কার্তিক মাসের ব্রত মাহাত্ম্য

0
97

(কার্তিক ব্রত মাহাত্মের নানাবিধ বর্ণনা আছে ও কার্তিক মাসে অনুসরণযোগ্য বিভিন্ন বিধিনিষেধও আছে। শ্রীল সনাতন গোস্বামী স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ আদি বিভিন্ন পুরাণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর ‘হরিভক্তিবিলাস’ গ্রন্থে কার্তিক ব্রতের বর্ণনা দিয়েছেন। সেইসব বর্ণনার কিছু অংশ ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে নিম্নে প্রদত্ত হলো।) কার্তিক ব্রতের মহিমা ‘সকল তীর্থ, যজ্ঞ, দক্ষিণা, পুষ্করে-কুরুক্ষেত্রে- হিমালয়ে বসবাসের পুণ্য ও মেরুসদৃশ স্বর্ণস্তুপ দানের পুণ্য-এ সবই শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় কার্তিক মাসের মধ্যে অবস্থান করে।’ ‘কার্তিক মাসে শ্রীবিষ্ণুর যে সেবাই করা হয় তা সবই নিত্য। হে নারদ, আমি তোমাকে সত্য বলছি। ‘কার্তিক হল সব মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, পুণ্য কর্মসমূহের মধ্যে পুণ্যতম, যা-কিছু শুদ্ধ করে তার মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধকারী।’
ন কার্তিক সম মাসো
ন কৃতেন সমং যুগং।
ন বেদ সদৃশং শাস্ত্রং
ন তীর্থং গঙ্গয়া সমং ॥
‘কার্তিকের তুল্য মাস নেই। সত্যযুগের ন্যায় যুগ নেই। বেদের সমান শাস্ত্র নেই । গঙ্গার ন্যায় তীর্থ নেই।’
কার্তিক মাস শ্রেষ্ঠ। কার্তিক মাস সর্বদা বৈষ্ণবগণের প্রিয়। হে মহর্ষি, যে বৈষ্ণব ভক্তি সহকারে কার্তিক মাসের পরিচর্য্যা করেন তিনি পূর্বপুরুষগণকে নরক থেকে উদ্ধার করেন।’ পদ্মপুরাণে কথিত হয়েছে-দ্বাদশ মাসের মধ্যে কার্তিক মাসই শ্রীহরির সর্বাধিক প্রিয়। এই সময়ে যিনি এমনকি শ্রীবিষ্ণুর সামান্য আরাধনাও করেন, কার্তিক মাস তাঁকে শ্রীবিষ্ণুর অপ্রাকৃত ধামে বাস প্রদান করে। ‘সবাই জানে, ভগবান দামোদর তাঁর ভক্তগণকে ভালবাসেন। শ্রীদামোদর মাস তথা এই কার্তিক মাসও ভক্তদের ভালবাসেন। কার্তিকমাস সামান্যতম ভক্তিকেও প্রচুর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান করেন।
দীপেনাপি হি যত্রাসৌ প্রীয়তে হরিরীশ্বরঃ।
সুগীতম চ দদাতি এব পর দীপ প্রবোধনাৎ॥
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কার্তিক মাসে একটিমাত্র প্রদীপ নিবেদনেও প্রসন্ন হন। যাঁরা দামোদরের উদ্দেশ্যে দীপদানের ব্যাপারে অন্যদেরকে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনে সাহায্য করেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁদেরও মহিমান্বিত করেন।
কার্তিক মাসে করণীয় কিছু নির্দিষ্ট পুণ্যকর্মের মাহাত্ম্য স্কন্দপুরাণে কথিত হয়েছে-‘কার্তিক মাসে দান, যজ্ঞ, জপ ও তপস্যা করা হলে, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, তা অক্ষয় ফল প্রদান করে।’
অধিকন্তু বলা হয়েছে: ‘হে নারদ, আমি স্বয়ং দেখেছি, যে কোন ব্যক্তি কার্তিক মাসে মহানন্দে ভগবদ্গীতা পাঠ করলে তিনি জন্ম-মৃত্যুময় এই পৃথিবীতে আর প্রত্যাবর্তন করেন না।’
‘যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে শ্রীবিষ্ণুর সহস্রনাম ও গজেন্দ্র-মোক্ষণ লীলা পাঠ করেন, তার পুনর্জন্ম হয় না।’
