ভগবান নিজেই ভগবানের আরাধনা শিখিয়েছেন

0
86

প্রভুপাদ কথোপকথন
ভগবান নিজেই ভগবানের আরাধনা শিখিয়েছেন

এখানে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি.ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এবং একজন টেলিভিশন রিপোর্টারের মধ্যকার মতবিনিময়ের অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছে। এই মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই ফ্লোরিডার গেইনেসভিলে।

সাক্ষাতকারী: কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি, আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনি এবং আপনার অনুগতরা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদ অনুসরণ করছেন। তিনি পাঁচ শত বছর পূর্বে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। সাক্ষাৎকারী : ভারতে?
শ্রীল প্রভুপাদ : ভারত, হ্যাঁ। তিনিই কৃষ্ণ স্বয়ং, এবং তিনি কৃষ্ণকে কিভাবে ভালবাসতে হয় তা শেখাচ্ছেন। তাই, তার প্রদর্শিত পন্থায় হচ্ছে সর্বোত্তম অনুমোদিত। যেমন ধরুন আপনার প্রতিষ্ঠানে আপনি হলেন একজন দক্ষ ব্যক্তি। যদি নতুন কেউ সেখানে কিছু করে এবং আপনি যদি তাকে বলেন, “তুমি এভাবে কর”, সেটি হবে অনুমোদিত পন্থা। তাই যখন ভগবান আবির্ভূত হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে, তিনি নিজেই ভগবানের ভাবনা শিক্ষা দিলেন।
কৃষ্ণ বলেছেন, “কেবল আমার শরণাগত হও, আমি তোমাকে মুক্ত করব।” কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ বিভ্রান্তিতে ছিল। তাই কৃষ্ণ নিজেই ভগবান চৈতন্য মহাপ্রভুরূপে এসে আমাদের শরণাগত হওয়ার শিক্ষা প্রদান করেছেন এবং যেহেতু আমরা ভগবান চৈতন্য মহাপ্রভুর পন্থা অনুসরণ করছি, তাই এই পন্থা এতই মহিমান্বিত যে, এমনকি পাশ্চাত্যবাসীরা যারা কখনো কৃষ্ণ সম্পর্কে জানত না, তারাও এই পন্থা অনুসরণ করছে।
এই পন্থা অত্যন্ত কার্যকরী। আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য ছিল সেটি। আমরা বলি না, “এই ধর্ম সেই ধর্ম থেকে উন্নত” কিংবা “আমার পন্থায় উত্তম।” আমরা ফলাফল দেখতে চাই। সংস্কৃতে একটি উদ্ধৃতি রয়েছে ফলেন পরিচায়তে- ফলাফল দিয়েই কোন কিছু বিচার করা যায়।
আপনি বলতে পারেন, “আমার পন্থাটি খুবই সুন্দর।” কিংবা আপনি বলতে পারেন আপনার পন্থাটিই উত্তম। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যই ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই বিচার করতে হবে। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, “ধর্মের সেই পন্থাই উত্তম, যা অনুসরণ করে, কারো ভগবানের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে।”
সাক্ষাৎকারী : হ্যাঁ। কিন্তু, আপনি নিশ্চয় জানেন যে, আপনার ধর্মই এই বিশেষ নীতিশিক্ষা প্রদানকারী একমাত্র ধর্ম নয়।
শ্রীল প্রভুপাদ : আমি সেটি ব্যাখ্যা করছি যে, এটি একমাত্র নয়। “ভগবানকে ভালাবাসা” এই শিক্ষা প্রদানের জন্য অনেক পন্থা আছে, কিন্তু আমাদের এই পন্থাটি কার্যকরীভাবে ফলপ্রসূ। সাক্ষাৎকারী: এখন, এই বিশেষ দর্শনের উৎপত্তি
——————————————————————————————————

ভগবান হলেন এক। কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে ঈশ্বরের বিজ্ঞান। দুই এর সাথে দুই যোগ করলে যে চার হয় সেটি সকলেই বুঝতে পারে। এমন নয় যে, এটি কেবল খ্রিস্টানরাই বুঝবে, হিন্দুরা নয়। দুই, দুই যোগ করলে চার হবে এটা সকলের জন্যই সমান। একইভাবে, ভগবান সকলের জন্য সমান। কিন্তু এখন, ভগবানকে ভালোবাসার পন্থার বিষয়টি শুধুমাত্র ভিন্ন।

