কেন ধর্ম অনুশীলন করব?

0
42

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য : আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)
২১, অক্টোবর, ১৯৭২ সালে বৃন্দাবন, ভারতে প্রদত্ত বঙ্গানুবাদ


কামস্য নেন্দ্রিয়প্রীতিলাভো জীবেত যাবতা।
জীবস্য তত্ত্বজিজ্ঞাসা নাৰ্থো যশ্চেহ কৰ্মভিঃ ॥

ইন্দ্রিয় সুখভোগকে কখনই জীবনের উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সুস্থ জীবন যাপন করা অথবা নির্মল রাখার বাসনাই কেবল করা উচিত। কেননা মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা। এছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ম করা উচিত নয় । (শ্রীমদ্ভাগবত-১/২/১০)
কোন জাগতিক সুবিধা লাভের জন্য ধর্মের অনুশীলন করা উচিত নয়। সাধারণত লোকেরা কিছু জাগতিক সুবিধা লাভের জন্য ধর্ম অনুশীলন করে। যেমন খ্রিষ্টানরা গীর্জায় গিয়ে বলে যে, ভগবান আমাদেরকে প্রতিদিনের রুটি দাও অথবা তারা অন্যান্য মন্দিরে যায় জাগতিক কিছু প্রার্থনা করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্দ্রিয় তৃপ্তি নয়।
ধর্ম মানে হচ্ছে ধর্মস্য অপবর্গস্য অর্থাৎ ধার্মিক জীবনে প্রবেশ করা মানে হচ্ছে ত্রিতাপ ক্লেশের পরিপূর্ণ জীবন থেকে মুক্ত হওয়া অপবর্গ লাভ করা। সে জন্য কিন্তু সেই অর্থগুলো ইন্দ্রিয় তৃপ্তি করার জন্য ব্যবহার করা ঠিক নয়। অর্থের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। আমরা কৃষ্ণভাবনাময় প্রচারে, গ্রন্থ বিতরণ করে অনেক অর্থ পাই ।
ইউরোপ, আমেরিকাতে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া কঠিন। যেমন- অনুদানের জন্য কোনো ভদ্র লোকের বাড়িতে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশও করতে পারবেন না। কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনি যদি অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করেন তাহলে আপনাকে হত্যা করা হবে এবং তারা দরজার সামনে বড় একটা সাইন বোর্ডে ঝুলিয়ে রাখেন সেখানে লিখা থাকে, “কুকুর থেকে সাবধান”। সুতরাং সেখানে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়া খুবই কঠিন। স্যার আমাকে কিছু দিন এরকম বলা সেখানে অসম্ভব। কিন্তু আমরা ২০টি গ্রন্থ ছাপিয়েছি।
গ্রন্থ প্রচার করে আমরা প্রতিদিন ২৫ হাজার রুপি (৩৭,৫০০ টাকা) আয় করছি। সে জন্য আমরা প্রতিমাসে সাত লাখ রুপি মুনাফা পেতে পারি। আমার গুরু মহারাজ বলেছেন, ‘কেন তুমি অর্থ উপার্জনের জন্য অন্যদের তোষামোদ করবে? অর্থ উপার্জনের জন্য তুমি সত্য কথা বল। তাহলে অবশ্যই অর্থ আসবে। এটাই হচ্ছে আমার বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা। আমাদের অনেক অনুগামী রয়েছে। এই সকল সংগৃহীত অর্থ ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য নয়। আমরা যদি লোকেদের দেওয়া অর্থ নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করি তাহলে দাতার কু কর্মের ফলও আমাদেরকে ভোগ করতে হবেই।
ভগবদ্গীতা ও ভাগবত আদি শাস্ত্রে বলা হচ্ছে যতক্ষণ আমরা ইন্দ্রিয় তৃপ্তি নিয়ে চিন্তিত থাকব ততক্ষণ আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত অর্থের চেয়ে অধিক অর্থ পাব না। অন্যথায় আমরা দেখি যে বহু লোক ধনী পরিবারে জন্মাচ্ছে। আবার অনেকে গরীব পরিবারে জন্মগ্রহণ করছে যারা দু’বেলাও খেতে পারে না দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করেও। এটা হচ্ছে ভাগ্য। ভাগ্য পূর্বেই নির্ধারিত আছে কিন্তু আমরা চাইলে আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃতকে বিকশিত করতে পারি। সেই সুযোগ রয়েছে। সে জন্য ভাগবতে বলা হয়েছে তসৈব হেতোঃ প্রয়তেত কোবিদো-যারা বুদ্ধিমান, জ্ঞানী তাদের উচিত কৃষ্ণভাবনাময় চেতনা বিকশিত করার জন্য জীবনকে নিয়োজিত করা। কৃষ্ণভক্তি সবার মধ্যেই সুপ্তভাবে রয়েছে—

