ভালো জপের জন্য ৬টি কার্যকরী সূত্র

2
171

শ্রীমৎ শচীনন্দন স্বামী

প্রথম সূত্র: ‘মন সংস্কারম’ অর্থাৎ মনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় (৬.২৬) এই অভ্যাসটি সম্পর্কে বলেছেন, “চঞ্চল ও অস্থির মন যে যে বিষয়ে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয়ের থেকে নিবৃত্ত করে আত্মার বশে আনতে হবে।” এই প্রথম অভ্যাসটির অর্থ হল মন যখন পবিত্র হরিনাম থেকে অন্যত্র পালিয়ে যায় তখন সাধককে তাঁর মন ফিরিয়ে আনার জন্য সৎ ও বিনীত হতে হবে। “প্রিয় মন! মহাশয়! ফিরে আসুন! ফিরে আসুন!”

এটা কিভাবে করা যায়? সবচেয়ে সহজ পন্থা হল জপ করার সময় মহামন্ত্রের শব্দগুলোর দিকে তাকানো। এটাই হচ্ছে যৌগিক ধ্যানের আদর্শ প্রক্রিয়া। একবার শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী তাঁর এক শিষ্যাকে জপ করার সময় যুগপৎ ভাবে নামধ্বনির নিকট দৃষ্টিপাত করার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। এই ধরণের দৃষ্টিনির্ভর ধ্যান একটি যোগিক চর্চা। এটা কিছুটা অতীন্দ্রিয় শক্তিসম্পন্ন। পাশ্চাত্য মনস্তত্ত্ব দিয়ে এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করা কঠিন কিন্তু এটি মনকে স্থির করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। কিছু সময় যুগপৎভাবে জপ এবং মন্ত্রটি পাঠ করার পর মন প্রশমিত এবং শান্ত হয়।

দ্বিতীয় সূত্র: ‘শৌচ’-অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শুচিতা। যেকোন ভক্তের জন্য শুচিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে যখন তিনি জপ করতে বসেন তখন তিনি যে চলচ্চিত্র দেখেছেন, যে জাগতিক গ্রন্থ পড়েছেন এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যে গোপন দৃষ্টিপাত করেছেন সবকিছু মনে আসে। এটা অনেকটা মনে মনে অবিন্যস্ত বিরক্তিকর চলচ্চিত্র দেখার মতো। সেজন্য যখন কেউ মনের এসমস্ত ধূলি, ঘর্ম এবং কাদা থেকে মুক্ত থাকেন তখন সুস্পষ্টভাবেই জপ করতে এবং গ্রন্থ পাঠ করতে বসা অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সবাই মনের এসমস্ত ধূলি, ঘর্ম ও কাদা সম্পর্কে সচেতন নয়। এটি আরো বেশি দূষণের কারণ।

তৃতীয় সূত্র: “মৌন”– নিরবতা। প্রজল্প মনকে দূষিত করে। আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে এটিকে অবশ্যই পরিহার করতে হবে। কেননা এর প্রভাব খুবই বিরক্তিকর। সনাতন গোস্বামী বলেছেন যে, সবরকমের প্রজল্পের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে কোন বৈষ্ণবের নিন্দা করা। ভক্তকে জাগতিকভাবে মৌনী কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে বাচাল হতে হবে। সবার কৃষ্ণ সম্পর্কে কথা বলা উচিত এবং কেউ যদি নাটক বা গুজব উপভোগ করতে চায় তাহলে তিনি বিস্ময়কর নিত্যানন্দ প্রভু সম্পর্কে কথা বলতে পারেন। তিনি তাঁর প্রিয় ভক্তের বুকের উপর পদাঘাত করেছিলেন। আধ্যাত্মিক বিষয়ের আলোচনা মনকে শুদ্ধ করে।

