এই পোস্টটি 57 বার দেখা হয়েছে
দামোদর দাস: একসময় বিশ্ববাসীর কাছে বিশাল পরাক্রমশালী সেনা অধিপতি হিসেবে তিনি খ্যাত ছিলেন। লোকেরা তাকে বলত, সিংহের মত শক্তিশালী। ধনুক এবং তীর হাতে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য, অপ্রতিরোধ্য। শত ফুট সুউচ্চে দণ্ডায়মান চক্রে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুকে সরাসরি দর্শন না করে শুধুমাত্র জলে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিবিম্ব লক্ষ্য করে লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন। কারো বা কোন কিছুর সাহায্য ছাড়াই একাই বহু চৌকস সৈন্যদের অনায়াসে পরাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু আজ তার কি হল! যুদ্ধের প্রারম্ভে প্রতিদ্বন্দ্বী সেনাদলের মধ্যে দাড়িয়ে তিনি এখন বিষাদগ্রস্থ। চরম উদ্বিগ্নতায় তার দেহ কাঁপছে। যদিও (খুব সম্ভবত ভীষ্মদেব ছাড়া) প্রতিপক্ষের অন্য সমস্ত বীর, রথী, মহারথীদের তিনি সহজেই পরাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে, তিনি ভীষ্মদেবের যুদ্ধ পারদর্শিতা নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তবে তার উদ্বিগ্নতার কি রহস্য! কেন তিনি যুদ্ধ করার সমস্ত শক্তি ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন? কারণ তিনি সম্মুখীন হয়েছেন এমন এক সুবিশাল যুদ্ধে যেখানে তার প্রতিপক্ষ ছিল পিতামহ, শ্বশুর, ভ্রাতা, পিতৃভ্রাতা এবং পরমারাধ্য গুরুদেব যার চরণাশ্রিত হয়ে তিনি গ্রহণ করেছিলেন যুদ্ধের রণকৌশল। তাঁর ধনুর্বান খসে পড়ছিল, শরীর জ্বালা করছিল। তিনি প্রকম্পিত হচ্ছিলেন কেননা তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন না এই যুদ্ধ তার জন্য কি সুফল নিয়ে আসতে পারে? সমগ্র সমাজ, সংস্কৃতি, উত্তরাধিকারি ও পিতৃপুরুষদের হত্যা করার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই বিজয় এর সার্থকতাই বা কি। অতএব তিনি সিদ্ধান্ত নেন রনাঙ্গণ পরিত্যাগ পূর্বক বনে গমন করে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার। কেননা পরিজনের রক্তে রঞ্জিত বিজয় অপেক্ষা পরের দানে জীবিকা নির্বাহ অধিকতর শ্রেয়স্কর। কাকা, ভ্রাতা, আচার্য, এই নামের দ্বারা পরিব্যাপ্ত সামাজিক সম্পর্কের জাল যা তাকে পূর্বে আনন্দ প্রদান করেছিল আজ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারাই তাকে বিব্রতকর ও বেদনাদায়ক অবস্থায় পর্যবসিত করছে। কিভাবে তিনি তাদের হত্যা করবেন? তিনি নামের দ্বারা সমস্ত শত্রুদের চিহ্নিত করতে পারেন, এই নাম তার কাছে বিস্ময়কর (যেমন-দুর্যোধন, ভুরিশ্রবা, কর্ণ, দ্রোন)। অর্জুনের আত্মানুসন্ধানের এই প্রক্রিয়ার বিশদ বর্ণনা রয়েছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শুরুতেই। সামাজিক উপাধি নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জালে আবদ্ধ অর্জুন তখন তার উপাধিগুলো পরিবর্তন করতে প্রয়াসী হন, যেমন-সৈন্য থেকে ভিখারি। কিন্তু তার পরম বিশ্বস্ত মিত্র ও অভ্রান্ত আচার্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে যুক্তি দ্বারা প্রদর্শন করলেন যে ভিক্ষুক হোন বা যাই হোন তবুও তিনি সুখি হতে পারবেন না। অতএব তার এই বিষাদগ্রস্থতা হতে পরিত্রানের নিমিত্তে তাকে উপদেশ দেন ক্ষত্রিয়, ভিক্ষুক, শিষ্য ইত্যাদি সমস্ত জাগতিক নামসমূহ পরিত্যাগ পূর্বক সত্যিকার সত্তার অনুসন্ধান ও উচ্চতর আত্মোপলব্ধির জ্ঞান আহরণে সুগভীর মননশীলতার মনোনিবেশ করতে অন্যথায় তার জীবনে তাকে আরো উদ্বিগ্নতায় পর্যবসিত হতে হবে।
