শ্রীশ্রী গৌরমণ্ডল দর্শন : বঙ্গদেশ চাঁটিগ্রাম

0
123

শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম

শচীদুলাল প্রেমসাগর দাস


চট্টগ্রামের বৈষ্ণবীয় ইতিহাস (আবির্ভাব ভূমি)

১. চক্রশাল (বিদ্যানিধির শাসনাধীন অঞ্চলের নাম) বা মেখল পুণ্ডরীক ধাম (হাটহাজারি)
=শ্রী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি (কৃষ্ণলীলায় শ্রীমতী রাধারানির পিতা বৃষভানু মহারাজ)
২. বেলেটী (বাঁশখালী থানার অন্তর্গত বাণীগ্রাম [কথিত]) শ্রী গদাধর পণ্ডিতের (কৃষ্ণলীলায় শ্রীমতী রাধারানি)
৩. ছনহরা গ্রাম (পটিয়া) = বাসুদেব-মুকুন্দ দত্তের (কৃষ্ণলীলায় মধুব্রত ও মধুকণ্ঠ), (বাসুদেব দত্ত সত্যযুগে প্রহ্লাদ মহারাজের প্রকাশ)
৪. বিনাজুরী (রাউজান) = শ্রী জগৎ চন্দ্র গোস্বামী [চৈতন্য লীলায় মহাপ্রভুর মন্ত্ৰ শিষ্য (গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানের ভাষ্যানুসারে)]
৫. জারগ্রাম (পথেরহাট, নোয়াপাড়া) = শ্রী ধনঞ্জয় পণ্ডিত (কৃষ্ণ লীলায় বলরাম পার্ষদ দ্বাদশ গোপালের অন্যতম বসুধাম সখা)


চৈতন্য এব সঙ্কর্ষণঃ বাসুদেবঃ পরমেষ্ঠী রুদ্রঃ। শুক্রো বৃহস্পতিঃ সর্ব্বদেবঃ সর্বাণি স্থাবরাণি চরাচরাণি চ যৎকিঞ্চিৎ সদসৎ করণং সর্ব্বম।

“শ্রীচৈতন্যদেবই সঙ্কর্ষণ ও বাসুদেব, তার থেকে ব্রহ্মা, রুদ্র, ইন্দ্র, বৃহস্পতিসহ সর্ব দেবতা বিনির্গত হয়। তিনি সচল-অচল ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের স্তর ও নিত্য অস্তিত্বের স্তরের জীব সকল জীবসত্তার উদ্ভবের কারণ।” অথর্ববেদ, পিপ্পলাদ্ শাখা, শ্লোক-১৫

কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্ৰপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ।।

-“এই কলিযুগে সুমেধাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ অবিরাম কৃষ্ণ-কীর্তনকারী ভগবানের অবতারকে আরাধনা করার জন্য সংকীর্তন যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। যদিও তাঁর গায়ের বর্ণ অ-কৃষ্ণ (গৌরােজ্জ্বল), তবুও তিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তিনি তাঁর সঙ্গী, সেবক এবং অন্তরঙ্গ পার্ষদে পরিবৃত।” শ্রীমদ্ভাগবত ১১/৫/৩২

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু নিজ ধামসহ সর্বযুগের সব অবতার এক সঙ্গে নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে। সেই সব ভক্তগণের অধিকাংশই বঙ্গদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকট হয়ে অপ্রাকৃত লীলা প্রকাশ করে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সংকীর্তনে অংশগ্রহণ করলেন এবং বঙ্গদেশকে মহান তীর্থে পরিণত করলেন। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর পার্ষদবর্গ যে সমস্ত স্থানে অবতীর্ণ হয়ে লীলাবিলাস করেছেন সেই স্থানকেই গৌড়মণ্ডল ভূমি বলা হয়। যদিও গৌড়মণ্ডল ভূমির আয়তন জড় ইন্দ্রিয়ের দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না। তথাপিও পূর্বতন আচার্য এর সীমা নির্ধারণ করেছেন- দক্ষিণ-পশ্চিমে রেমুণা, উক্তর-পশ্চিমে (কানাই নাটশালার পশ্চিম) মন্দার পর্বত, উত্তর-পূর্বে সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বে পুণ্ডরীক ধাম। গৌড়মণ্ডল ভূমির মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বৈষ্ণব আচার্য চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমাবতার শ্রীল নরােত্তম দাস ঠাকুর তাঁর প্রার্থনা গীতিতে বলেছেন-

“শ্রীগৌড়মণ্ডল ভূমি যেবা জানে চিন্তামণি। তাঁর হয় ব্রজভূমে বাস ॥
গৌরাঙ্গের সঙ্গিগণে নিত্যসিদ্ধ করিমানে। সে যায় ব্রজেন্দ্রসুত পাশ ॥”

– গৌড়মণ্ডল এবং ব্রজমণ্ডল অভিন্ন। ব্রজের পার্ষদবৃন্দই বঙ্গদেশে প্রকট হয়ে ব্রজের শ্রীরাসবিলাসের ভাব উদ্দীপনে সংকীর্তন বিলাস করত বঙ্গদেশকে মহা মহিমা তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করেছেন।

পাণ্ডব বর্জিত বলে খ্যাত চাঁটিগ্রাম প্রকাশ চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের চট্টগ্রামকে প্রেমবন্যায় প্লাবিত করার উদ্দেশ্যে এখানে মহাপ্রভুর বহু পার্ষদ আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর, বাসুদেব দত্ত, মুকুন্দ দত্ত, গদাধর পণ্ডিত, জগৎচন্দ্র গােস্বামী, ধনঞ্জয় পণ্ডিত প্রমুখ।

ইসকনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর গৌড়মণ্ডলের অপ্রাকৃত মহিমা ও শ্রীধামসমূহের গুরুত্ব পাঠ করে শ্রীধামসমূহ দর্শনের জন্য আমার হৃদয়ে অভিলাষ জন্মে। আমার অভিপ্রায় হয় লােকচক্ষুর অন্তরালে থাকা হীরক খণ্ড সদৃশ অপ্রাকৃত ধামসমূহকে পাঠকদের দৃষ্টিগােচর করা। সেই উদ্দেশ্যে প্রাণেশ্বর পরমাত্মা প্রভু, ব্যাক টু গডহেড প্রতিনিধি ভক্ত আনন্দ ও ভক্ত প্রবালকে সাথে নিয়ে মে মাসের এক রৌদ্রোজ্জ্বল। দিনে চাঁটিগ্রাম (প্রকাশ-চট্টগ্রাম)-এর পবিত্র ধামসমূহ দর্শনে যাত্রা শুরু করি।

শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম

পথ নির্দেশ : শ্রীপাট মেখল বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৮ কিলােমিটার উত্তরে হাটহাজারি থানার অন্তর্গত। চট্টগ্রাম শহর থেকে বাসে সরাসরি হাটহাজারিতে নেমে টেম্পাে বা হাঁটাপথে দুই কিলােমিটার গেলেই এই শ্রীপাটে আসা যায়। অথবা চট্টগ্রাম শহর থেকে সরাসরি অটোরিকশাযােগে এই শ্রীধামে আসা যায়।

পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি কে? 

যে রাধাভাবে বিভাের হয়ে প্রেমের বস্তুনিষ্ট ভগবত প্রেম জগতে প্রবর্তনের নিমিত্তে কলির প্রথম সন্ধ্যায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে অবতীর্ণ হয়েছে, তার পূর্ব অন্ত ভাবের আশ্রয় স্বরূপ ছিলেন শ্রীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর মহাশয়। ব্রজমণ্ডলে যিনি বৃষভানু মহারাজ তিনিই অধুনা পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি রূপে প্রকটিত হয়েছেন। ষড় গােস্বামীর অন্যতম শ্রীল জীব গােস্বামীপাদ বলেছেন-

ধ্যেয়ং পুন্ডরীকং প্রেমনিধিং সর্ব্ব বন্দিতম/
বৃষভানু মহারাজং দ্বাপরে ব্রজমণ্ডলে/
ত্রেতায়াং জনকং যং রাজির্ষং হি বৃহস্পতিম।।

শ্ৰীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি প্রেমের প্রকাশস্বরূপ বন্দিত হন দ্বাপরে বৃষভানু মহারাজ হিসেবে এবং ত্রেতায় রাজর্ষি জনক হিসেবে।

শ্রীমৎ কবিকর্ণপুর তাঁকে বৃষভানু রাজা সম্বোধনেই আনন্দ পেতেন। রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলে বিদ্যানিধির পূর্ব পুরুষগণের স্থিতি বর্তমান ছিল। উনারা চতুঃ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অন্যতম, ব্রহ্মমধ্ব গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের পুনঃ প্রবর্তক আচার্য মধ্বাচার্যের বংশবতাংশ। চৈতন্য লীলার অপূর্ব লীলা সমন্বয়ক শ্রীল বিদ্যানিধি ঠাকুর প্রসঙ্গে শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর চৈতন্য ভাগবতে বর্ণনা করেছেন :

চাঁটিগ্রামে জন্ম বিপ্র পরম পণ্ডিত। পরম-স্বধর্ম সর্বলােক-অপেক্ষিত।। ……..
গঙ্গাস্নান না করেন পাদস্পর্শ ভয়ে। গঙ্গা দরশন করে নিশার সময়ে ।

(চৈতন্য ভাঃ মধ্যঃ ৭/২৩-২৮)

অপূর্ব আত্মদর্শন নিয়ে যিনি গঙ্গায় মানুষের অনাচার সহ্য করতে পারতেন না, মাতৃ অঙ্গে পাদ স্পর্শ ভয়ে গঙ্গায় নামতেন না, ভগবত অৰ্চনের পূর্বে রসপুষ্ট আত্মানন্দ হেতু গঙ্গার পবিত্র জল পান করতেন তিনি পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর মহাশয়।

পরম অদ্ভুত তাঁর সকল চরিত্র। তাঁর নাম শ্রবণেও সংসার পবিত্র । (চৈতন্য ভাঃ) পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি আর গদাধর, এই দুই আমার নিত্য কলেবর ।। (চৈতন্য ভাঃ)

রসমাতৃক বহু চিন্ময় গুণের সমাহার দেখে মহাপ্রভু তাঁকে প্রেমনিধি, পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি, গুণনিধি, ক্ষণে ক্ষণে আচার্যনিধি নামে অভিহিত করে আনন্দ লাভ করতেন। সর্বপ্রকার অপরাধের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব অপরাধ করার পরেও যিনি মহা সমুদ্রের মত ক্ষোভিত না হয়ে, পরম ঔদার্যে (রাধা ঠাকুরানির অবতার) গদাধর পণ্ডিতকে করুনায় আশ্রয় দিয়েছেন বলে, তিনি দয়ানিধি নামেও খ্যাত। কলির করুনার্ণ অবতারী শ্রী গৌরহরি নিত্য সঙ্গসুখ লাভের আত্মামানসে, পূর্বরাগের বশবর্তী হয়ে যাঁর অমিয় নাম ধরে রােদন পূর্বক “পুণ্ডরীক বাপ্রে” বলে আর্তনাদ করতেন তিনিই পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর।

