এই পোস্টটি 175 বার দেখা হয়েছে
প্রহ্লানন্দ স্বামী: আমাদের এই আশ্চর্যকর শরীরের দুটি দৈহিক রক্ষাকবচ রয়েছে যা আমাদের দেহকে বাহ্যিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। একটি হচ্ছে দেহের চর্ম যা বাইরের আঘাত ও রোগ জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করে। অন্যটি হচ্ছে আমাদের দেহের অভ্যন্তরে পাচক যন্ত্র।পাচকযন্ত্রের আভ্যন্তরস্থ অন্ধ্র অজীর্ণ খাদ্য উপাদানসমূহকে সরাসরি শরীরের টিস্যুতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। যেসমস্ত খাদ্য আমাদের শরীরের জন্য উপযুক্ত এবং সহজে পাচ্য হয় সেগুলো পরবর্তীতে আমাদের দেহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। অন্যথায় আমাদের শরীরের জন্য অনুপযুক্ত খাদ্যগুলো সম্পূর্ণ খাদ্য পাচন প্রক্রিয়ায় সমস্যার সৃষ্টি করে এবং এ সমস্ত খাদ্যগুলোকে পাচকযন্ত্র এলিয়েন বা আক্রমণকারী হিসেবে পরিগণিত করে। আমাদের দেহের এই সিস্টেম অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্ষাকর্তা, যা মূলত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মতে ‘অহংকার’ নামক এক জড় উপাদান দ্বারা পরিচালিত হয়। সংস্কৃত শব্দ অহংকারের অর্থ হচ্ছে ‘আমিই কর্তা’ (‘অহম্’ মানে আমি, ‘কার’ মানে কর্তা)। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (৯/১০) মতে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছে প্রকৃত কর্তা এবং শ্রীকৃষ্ণের যে শক্তি জাগতিক শক্তিসমূহকে পরিচালিত করে তা হচ্ছে ‘মায়া’। অহংকার হচ্ছে জড় অস্তিত্বের মূল কারণ এবং অহংকারের ফলে আমাদের দেহে দশটি ইন্দ্রিয়ের সমাবেশ হয়। যদিও আমাদের দেহে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষ রয়েছে যেগুলো সূস্থ দেহে একটি অন্যটির সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি ও পরিবহনের মাধ্যমে কাজ করে চলেছে। যদিও এটি দেহের বাইরের শক্তি দ্বারা খুব স্বাভাবিক এবং সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে চলছে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি শক্তিশালী হয় তবে আমাদের দেহ এবং মনে কোন নেতিবাচক রশ্মি বা প্রভাব প্রবেশ করতে পারে না ফলে দেহ সুস্থ থাকে। সুতরাং আমাদের খাদ্য পরিপাক সিস্টেমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে খাদ্য নির্বাচন। বৈদিক তথা আয়ুর্বেদ মতে আমরা যা হজম করতে সক্ষম তাকে খাদ্য বলে এবং যা আমরা পারি না তা হল ‘বিষ’ এবং যা আমাদের খাদ্য হজমে সহায়তা করে তা হল ‘ঔষধ’। জিহ্বায় খাবার স্পর্শ করা মাত্রই খাদ্যের পরিপাক ক্রিয়া শুরু হয়। জিহ্বায় স্পর্শ করা মাত্রই জিহ্বা থেকে আমাদের মস্তিস্কে এবং পাকস্থলীতে খাবারের প্রকৃতি সম্পর্কিত তথ্য পৌছে যায় এবং তৎক্ষণাৎ পাকস্থলী সঠিক রস বা এনজাইম নিঃসরণের প্রস্তুতি শুরু করে। অপরিপক্ক খাবার পুষ্টি যোগানের পরিবর্তে ‘অম’ নামক বিষ সৃষ্টি করে যেটি থেকে বিভিন্ন পরজীবি, জীবাণু তথা ভাইরাস উৎপন্ন হয় এবং কোটি কোটি সংখ্যায় সমগ্র দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেহযন্ত্রের পদ্ধতি ভঙ্গুর করে রোগের সংক্রমণ ঘটায়। সুতরাং আমাদের সুস্থ দেহ লাভের উপায় হচ্ছে বুদ্ধিমত্তার সাথে উপযুক্ত জীবনধারা এবং খাদ্যভ্যাস গঠন করা।
সাধারণত খাদ্য পরিপাকের পেছনে কাজ করে ৪ ধরনের পরিপাক অগ্নি। সেগুলো হল: শম অগ্নি, বিশজ্ঞ অগ্নি, তীক্ষ্ম অগ্নি, মণ্ড অগ্নি।
শম অগ্নি: এই অগ্নি ভারসাম্যপূর্ণ এবং খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ দেহের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট পন্থায় পরিপাককৃত ও শোষিত হয়।