আমাদের জীবনেও এটি ধ্রুব সত্য। আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই নামের দ্বারা পরিচায়িত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এটি ১টি সাধারণ বিষয়। যেমন-কেউ যদি আপনাকে প্রশ্ন করে আপনি কে? নিশ্চয় এর উত্তরে আপনি আপনার নামই বলবেন। নাম হচ্ছে নিজেকে পরিচায়িত করার অন্যতম উপায়। নাম যদি না থাকত তবে সত্যিই অচলাবস্থার সৃষ্টি হত। যদিও শেকস্পিয়র বলেছিলেন, ‘নামে কি আসে যায়/গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সে একই সৌরভ ছড়াবে।’ কিন্তু তা কতটুকু সত্যি বিশেষ করে একজন মানুষের ক্ষেত্রে? আমেরিকায় ‘হ্যান্ডল’ ১টি বাজে শব্দ, কিন্তু কিন্তু অন্য দেশে এটি ভাল শব্দ হিসেবে বিবেচিত, এর অর্থ ‘নিয়ন্ত্রণ করা’। নামও মানব সমাজকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। মনস্তত্ত্ববিদ রোলো তার এক রোগীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “আমরা হচ্ছি বহু দর্পনের সমাবেশ, আমরা অন্যদের প্রত্যাশা মত প্রতিফলিত হচ্ছি।
গীতার তাৎপর্যে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন-আমেরিকান, ভারতীয়, জার্মানিয়ান, ইংরেজ, পুরুষ-মহিলা, মানুষ, কুকুর প্রভৃতি মর্মার্থহীন উপাধিমাত্র। শুধুমাত্র আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে আমরা সমস্ত নামের আবর্তন হতে মুক্ত হতে পারি। একসময় শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ নামে দুটি ব্যাপক বিভেদমূলক ছিল যার ধারাবাহিকতা বহুলাংশে কমলেও এখনও অনেক বিদ্যমান। অর্জুনও পতিত হয়েছিলেন এই কৃত্রিম নামের দ্বন্দ্বে। কি আশ্চর্য এই নামের দ্বন্দ্ব। কারণ অন্যরা এই নামে আখ্যায়িত করছে যা আমাকে বিশেষ অবস্থায় বিশেষ অবস্থানে দাড় করিয়েছে এবং আমাকে চাপ দিচ্ছে দন্দ্বে জড়িত হতে। আমি আকে অস্বীকারও করতে পারিনা কেননা এর সাথে সামাজিক সম্পর্ক, দায়বদ্ধতাও জড়িত রয়েছে। এভাবে এথেন বনাম স্প্যাটার্ন, ক্যাথলিক বনাম প্রোটিস্ট, কৃষ্ণাঙ্গ বনাম শ্বেতাঙ্গ, পুরুষ বনাম মহিলা, মালিক বনাম শ্রমিক ইত্যাদি দ্বন্দ্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের সত্যিকার অধিকার নিয়ে কেউই সংগ্রাম করছি না। এটা ঠিক যে, আমরা আমাদের নামগুলোকে পরিবর্তন করতে পারি। বয়সের ভিত্তিতে কারো উপাধি পরিবর্তন হয়। শিক্ষার ভিত্তিতে উপাধি পরিবর্তন হয়। সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন হয়। আরো আশ্চর্য হচ্ছে মানুষ স্বেচ্ছায় তার লিঙ্গ পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলছে। অভিবাসনের ভিত্তিতেও নামের পরিবর্তন করে। কিন্তু এই সমস্ত কিছুই আমাদেরকে উদ্বিগ্নতা ও অসন্তোষ এর প্রতিক্রিয়া হতে নিবৃত্ত করতে পারবে না।
গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, জড়া প্রকৃতির স্থায়িত্ব নেই এবং অন্তপ্রকৃতির বিনাশ নেই। অর্থাৎ যা পরিবর্তনশীলতা অবাস্তব এবং যা অপরিবর্তনশীল তাই বাস্তব। সুতরাং নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা নামের আবর্তন হতে বেরিয়ে সত্যিকার সত্তা সম্পর্কে অবগত হতে পারিনা। তবে এমন কোন নাম কি রয়েছে? যা অপরিবর্তনীয়। যা আমাকে আমার সঠিক দিকে ধাবিত করবে, আমার সত্যিকার পরিচয় প্রদান করবে। সত্যিকার আত্মসচেতনতা বোধ জাগ্রত করা কঠিন নয়। প্রশ্ন করুন আমার আসল পরিচয় কি? আমি একজন মানুষ। মানুষ নামটি অন্তত এই জীবদ্দশায় অপরিবর্তনীয়। এই শব্দের সারাংশ কি? কেন মানুষ অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে ভিন্ন? বিভিন্ন দার্শনিক এই ‘মানুষ’ নামকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। রোলো বলেছেন, ‘মানুষ হচ্ছে অন্যান্য প্রাণীদের থেকে ভিন্নতর, কেননা তার মধ্যে রয়েছে আত্মসচেতনতা, নিজের সত্যিকারের সত্তাকে জানার ক্ষমতাই (আত্মোপলব্ধি) তাকে উন্নত করেছে।