পুণ্ডরীক ধামের ইতিহাস

পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির পূর্বপুরুষগণ কর্ণাটকের অধিবাসী ছিলেন। পরবর্তীতে তার পিতা বরেন্দ্র অঞ্চল নামে পরিচিত বর্তমান রাজশাহী অঞ্চলের রাজগুরু পদে অভিষিক্ত হন। তারা ছিলেন মধ্বাচার্যের বংশধর। তাঁর পিতা আগে শক্তিসাধক ছিলেন। অর্থাৎ শিব এবং দুর্গার মিলিত রূপের সাধনা করতেন। পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির পিতা বানেশ্বর পণ্ডিত ও মা গঙ্গাদেবী চট্টগ্রামে আসেন আদিনাথ দর্শনের জন্য। বর্তমানের মেখলা ছিল তৎকালীন রাজা রামসেনের রাজধানী। তখন বর্তমানের কর্ণফুলী ছিল হালদা নদীতেই। অর্থাৎ হালদাই ছিল প্রাচীন কর্ণফুলী এবং সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী, বঙ্গোপসাগর হয়ে আদিনাথ যাওয়ার পথে মেখলার পাশ দিয়ে যেতে হতাে। তিনি যেহেতু রাজগুরু ছিলেন সেহেতু বরেন্দ্র রাজা তাকে রাজকীয় নৌকা বা দিয়ে পাঠিয়েছেন। তখন হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের আক্রমণে ঐ নৌকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রাজা রামসেন শুনেছেন বরেন্দ্র রাজার রাজগুরু বানেশ্বর পণ্ডিত (পুন্ডরীক বিদ্যানিধির পিতা) এসেছেন এবং ঐ গুরু মহাশয়কে দেখে, উনার পাঠ শুনে রামসেনের হৃদয়ে শ্রদ্ধা জাগে। ফলে তিনি বানেশ্বর পণ্ডিতের নিকট থেকে দীক্ষা নিতে মনস্থ হলেন এবং সেখানেই থেকে যাবার প্রস্তাব দিলে বানেশ্বর পণ্ডিত বললেন, তােমার অকৃত্রিম সেবায় আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। তবে আমি আদিনাথ যাচ্ছি, যদি সেখানের আদিনাথ বলেন তাহলে আমি তােমাকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করব। তারপর সেই মেরামতকৃত বা নিয়েই তিনি আদিনাথ গেলেন এবং সেখানে স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হলেন যে, তুমি ফিরে যাওয়ার পথেই রামসেনকে দীক্ষা দেবে। মেখলাতেই তুমি অবস্থান করবে। খুব শীঘ্রই তােমার একটি পুত্র প্রকটিত হবে। সেই পুত্রের নাম রাখবে পুণুডরীক। তারপর স্বপ্নে একটি শ্বেতপদ্ম উনার সহধর্মিণীর গর্ভে ছােয়ালেন। পুণ্ড মানে পদ্ম। পুণ্ডরীক মানে পদ্মের মতাে চোখ। এজন্য পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির প্রণাম মন্ত্র শ্রীল জীব গােস্বামীপাদ বলছেন-

ওঁ নমস্তে শ্রী পুণ্ডরীকায় কৃষ্ণ-প্রেম প্রদায়। শ্রী মাধবেন্দ্র-সেবকায় মহাবদান্যায়তে।।… বন্দে বিদ্যানিধিং সদাশিবং শ্রীগর্ভমেবচ। শ্রীনিধিং বুদ্ধিমন্তং চ শ্রীল শুক্লাম্বরং পরম।।

পদ্মফুলের মতাে তার চক্ষুদ্বয় এবং জ্যোতির্ময়। তিনি কৃষ্ণভক্তিতে সাগরের মত প্রশান্তময়। আমি প্রণাম করছি যিনি তম আর্তিকে হরণ করেন। আমি তার স্মরণ গ্রহণ করছি।

রাজা রামসেন দীক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে গুরুদক্ষিণা হিসেবে পুরাে রাজধানীটিই দান করে দিলেন। ত্রিপুরা থেকে শুরু করে আসামের কিছু অংশ, হাতিয়া, ফেনী পর্যন্ত ছিল রাজা রামসেনের রাজত্ব। রাজা রামসেন হাতিয়া থেকে শুরু করে মেখলা থেকে পূর্ব দিকে প্রায় চার ক্রোশ এবং পটিয়ার ছনহরা পর্যন্ত যেখানে বাসুদেব, মুকুন্দ দত্তের জন্মস্থান সেখান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমি নিঙ্কর দান করে দিলেন বানেশ্বর পণ্ডিতকে। অর্থাৎ এই জায়গার কোনাে কর দিতে হবে না। উল্লেখ্য, বাসুদেব দত্ত ও মুকুন্দ দত্তের পিতা ছিলেন অত্র অঞ্চলের উপ-জমিদার।

শ্ৰী পুণ্ডরীক ধাম-যা গৌড়মণ্ডলের বর্ষাণা স্বরূপ-কলৌঃ বৃষভানু অবতার শ্রীল পুণ্ডরীক প্রেমনিধির অপ্রাকৃত লীলাবিলাসস্থল। শ্রীকৃষ্ণের চরণে শুদ্ধভক্তি প্রাপ্তির জন্য শ্রীধাম ভক্তদের জীবনে আবশ্যকীয় ক্ষেত্র। শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধামে অদ্যপি শ্রীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ও গৌর পার্ষদদের শাশ্বত অপ্রাকৃত লীলাবিলাস নিত্য বিরাজমান।