——————————————————————————————————
এই পৃথিবীর একটি অংশ ভারতে হয়েছে, ঠিক? পৃথিবীর পূর্বাংশে, এখন আমরা যা দেখছি, এই পন্থা কি সেখানে সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ।
সাক্ষাৎকারী : আপনার সেখানে বহু অনুসরণকারী রয়েছে?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। খুব সম্প্রতি, আমি ভারতে গিয়েছিলাম। আমি সেখানে দুইটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি যার প্রত্যেকটির স্থায়িত্ব ছিল ১০ দিন, সেখানে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। ভারতের জনগণের স্থিতিটি হচ্ছে, তারা স্বভাবতই কৃষ্ণভাবনাময়, কিন্তু বর্তমান সময়ে, তাদের তথাকথিত নেতারা জড় ভাবনার প্রতিস্থাপন ঘটাতে চাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারী : হিন্দু ধর্মের সাথে কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শন কি যথাযোগ্য?
শ্রীল প্রভুপাদ : যে কোন ধর্মের সাথেই যথাযোগ্য ।
সাক্ষাৎকারী: যে কোনো ধর্ম ?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ, কারণ ভগবান হলেন এক। কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে ঈশ্বরের বিজ্ঞান। দুই এর সাথে দুই যোগ করলে যে চার হয় সেটি সকলেই বুঝতে পারে। এটি এমন নয় যে এটি কেবল খ্রিস্টানরাই বুঝবে, হিন্দুরা নয়। দুই, দুই যোগ করলে চার হবে সেই সকলের জন্যই সমান। একইভাবে, ভগবান সকলের জন্য সমান। কিন্তু এখন, ভগবানকে ভালোবাসার পন্থার বিষয়টি শুধুমাত্র ভিন্ন।
সাক্ষাৎকারী: এখন, আপনি কি দাবি করছেন, ভগবানকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আপনার প্রদর্শিত পন্থাটিই হচ্ছে ভগবানকে ভালোবাসার পন্থা?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। বিশেষত এই যুগে।
সাক্ষাৎকারী : এই যুগের জন্য ?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ ।
সাক্ষাৎকারী : আপনি বোঝাচ্ছেন কলিযুগ?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ ।
সাক্ষাৎকারী : আমরা এখন যে সময়ে আছি সেটি?
শ্রীল প্রভুপাদ : কারণ এই পন্থাটি অনুমোদিত। কৃষ্ণ নিজেই তার স্বরূপে এবং তার অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে এই পন্থার বিধান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই যুগে আত্ম উপলব্ধি কিংবা ভগবান উপলব্ধি কিংবা ভগবানকে ভালোবাসার শিক্ষা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য এটিই হল একমাত্র পন্থা।
কৃষ্ণ বলেছেন। তাই এটি হল অনুমোদিত পন্থা এবং এটি কার্যকরী হচ্ছে। অন্যথায় এই বালক বালিকারা সবাই পাশ্চাত্যবাসী, তারা কৃষ্ণকে জানত না। কিন্তু এখন আমার ৬০টি কেন্দ্র রয়েছে এবং প্রত্যেকটি কেন্দ্রে গড়ে একশত ভক্ত রয়েছে। তারা সকলে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে। এই পন্থা যদি অনুমোদিত না হয়, তবে কিভাবে এতকিছু সংঘটিত হচ্ছে?
সাক্ষাৎকারী : যাই হোক, তারা বলেছে যে তারা পূর্বে কৃষ্ণ সম্বন্ধে জানতো না, অবশ্য আপনিই সঠিক। কিন্তু বিভিন্ন মানুষ তাদের ভগবানের নাম বিভিন্নভাবে রেখেছে। আপনি আপনার ভগবানের নাম বলছেন কৃষ্ণ। পাশ্চাত্যদেশে বহু মানুষ তাদের ভগবানের নাম রেখেছে যীশুখ্রিস্ট।
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। সেটি ঠিক আছে। আমরা সেই সম্বন্ধে বলি যে, যদি প্রকৃতপক্ষে ভগবানের সাথে সম্বন্ধিত কোনো নাম আপনি পেয়ে থাকেন তাহলেও সেটি একই। যেমন আমরা জপ করি-
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে,
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