নিত্যসিদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম ‘সাধ্য’ কভু নয় ।
শ্রবণাদি-শুদ্ধচিত্তে করয়ে উদয় ৷৷

কৃষ্ণের জন্য আমাদের ভালবাসা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেটা আবৃত হয়ে রয়েছে। সে জন্যই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলন হৃদয়ের সুপ্ত কৃষ্ণপ্রেম জাগরিত করার একটি প্রক্রিয়া। এটি ইতোমধ্যেই রয়েছে কিন্তু আমরা লোকদেরকে কৃষ্ণ সম্পর্কে শ্রবণ করার সুযোগ দিয়ে সেটাকে জাগরিত করছি। চেতোদর্পণমার্জনং প্রকৃতপক্ষে কাউকে যদি কৃষ্ণ কথা এবং হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র শ্রবণের সুযোগ দেয়া হয় এবং সে যদি নিয়মিত কৃষ্ণকথা ও হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র শ্রবণ করে তাহলে তার হৃদয়ে সমস্ত নোংরা জিনিসগুলো ধীরে ধীরে দূর হয়ে যাবে এবং সে কৃষ্ণকে উপলব্ধি করতে পারবে।


কৃষ্ণের জন্য আমাদের ভালবাসা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেটা আবৃত হয়ে রয়েছে। সে জন্যই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলন হৃদয়ের সুপ্ত কৃষ্ণপ্রেম জাগরিত করার একটি প্রক্রিয়া। এটি ইতোমধ্যেই রয়েছে কিন্তু আমরা লোকদেরকে কৃষ্ণ সম্পর্কে শ্রবণ করার সুযোগ দিয়ে সেটাকে জাগরিত করছি।