শ্রী গৌরমণ্ডল ধামের মাহাত্ম্য

গোলক বৃন্দাবনের কন্টকাবৃত বৃক্ষরাজীর দ্বারা আবৃত বিরজার কুঞ্জে যাত্রাপথে পদ্মপাপড়ী সদৃশ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম আঘাত প্রাপ্ত হয় বিধায় এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সর্বদাই বশীভূত রাখার প্রত্যয়ে শ্রীমতি রাধারানি এমন একটি মনোরম স্থান সৃষ্টি করার অভিলাষ করলেন যেখানে শ্রীবৃন্দাবনের ন্যায় কাঁটাযুক্ত কোনো বৃক্ষ থাকবে না, নুড়ীযুক্ত কোন স্থান থাকবে না। যেখানে কুঞ্জের পাশে থাকবে স্নিগ্ধ নদী। যেটি বৃন্দাবনের কুঞ্জের পরিবেশকেও ম্লান করে দেয়।

সেই স্থানটি হচ্ছে গৌরমণ্ডল ভূমি। হরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মাণ্ড অপেক্ষা ব্রহ্মার সাধনাস্থল পুস্কর শ্রেষ্ঠ। পুস্কর অপেক্ষা কুরুক্ষেত্র শ্রেষ্ঠ। কারণ ভগবানের বাগ্ময়বিগ্রহ শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা সেখানে বর্ণিত হয়েছে। কুরুক্ষেত্র অপেক্ষা গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, গঙ্গা অপেক্ষা সাতটা পুরী শ্রেষ্ঠ। শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথপুরী, উজ্জয়িনীপুরী (বৈজয়ন্তীপুরী), কাঞ্চীপুরী, রঙ্গপুরী, দ্বারকাপুরী, বদ্রীপুরী ইত্যাদি। সেই সাতটি পুরী থেকে শ্রেষ্ঠ মথুরাপুরী। ষড়গোস্বামীর অন্যতম শ্রীল রূপগোস্বামী পাদ রচিত উপদেশামৃতে বলা হয়েছে—

বৈকুণ্ঠাজ্জনিতো বরা মধুপুরী তত্রাপি রাসোৎসবাদ্
বৃন্দারণ্যমুদারপাণি-রমণাত্তত্রাপি গোবর্ধনঃ ৷
রাধাকুণ্ডমিহাপি গোকুলপতেঃ প্রেমামৃতাপ্লাবনাৎ
কুর্যাদস্য বিরাজতো গিরিতটে সেবাং বিবেকী ন কঃ ॥

মথুরা নামক দিব্য স্থান ঐশ্বর্যময় অপ্রাকৃত জগৎ বৈকুণ্ঠ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কারণ শ্রীভগবান স্বয়ং সেখানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আবার বৃন্দাবনের অরণ্য মথুরা মণ্ডল অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেখানে রাসলীলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং গোবর্ধন পর্বত বৃন্দাবন-অরণ্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, কারণ তা শ্রীভগবানের চিন্ময় হস্তের দ্বারা উত্তোলিত হয়েছিল এবং সেখানে ভগবান নানাবিধ প্রেমময় লীলা বিলাস সাধন করেছিলেন এবং এই সবের ঊর্ধ্বে পরম রমণীয় রাধাকুণ্ড হল সর্বোত্তম স্থান, তার কারণ তা গোকুলরাজ শ্রীকৃষ্ণের অমৃতোপম প্রেমের বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। সুতরাং এমন কোনো বিবেকী ব্যক্তি কি কোথাও আছেন যিনি গোবর্ধন পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এমন পরম রমণীয় রাধাকুণ্ডের সেবা করতে অভিলাষী নন?

রাধাকুণ্ড হচ্ছে অনন্ত চিৎজগৎ ও জড় জগতের মধ্যে সর্বোত্তম স্থান। সেই রাধাকুণ্ড সমাবৃত বৃন্দাবন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হচ্ছে গৌরমণ্ডল। সেইজন্য শ্রীল প্রভুপাদ, ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, শ্রীল গৌর কিশোর দাস বাবাজী, ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, শ্রীল জগন্নাথ দাস বাবাজী, নরোত্তম দাস ঠাকুর, আচার্য শ্রীনিবাস আদি সমস্ত গৌড়ীয় আচার্যগণ গৌরমণ্ডলকে আশ্রয় করেছে। সেই গৌরমণ্ডলের নাভীকেন্দ্র বা হৃদয় হচ্ছে মায়াপুর যোগপীঠ। ভগবান যেখানে আবির্ভুত হয়েছে। যদিও ষোড়শ দল বিশিষ্ট শ্রীবৃন্দাবন হচ্ছে পদ্মফুলের মতো, যোগপীঠটা ষোড়শ দলের মতো। আর গৌরমণ্ডল হচ্ছে চতুর্দল বিশিষ্ট। তার একটি পত্র হচ্ছে বৃন্দাবনের রমনরেতি স্বরূপ রেমুনা, দ্বিতীয় পত্র দক্ষিণ-পশ্চিম দিক কানাই নাটশালা যেটি হচ্ছে গৌরমণ্ডলের গোষ্ঠ, তৃতীয় পত্র উত্তর-পূর্ব দিক হচ্ছে গৌরমণ্ডলের মথুরা মূলত ঢাকা দক্ষিণের শ্রীহট্টেই চৈতন্য মহাপ্রভুর বীজ সঞ্চারিত হয়, আর চতুর্থ পত্র গৌরমণ্ডলের বর্ষানা অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হচ্ছে পুণ্ডরীকধাম।

সূত্র : তন্ত্রশাস্ত্রের শিব-পার্বতী সংবাদ, প্রবোধানন্দ সরস্বতী ঠাকুর কৃত নবদ্বীপ শতকম্ ও আরো প্রামানিক শাস্ত্রগ্রন্থ


