এই পোস্টটি 118 বার দেখা হয়েছে
চৈতন্য সন্দেশ ডেস্ক: বষ্ণবকুল-
চূড়ামণি শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী ছিলেন সপ্তগ্রামের রাজার একমাত্র পুত্র সন্তান। সেই সময় ভারতবর্ষ ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশ; বঙ্গভূমি ছিল সেই ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ স্থান এবং বঙ্গভূমির বন্দর সপ্তগ্রাম ছিল সবচাইতে ঐশ্বর্যমণ্ডিত অঞ্চল। রঘুনাথ দাস – গোস্বামীর পিতার জমিদারীর বাৎসরিক আয় ছিল তখনকার দিনে কুড়ি লক্ষ টাকা। সেই রঘুনাথ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা শুনে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। সন্ন্যাস গ্রহণ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন শান্তিপুরে আসেন, তখন রঘুনাথ তাঁর দর্শন ও কৃপা লাভ করেন। তারপর মহাপ্রভু পুরীতে চলে যান; আর মহাপ্রভুর প্রেমে পাগল হয়ে রঘুনাথ ঘরে ফিরে যান। বার বার তিনি ঘর থেকে পালিয়ে নীলাচলে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁর পিতা তাঁকে পথ থেকে ধরে এনে ঘরে বন্ধ করে রাখেন, এবং তাঁকে আগলে রাখার জন্য এগারজন প্রহরীর ব্যবস্থা করেন। তারপর মহাপ্রভু যখন শান্তিপুরে আসেন, তখন পিতার অনুমতি নিয়ে রঘুনাথ তাঁকে দেখতে যান, এবং তাঁর মনের কথা তাঁকে শোনান। তখন মহাপ্রভু তাঁকে নির্দেশ দেন, ঘরে ফিরে গিয়ে অনাসক্ত চিত্তে বিষয় দেখাশুনা করতে এবং মানসে নিষ্ঠা সহকারে শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের ভজনা করতে। তিনি তাঁকে আশ্বাস দেন, বৃন্দাবন থেকে তিনি যখন নীলাচলে ফিরে যাবেন, তখন রঘুনাথ যেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্তরে ব্যথিত হলেও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশ শিরোধার্য করে রঘুনাথ গৃহে ফিরে গেলেন এবং মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে বাহিরে বৈরাগ্য প্রদর্শন না করে কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে যেতে লাগলেন। তা দেখে তাঁর পিতামাতা খুব খুশী হলেন। এই ভাবে প্রায় দু’বছর কেটে গেল। তখন একদিন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু পানিহাটি গ্রামে এসেছেন শুনে রঘুনাথ সেখানে গেলেন, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। নিত্যানন্দ প্রভু তখন গঙ্গাতীরে এক বৃক্ষের নীচে একটি বেদীতে, বহু পার্ষদ পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন। দূর থেকে রঘুনাথ তাঁকে দণ্ডবৎ প্রণতি করলেন। স্নেহ বিগলিত চিত্তে নিত্যানন্দ প্রভু তখন বললেন, “চোরা দিলি দরশন। আয়, আয়, আজি তোর করিমু দণ্ডন।”
নিত্যানন্দ প্রভু এভাবে ডাকলেও রঘুনাথ তাঁর কাছে যায় না। তখন নিত্যানন্দ প্রভু জোড় করে তাঁকে কাছে টেনে তার মাথায় তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করে তাঁকে কৃপা করেন এবং বলেন, “নিকটে না আইস, চোরা, ভাগ’ দূরে দূরে। আজি লাগ পাঞাছি দণ্ডিমু তামারে ॥ চিড়াদধি ভক্ষণ করাহ মোর গণে।”
সেই নির্দেশ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে রঘুনাথ তৎক্ষণাৎ গ্রামে গ্রামে লোক পাঠিয়ে চিড়া, দই, দুধ, সন্দেশ, চিনি, কলা আনালেন এবং এক অপূর্ব মহোৎসবের আয়োজন করলেন। সেই মহোৎসবের কথা শুনে অসংখ্যা ব্রাহ্মণ-সজ্জনেরা আসতে লাগলেন।
গরম দুধে চিড়া ভিজিয়ে, তার অর্ধেক দই চিনি আর কলা দিয়ে মাখা হল; আর অর্ধেক ঘন দুধ, চাঁপাকলা, চিনি, ঘি এবং কপূর দিয়ে মাখা হল। অন্তরঙ্গ পার্ষদ পরিবেষ্টিত হয়ে নিত্যানন্দ প্রভু গঙ্গাতীরে বটবৃক্ষতলে চত্বরের উপর বসলেন। বহু লোকের ভিড়ে গঙ্গার তীরবর্তী স্থান পূর্ণ হয়ে গেল। তখন তীরে স্থান না পেয়ে বহু লোক সেই চিড়া দধি এবং চিড়া দুগ্ধ নিয়ে গঙ্গার জলে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন নিত্যানন্দ প্রভু ধ্যানে মহাপ্রভুকে নিয়ে এলেন এবং দুজনে মিলে সকলের চিড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। সকল পাত্রের এবং মালসার এক এক গ্লাস চিড়া নিত্যানন্দ প্রভু পরিহাস করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মুখে দিলেন, তখন মহাপ্রভুও হাসতে হাসতে আর এক গ্রাস নিয়ে নিত্যানন্দ প্রভুর মুখে দিলেন। সমস্ত বৈষ্ণবেরা আনন্দিত হয়ে তা দেখলেন। নিত্যানন্দ প্রভু আজ্ঞা দিলেন, ‘হরি বল করহ ভোজন’। ‘হরি’ ‘হরি’ ধ্বনিতে তখন ভুবন ভরে উঠল। মহোৎসবের কথা শুনে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সমস্ত পসারিরা চিড়া, দধি, সন্দেশ, কলা বিক্রি করার জন্য নিয়ে এল। মূল্য দিয়ে রঘুনাথ সে সমস্ত কিনে নিলেন, এবং তাদেরও চিড়া দধি খাওয়ালেন। মজা দেখবার জন্য যারা এলো তারাও প্রসাদ পেল। এভাবে চিড়া-দধি মহোৎসবের সূচনা হয়।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ‘ইসকন’-এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদের প্রতিবছর আষাঢ়ের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে পানিহাটিতে এই চিড়া-দধি মহোৎসবের আয়োজন করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন। সেই নির্দেশ অনুসারে ইসকনের ভক্তবৃন্দ প্রতি বছর পানিহাটিতে এবং পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় মহাসমারোহে এই মহোৎসব পালন করে চলেছে। এই মহোৎসব উপলক্ষে পানিহাটিতে সেদিন অগণিত মানুষের সমাবেশ হয়; এবং ইসকনের ভক্তরা সকলকে চিড়া-দধি প্রসাদ প্রদান করেন। এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণের অভিন্ন বিগ্রহ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর অনুগত বৈষ্ণবদের কৃপা লাভ করার জন্য আমরা আপনাকে সবান্ধবে আসতে নিমন্ত্রণ ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন – ২০১১ইং
