির আগমন ঘটে?
স. স্বামী: এই প্রশান্তি হল দিব্য তরঙ্গের ফলাফল যা মন্দিরে ক্রমাগতই অনুপ্রবেশ ঘটে। এই দিব্য তরঙ্গের আগমন ঘটে বিগ্রহরূপে ভগবানের উপস্থিতির মাধ্যমে এবং সেই সাথে ক্রমাগত হরিনাম জপ কীর্তনের
মাধ্যমে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অনেক অনেক লোক মন্দিরে আসে গৃহে ফেরার পূর্বে নিজেদের মানসিক চাই অশান্তি দূরীভূত করার জন্য। তারা ভগবানকে দর্শন করে আরতিতে অংশগ্রহণ করে অথবা মন্দির হলে একটি চিন্ময় পরিবেশে পারমার্থিক আলোচনা করে। এভাবে তারা জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো মধ্যেও মানসিক প্রশান্তি অর্জন করে। শ্রীল প্রভুপাদ (ইসকন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য্য) চেয়েছিলেন যে, ইসকনের মন্দিরগুলো হবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে, যাতে করে অধিকাংশ লোকেরা মন্দির প্রদত্ত প্রশান্তি খুব সহজেই পেতে পারে।
মি. গুঞ্জ: মাকে মাঝে আমি আশ্চর্য হই যে, মনের প্রশান্তি একটাই রাজকীয় যে, আমাদের অনেক কর্তব্য সম্পাদন করতে হয় পরিবারে, অফিস এবং সমাজের জন্য।
স. স্বামী: মনের প্রশান্তি রাজকীয় নয়, কিন্তু যেটি প্রয়োজন সেটি হল আমাদের কর্তব্যগুলো ভালোভাবে সম্পাদন করা। কয়েক মিনিট পর্যন্ত একটি ৫ কেজি ওজনের ভার উত্তোলন করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু যদি সেটি জীবনের অবশিষ্ট সময় ক্রমাগত উত্তোলন করা হয় তখন এটি বোঝা হয়, একটি অসহনীয় বোঝা। আমাদের বাহু পেশীগুলো কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিতে হবে এবং যার ফলে শক্তি সঞ্চিত হয়। অনুরূপে আমাদের কর্তব্যগুলো এবং তাদের সাথে আগত উদ্বিগ্নতা হল আমাদের মনের উপর বোঝাস্বরূপ। যদি এসমস্ত বোঝাগুলিকে আমাদের মনে ক্রমান্বয়ে ধারণ করি তখন সেগুলো মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।
সেজন্যে আমাদের সংক্ষিপ্ত বিরতি দেয়া প্রয়োজন যার মাধ্যমে আমাদের মন প্রয়োজনীয় বিশ্রাম গ্রহনের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
লোকেরা এই বিরতি টেলিভিশন এবং মুভি দেখে বিনোদনের মাধ্যমে অতিবাহিত করে। বিনোদন হয়ত মাঝে মাঝে আমাদের সতেজতা দেয়, কিন্তু প্রায়ই এসব বিনোদন ভাবনা, বাসনা এবং স্মৃতিকে বিচলিত করে। অপরদিকে, যখন আমরা মন্দিরে আসি, তখন আমরা মন্দিরের চিন্ময় পরিবেশের মাধ্যমে মানকিক বোঝা বা সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারি। এভাবে যখন আমরা মানসিকভাবে বিশ্রাম এবং সতেজতা গ্রহন করি, তখন আমরা আমাদের কর্তব্যগুলো পুনরায় পূর্ণ শক্তি নিয়ে শুরু করতে পারি।
মি. গুপ্ত: আমার কখনো ধারণাতেও ছিল না যে মন্দির সমাজকে মানসিকভাবে প্রশান্তি রাখতে অবদান রাখছে।
স. স্বামী: আপনিই শুধু নন। ইসকনে যুক্ত হওয়ার আগে এ ধরনের ধারণা আমারও ছিল না। সেজন্যে আমাদের পারমার্থিক সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা উচিত। এরপরের অবদানটি হল ‘শিক্ষা’ অন্যান্য মন্দির সমূহ প্রদান করছে শুধুমাত্র একটি প্রশান্তিময় পরিবেশ, কিন্তু ইসকন মন্দিরগুলো বিশেষভাবে পারমার্থিক শিক্ষাও প্রদান করছে।
মি. গুপ্ত: পারমার্থিক শিক্ষা বিজ্ঞানের এই যুগে আমাদের কি সত্যিই এটি দরকার?
স. স্বামী: বিজ্ঞান আমাদের বলে কিভাবে বিষয় সম্পাদন করতে হয়। কিন্তু পারমার্থিকতা আমাদেরকে শেখায় কেন তা করতে হয়। যেমন- মেডিকেল কলেজ শিক্ষা দেয় কিভাবে একজন রোগীর আরোগ্য বিধান করতে হয় কিন্তু তারা শিক্ষা দেয় না কেন তাকে আরোগ্য বিধান করতে কিন্তু তারা শিক্ষা দেয় না কেন তাকে আরোগ্য বিধান করতে হবে। অনেক ডাক্তার তাদের রোগীদের দেখে অর্থ উপার্জনের মেশিন হিসেবে রোগীদেরকে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট এবং চিকিৎসা দিয়ে অধিক অর্থ উপার্জন করে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত লোকদের এই অবস্থা।
মি. গুপ্ত (প্রতিবাদসুলভভাবে): কিন্তু সেটি মানবিক ত্রুটি। এজন্যে শিক্ষাকে কেন দায়ী করা হবে?