শ্ৰীপুণ্ডরীক বিদ্যানিধির চিত্রপটের ইতিহাস

শ্রীপুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুরের একটি প্রাচীন তৈলচিত্র ছিল বলে শােনা যায়। একসময় ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ও তাঁর শিষ্যের অন্যতম প্রথম সন্ন্যাসী শিষ্য ভক্তিপ্রসাদ গােস্বামী গৌড়ীয় বৈষ্ণব চরিতাবলীর রচয়িতা সুন্দরানন্দ বিদ্যা বিনােদ প্রমুখ শিষ্যবর্গকে নিয়ে পুণ্ডরীক ধাম দর্শন করতে আসেন এবং পরিদর্শন শেষে ফিরে যাওয়ার সময় তারা বিদ্যানিধির পাদুকা, তার স্ব-হস্তে লিখিত ভাগবতের দশম স্কন্ধের ভাষ্য ও তার তৈলচিত্র নিয়ে যান। পরবর্তীতে ইসকনের শ্রীল প্রভুপাদের জনৈক শিষ্য (যিনি এই তৈলচিত্রটি পূর্বে দর্শন করেছিলেন), সেই চিত্রটির অনুরূপ বর্তমানে ধামেস্থিত পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির চিত্রটি অংকন করেন। অনেকেই উক্ত ছবির সাথে বর্তমান ছবির বিষয়ে সংশয় মনোভাব পােষণ করতে পারে বলে পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির অপ্রাকৃত লীলার মাধ্যমে উক্ত ছবির সত্যতা প্রমাণ করেন।

শ্রীল পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির তৈলচিত্র

একদিন (১৯৮৩-৮৪ সালে- বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরে) সুভগ স্বামী মহারাজ এবং ভানুস্বামী মহারাজ দু’জনই প্রাতকালীন স্নান করার জন্য রাধাকুণ্ডের পাশে আসলেন। ঠিক সেসময় হঠাৎ এক ভিন্নধর্মী ব্যক্তি হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে স্থানীয় ভাষায় বললেন, “গতকাল রাতে এখানে এক সুদর্শন ব্যক্তিকে দেখেছি। যার উচ্চতা ছিল প্রায় ৮/১০ ফুট, মাথায় কুঞ্চিত কেশ, পরনে ছিল সাদা ধূতি ও গােলাপী রংয়ের ফতুয়া, কাঁধে ছিল চাদর। দেখে মনে হচ্ছিল শরীর থেকে এক উজ্জ্বল নূর (আলাে) বের হচ্ছিল। উনি কে এবং তিনি বর্তমানে কোথায়?” মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, “উনাকে কি জন্য”? তখন উক্ত ব্যক্তি বলতে লাগলেন, “গতকাল রাতে আমার ছেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আর আমি মূল রাস্তা দিয়ে যেতে দেরী হবে বিদায় বিলের মধ্যখানে হাটহাজারি হাসপাতালের দিকে যাওয়া শুরু করলাম। লােকটি নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দিল। যেটি ছিল বর্তমান গােবর্ধন পর্বতের পেছনে একটি শিশুগাছের নীচে। হঠাৎ দেখি এক ব্যক্তি দাড়িয়ে আছে এবং আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি কোথায় যাচ্ছি? আমি বললাম ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি আমার ছেলের জন্য ঔষধ আনতে। উনি বললেন ধর, এই তুলসী পাতা নিয়ে তাের ছেলের বুকে রাখবি। তাহলেই সুস্থ হয়ে যাবে। কথামতাে আমিও তাই করলাম। তৎক্ষণাৎ দেখি ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ। তাই উক্ত মহাপুরুষের নিকট কৃতজ্ঞতা জানাতে এলাম। উনাকে কি দেখেছেন?” মহারাজ বললেন, এরকম কোনাে ব্যক্তিকে তাে আমরা দেখিনি। আচ্ছা তুমি একটু এ জায়গায় দাড়াও।


আতুড় ঘর/ ভজন কুঠির

চট্টগ্রামের মেখলা গ্রমেই আবির্ভূত হন পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি ঠাকুর। বর্তমান যেখানে ভজন কুঠির আছে সেখানেই। তখনকার সময়ে জমিদার বা রাজাদের নিজেদের আতুরঘর (সন্তান জন্ম দেয়ার নির্দিষ্ট স্থান) থাকত ।

কলৌ বৃষভানুরাজ শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির আবির্ভাবস্থলী তথা আতুড় ঘর/ভজন কুঠির

অর্থাৎ বর্তমানের ভজনস্থলীটি হচ্ছে সে সময়ের প্রসূতিগৃহ বা আতুরঘর। যেটার গঠনশৈলী কিছুটা ভিন্ন। যেমন, পূর্ব-পশ্চিম দিকে পরস্পর বিপরীতমুখী সমান্তরাল জানালা থাকবে এবং দরজা হবে ছোট। যাতে বহিরাগতদের নজর সরাসরি না পড়ে। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, এই আতুর ঘরের সামনেই ছিল প্রাসাদ। অর্থাৎ বর্তমানে নাটমন্দির সহ মূল মন্দির যেখানে অবস্থান করছে ঠিক সেখানেই। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সাথে কৃষ্ণকিঙ্কর বিদ্যালঙ্কার এবং হরেশচন্দ্র স্মৃতিতীর্থ কথোপকথনেও এসব তথ্য জানা যায়। যা শ্রীল প্রভুপাদও তার চৈতন্য চরিতামৃতের তাৎপর্যে উল্লেখ করেছেন। এখানেই একসময় লক্ষ্মী জনার্দন বাসুদেব বিগ্রহের সেবা করা হত।


বিদ্যানিধির নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি তৈলচিত্র ছিল। একদিন সেটি প্রভুপাদের এক শিষ্যের নজরে পড়ে এবং সেটিকে তিনি নবরূপ দান করেন।

