শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নাম ভজনের ২০টি উপদেশ (পর্ব-০১)

0
267

২০টি উপদেশের ১০টি নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
১. “ভগবান দিব্য নাম-সমূহ জপের মাধ্যমে সর্বদাই ভগবানকে আহ্বান করা উচিত। উচ্চস্বরে দিব্যনাম জপ করা এবং জপমালায় নির্দিষ্ট জপ-সংখ্যা পূরণ করার বিষয়ে আপনাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। এতে সকল প্রকার অনর্থ দূর হয়ে যাবে। তখন নাস্তিক ভাবাপন্ন মানুষদের নিন্দাবাক্যে আপনি আর বিচলিত বোধ করবেন না।”
২. “নাম জপকালে যদি পাপময় ও জড়বিষয়ক ভাবনা আপনাকে গ্রাস করে, তবুও তা যেন আপনাকে অধ্যবসায়ের সঙ্গে জপের অভ্যাস হতে বিচ্যুত না করে। জপ অভ্যাসের প্রাথমিক স্তরে মনে এরকম চিন্তাভাবনার উদয় হওয়া স্বাভাবিক। এরকম চিন্তার দ্বারা হতোদ্যম হবেন না, কেননা তা আপনার পারমার্থিক অগ্রগতিতে সাহায্যে করবে না। নামে প্রীতির উদয়ের ফলেই কেবল ঐসব চিন্তা বন্ধ হতে পারে। নামজপে যদি নিষ্ঠা ও উৎসাহ না থাকে, তাহলে কিভাবে জড় চিন্তার নিরসন হতে পারে? কায়-মন-বাক্যে নামসেবা দ্বারা আপনি অচিরেই পরমেশ্বর ভগবানের উজ্জ্বল বিগ্রহ অবলোকন করতে পারবেন।”
৩. “আমি এটি শ্রবণ করে প্রীত হচ্ছি যে, দিব্যনাম জপে আপনার উৎসাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিষ্ঠা সহকারে অবিশ্রান্ত নাম জপের মাধ্যমে সর্ব অনর্থ বিদূরিত হবে। তখন শ্রীনামের রূপ, গুণ ও লীলা স্বতঃই প্রকাশিত হবে। ভগবান ও তাঁর দিব্যনাম অভিন্ন।
কিন্তু এটি কেবল তখনই অনুভব করা যায়, যখন সকল অনর্থ দূর হয়। নিরপরাধে নামজপ আমাদের এটি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে দিব্যনাম সর্বসিদ্ধি প্রদান করে থাকে।”
৪. “শুদ্ধ-নাম জপের ফলে আত্মার স্থূল ও সুক্ষ্ম জড়াবরণ নাশ হয়ে যায়,
*‘শ্রীগোপীনাথ গৌড়ীয় মঠ হতে প্রকাশিত ‘শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী’ নামক গ্রন্থে মুদ্রিত তাঁর বিভিন্ন শিষ্যকে লেখা শ্রীল সরস্বতী ঠাকুরের পত্রাবলী থেকে উদ্ধৃত। ইংরাজী অনুবাদ করেছেন শ্রীল ভক্তিস্বরূপ দামোদর মহারাজ। এবং ভক্তের নিত্য শুদ্ধস্বরূপ প্রকাশিত হয়।”
“শ্রীনামেই জীবের স্বরূপ উদয় হয়। কৃষ্ণরূপ আকর্ষণ-কারণ।”
৫. “কায়, মন ও বাক্য দ্বারা শ্রীনামের সেবা অব্যাহত রাখলে শ্রীনাম আপনার অন্তরে প্রকটিত হবেন। নাম জপে যেসব উপলব্ধি হয়, শাস্ত্র শ্রবণ ও পাঠ সে বিষয়ে দৃঢ় নিশ্চিত হতে সাহায্য করে।”
৬. “নামাপরাধ-শূন্য হতে হলে নিরন্তর নামজপ করে যেতে হয়। শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীরূপ গোস্বামীতে তাঁর সকল শক্তি অর্পন করেছিলেন। সেজন্য, আমরা অবশ্যই শ্রীরূপ গোস্বামী ও তাঁর অনুগামীবৃন্দের কৃপা প্রার্থনা করব। শ্রীরূপ গোস্বামীর অপ্রাকৃত সেবায় নিয়োজিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য শ্রীনামের কৃপা প্রার্থনা করা কর্তব্য। নিশ্চিত থাকুন যে শ্রীভগবান আপনার হৃদয়ে নাম রূপে বিরাজ করার জন্য আগমন করবেন।”
