বৈষ্ণব অপরাধ

0
78

ভক্তচরণে যারা অপরাধী তাদের নিস্তার নেই। তাদের দণ্ড অনিবার্য।
শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

ত্বমেকঃ সর্বজগত ঈশ্বরো বন্ধমোক্ষয়োঃ।
তং ত্বামচন্তি কুশলাঃ প্রপন্নাতিহরং গুরুম্ ॥

শ্রীমদ্ভাগবত (৮.৭.২২) অনুবাদ : হে ভগবান, আপনি সমগ্র জগতের বন্ধন এবং মুক্তির কারণ, কেননা আপনি তার ঈশ্বর। যারা আধ্যাত্মিক চেতনায় উন্নত, তাঁরা আপনার শরণাগত হয়, এবং তাই আপনি তাঁদের দুঃখ দুর্দশা দূর করেন, এবং আপনি তাঁদের মুক্তিরও কারণ। আমরা তাই আপনার অর্চনা করি।

দেবাদিদেব শিবের অনন্য অবস্থান

শ্রীমদ্ভাগবতের এই অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ইচ্ছায় ও তত্ত্বাবধানে দেবতা ও অসুররা একবার একত্রিত হয়েছিলেন তাদের জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষনে। তারা নিজেরা তাদের জীবনের এক বিশাল জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একত্রিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আর তাদের সেসময় তত্ত্বাবধান করছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু। আর সে সময়ে উদ্ভুত এক উৎকট সমস্যা হতে উত্তরনের নিমিত্তে আবির্ভূত হলেন দেবাদিদেব মহাদেব, তারা একত্রিত হয়ে শিবের নিকট উপস্থিত হয়ে তার স্তবস্তুতি করতে শুরু করলেন। আমাদের জেনে রাখা উচিত, শিব অনন্য ও স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর এমন কিছু স্বতন্ত্র গুণাবলী আছে যা শুধুমাত্র ভগবান শ্রী বিষ্ণুর আছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তমোগুণ হতে শিবের উৎপত্তি। দেবাদিদেব মহাদেবকে বলা হয় গুণাবতার। ব্রহ্মসংহিতা অনুসারে, যখন দুধ কোনো টক বস্তুর সংস্পর্শে আসে তখন তা দধিতে পরিণত হয় এবং গুণাবলীর দিক হতে তা দুধ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু তা দুধেরই বিকার মাত্র। ঠিক তেমনি ভগবান বিষ্ণু নিজেকে বিশেষ আবরণ দ্বারা আচ্ছাদিত করে শিব রূপে প্রকটিত হয়েছেন তাই তিনি একাধারে এক আবার ভিন্ন। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে জীবতত্ত্ব হিসেবে অবহিত করা হলেও শিবকে জীবতত্ত্ব হিসেবে অবহিত করা হয় না। তিনি জীবতত্ত্ব নন। তাঁকে শিবতত্ত্ব হিসেবে অবহিত করা হয় তাঁর গুণাবলী সম্পূর্ণ রূপে স্বতন্ত্র। তিনি বিষ্ণু হলেও তাঁকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, তিনি বিষ্ণুর গুণাবলী প্রদর্শন করতে পারেন না এবং বিষ্ণুর মতো কার্য সম্পাদনও করতে পারেন না। দেবাদিদেব শিব হলেন পরম বৈষ্ণব, বৈষ্ণব শ্রেষ্ঠ। শ্রীমদ্ভাগবতে শিব সম্পর্কে বলা হয়েছে বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভু অর্থাৎ বৈষ্ণবদের মধ্যে শিবই শ্রেষ্ঠ। অতএব এখানে প্রমাণিত হয় নারায়ণের শ্রেষ্ঠ ভক্ত হিসেবে শিবের এক স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। তাই সকল বৈষ্ণবরাই ভগবানের এক মহান শুদ্ধভক্তরূপে শিবের অর্চন করে থাকে। এমনকি বৃন্দাবনেও শিবকে আমরা দেখতে পাই তিনি ক্ষেত্রপালরূপে সেখানে বিরাজিত। তদ্রুপ পুরীতেও। বৃন্দাবনে আমরা শিবকে দেখতে পাই বিভিন্ন রূপে যেমন কোথাও তিনি তার স্বাভাবিক রূপে আবার কোথাও তিনি পদ্মাসনে সমাসীন হয়ে ধ্যানস্থ অবস্থায় আবার কোথাও শম্ভুরূপে। বৃন্দাবনে শিবের ধ্যানস্থ হয়ে থাকার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি ধ্যানে শ্রী রাধাকৃষ্ণের দিব্যলীলা স্মরণ ও দর্শন করেন। তিনি সর্বক্ষণ এরূপে ভাবে ধ্যানস্থ হয়ে শ্রী রাধাকৃষ্ণের দিব্যলীলা রমন করেন। তার মন সর্বদা শ্যামসুন্দরের পাদপদ্মে নিবিষ্ট থাকে। পুরীতে তিনি বিরাজ করছেন অষ্টশম্ভু রূপে। স্কন্ধপুরান অনুসারে তারা হলেন কপালমোচন, কামেশ্বর, ক্ষেত্রপাল, যমেশ্বর, মার্কণ্ডেয়শ্বর, ঈশানেশ্বর, বিশ্বেশ্বর, নীলকণ্ঠেশ্বর অন্যান্য শাস্ত্রে অষ্টশম্ভুর নাম এই রকমভাবে দেওয়া আছে। লোকনাথ, বড় লোকনাথ, শঙ্খেশ্বর, যমেশ্বর, মার্কণ্ডেশ্বর, কপালমোচন, নীলকণ্ঠেশ্বর, বানাশ্বর।

