এই পোস্টটি 95 বার দেখা হয়েছে
‘মহাশূন্যে ভগবান নেই!’— ইউরি গ্যাগারিন
নৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন
নন্দ দুলাল দাস: ভগবান নৃসিংহদেব যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন তার রূপ ছিল ভয়ানক। স্বর্ণ রঙের কেশর উড়ছে, ক্রোধান্বিত আঁখিযুগল, ধারাল নখ যে কোন হৃদয়কে আতংকিত ক
রতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ভগবান নৃসিংহদেবের কথা উল্লেখ করা হলেই দেখা যায় তার অর্ধ নর, অর্ধ সিংহ রূপ সমন্বিত বিশাল সেই ভয়ংকর রূপ। ভগবান আবির্ভূত হয়েছিলেন তার প্রিয় ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজকে তার পিতার রোষানল থেকে রক্ষা করার জন্য, এমনকি হাতে মৃত্যুরূপ তলোয়ার নিয়ে যখন প্রহ্লাদ মহারাজকে হত্যা করতে হিরণ্যকশিপু উদ্যত হয়েছিলেন তখনও ছোট প্রহ্লাদ ভগবানের প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে ও বিচ্যুতি হননি। তিনি সে অবস্থায়ও তার অজ্ঞ পিতাকে কৃপাপরবশ হয়ে ভগবানের অস্থিত্ব রয়েছে এ বিষয়ে এবং আত্মঅহংকারের নিরর্থকতা সম্পর্কে উপদেশ দিতে লাগলেন। যখন নিষ্ঠুর পিতা তার ছোট পুত্রের দেহ। থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত হলেন, তখনই ভগবান তার ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হলেন তাকে রক্ষা করার জন্য। এর পরের ইতিহাস হল অত্যাচারী সেই রাজা নিধন হল এবং সর্বকালের জন্য প্রহ্লাদ মহারাজের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হল।
ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান এ বিষয়টি প্রহ্লাদের কাছ থেকে ১ম পৃঃ পর W অবগত হয়ে হিরণ্যকশিপু তখন প্রহ্লাদকে হত করার পূর্বে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি তোমার ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান হয় তবে তিনি কি এই পিলারটির মধ্যেও অবস্থান করছেন?’ প্রহ্লাদ তখন দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ অবশ্যই’। হিরণ্যকশিপু তখন তৎক্ষণাৎ তার তলোয়ার তুলে এর শেষ সমাধান করতে চাইল। ঠিক তখনই প্রহাদের উদ্ধৃতি প্রমাণ করতে ভগবান নৃসিংহদেব সেই পিলার থেকে আবির্ভূত হলেন। আশ্চর্যজনকভাবে, এই ঘটনায় দু’জন ব্যক্তি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী আচরণ প্রদর্শন করেছিলেন। একজন ভগবানের অস্থিত্ব বিষয়ে স ম্পূর্ণরূপে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, অন্যজন তার অস্থিত্ব না থাকা বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নাস্তিক পরিবেশে বেড়ে উঠেও প্রহ্লাদ কিভাবে মৃত্যুর চরম মুহূর্তেও ভগবানকে সর্বত্র দর্শন করার দৃষ্টি লাভ করলেন? প্রহাদ মহারাজের মত শুদ্ধ ভক্তের সান্নিধ্য পাওয়া সত্ত্বেও কিভাবে হিরণ্যকশিপু সমস্ত কিছুতে ভগবানের অস্থিত্ব না থাকা বিষয়ে ধারণা অর্জন করলেন? মানুষ ভগবানকে পাওয়ার জন্য বনে, পর্বতের সুউচ্চে এবং দূর-দুরান্তে অনুসন্ধান করছে। সাধারণ প্রচলিত ধারণা হল ভগবান ঐসব স্থানেই অবস্থান করেন। অনেক সময় লোকদের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভগবানের কাছে প্রার্থনা নিবেদন করতে দেখা যায়। কেননা তাদের
ধারণা ভগবান আকাশে বিদ্যমান। রাশিয়ান মহাকাশ নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন যখন মহাকাশ থেকে ফিরে আসেন তখন তাকে প্রশ্ন করা হল, তিনি মহাশূন্যে ভগবানকে দেখতে পেয়েছিলেন কিনা? তার উত্তর ছিল ‘না’।
তবে প্রকৃতপক্ষে ভগবানের অস্থিত্ব কোথায়?