পুণ্ডরীক ধামে অবস্থিত নারদ মুনির নয়নাভিরাম ভাস্কর্য

মহারাজ পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির ঐ ছবিটি আনতে গেলেন। ছবিটি উক্ত ব্যক্তিকে দেখালে তিনি বলে উঠেন, হ্যা হ্যা এই ব্যক্তিকেই আমি গতকাল দেখেছি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, যদিও নষ্ট হওয়া ছবিটিকেই উক্ত ভক্ত নবরূপ দিয়েছিল কিন্তু এতে ছবি বিকৃত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা ছিল। কিন্তু আশ্চর্য সত্য হচ্ছে তা মােটেও বিকৃত হয়নি যা প্রমাণিত হয় উক্ত ব্যক্তির চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে।

রাধাকুণ্ড

মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাত হওয়ার পূর্বে স্বরূপ দামােদরের সঙ্গেও বিদ্যানিধির সখ্যতা ছিল । মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাতের পরে স্বরূপ দামােদরও এই পুণ্ডরীক ধামে এসেছিলেন।
শিবানন্দ সেন, নরহরি চক্রবর্তী ঠাকুর, ধনঞ্জয় পণ্ডিত, বাসুঘােষ ঠাকুরসহ অনেক চৈতন্য পার্ষদ এখানে আসতেন। তারা মূলত আসতেন রাধাষ্টমীর সময়। রাধাষ্টমী উৎসবের যে বর্ণনা আছে সেখানে নরহরি চক্রবর্তীর রচিত পদ, বাসুঘােষের রচিত পদ, মুকুন্দ দত্তের রচিত পদে বলা আছে, বিদ্যানিধির যে গৃহটা ছিল নবদ্বীপে সে গৃহে মহাপ্রভু গিয়ে রাধাষ্টমী করতেন। সেখানে দু’ভাগে বিভক্ত হতাে। একটা দল এখানে চলে আসত। যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক পার্ষদরা এই পবিত্র পুণ্ডরীক ধামে আসত। একদিন স্বরূপ দামােদর এবং পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি সহ ভজন করতে করতে অভিলাষ হয়েছে লক্ষ্মী জনার্দনকে নিয়ে সােনার নৌকায় সলিল বিহার করবে। ঠিক করা হল দিব্যকুণ্ডে এই বিহার অনুষ্ঠিত হবে। এমতাবস্থায় পৌষ পূর্ণিমার দিন স্বরূপ দামােদর এবং পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি মিলে গােপী গীত গাইতে লাগলেন রাত্রিবেলায় এবং শ্রীমতী রাধারানিও সেখানে প্রকটিত হয়ে পিতাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন, পিতা তােমার কি অভিলাষ? তখন পিতাও বলতে লাগল আমার ইচ্ছে দিব্যকুণ্ডে সলিল বিহার করব। তারপর রাধারানি পদাঘাত করলেন এবং বর্তমানের রাধাকুণ্ডের জন্ম হল এবং সেই কুণ্ডেই সলিল বিহার উদযাপিত হয়। এখানে উল্লেখ্য, এই কুণ্ডের জল এতই সুমিষ্ট যে, টিউবওয়েল থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় লােকেরা রান্না বান্না ও খাওয়ার জন্য এখান থেকেই জল নিয়ে যেত এবং তারা বিশেষ বিশেষ তিথিতে এখানে স্নান করত। এখানে সাধারণত নারীরা অশৌচ চলাকালীন স্নান করতে আসত না।

এই পুণ্ডরীক ধাম তখন ছিল জঙ্গলে পূর্ণ। এই শ্যামকুণ্ডের পাশেই ছিল এক বিশাল নিমবৃক্ষ। এখনাে ঐ নিমবৃক্ষের খণ্ডিত অংশ এই পুকুরে আছে। ঐ নিমবৃক্ষে ও চিহ্নিত, তিলক চিহ্নিত বিভিন্ন সর্পেরা বাস করত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পরে অনেক পুকুরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে মনে করে সরকার বিভিন্ন পুকুর শুকিয়ে অস্ত্র উদ্ধার শুরু করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এই পুকুরও শুকানাের জন্য সেচ পাম্প বসানাে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, সেচ পাম্পের মাধ্যমে লাগাতার পানি শুকিয়ে ফেলার পরও কোনাে কুলকিনারা না হওয়াতে আরাে একটি পাম্প বসানাে হয়। চারটি সেচ পাম্প দিয়ে কুণ্ডের জল শুকানাের চেষ্টাও বিফল হওয়াতে সরকার কর্তৃপক্ষও আশ্চর্য হয়। কারণ এরকম আশ্চর্য ঘটনা অন্য কোনাে ক্ষেত্রে হয়নি। এখনাে অব্দি আশ্চর্যজনক সত্য যে, বন্যা হলে মন্দির আঙ্গিনা ডুবে গেলেও রাধাকুণ্ডে বাহিরের জল প্রবেশ করে না এবং সেখান থেকে জল বাহিরেও যায় না। উল্লেখ্য যে, উক্ত কুঞ্জে পাড় পাশ্ববর্তী পুকুরের মতােই, তারপরও বহিরাগত জল অনুপ্রবেশ করে না।


গিরি গোবর্ধন

শ্রীপুণ্ডরীক ধামে অবস্থিত গিরি গোবর্ধন হচ্ছে শ্রীপুণ্ডরীক বিদ্যানিধি পত্মী শ্রীমতি

গিরি-গোবর্ধন

রত্নাবতী দেবীর সমাধিস্থল এবং পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির সব অধস্তনদেরও সমাধি এ স্থানে। তাই শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ঠিক করলেন ঐ স্থানে যাতে ভবিষ্যতে কোন কাঠামো না হয় এবং যথাযথ সম্মানও বজায় থাকে সেজন্যই সেখানে গোবর্ধন পর্বত স্থাপন করা হবে।