“হে মহর্ষি, অনুগ্রহপূর্বক অন্য সমস্ত ধর্মাচরণ পরিত্যাগপূর্বক কার্তিক মাসে কেবলমাত্র ভগবান কেশবের বিগ্রহের সন্মুখে পবিত্র শাস্ত্রসমূহ শ্রবণ করুন।’ পদ্মপুরাণে কথিত হয়েছে- কার্তিক মাসে ভূূমিতে শয়ন, ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন, পলাশপত্রের উপর হবিষ্যান্ন ভোজন ও শ্রীদামোদরের আরাধনা করা কর্তব্য। এইরূপে সর্বপাপমুক্ত হয়ে ভগবদ্ধামে সারূপ্যমুক্তি লাভ করে শ্রীহরির সাক্ষাৎ সেবানন্দ লাভ হয়। অধিকন্তু বলা হয়েছে:
‘যে ব্যক্তি সমগ্র কার্তিক মাস ব্যাপী প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করেন, স্নান করেন, ইন্দ্রিয় সংযত রাখেন, শান্ত থাকেন, জপ করেন ও শুধুমাত্র হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন, তিনি সর্বপাপমুক্ত হন। যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে দিনে একবার মাত্র আহার করেন, তিনি অতি বিখ্যাত, শক্তিশালী ও নায়কোচিত হয়ে ওঠেন।
অধিকন্তু বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে পলাশ পত্রের উপর ভোজন করেন তিনি সর্বপাপমুক্ত হন। যে জন শ্র্রীহরির প্রসাদভোজী হন তাঁর মোক্ষলাভ হয়। যে ব্যক্তি যোগ্য ব্রাহ্মন নন, তার পক্ষে পলাশ বৃক্ষের মাঝখানের পাতায় ভোজন করা উচিত নয়।’
আরো বলা হয়েছে: কার্তিক মাসে যিনি সর্বশক্তিমান ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করেন, শ্রীভগবান তাঁর সহস্র্র-সহস্র অপরাধ ও বহু ভয়াবহ পাপকর্ম মার্জনা করেন। যে ব্যক্তি শ্রীবিষ্ণুকে ঘৃত ও শর্করাযুক্ত সুস্বাদু পরমান্ন নিবেদন করে সেই প্রসাদ গ্রহণ করেন, তিনি দৈনিক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের ফল প্রাপ্ত হন।’
শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে ব্যাখ্যা করে বলছেন যারা কার্তিক মাসে প্রাতস্নান, রাত্রি জাগরণ, দীপদান ও তুলসী সেবা করেন তারা শ্রীবিষ্ণুর ন্যায় দিব্যদেহ লাভ করেন। যারা তিন দিবস মাত্র এইসকল পুণ্যকর্ম করেন, দেবগণও তাদের সর্বপ্রকারে সম্মানিত করেন। যারা সমগ্র জীবন এইসকল পুণ্যকর্মের অনুষ্ঠান করে এসেছেন তাদের আর কি কথা! আকাশ দীপের মহিমা
পদ্মপুরাণে উক্ত হয়েছে: যে ব্যক্তি কার্তিক মাসে উচ্চাকাশে দীপ প্রদান করেন তিনি সমস্ত কটুম্বগণসহ বিষ্ণুলোকে গমন করেন। আকাশে দীপদানের মন্ত্র নমোহনায় বেধসে’ (পরমশ্রষ্টা অনন্তদেবকে প্রণাম করি) মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ভক্তগণ আকাশে ভগবান দামোদর ও সৌভাগ্যদেবীকে দীপ-নিবেদন করেন। কিছু সুনির্দিষ্ট স্থানে কার্তিক ব্রত পালনের মাহাত্ম্য সমন্ধে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে: কেউ যে স্থানেই থাকুন না কেন, কার্তিক মাসে প্রাতস্নান, দান ও বিশেষত: শ্রীভগবানের আরাধনার মাধ্যমে অগ্নিহোত্র যজ্ঞানুষ্ঠানের ফল লাভ করবেন।’ “কার্ত্তিক ব্রত পালনের ফল দশলক্ষ গুণ বর্ধিত হয় যখন তা কুরুক্ষেত্রে বা গঙ্গাতটে অনুষ্ঠিত হয়। পুষ্কর তীর্থে তার ফল আরো অধিক। কার্তিক মাসে দ্বারকায় স্নান ও ভগবদারাধনার ফলে কৃষ্ণলোক প্রাপ্তি ঘটে।’
হে মুনিগণ, অন্যান্য তীর্থনগরীও অনুরূপ ফলপ্রদান করে। মথুরা মণ্ডলের কথা ভিন্ন কারণ শ্রীকৃষ্ণ মথুরা মণ্ডলেই দামোদরলীলা প্রকাশ করেছিলেন। মথুরায় কার্তিকব্রত পালনের ফলে কৃষ্ণপ্রেম লাভ হয়।


মাসিক চৈতন্য সন্দেশ অক্টবর ২০২২ হতে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here