শিখা এবং এর আলো
আধুনিক সভ্যতা একটি বিষয় দাবি করে, “Seeing is believing” অর্থাৎ যদি ‘স্বচক্ষে দেখি তবেই বিশ্বাস করব।’ এটি অনেকটা সবার একটি মন্ত্রে রূপ নিয়েছে। এই তথাকথিত বাক্যটি চালু হয় ১৬ শতাব্দিতে রেঁনেসা যুগের সময়ে। এর পূর্বে এ মতবাদ ছিল না।
আমরা সর্বত্রই বাতাসের অস্থিত্ব উপলব্ধি করতে পারি কিন্তু এটি দেখতে পারি না। আমাদের পক্ষে এটি দেখা সম্ভব নয়। যদি তাই হয়, তবে আমরা কেন বলি ‘দেখলেই বিশ্বাস করব’।
বৈদিক শাস্ত্রে (বিষ্ণু পুরান ১.২২.৫৩) উল্লেখ আছে। ভগবান এক স্থানে অবস্থান করলেও তিনি সর্বত্রই বিরাজমান, যেমনটি একটি শিখা এক স্থান থেকে তার তাপ ও আলো ছড়ায়। মাঝে মাঝে এ সম্পর্কে সূর্যের দৃষ্টান্তও দেয়া হয়। ছান্দোগ্য উপনিষদ (৩/১৪/১) সিদ্ধান্ত দেয়, সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম-ভগবানের উর্ধ্বে কোন কিছুরই অস্থিত্ব নেই।
বিশ্বাস অর্জন
ভগবান যে আছেন এ বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান। যতই এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করব তত বেশি ভগবান যে আছেন তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব।
এ বিষয়ে বলা যায়, একজন ডাক্তার একটি রোগীর কি রোগ হয়েছে তা চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু যেহেতু রোগীর সেই জ্ঞান নেই তাই সে রোগ চিহ্নিত করতে পারে না। আবার একজন ভূতত্ত্ববিদ ভূমিকে শুধুমাত্র শুষ্ক ভূমি হিসেবে না দেখে এর নিচের স্তরের জলের অস্থিত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ এটিকে শুধুমাত্র শুস্ক মাটি হিসেবে দর্শন করবে। অনুরূপভাবে একজন আন্তরিক পারমার্থবাদী সবস্থানে ভগবানের অস্থিত্ব উপলব্ধি করতে পারে যা অন্যরা পারে না। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে এ সমস্ত পারমার্থবাদী ভগবানকে সর্বদা দর্শন করার যোগ্যতা অর্জন করে।
ভগবদ্গীতার ১৫/১০-এ বর্ণিত আছে, ‘ভগবান কৃষ্ণ বলছেন, বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষ: মূঢ় লোকেরা আমাকে উপলব্ধি করতে পারে না…… ‘কিন্তু যাদের আঁখিযুগল জ্ঞানের দ্বারা প্রশিক্ষিত হয়েছে তারা ভগবানকে সর্বত্র দর্শন করতে পারে।’
আধুনিক সভ্যতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য বেশ গর্বিত, বিশেষত তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।
সারা বিশ্বে পূর্বের চেয়ে আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। পূর্বের চেয়ে আরো অনেক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে। তাই বর্তমান যুগকে বলা হয় ‘তথ্য প্রযুক্তির যুগ’। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে যখন খুশি যে কোন তথ্য অনুসন্ধান করতে পারে। কিন্তু সেই ইন্টারনেটে ভগবান বিষয়ে অনুসন্ধান নিঃসন্দেহেই অনেকাংশে কম। তথ্য প্রযুক্তির যুগে গা ভাসিয়েও মানুষ ভগবানকে দর্শনের পথে সফলকামী নয়।
অন্যদিকে পারমার্থবাদীরা পারমার্থিক জ্ঞানের মাধ্যমে ভগবানকে দর্শন করে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। এটি অনেকটা একজন ব্যবসায়ীর মত যিনি সবখানেই দেখেন অর্থ আয়ের সুযোগ হিসেবে।
প্রহাদ মাতৃগর্ভেই নারদমুনির কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। সেই জ্ঞানের মাধ্যমে প্রহ্লাদ সর্বত্র ভগবানকে দর্শন করার যোগ্যতা লাভকরেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/২৯/১২) ভগবান কৃষ্ণ আমাদের মধ্যে এই ধরনের গুন অর্জনের জন্য অভিলাষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,
মামেব সর্বভূতেষু বহিরন্তর পাবৃতম্। ঈক্ষেতাত্মনি চাত্মানং যথা খমমলাশয়ঃ।
অনুবাদ: ভক্তের উচিত শুদ্ধ হৃদয়ে অন্তরে এবং বাইরে সর্বব্যাপ্ত আকাশের মতো, নিজের মধ্যে ও সমস্ত জীবের মধ্যে বর্তমান জড়কলুষশূন্য পরমাত্মারূপে আমাকে দর্শন করা।
তাই ভগবানকে দর্শনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য নারদ মুনির মত মহান ভগবদ্ভক্তদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সেই শিক্ষা অর্জন করতে হয়। যাদের মাধ্যমে ভগবানের কৃপাশির্বাদ বর্ষিত হয়।
ভগবানকে দর্শনের জন্য আচরণ
একসময় মহান আচার্য্য, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর একটি উদ্ধৃতি দেন, ‘ভগবানকে দেখার চেষ্টা করো না, পক্ষান্তরে এমনভাবে আচরণ কর যেন ভগবান তোমাকেই দর্শন করতে চায়।’ এ উদ্ধৃতি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। ভগবান নিজেকে সেই ব্যক্তির কাছেই প্রকাশ করেন যখন তিনি দেখেন ব্যক্তিটি যেকোন উপায়েই হোক তাকে উপলব্ধির আগ্রহ রয়েছে। সেই আগ্রহ প্রকাশ করার বাস্তবিক প্রক্রিয়া হল, তার প্রতি সেবা করতে কতটা প্রস্তুত সেটার উপর।যখন ইউরি গ্যাগারিন মহাশূন্যে ভগবানকে দেখেননি বলেন, তখন স্থানীয় এক ধর্মীয় গুরু তার প্রত্যুত্তর দেন, “তিনি এই পৃথিবীতেই কখনো ভগবানকে দেখতে পাননি, তবে মহাশূন্যে গিয়ে কিভাবে ভগবানকে দেখবেন?” এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ভগবানকে দেখার জন্য কোন ভৌগলিক স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না, বরং আমাদের মনের ফ্রেমকে পরিবর্তন করা প্রয়োজন, হিরণ্যকশিপু এবং প্রহ্লাদ মহারাজের মধ্যে এটিই ছিল পার্থক্য। হরেকৃষ্ণ।
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, ১ মে-২০১১ইং