আমরা কাউকে বলি না যে, তোমরা হিন্দু হয়ে যাও। আমরা বলছি যে, এসো আমরা একসাথে কীর্তন করি। প্রথমে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রচার করার সময় আমার সাথে কেউ ছিল না। আমি টম্পর্কিন স্কয়ার পার্কে বসে আমি কীর্তন করছিলাম। সেখানে ব্রহ্মানন্দ, অচ্যুতানন্দ নৃত্য করেছিল। যদিও সেখানে কোন মদঙ্গ, করতাল ছিল না। দুন্দুভী ছিল সেটি বাজানো হয়েছিল এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি সেখানে কীর্তন করছিলাম। যুবক-যুবতীরা তাদের সাথে নিয়ে আসা কুকুরের সাথে নাচতে শুরু করেছিল এবং সেটাই হচ্ছে শুরু। ধীরে ধীরে তারা আমার ছাত্রে পরিণত হয়।
প্রভুপাদ হয়গ্রীব প্রভু সম্পর্কে বলেছেন যে, হয়গ্রীব প্রভুর নাম ছিল হাওয়াড উইলার। তিনি ছিলেন একজন অধ্যাপক। তিনি ভারতে গিয়েছিলেন গুরুর সন্ধানে কিন্তু তিনি কোন গুরুর সন্ধান পেলেন না। রাস্তায় আমাদের দেখা হয়েছিল এবং এরপর তিনি আমাদের সাথে যুক্ত হন। এভাবে আমরা বিস্তার লাভ করি। প্রথমে নিউইয়র্কে তারপর সানফ্রান্সিসকোতে তারপর মন্ট্রিয়ালে এবং বর্তমানে (সেই সময়) ১০০টি মন্দির রয়েছে। কেবল এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তনের দ্বারা আর কিছুই আমরা করিনি এবং যেখানেই যাই লোকেরা বলে ঐ যে হরেকৃষ্ণ ভক্তরা আসছে। যেখানেই আমরা যাই আমাদেরকে সম্মান করে।
লোকেরা জানে যে, আমরা চারটা নিয়ম খুব কঠোরভাবে পালন করি যেমন কোন অবৈধ সঙ্গ, নেশা, দ্যূতক্রীড়া, মাংসাহার নয় এবং তারা বিস্মৃত হয়ে যায় কিভাবে আমরা এগুলো পালন করতে পারি। সে জন্য এখানে বলা হচ্ছে যে, কামস্য ন ইন্দ্রিয় প্রীতি যতদিন আমরা এই দেহের মধ্যে থাকব ততদিন আমাদের খেতে হবে, ঘুমাতে হবে, ইন্দ্রিয় উপভোগ করতে হবে। এগুলো হচ্ছে দেহের প্রয়োজন। কামকে অনুমোদন করা হয়েছে। কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৭/১১) বলেছেন যে, ধর্মাবিরুদ্ধো ভূতেষু কামোহস্মি ভরতর্ষভ ॥
আমি ধর্ম নীতির অবিরুদ্ধ কাম। সেই ধর্ম অনুমোদন করা হয়েছে ধর্ম অবিরুদ্ধ কাম। কিন্তু ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য অনুমোদন করা হয়নি। যেমন আপনি বিয়ে করতে পারেন। আপনি সন্তান জন্ম দান করতে পারেন সেটা ঠিক আছে কিন্তু আপনি কেবল উপভোগ করার জন্য মৈথুন করতে পারেন না। কেবল উপভোগের জন্য সেটা অনুমোদন করা হয়নি। আপনি খান, ঘুমান, মৈথুন ও আত্মরক্ষা করেন। কোন কিছুই শাস্ত্রে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে হবে। এই জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে তত্ত্ব জিজ্ঞাসা। সেটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। বৈদিক প্রক্রিয়া হচ্ছে লোকেরা তাদের দৈহিক প্রয়োজনগুলো মেটাবে একই সাথে তারা পরম সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে ধীরে ধীরে প্রগতি সাধন করবে। সেটিই হচ্ছে বৈদিক প্রক্রিয়া ।
বেদে ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য পর্যাপ্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়। অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা বা তত্ত্ব জিজ্ঞাসা এটা কেন বলা হচ্ছে? জীবস্য তত্ত্ব জিজ্ঞাসা। তত্ত্ব জিজ্ঞাসা মানে এই মানব জীবন পেয়ে আমাদেরকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে। যেমন, সনাতন গোস্বামী মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কে আমি: ‘কেন আমায় জারে তাপত্রয়’। আমি কে?, কেন আমাকে ত্রিতাপ দুঃখ সর্বদা ভোগ করতে হচ্ছে? এটা হচ্ছে তত্ত্ব জিজ্ঞাসা এবং যেহেতু আমি পরম ব্রহ্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ সে জন্য আমার অবশ্যই নিজেকে জানা উচিত। সেটিই হচ্ছে ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার শুরু। ঠিক যেমন ভগবদ্গীতার ২/১৩ শুরুতে কৃষ্ণ বলছেন অর্জুনকে তুমি দেহ নও তুমি হচ্ছ ব্রহ্ম।

দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।

অস্মিন দেহে এই দেহে একজন রয়েছে সেটিই হচ্ছে ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার শুরু। আমি কে? আমি যদি নিজেকে না জানি কৃষ্ণকে আমি জানতে পারব না। কেউ যদি নিজেকে না জেনে কৃষ্ণকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে তাহলে সে ভুল করবে। অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্। আমি মানুষের রূপ ধরে যখন আবির্ভূত হই মৃঢ় লোকেরা আমাকে উপলব্ধি করতে পারে না। তারা মনে করে আমিও তাদের মতো একজন সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ তাদের থেকে একটু বেশি শক্তিশালী, একটু বেশী ধনী, একটু বেশি খ্যাতি সম্পন্ন মানুষ এরকম মনে করে। যেহেতু তারা নিজের সম্পর্কে জানে না। আমি কে এটা জানে না সেজন্য কৃষ্ণকেও মানুষ বলে মনে করে। সে জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ব্রহ্ম বা পরমেশ্বর ভগবান সম্পর্কে জানতে হবে এবং তার আগে জানতে হবে আমি কে? সেটা হচ্ছে তত্ত্ব জিজ্ঞাসা। জীবস্য তত্ত্ব জিজ্ঞাসা।
আমাদেরকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। প্রত্যেকেই কাজ করছে বিশেষ করে এই পাশ্চাত্য দেশগুলোতে সবাই ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য কাজ করছে। সবখানেই লোকেদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কিভাবে আরও বেশি বেশি ইন্দ্রিয় তৃপ্তি করবে সেটিই হচ্ছে তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সেটি জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য নয়। জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য বিশেষ করে আমরা এই মনুষ্য জীবন পেয়েছি অনেক বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ্য জীবন লাভ করেছি। চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ করার পর আমরা এই মনুষ্য জীবন পেয়েছি। এই সুযোগকে আমাদের কাজে লাগানো উচিত।
আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত আমি কে? ভগবান কে? ভগবানের সাথে আমার কি সম্পর্ক এবং আমরা যদি এই সুযোগ একবার হারিয়ে ফেলি তাহলে আমরা আত্মহত্যা করছি। আমরা পুনরায় সেই জন্ম-মৃত্যুর চক্রেই ফিরে যাব। সেজন্য মানুষের জীবনকে অবহেলা করা উচিত নয়। এই সুযোগটাকে গ্রহণ করে এটাকে ভগবানের সেবায় ব্যবহার করা উচিত। যেমন নরোত্তম দাস ঠাকুর বলেছেন, হরি হরি বিফলে জনম গোয়াইনু, মনুষ্য জনম পাইয়া রাধা-কৃষ্ণ না ভজিয়া জানিয়া শুনিয়া বিষ খাইনু।
আমি কি করছি, আমি জেনে শুনে বিষ খাচ্ছি। পরম সত্যকে অর্থাৎ ভগবানকে উপলব্ধি করার মতো একটি মাথা রয়েছে। কিন্তু আমি সেটাকে কেবল ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য অতিবাহিত করছি। সেজন্য আমি জেনে শুনে বিষ পান করছি। যেমন কেউ যদি জেনে শুনে বিষ পান করে সে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু সে শেষ পরিণতি চায় নিজে আত্মহত্যা করতে। জেনে শুনে বিষপান করা জীবনের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা যে মনুষ্য দেহ পেয়েছি এটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা।
ভগবান ও প্রকৃতি এটি আমাদেরকে দিয়েছে এবং এর সদ্ব্যবহার আমাদেরকে ব্যবহার করতে হবে কৃষ্ণ সেখানে রয়েছেন। কৃষ্ণ বলছেন, ‘কৃষ্ণ’ মানে এমন নয় যে সরাসরি থাকতে হবে। কৃষ্ণ তার বাণীর মধ্যে রয়েছেন। কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম। কৃষ্ণ এবং তার বাণীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যেমন ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে কৃষ্ণের বাণী এবং আপনি যখন ভগবদ্গীতা পাঠ করছেন তাহলে আপনার জানা উচিত যে, আপনি কৃষ্ণের সাথে কথা বলছেন সরাসরি। মহাপ্রভু সেজন্য উপদেশ দিচ্ছেন ‘যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ উপদেশ’। এই কৃষ্ণ উপদেশ এই কৃষ্ণ কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমার গুরু মহারাজ প্রভুপাদ বলেছেন, “এই জগতে কোন কিছুর অভাব নেই শুধু একটা জিনিষের অভাব রয়েছে, সেটা হচ্ছে কৃষ্ণ ভক্তি। আর সবকিছু রয়েছে”। প্রকৃতপক্ষে সেটাই
হচ্ছে সত্য এই জগতে কোন কিছুর অভাব নেই। অনুন্নত দেশে গরীব লোকেদের কিছু মৌলিক চাহিদার অভাব রয়েছে। আসলে পাশ্চাত্যদেশগুলোতে যেমন আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সেখানে অসংখ্য খালি জায়গা রয়েছে। সেখানে যে খাদ্যগুলো উৎপাদন হয় তা বিশ্বের ৬০০ কোটি মানুষ থেকেও ১০ গুণ লোককে খাওয়ানো যাবে। সবকিছু পর্যাপ্ত পরিমানে রয়েছে। যেমন আমেরিকাতে অনেক শস্য, সবজি ফেলে দেয়। সেটা হচ্ছে ভুল ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় দারিদ্রতা বা অভাবের কোন প্রশ্ন নেই। সেটা হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কারণ তারা সঠিক ব্যবস্থাপনা জানে না। মূর্খ লোকেরা তখন বলে যে, আমাদের খাবার নেই। আসলে খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমানে রয়েছে কিন্তু জগতে যখন আসুরিক লোকরা বেড়ে যাবে তখন প্রকৃতি খাদ্য সরবরাহ কমিয়ে দিবে। সেটা আমরা পৃথু মহারাজের ইতিহাস থেকে জানতে পারি। যখন পৃথিবী ঠিক মত খাদ্য সরবরাহ করছিল না তখন পৃথু মহারাজ বসুন্ধরাকে হত্যা করার জন্য তীর নিয়ে ধাবিত হয়েছিলেন। তখন মাতা বসুন্ধরা উত্তর দিয়েছিলেন যে, যেহেতু জগতে অসুরদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।