চতুর্থ সূত্র: ‘মন্ত্রার্থ চিন্তনঃ’-মন্ত্রের অর্থের উপর ধ্যান করা। কোন ভক্ত মনোযোগ না দিলে জপ করতে পারেন না কেননা অলস মন পুনরায় মায়ার চিন্তায় ফিরে যায়। সেজন্য সবার উচিত “হে রাধে! হে কৃষ্ণ! কৃপা করে আমাকে আপনাদের সেবায় নিয়োজিত করুন এই মনোভাব নিয়ে জপ করা। প্রাথমিক ভক্তদের জন্য সেবা হয়তো প্রচারের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে কিন্তু আরা উন্নত ধরণের সেবাকে বলা হয় ভাব সেবা। সেই ভাব সেবায় ভক্ত নরোত্তম দাস ঠাকুরের ভক্তিনির্দেশক গ্রন্থ “প্রার্থন”-এর নির্দেশাবলী অনুসারে রাধাকৃষ্ণকে প্রেমময় ভাব নিয়ে আহ্বান করেন। একজন জ্যেষ্ঠ ভক্ত আমাকে গোপনে বলেন, “জপ করার সময় আমি পুষ্প দিয়ে ভগবানের দিব্য রূপ সজ্জিত করি। জপের সময় আমি এই সেবাটি করতে ‘ভালোবাসি’।” এটি হচ্ছে মন্ত্রের অর্থের উপর ধ্যান। ভক্তকে অবশ্যই মন্ত্রের অর্থের সাথে পরিচিত হতে হবে।

পঞ্চম সূত্র: অভ্যাগ্রত্ব বা ধৈর্য্য হলো এমন সূত্র যা লালন করা প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে জপ চর্চা করবেন না। কোনোমতে নির্ধারিত সংখ্যক মালা জপ শেষ করার ইচ্ছা এতই প্রেমহীন যে তা ভক্তিবিরোধী। আপনি কি কখনো এমন কারোর সাথে আলাপ করেছেন যিনি যতদ্রুত সম্ভব আপনার সাথে আলোচনা শেষ করতে চান? তখন আপনি তাকে বলবেন, তোমার কাছে এটা যদি এতই গুরুত্বহীন হয় তাহলে আমি স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি।  দেরী করা নিষ্প্রয়োজন। তোমাকে শেষ করতে হবে না, আমিই বরং তা শেষ করে দিচ্ছি। এই ধরণের আলোচনায় আমার কোন আগ্রহ নেই।” জপ নিয়ে দৌড়াবেন না কেননা কৃষ্ণ যখন দেখবেন, আপনি কোনমতে শেষ করতে চান তখন তিনি পালাবেন তিনি হয়তো বলবেন,“তুমি আমাকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করার পূর্বেই আমি তোমাকে ত্যাগ করছি। তখন আপনার সাথে কেবল কিছু শুষ্ক মালা অবশিষ্ট থাকবে।

ষষ্ঠ সূত্র: অনির্বেদ, দৃঢ়তা। এটি অবিচলতাকে নির্দেশ করে। ‘অ’ মানে নয়’ এবং “নির্বেদ” মানে ঔদাসীন্য, “অবহেলা অথবা বিষাদ। অন্যকথায়, জপের ফল যদি তৎক্ষণাৎ না আসে তাহলে কারো আশাহত হওয়া উচিত নয়।  জপ যে জীবনের ব্রত এই ছয়টি গুণ সে সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদন করে। জপ এমন কোন ব্যাপার নয় যে ভক্ত কেবল যখন বসেন তখন তা করবেন। কোন ভক্ত যদি যথার্থরূপে জপ করতে চান তাহলে তাকে এই ছয়টি গুণাবলী লালনের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

আমরা যখন প্রথমে শ্রদ্ধা, তারপর মন্ত্রের অর্থ চিন্তা, অতঃপর আকুল বাসনা প্রকাশ-এই হলঘরগুলো অতিক্রম করব- যদি নামপ্রভুর কৃপা হয় তিনি হয়তো সেই গোপন কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। তিনি যদি মনে করেন যে, দ্বার খোলার পূর্বে আমাদের অপেক্ষা করা উচিত তাহলে আমরা অপেক্ষা করব। আমরা দ্বারের সম্মুখে বসে থাকব। কখনো কখনো আমরা হয়তো কিছু আলোকচ্ছটা, বা কোন ধূপকাঠির সুগন্ধ পাওয়ার মাধ্যমে আমাদের প্রভুর সামান্য কৃপা অনুভব করব। তখন আমরা জানব যে, “হ্যাঁ, আমাদের ভগবান, আমাদের প্রভু সেখানে রয়েছেন। তিনি উপস্থিত রয়েছেন। সেজন্য আমি এই প্রবেশদ্বারের সম্মুখে বসে ও জপ করে সম্পূর্ণ তৃপ্ত। আমি গোলযোগ সৃষ্টি হবার মতো উচ্চস্বরে জপ করব না কিন্তু তিনি আমাকে শুনতে পাবেন। তিনি যখন দ্বার খোলার প্রয়োজন অনুভব করবেন তখন তিনি তা খুলে দেবেন।”

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, মার্চ ২০২১ সংখ্যা

 

 

 

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here