শ্যামকুণ্ড

পুণ্ডরীকধামে রাধাকুণ্ডের অবস্থান থাকায় দর্শন করতে আসতেন ধনঞ্জয় পণ্ডিত। কথিত আছে যে, ধনঞ্জয় পণ্ডিত (নিত্যানন্দ আত্মজ) এবং লক্ষ্মী জনার্দনের সেবক জগৎচন্দ্র গােস্বামী (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মন্ত্রশিষ্য) উভয়েই বৃন্দাবনের শ্যামকুণ্ড থেকে জল এনে নিজেরাই মাটি খুঁড়ে পুণ্ডরীকধামের শ্যামকুণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শ্যামকুণ্ড

“একবার যখন বাস্তুবিদ এসেছিলেন পুণ্ডরীকধামে, তখন বলেছিলেন যে এই শ্যামকুণ্ড এবং ভক্তিকুণ্ড বাস্তুমতে সঠিক নয়, রাধাকুণ্ড ঠিক আছে। তাই চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী প্রভু যখন শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজকে জিজ্ঞেস করলেন, “শ্যামকুণ্ড ভরাট করে ফেলব কিনা?” তখন মহারাজ বলেছিলেন “আমি তােমার মাথা ফাটিয়ে দেব যদি তুমি সেই চেষ্টা কর।” মহারাজ শ্যামকুণ্ডের মহিমা নিশ্চই জানতেন। তিনি বলেছিলেন ভক্তিকুণ্ড ভরাট করানাে যাবে, কিন্তু শ্যামকুণ্ড নয়।”


শ্রী লক্ষ্মী জনার্দন বাসুদেব বিগ্রহের ইতিহাস (প্রকাশ-কাঁলাচাদ ঠাকুর)

শ্রী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির সর্বশেষ বংশধর কৃষ্ণকিংকর তৎকালীন বৃটিশ সরকারের অনুগত উপজাতীয় রাজার অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। বিদ্যালংকার হচ্ছে উপাধি। কৃষ্ণকিংকর বিদ্যালংকার তার উইলে পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির আরাধ্য বিগ্রহ শ্রীশ্রী লক্ষ্মী জনার্দন এর নামে সমস্ত সম্পত্তি দেবোত্তর উইল করে যান। বর্তমান কালাচাঁদ ঠাকুরের পূর্বনাম শ্রীশ্রী লক্ষ্মী জনার্দন বাসুদেব । এই বিগ্রহ পূর্বে পুণ্ডরীক ধামেই ছিল।

শ্রীশ্রী লক্ষ্মী জনার্দন বাসুদেব (প্রকাশ-কালাচাঁদ ঠাকুর)

কিন্তু বিগ্রহ বর্তমান স্থানে কালাচাঁদ সূত্রধর কর্তৃক সেবা প্রকাশ হয়েছে বলে কালাচাঁদ ঠাকুর বলে খ্যাত হন। পুণ্ডরীক ধাম থেকে ৩৫০ বছর পূর্বে এই বিগ্রহ চলে গিয়েছেন। যখন বর্গীরা প্রথম আরাকান রাজ্য আক্রমণ করে। তখন আরাকান রাজার সমর্থন পুষ্ট স্থান ছিল পুণ্ড্ররীক ধাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থানেও আক্রমণ করবে ভেবে বিগ্রহকে বর্তমান ফতেয়াবাদ চৌধুরী হাটে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে এখনো কালাচাঁদ দিঘি আছে। তখন লক্ষ্মী জনার্দনকে গ্রামের লোকেরা কালোচাঁদ বলে ডাকত। যেখানেই যেত এই বিগ্রহ পুণ্ডরীক ধামের দিকে মুখ করে থাকত। পরবর্তীতে যখন ফতেয়াবাদে সেবা বিপর্যয় ঘটে তখন কালাচাঁদ সূত্রধরকে স্বপ্নযোগে ভগবান লক্ষ্মী জনার্দন আদেশ করেন বোয়ালখালী বর্তমান স্থানে নিয়ে যেতে। শ্রীশ্রী লক্ষ্মী জনার্দন হলেন বাসুদেব বিগ্রহ, ঐশ্বর্যাত্মিক। বাসুদেব বিগ্রহের একপাশে রয়েছে লক্ষ্মীদেবী তথা রুক্মিনী দেবী অন্য পাশে রয়েছেন সত্যভামা, নিচে গরুড়দেব। এই বিগ্রহের কোন নির্মাতা নেই, এটি শালগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই বিগ্রহের প্রকাশ মাধবেন্দ্র পুরীর প্রেমের মাধ্যমে।
মাধবেন্দ্র পুরী একবার গণ্ডকী তীর্থ তথা চক্রতীর্থে (যেখানে শালগ্রাম উৎপন্ন হয়) গমন করেন। তিনি সেখানে কাম গায়ত্রী মন্ত্র জপ করছিলেন, তখন একটি বিশাল শালগ্রাম শিলা এসে তার হৃদয়ে আঘাত করে। শিলার ধাক্কায় তার গায়ত্রী ভঙ্গ হয়, তাই তিনি অন্যত্র সরে গিয়ে পুণরায় গায়ত্রী জপে রত হলেন। আবার সেই শিলা সেখানেও আঘাত করল। এভাবে তিনবার একই ঘটনা হওয়ায় তিনি বুঝতে পারলেন সেই শালগ্রাম শিলা তাঁর কাছ থেকে সেবা পেতে চাইছেন। সেই শিলাটি অনেক বিশাল, কিন্তু এটি আশ্চর্যজনকভাবে অত্যন্ত হালকা। এটি সুদর্শন চক্র চিহ্নিত জনার্দন শিলা। শিলাটি তিনি তাঁর শ্রীপাট সুনামগঞ্জে নিয়ে আসলেন। ঐখানে সেই শিলাটিকে মাধবেন্দ্রপুরীপাদ তুলসী নিবেদন করতে গিয়ে অষ্টসাত্ত্বিক বিকারগ্রস্থ হয়ে এক সপ্তাহের অধিককাল সমাধিস্তরে অধিষ্ঠিত থাকেন। ঐ সমাধিস্থ অবস্থায় তিনি যা যা ভেবেছেন ঠিক একই রকম ভাব থেকে লক্ষ্মী-জনার্দন বিগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। লক্ষ্মী জনার্দন মাধবেন্দ্র পুরীপাদকে বলল “তোমার শিষ্য পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির কাছে আমাকে সমর্পণ কর।”
এরপর শ্রীল মাধবেন্দ্র পুরীপাদ এবং তার শিষ্য মৈথিল বিষ্ণুপুরী সহ পুণ্ডরীকধামে এসে মহাসাড়ম্বরে একুশ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান করে লক্ষ্মী-জনার্দনকে প্রতিষ্ঠা করলেন। পুণ্ডরীক বিদ্যানিধিই যে বৃষভানু মহারাজ এটা প্রথম প্রকাশ করলেন মাধবেন্দ্র পুরীপাদ। তিনিই বলেছেন তাঁর আতুরঘরটিই হবে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম স্থান। কারণ পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি হচ্ছেন প্রেমকল্পের আশ্রয়বিগ্রহ। যেখানে প্রেম নেই সেখানে ভগবান থাকতে পারেন না। প্রেম যেখানে প্রকাশিত সেই স্থানটিই হচ্ছে ভগবানের অবস্থানের সর্বোত্তম স্থান। এজন্য শ্রীল মাধবেন্দ্র পুরীপাদই এই আতুরঘরেই তার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি এই বিগ্রহের আরাধনা বা ভজন সাধন করেছেন বলেই বর্তমানে ভজনস্থলী হিসেবে পরিচিত। 