৭. “কুসঙ্গজনিত কু-প্রভাব বিদূরিত করার সর্বাপেক্ষা ভাল উপায়গুলির একটি হচ্ছে নামজপ বৃদ্ধি করা। আপনি যদি দৈনিক ১ লক্ষ নাম করেন তাহলে নাস্তিকেরা আপনার ভজনাক্রিয়ায় আর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। আপনি সময় বের করার প্রয়াস করুন, যাতে আপনি প্রতিদিন ১ লক্ষ নাম (৬৪ মালা) জপ করতে পারেন। নাহলে তাকে পতিত বলে বিবেচনা করা হয়। এই পতিত অবস্থা অতিক্রম করার জন্য চেষ্টা করা কর্তব্য।”
৮. “শ্রীভগবান তাঁর নাম হতে অভিন্ন। যদি কেউ তাঁর বদ্ধ অবস্থার জন্য এটি উপলব্ধি করতে না পারে, তাহলে তাঁর কর্তব্য হরিভজনে অভিজ্ঞ কোনো শুদ্ধ ভক্তের সেবা করা। আপনিও ভজনে দক্ষ হয়ে অন্যদের উপকার করতে পারেন। আপনার ভোগপ্রবৃত্তি যাতে আপনাকে পরাভূত না করতে পারে, সেজন্য অনুগ্রহ করে উচ্চস্বরে জপ করুন।”
৯. “শ্রীগৌরসুন্দর বিশেষভাবে সেসব বিনীতচিত্তদের প্রতি কৃপাপরায়ণ, যাঁরা নিজেকে সম্পূর্ণ অযোগ্য বলে অনুভব করেন। আমি শ্রীমন্মহাপ্রভুর নিকট প্রার্থনা করি যাতে দিব্যনাম জপে আপনার অনুরাগ বর্ধিত হয়। আপনার কর্তব্য হচ্ছে বিনম্র চিত্তে অমানীমানদ গুণের অনুশীলন করতে করতে নিরন্তর হরিভজন করা। আপনি যদি নির্বিঘ্নে শ্রীনাম জপ করতে পারেন, তাহলে আপনি অত্যন্ত সুখী হবেন।”
১০. “শ্রীনাম জপ সরাসরি কৃষ্ণ সাক্ষাৎকারের সমতুল্য। মুক্তাত্মাগণ শ্রীনামের মূর্তিমন্ত বিগ্রহের সেবায় নিয়োজিত থাকেন, সেসাথে দিব্য গ্রন্থাবলি পাঠ করতে থাকেন- যেমন শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত, প্রার্থনা, প্রেমভক্তি চন্দ্রিকা এবং কল্যাণ-কল্পতরু। আপনার জানা কর্তব্য যে, বিগ্রহ পূজা ও শ্রীভগবানের দানাদি কার্যকলাপের মুখ্য ফল হচ্ছে নাম জপ।”
১১. “আপনার উচিত সকল অপরাধ ও অসৎসঙ্গ থেকে মুক্ত হয়ে নাম জপ করা। যিনি সম্বন্ধ-জ্ঞানসহ হরিনাম জপ করতে থাকেন, কোনো বাধা-বিঘ্ন তাঁকে সিদ্ধিলাভের পথ থেকে ভ্রষ্ট করতে পারে না। জীব যতক্ষণ না কৃষ্ণনাম-ভজনে অনুরক্ত হচ্ছে ততক্ষণ কোনো কিছুতেই জীবের মঙ্গল হতে পারে না।”
১২. কেবল সাধারণ জড়দৃষ্টিতেই শ্রীভগবান ও তাঁর নামে ভেদ দৃষ্ট হয়। এমনকি দিব্যানামে কোন স্বাদ না অনুভূত হলেও প্রগাঢ় শ্রদ্ধা সহকারে জপ করে যাওয়া কর্তব্য। কঠোরভাবে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় জপ করতে থাকলে ভক্ত ক্রমশঃ শ্রীনাম, নামী ও স্বয়ং গৌর-কৃষ্ণের অভিন্নতা উপলদ্ধি করতে পারেন। শ্রীগৌরহরি ও রাধাকৃষ্ণ এক ও অভিন্ন। শ্রীগৌরাঙ্গ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। শ্রীগৌরসুন্দরের করুণা অসীম এবং শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের অমৃতময় মাধুর্য অন্তহীন!”