বিশজ্ঞ অগ্নি: এই অগ্নি পরিবর্তনশীল। যে সমস্ত ব্যক্তির মধ্যে এই ধরনের অগ্নি রয়েছে তাদের মাঝে মাঝে কোষ্টবদ্ধতা দেখা দেয় আবার মাঝেমাঝে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়। এই ধরনের অগ্নি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ‘ভত্ত’ দোষ দেখা যায়।
তীক্ষ্ম অগ্নি: এই অগ্নির মাত্রা খুব উচ্চ। এই পরিপাক অগ্নির মাত্রা এতই বেশি যে মাঝে মাঝে খাবার এবং এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুড়ে যায়, এমনকি বিপুল পরিমাণ খাদ্য খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে হজম হয়ে যায়। এই পরিপাক অগ্নি থাকা ব্যক্তিগণ সবসময় ক্ষুদার্থ এবং বেশি পরিমাণ খাবার খেয়ে থাকেন। কিন্ত অধিকাংশ খাবারই ভস্মিভূত হয় এবং অল্প পরিমাণ খাদ্য উপাদান হজম হয়। তীক্ষ্ম অগ্নিতে সাধারণত পিত্ত দোষ দেখা যায়
মণ্ড অগ্নি : এই অগ্নির মাত্রা নিম্ন। পরিপাক খুবই ধীর গতিতে হয় এবং খাবার অপরিপক্ক থাকে এবং বদহজম হয়। মণ্ড অগ্নিতে কফ দোষ দেখা যায়।
দেহের সুনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা এবং খাদ্যাভ্যাস থাকলে শরীরে ‘শম অগ্নি’ উৎপন্ন হয়। যা সবচেয়ে উপযুক্ত। ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণও পরিণত জীবনধারার গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন (৬/১৭), পরিপাককৃত খাবার দেহে ৭টি ভিন্ন ধরনের টিস্যুতে পরিণত হয় যা দেহকে সহায়তা করে। এই ৭টি টিস্যুকে বলা হয় সপ্ত ধাতু। এগুলো জাগতিক দেহ এবং সূক্ষ্মদেহের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এই সপ্ত ধাতু হল:
১) রস (প্লাজমা) ২) রক্ত ৩) মাংস ৪) মেদ (Fat) ৫) অস্থি (দেহের হাড়) ৬) মজ্জা ৭) শুক্র এবং অর্থব (নারী এবং পুরুষের বংশবদ্ধির উপাদান)।
যখন এই সপ্ত ধাতু শক্তিশালী এবং স্ববিন্যস্ত থাকে তখন এক বিশেষ শক্তি উৎপন্ন হয় যাকে বলা হয় ‘ওজ’। যদি ‘ওজ’ দেহে শক্তিশালী হয় তবে পরিপাক অগ্নিগুলো ভারসাম্য লাভ করে এবং শারীরিক যেসমস্ত কর্ম, দেহ ও মনকে স্বাস্থ্যবান রাখে সেগুলো বলবান হয়।’ওজ’ সাধারণত ‘তেজ’ এবং ‘প্রাণ’ নামক শক্তির বর্ধনে সহায়তা করে। ‘তেজ’ নামক শক্তি দেহের পরিপাক অগ্নিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমস্ত রকমের পরিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে প্রাণ নামক শক্তি দেহের পরিপাক অগ্নিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমস্ত রকমের পরিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে প্রাণ নামক শক্তি দেহের চলাচল ও কার্যক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
শুক্র (Semen) এবং অর্থব (Ovum) পুনঃ পুন শোধনের পর সারবস্তু হিসেবে ওজ তৈরি করে। আমাদের দেহের ধাতুসমূহে যদি সঠিক পরিপাকক্রিয়ার অভাব দেখা দেয় তবে শুক্র এবং অর্থব উৎপাদনে ত্রুটি হয়।
বিশেষ নোট: আমাদের দেহে থাকা যে ৪টি পরিপাক অগ্নির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি কিন্তু কাঠ পোড়ানো অগ্নি নয়। এই অগ্নিকে জঠর অগ্নিও বলা হয়। কেননা এই অগ্নির উত্তাপ খাদ্য পরিপাক ক্রিয়ায় সহায়তা করে। আমাদের দেহের স্বাভাবিক উত্তাপ এই অগ্নির প্রতিক্রিয়া মাত্র। আগামী সংখ্যায় আয়ুর্বেদিক খাদ্যাভ্যাস প্রণালীর আরো নানা অজানা তথ্য প্রকাশিত হবে। এই কলাম সম্পর্কিত আপনাদের যেকোন মন্তব্য, পরামর্শ, জিজ্ঞাসা আমাদের জানাতে পারেন চিঠিতে কিংবা ইমেইলে। হরেকৃষ্ণ।