স. স্বামী: প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল দক্ষতা দেওয়াই নয়, বরং তাদের নিম্ন মানবিক প্রবৃত্তিগুলোকেও পরিশুদ্ধ করা প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। কোন কিছু শেখা মানে শুধু আয় উপার্জনের জন্য নয় বরং সেবা করার জন্যও।
মি.গুপ্ত (চিন্তাশীলভাবে): সেবা?
স. স্বামী: হ্যাঁ ডাক্তারের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগীদের সেবা প্রদান করা তাদের রোগজনিত সমস্যা থেকে মুক্ত করা। একটু ভাবুন না, যদি সবাই একে অপরের ক্ষতি না করে সেবা করে তবে এই বিশ্বটা কেমন হবে। পারমার্থিক শিক্ষা বিশ্বে এ ধরনের সেবা সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে পারে।
মি. গুপ্ত: এ জন্য পারমার্থিক শিক্ষার কেন প্রয়োজন? আমাদের যেটি দরকার তা হল লোকেদের ভালো হতে এবং অন্যদের ভালো করতে সাহায্য করা। এটুকুইতো যথেষ্ট।
স. স্বামী: পারমার্থিক শিক্ষা ছাড়া, অধিকাংশ লোকেরা না ভাল থাকতে সমর্থ হবে না দীর্ঘ সময় ধরে ভালো থাকতে পারবে। তারা শীঘ্রই একটি অনৈতিক, ধ্বংসাত্মক মানসিকতার শিকার হতে পারে।
মি. গুপ্ত: কেন?
স. স্বামী: নৈতিক আদর্শের মাধ্যমে ভালো হওয়া এবং ভালো কাজ করা অথবা ভালো জীবন যাপন করা অনেকটা নিরাপদ ও সুন্দর ভ্রমণের জন্য ট্রাফিক আইন অনুসরণের মত। ভ্রমনের উদ্দেশ্যে শুধু ট্রাফিক আইন মেনে চলা নয় বরঞ্চ গন্তব্যে ঠিকভাবে পৌঁছতেও হবে। যদি ভ্রমণকারী মনে করে যে, ট্রাফিক আইন গন্তব্যে পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং এখন কোন পুলিশও নেই তবে সে শীঘ্রই সে আইনগুলো ভেঙে ফেলতে প্ররোচিত হবে। ট্রাফিক আইনগুলোর মত কিছু নৈতিক আদর্শগুলো সমাজে যদিও রয়েছে কিন্তু আধুনিক শিক্ষা আমাদেরকে জীবনের লক্ষ্য অথবা সামাজিক কর্তব্যগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষা দেয় না। তাই অধিকাংশ লোকেরা সম্পদ, সম্মান, শক্তি, অবস্থান ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য বাছাই করে নেয়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা একসময় এমারসন, আইনস্টাইন, গান্ধী এবং বিশ্বের অনেক
চিন্তাবিদদের একমাত্র পাঠ্যবস্তু ছিল, সেই ভ. গীতায় জড়জগতের এসব দুরবস্থার কথা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, সুতরাং জীবনের উদ্দেশ্য যদি অন্য কিছু থাকে (সম্মান, শক্তি …….) তবে এক্ষেত্রে নৈতিক আদর্শগুলোর ব্যবহার অনেক সময় অচল হয়ে যায়।
মি. গুপ্ত: হ্যাঁ, নৈতিকতা স্থায়ী হয় না, আমার ৩০ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি অনেক নীতিবান মানুষ এক সময় অনৈতিকতায় জড়িয়ে গেছে।
স. স্বামী: বৈদিক শাস্ত্র ব্যাখ্যা করছে যে, ভগবানকে ভালোবাসাই আমাদের পরম লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিভিন্ন ধর্মে এ শিক্ষাই দেয়া হচ্ছে।
মি. গুপ্ত: কিন্তু ভগবানকে ভালোবাসাই যদি পরম লক্ষ্য হয়ে থাকে তবে কিভাবে এটি নৈতিকতা শিক্ষা দেয়?
স. স্বামী: এটা ঠিক একটি ঘরের মাষ্টার সুইচ অন করার মত। যেটির কারণে ঘরের সমস্ত আলো জ্বলে উঠবে। অনুরূপভাবে যদি ভগবানকে ভালোবাসা হয় তবে আপনাআপনিই সমস্ত জীবের প্রতি ভালোবাসতে শিখব। তখন এই বিশ্বের প্রতিটি জীবকে ভগবানকে কেন্দ্রে রেখে একটি পরিবার হিসেবে উপলব্ধি করতে পারব। তখন প্রকৃত নৈতিকতা আপনা আপনিই উত্থিত হবে। আমাদের কাছ থেকে স্বার্থপর মনোবৃত্তি, কামুক প্রবৃত্তি, লোভ এবং হিংসা ইত্যাদি দূরীভূত হবে এই হল পারমার্থিক শিক্ষার সুফল যা একে অপরের প্রতি সেবা সংস্কৃতির দিকে পরিচালিত করে। আমাদের মন্দিরগুলো সেটিই প্রদান করছে।
মি. গুপ্ত (অনেকক্ষণ ভাবার পর): আচ্ছা, আমার এখনও মনে পরে পূবে আমার দাদা দাদিরা তাদের ঘরের দরজা খোলা রেখে কোথাও চলে গেলেও কেউই কোন কিছু চুরি করত না। এখন বুঝতে পারছি সেটি কিভাবে সম্ভব হত। হরে কৃষ্ণ। (চলবে…..)
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন – ২০১১ইং