সাক্ষাৎকারী : ঠিক। হ্যাঁ।
শ্রীল প্রভুপাদ : তাই বৈদিক শাস্ত্রমতে, কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং : কৃষ্ণই হচ্ছেই পরমেশ্বর ভগবান তার বহু নাম রয়েছে। এমনকি হাজার এবং লক্ষাধিক নাম রয়েছে। এটি হচ্ছে প্রকৃত নাম। তাই ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন আপনাকে কৃষ্ণ নাম জপ করতে হবে। কিন্তু যদি আপনি ভগবানের প্রকৃত অন্য কোনো নাম পেয়ে থাকেন তবে সেই নাম জপ করতে পারেন। আমরা অনুরোধ করি “ভগবানের দিব্য নাম জপ করুন।”
সাক্ষাৎকারী : কিন্তু আপনি এখানে এসেছেন মধ্য ষাট এর দশকে অর্থাৎ এক দশকের কিছু সময় আগে… আমি আপনার কাছ থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি … আমেরিকায় আসার পেছনে আপনার কোন প্রেরণা শক্তি কাজ করেছিল?
শ্রীল প্রভুপাদ : সেটি ইতোমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। চৈতন্য মহাপ্রভু চেয়েছেন যে তার এই পন্থা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এবং সকলেই এটি গ্রহণ করুক এবং আমার গুরু মহারাজ আমাকে বলেছিলেন, “তুমি যাও এবং এটি করার চেষ্টা কর।” তাই আমি এই উদ্দেশ্য সাধনে এখানে এসেছি এবং সেই উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারী : এখানে অবশ্যই একটি বিষয় রয়েছে, যদিও আপনি আসার পূর্বে ভগবানকে জানার পন্থায় প্রাচ্যের অসন্তোষ পাশ্চাত্যদেশেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় আপনার আগমনের কোন তাৎপর্যই থাকত না।
শ্রীল প্রভুপাদ : অসন্তোষ শুধুমাত্র পৃথিবীর এই অংশের নয়। প্রত্যেকটি অংশেই রয়েছে। পৃথিবীর সর্বত্রই, বিশেষত সকলেই ভগবানকে জানার জন্য খুবই কম আগ্রহী। এখানে কুকুরকে জানার জন্য আগ্রহ বেশি।
সাক্ষাৎকারী : আপনি ভগবানের ভাবনা বৃদ্ধি করার জন্য প্রচেষ্টারত, তাই না?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। সেটিই মানব জীবনের একমাত্র ভাবনা হওয়া উচিত।
সাক্ষাৎকারী : আপনি বিশেষত ভগবানের নাম কি হবে, সেই বিষয়ে আগ্রহী নন?
শ্রীল প্রভুপাদ : না, না। আমাদের উদ্দেশ্য কিংবা মিশন হল মানুষ যাতে ভগবান সম্বন্ধে সচেতন হয় এবং এই যুগে সেই পন্থাটি হল ভগবানের নাম জপ-কীর্তন করা। যদি আপনি ভগবানের কোনো নাম পেয়ে থাকেন যেটি প্রকৃতপক্ষে ভগবানের একটি নাম, তবে আপনি সেই নাম জপ করে সাফল্যবান হবেন।
সাক্ষাৎকারী : কৃষ্ণের নাম জপ করা, হরেকৃষ্ণ মন্ত্র, আপনাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই না? প্রকৃতপক্ষে আমি ভাবছি যে আমি আপনাকে এবং আপনার কিছু শিষ্যকে, যারা এখানে বসে আছেন, তাদেরকে কিছুক্ষণ পরে বলব কৃষ্ণ নাম কীর্তন করার জন্য। সেটি হবে এই বিশেষ কার্যক্রমের যথাযথ পরিসমাপ্তি।
যাই হোক, আমি এখনো আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি, কয়েকটি প্রেক্ষিত নিয়ে। ম্যাগাজিনে এবং কিছু অন্যান্য প্রকাশনায় আপনার লেখা কিছু পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, ভগবান এবং প্রত্যেকটি সত্ত্বার মধ্যে পারস্পরিক সম্বন্ধের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ। এটি সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারী : প্রকৃতপক্ষে মনে হচ্ছে একে অন্যের মধ্যকার সম্বন্ধের চাইতে সেই সম্বন্ধকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি কি সঠিক?
শ্রীল প্রভুপাদ : না। প্রথমে আমাদেরকে অবশ্যই ভগবানের সাথে হারানো সম্পর্ক পুনঃরুদ্ধার করতে হবে। আপনি দেখছেন? তারপরই আমরা একে অন্যের মধ্যকার সম্বন্ধ উপলব্ধি করতে পারব।

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here