প্লেটো বলেছেন, ‘আত্মোপলব্ধির জ্ঞান হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের সার, আমি তার থেকে জ্ঞান গ্রহনে আগ্রহী’ যিনি আত্মোপলব্ধির চেষ্টায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমাদের অনুসন্ধানের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো ত্রুটিপূর্ণ বলে আমাদের উচিত বৈদিক সাহিত্য হতে পূর্ণাঙ্গ অর্থ গ্রহণ করা। সেখানে বলা হয়েছে আত্মোপলব্ধিই হচ্ছে মানব জীবনের ধর্ম। যেমনটা সাঁতার কাটা হচ্ছে মাছের ধর্ম, উড়া হচ্ছে পাখির ধর্ম। আমাদের শরীর জড়া প্রকৃতির সৃষ্টি অনেকটা মেশিনের মত কিন্তু এতে অনুভূতি রয়েছে। আমরা আমাদের
জীবনের বেদনাদায়ক অনুভূতিগুলো অবজ্ঞা করতে পারি না। গীতার তাৎপর্যে প্রভুপাদ বলেছেন, “সকলেই বিভিন্নভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, অর্জুনও কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে কষ্ট পাচ্ছিলেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হচ্ছিলেন ততক্ষণ, শান্ত হতে পারছিলেন না।” কেননা আমরা অন্তপ্রকৃতির অধিবাসী হয়েও জড়া প্রকৃতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। অনেকটা জলের মাছ যেমন ডাঙ্গায় কষ্ট পায় তেমনটি। এদের মধ্যে কিছু উত্তম অধিকারীর মানুষ রয়েছে যারা অনুসন্ধান করে তারা কে? তারা এখানে কেন? কেন তারা কষ্ট পাচ্ছে? কিন্তু সামান্যই এ সমস্ত অবস্থা থেকে উত্তরনের প্রয়াসী হন। কিন্তু তাদেরকে মানুষ বলা যায় না কেননা মনুষ্যত্ব তখনই অর্জন হয় যখন এসমস্ত অনুসন্ধান তার মনকে আত্মোপলব্ধির জন্য সচেতন করে তোলে। সমস্ত জীবের মধ্যে মানুষই শুধুমাত্র জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং সমস্ত নামের মায়াজনিত ভ্রম এর শৃঙ্খল ভেঙ্গে সত্যিকার আনন্দ উপভোগ করতে পারে। কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সুবিস্তৃত আত্মোপলব্ধির জ্ঞান দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তোমার জন্ম নেই, তোমার মৃত্যুও হবে না। মৃত্যু হবে শরীরের। মানুষ যেমন পুরাতন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে আত্মাও পুরাতন শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে। কৃষ্ণ, অর্জুনের দুর্দশার কারণ নির্ণয় করে, তাকে সত্যিকারের উপলব্ধি দিয়েছিলেন। নামের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তাকে দিয়েছিলেন উচ্চতর আত্মোপলব্ধির জ্ঞান। যা সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের উর্ধ্বে ও অভ্রান্ত এবং যার মাধ্যমে অর্জুন তার সত্যিকার সত্তাকে চিনতে পেরে হয়েছিলেন পূর্ন সন্তুষ্ট। অন্যকথায় তিনি তার সত্যিকার অপ্রাকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তিনি সৈনিক নন, তিনি ভিখারি নন, শিষ্যও নন। তিনি হচ্ছে সমস্ত আনন্দের উৎস ভগবানের নিত্য দাস। এটিই তার আসল পরিচয় এবং এভাবেই অর্জুন তার উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। আজকের দিনে যে কেউ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন এর আলোচনা অধ্যয়ন করে অর্জুনের মতই উপকৃত হতে পারে এবং অনাদিকাল হতে নির্ধারিত তার সত্যিকার নাম ‘কৃষ্ণের দাস’ দ্বারা নিজেকে আখ্যায়িত করতে পারে। হরে কৃষ্ণ।