১৩. “গভীর ধৈর্য ও নিষ্টা সহকারে নাম আশ্রয় করা উচিত; কোনরকম জড়াজাগতিক ফল বা উপকার লাভের আকাক্সক্ষা হতে মুক্ত থাকতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চিতভাবে প্রত্যুত্তম দেবেন। নাম জপের পূর্বে প্রথমে নিজ মন শ্রীগৌরাঙ্গের পাদপদ্মে সমর্পন করা কর্তব্য।”
১৪. “শ্রীকৃষ্ণে হচ্ছেন কৃপাময়, এবং একদিন তিনি আমাদের উপর তাঁর কৃপা বর্ষণ করবেন। শ্রীনামের নিকট আমাদের প্রার্থনা করতে হবে, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই আমাদের উপর তাঁর কৃপা বিতরণ করবেন।”
১৫. “ তুমি যদি শুদ্ধনাম জপ কর, তাহলে তোমার জড়কর্ম-সংক্রান্ত সকল বাসনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। শ্রীগুরুদেবের নিকট থেকে দীক্ষাগ্রহণ জপকারীকে শ্রীনাম জপের নতুন উদ্যম ও অনুপ্রেরণা দান করে। তাছাড়া আপনি নিজেকে শ্রীহরির দাস রূপে চিন্তা করুন এবং এইভাবে সকাম কর্ম হতে মুক্ত হোন । যদি সাধনভক্তির জীবন শুরু করার পর আপনি পুনরায় নিজেকে সকাম কর্মে নিমজ্জিত করতে চান, তাহলে তার অর্থ হচ্ছে এই যে আপনি এমনকি ভগবানের একটিমাত্র নামও জপ করেন নি! অজ্ঞ জীব নিজেকে অসহায় মনে করে, সে জন্য সে ইন্দ্রিয় তর্পণের সঞ্চয়ের কঠোর প্রয়াস করে। কিন্তু মুক্তাত্মা ভক্তগণ কেবল শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করতে থাকেন।”
১৬. “শ্রীনাম জপে সকল প্রকার অসাধু সঙ্গ (কর্মী, জ্ঞানী ও মায়াবাদীদের সঙ্গ) বিদূরিত করে, ঠিক যেমন ভোরে সূর্য উদিত হলে কুয়াশা দূর হয়ে যায়। শ্রীরূপ গোস্বামী আজ্ঞাকে (অসৎসঙ্গ ত্যাগ) চিত্তে ধারণপূর্বক আপনি শ্রীনাম জপ করেন। তাহলে আপনি শ্রীগৌরহরির করুণা লাভে সমর্থ হবেন।”
১৭. “মিছরি-রূপ ঔষধ গ্রহণের ফলে পাণ্ডুরোগী ধীরে ধীরে রোগমুক্ত হয়, এবং রোগমুক্তির সাথে সাথে যে মিছরির স্বাদ অনুভব করতে থাকে। ঠিক তেমনি নামজপ-রূপ ব্যবস্থাপত্রটি গ্রহণ করলে ভগবৎসেবা-বিমুখতা হ্রাস পারে। কৃষ্ণনামে মাধুর্য ধীরে ধীরে অভিব্যক্ত হবে এবং তখন ভক্ত তাঁর শুদ্ধ চিন্ময় ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা শ্রীভগবানের সেবা করতে শুরু করবেন।”
১৮. “পারমার্থক উন্নতি লাভের জন্য বৈষ্ণবগণের সেবা, বদ্ধজীবগণের কাছে প্রচার (জীবে দয়া) এবং কৃষ্ণনাম জপ করা প্রয়োজন। এই তিনটি কার্যের বা কিছু অনুকূল সেগুলি গ্রহন কর আর যা-কিছু প্রতিকূল, তা বর্জন কর।”
১৯. “তুমি যে অষ্টকালীয় লীলাস্মরণের মতো উচ্চতর বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা করছ, নিঃসন্দেহে তা অনুচিত। এই বিষয়গুলি অনর্থ-নিবৃত্তির স্তরে আত্তীকরণ করা সম্ভব নয়। যিনি প্রগাঢ় নিষ্ঠাসহকারে আন্তরিকভাবে শ্রীনাম জপ করছেন, তিনি নিজের শুদ্ধ স্বরূপ উপলব্ধি করবেন। অনর্থসমূহ বিদূরিত হবার পরই কেবল স্বরূপসিদ্ধি লাভ করা যায়।”
২০. “এই জ্ঞান এমন কিছু নয় যা যুক্তি- তর্কের দ্বারা লাভ করা যায় অথবা কৃত্রিমভাবে কারো উপরে আরোপ করা যায়। এমনকি দিব্য জ্ঞান লাভের স্তরেও আন্তরিক নিষ্টায় নামজপের মাধ্যমে নিজের চিদ্‌স্বরূপ সম্বন্ধে যা কিছু উপলব্ধি লাভ হয়, তা অবশ্যই শিক্ষাগুরুর দ্বারা সমর্থিত হওয়া উচিত। এই হচ্ছে ‘একাদশ ভাব’-এর অর্থ। ঐ উন্নত স্তরে, গুরুদেব ভক্তের ভজনের আরো উন্নতির জন্য কেবল নির্দেশনা প্রদান করেন। পারমার্থিক জীবনে অগ্রগতি লাভের সাথে সাথে এই সমস্ত উপলব্ধি স্বত:ই স্ফূরিত হতে থাকে।”


 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here