পুণ্ডরীক ধামে ইসকন

১৯২৯ সনে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ধামে আসেন। একই বছরে ব্রজমণ্ডল পরিক্রমার সময় রাধাকুণ্ডের তটে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এর অন্তরঙ্গ শিষ্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদকে শ্রীপুণ্ডরীক ধামের সেবা লাভ করতে না পরার দুঃখ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি শ্রীমৎ তমাল কৃষ্ণ গােস্বামী, শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী, শ্রীমৎ সুভগ স্বামী ও শ্রীপাদ নিষ্টুলা প্রভুকে ১৯৬৯ সনে শ্রীধাম পুনঃরুদ্ধারে আদেশ করেন। (সূত্র: ধামে শ্রীমৎ সুভগ স্বামীর প্রবচন) ১৯৭৮ সালের দিকে শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী ও শ্রীমৎ প্রভাবিষ্ণু স্বামী পুণ্ডরীক ধাম আসেন। সেসময় শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ পুণ্ডরীক ধাম মন্দিরের জন্য দশ হাজার টাকা অনুদান দেন। চট্টগ্রামে প্রচার শুরু হয় নিটুলা প্রভুর মাধ্যমে। পুরী ধাম কমিটি ১৯৭৯ সালে নিষ্টুলা প্রভুকে এক ধর্মসভায় আমন্ত্রণ জানালে, তিনি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ এবং প্রভাবিষ্ণু স্বামী মহারাজকে নিয়ে আসেন। ১৯৮১ সালে লক্ষ্মীপূজার দিন ইসকন আনুষ্ঠানিকভাবে ধামের সেবাপূজার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কথিত আছে যে, ইসকন আসার পূর্বে পুণ্ডরীক ধামে কাঁঠাল গাছের নীচে একটি মাটির ঘর, আর ভজন কুঠির ছিল মাত্র। কিন্তু ইসকন ধামের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সেখানে প্রভুত উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৮২ সালে শ্রীশ্রী বার্ষভানুবিমুরারী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়। যে পবিত্র স্থান থেকে বাংলাদেশে ইসকনে প্রথম মন্দিরমুখী কাযক্রমের সূচনা হয়। এছাড়াও ধামে রয়েছে সর্বতীর্থ পরিক্রমাস্থান, কীর্তন মঞ্চ, ভক্তিবেদান্ত স্বামী গেইট, ধামেশ্বর শিব মন্দির, বার্ষভানবিমুরারী কুঞ্জ, গােশালা ইত্যাদি।

শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধামে সেবিত অপূর্বমনোহর বিগ্রহ শ্রীশ্রী বার্ষভানবীমুরারী ও শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু

চাঁটিগ্রামের অন্যতম শ্রীশ্ৰী পুণ্ডরীক ধাম কেবলমাত্র দর্শন করার মাধ্যমে যে কেউ আধ্যাত্মিক স্তরের অতি উচ্চ আনন্দের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। শ্রীল ভক্তিবিনােদ ঠাকুর বলেছেন, যে সমস্ত স্থানে মহাপ্রভু এক মুহূর্তও তাঁর লীলা বিলাস করেছেন। সে সমস্ত স্থানে তিনি তাঁর সময় অতিবাহিত করবেন এবং সেই স্থানের ধূলায় গড়াগড়ি দিবেন।
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত (মধ্য, ১৫/৩৯, ৪২) –

“তবে মহাপ্রভু সব ভক্ত বােলাইল।
“গৌরদেশে যাহ সবে’’ বিদায় করিল ॥”
নিত্যানন্দে আজ্ঞা দিল যাহ গৌড়দেশে।
অনর্গল প্রেমভক্তি করিহ প্রকাশে ॥”

অতএব মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে আমরাও এই গৌরমণ্ডল ভূমিসমূহ দর্শন করে অপ্রাকৃত কৃপা অর্জনের দুর্লভ সুযােগ লাভ করতে পারব। 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here