জগতে যতবেশি আসুরিক লোকের বৃদ্ধি হবে। ততবেশি খাদ্য সরবরাহ কমে যাবে। শ্রীমদ্ভাগবতমের দ্বাদশ স্কন্ধে বলা হয়েছে কলিযুগে এমন একটা সময় আসবে যখন কোন শস্য ফলবে না। এমন একটা সময় আসবে যখন আর কোন খাদ্য সরবরাহ থাকবে না।

সেহেতু খাদ্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছি। কারণ জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণভাবনাময়কে বিকশিত করা। আসুরিক লোকেরা সেটা করেনা। সেজন্য খাদ্য সঙ্কট বাড়ছে।
জগতে যতবেশি আসুরিক লোকের বৃদ্ধি হবে। ততবেশি খাদ্য সরবরাহ কমে যাবে। শ্রীমদ্ভাগবতমের দ্বাদশ স্কন্ধে বলা হয়েছে কলিযুগে এমন একটা সময় আসবে যখন কোন শস্য ফলবে না। এমন একটা সময় আসবে যখন আর কোন খাদ্য সরবরাহ থাকবে না। সেজন্য আমাদের বেশি খাদ্য উৎপাদন বা খাদ্য জমা করার জন্য অধিক পরিশ্রম করার প্রয়োজন নেই। কৃষ্ণকে উপলব্ধি করার জন্য কৃষ্ণ ভাবনাময় হওয়ার জন্য বেশি বেশি পরিশ্রম করতে হবে। এটাই জীবস্য তত্ত্ব জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণের ওপর নির্ভর করা এবং তাকে দৃঢ়ভাবে হৃদয়ে ধারণ করা। সেটাই আমরা ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা করেছি যে, এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রচুর খরচ আমাদেরকে করতে হয়। কৃষ্ণ সেই সব খরচ করার যোগান দিচ্ছেন। আমাদের ব্রহ্মচারীরা চাকুরিতে যায় না অর্থ উপার্জন করতে। সেজন্য আশেপাশের প্রতিবেশিরা আমাদের প্রতি খুব ঈর্ষা পরায়ণ। তারা বলে যে, তোমরা চাকরি কর না, অর্থ আয় কর না। তবুও তোমরা ভালমত চলছ কিভাবে? তারা কল্পনাও করতে পারে না এটা কিভাবে সম্ভব । অর্থ উপার্জন বা খাদ্য সংগ্রহের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার কোন প্রয়োজন নেই। শ্রীমদ্ভাগবতের পঞ্চম স্কন্ধে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভগবান ঋষভদেব তার পুত্রদেরকে বলেছেন—

নায়ং দেহো দেহভাজাং নৃলোকে কষ্টান্ কামানহতে বিডুভুজাং যে।

তিনি বলছেন গাধার মতো কঠোর পরিশ্রম করা মানুষের কর্তব্য নয়। মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে তপস্যা করা-তপো দিব্যং পুত্রকা যেন সত্ত্বং অর্থাৎ মানুষের জীবন হচ্ছে তপস্যার জন্য, তত্ত্ব জিজ্ঞাসার জন্য। সেটি হচ্ছে বৈদিক সভ্যতার মৌলিক নীতি। মহাভারতে আমরা দেখি যে, তখন ব্যবসা বাণিজ্য ছিল না।
২০০ বছর আগেও ব্রিটিশ শাসনের আগে কোন শিল্প কারখানা ছিল না। এমন নয় যে, শিল্প কারখানা বাড়ালে বা অনেক সকাম কর্ম করলেই আমরা সুখী হতে পারব। সেটা অসম্ভব।
মনুষ্য জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয় গাধা বা গরুর মত কঠোর পরিশ্রম করা। যারা এরকম পরিশ্রম করে তারা হচ্ছে গরু এবং গাধা। সে দৃষ্টান্ত আমরা দিচ্ছি যেমন-মাঠে অনেক ঘাস রয়েছে কিন্তু সে চাইলে যেকোন জায়গা থেকে ঘাস খেতে পারে। প্রচুর ঘাস তার জন্য রয়েছে কিন্তু সে চাইলে যেকোন জায়গা থেকে ঘাস খেতে পারে। গাধা চিন্তা করছে আমি যদি কঠোর পরিশ্রম না করি তাহলে আমার মালিক তো আমাকে ঘাস দিবে না খাওয়ার জন্য। এটা হচ্ছে গাধার মত বুদ্ধি সব কিছুই তার জন্য রয়েছে। যেমন আফ্রিকাতে লাখ লাখ হাতি রয়েছে তারা প্রতিদিন অন্তত পক্ষে ৮২ পাউন্ড খাদ্য খায়। তাদেরকে খাদ্য সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে সেখানে খাদ্যের কোন অভাব নেই। যদিও তারা অনেক বেশি খায়। তারপরও খাদ্যের অভাব নেই। যদিও রাজনীতিবদরা বলছে, পৃথিবীতে জনসংখ্যার কারণে খাদ্য সঙ্কট বেড়ে যাচ্ছে। আসলে এটা সত্য নয় পরমেশ্বর ভগবান সবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে দিয়েছেন।

নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্ ।
একো বহূনাং যো বিদধাতি কামান্ ॥
কঠ উপনিষদ ২/২/১৩, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/১৩)

পরমেশ্বর ভগবান এবং জীব সকল নিত্য। পরমেশ্বর হচ্ছেন চেতন এবং জীব সকলও চেতন। পার্থক্য শুধু এই যে, সেই পরমেশ্বর সমস্ত জীবের প্রয়োজন সরবরাহ করছেন। কৃষ্ণ এখানে বলছেন বহুনাং যো বিদধাতি কামান কৃষ্ণ সবার জন্য খাদ্য দিয়েছেন। সেখানে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। খাদ্য কোথায়? খাদ্য কোথায়? জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ করার কোন প্রয়োজন নেই সব কিছুই ব্যবস্থা রয়েছে।
আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণভক্তি লাভ করা। কৃষ্ণভাবনাকে বুঝার জন্য কৃষ্ণকে উপলব্ধি করার জন্য এবং আমরা যদি কৃষ্ণকে উপলব্ধি করতে পারি তাহলে আমাদের সমস্যা এমনিতে সমাধান হয়ে যাবে। জীবনের প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ভ্রমণ ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ৷৷ এই জন্ম মৃত্যুর যে চক্র আবর্তন এটা হচ্ছে প্রধান সমস্যা। আমাদের অনুরোধ সবার প্রতি কোন রকম সন্দেহ বা সংশয় ছাড়া এই কৃষ্ণ ভক্তি আন্দোলনকে গ্রহণ করুন এটি একটি অনুমোদিত প্রামাণিক পন্থা। লোকেরা সারা বিশ্বে এটিকে গ্রহণ করছে।
আমাদের অনেক প্রচারক প্রয়োজন সে জন্য অনেক যুবক প্রয়োজন। যারা সারা বিশ্বে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনকে বিকশিত করবে। আফ্রিকানরাও কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করছে যদিও তারা ততটা সভ্য নয়। তারপরও তারা এটা গ্রহণ করছে। আপনারা শুনে অবাক হবেন, আমি একবার লন্ডন থেকে আফ্রিকাতে যাওয়ার পথে বিমানটি কিছুক্ষণের জন্য এথেন্স বিমানবন্দরে থেমেছিল। যখনই আমরা বিমান থেকে নেমেছি কিছু যুবক-যুবতী গ্রীসের এথেন্স নগরী থেকে তৎক্ষণাৎ সেখানে এসে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি গিয়েছিলাম পিলিপাইনের মেনিলাতে । কুকুর ভোজী ফিলিপাইনরাও কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে যোগ দিয়ে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করছে। একটা হোটেলের বড় একটা হলে অনেক যুবক এসেছিল। তারা একত্রে নৃত্য-কীর্তন করেছে এবং আমাদের গ্রন্থ নিয়েছে। সেখানে সুদামা বিপ্র গোস্বামী মহারাজ দায়িত্বে আছেন। তিনি দুই মাস আগে সেখানে গিয়েছিলেন এবং ছয় মাসের মধ্যে খুব সুন্দর একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।
মহাপ্রভু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘পৃথিবীতে আছে যত নগরাদিগ্রাম সর্বত্র প্রচারিত হইবে মোর এই নাম।’ তার কথার একটি অর্থ অবশ্যই আছে সেজন্য আমাদেরকে কেবল এই সুযোগটা গ্রহণ করতে হবে। চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা এটি গ্রহণ করতে হবে এবং আমাদের সর্বোচ্চ প্রয়াস করতে হবে। তাহলে লোকেরা সুখী হবে এবং আমরা সুখী হবো সেটিই হচ্ছে—জীবস্য তত্ত্ব জিজ্ঞাসা নার্থো যশ্চেহ কৰ্মভিঃ ৷৷


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here