ভগবান তাঁর নিজ ভক্তকে পূজা করে আনন্দিত হন

যদি কেউ ভগবানের শ্রী পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করতে শুধুমাত্র ইচ্ছা পোষন করেন, তখনই ভগবান তার প্রতি খুবই প্রীত হন। কেউ যখন ভগবানকে অৰ্চন করে তখন ভগবান প্রীত হন। কিন্তু কেউ যখন তার ভক্তকে অর্জন করে তখন তিনি আরো বেশী প্রীত হন। তিনি নিজে তার ভক্তকে অর্চন করে জগৎকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ত্রেতাযুগে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র রামেশ্বরম নামক তীর্থে লংকেশ্বর রাবণের সাথে যুদ্ধের প্রাক্কালে শিবের পূজা করেছিলেন। এই ঘটনাকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নরূপে উপস্থাপন করেছেন। কেউ কেউ রামচন্দ্রের ভগবত্তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনেকে প্রশ্ন করেন, শ্রী রামচন্দ্র যদি ভগবান হয়ে থাকেন তবে কেন তিনি শিবের অর্চন করেছিলেন? তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি তার কারণ ভগবান তার নিজ হাতে তার ভক্তকে পূজা করে আনন্দ পান। এরকম একটি নয়, অনেক ঘটনা, অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। দ্বারকাতেও ঠিক এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। যখন সুদামা বিপ্র কৃষ্ণের গৃহে এসেছিলেন, সেসময় ভগবান ব্রাহ্মণরূপী সুদামার অর্জন করেছিলেন। তিনি তাঁর পদ্মহস্ত দ্বারা সুদামা বিপ্রের পাদধৌত করেছিলেন এবং নিজের গলবস্ত্র দিয়ে তাঁর চরণ মুছে দিয়েছিলেন। আর শ্রী ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীরূপী সত্যভামা তাকে ব্যজন করেছিলেন। ঠিক তেমনি রামেশ্বরমে ভগবান তার শুদ্ধভক্ত শিবের অর্ধন করেছিলেন পরম ভালবাসা দিয়ে এবং তা করেছিলেন শুধুমাত্র তার ভক্তের মহিমা প্রকাশ করার জন্য। হরিনামের দশবিধ অপরাধের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও প্রথম অপরাধ হলো যে সমস্ত ভক্ত ভগবানের দিব্যনাম প্রচার করার জন্য নিজেদের সর্বতোভাবে উৎসর্গ করেছেন তাদের নিন্দা করা, অর্থাৎ ভক্ত নিন্দা, ভক্তকে অপমান করা, অবজ্ঞা করা, যেখানে স্বয়ং ভগবান নিজে তার ভক্তকে পূজা করেন সেখানে আমরা কি করে তার ভক্তকে নিন্দা করার, অপমান করার দুঃসাহস দেখায়। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ৯ম অধ্যায়ে ৩০নং শ্লোকে ভগবান বলছেন—

অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্ ।
সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ ব্যবসিতো হিসঃ ॥

অনুবাদ : অতি দুরাচারী ব্যক্তিও যদি অনন্য ভক্তি সহকারে আমাকে ভজনা করেন, তাকে সাধু বলে মনে করবে, কারণ তাঁর দৃঢ় সংকল্পে তিনি যথার্থ মার্গে অবস্থিত।
যেখানে ভগবান দুরাচারী ব্যক্তিকেও শুধুমাত্র তাঁকে অনন্যচিত্তে ভজনা করার কারণে সাধু বলছেন সেখানে তোমার অবস্থান কোথায়? তুমি কার নিন্দা করছো? সেখানে কৃষ্ণ বলছেন, সে সাধু। আর যে ব্যক্তি তার দেহ, মন, বাক্য সর্বস্ব ভগবানের চরণে সম্পন্ন করেছেন।


একজন ভক্ত তিল তিল করে সারা জীবন ধরে তার ভক্তির বাগানকে গড়ে তোলে। ভক্তিবীজ অংকুরিত হয়ে ভক্তিলতা উত্থিত হয়। এটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে, এই ভক্তিলতা খুব সামান্য একটু বৃদ্ধি হতেই বহু সময় লেগে যায়, এমনকি বহু জন্ম পর্যন্তও। কিন্তু সেই বাগানে মত্ত হাতিরূপী বৈষ্ণব অপরাধ প্রবেশ করে মুহূর্তেই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়।


এ ক্ষেত্রে শুদ্ধ ভক্তদের কথা বলার আর কি অপেক্ষা রাখে? এরূপ শুদ্ধ মহাত্মাদের পাদপদ্ম সর্বদা অৰ্চনীয়। সর্বদাই তাদের মহিমা গুণান্বিত এবং তাদের চরিত্র সর্বদাই অনুসরণীয়।

ভগবানের শুদ্ধভক্তের চরণে অপরাধ ও তার প্রতিক্রিয়া

কদাচিৎ কালেভদ্রেও যদি এরূপ শুদ্ধভক্তের চরণে অপরাধ হয়ে যায় তবে তার প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়ংকর। কেউ যদি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এরূপ অপরাধ করে তবে তার কি অবস্থা হবে? তাই আমাদের খুব সাবধান থাকা উচিত। বৈষ্ণব অপরাধকে তুলনা করা হয়েছে মত্ত হাতির সাথে । কৃষক অনেক ঘাম, যত্ন আর প্রেম দিয়ে গড়ে তোলে তার সাজানো বাগান। কিন্তু হঠাৎ মত্ত হাতি যদি তার বাগানে প্রবেশ করে তবে মুহূর্তেই সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তেমনি একজন ভক্ত তিল তিল করে সারা জীবন ধরে তার ভক্তির বাগানকে গড়ে তোলে। ভক্তিবীজ অংকুরিত হয়ে ভক্তিলতা উত্থিত হয়। এটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে, এই ভক্তিলতা খুব সামান্য একটু বৃদ্ধি হতেই বহু সময় লেগে যায়, এমনকি বহু জন্ম পর্যন্তও। কিন্তু সেই বাগানে মত্ত হাতিরূপী বৈষ্ণব অপরাধ প্রবেশ করে মুহূর্তেই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এরূপ শুদ্ধভক্তদের চরণে অপরাধ ভক্তিলতাকে সমূলে উৎপাটন সহ ভক্তিবীজ পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সক্ষম। এরূপ শুদ্ধাত্মাদের চরণে যখন কোনো অপরাধ হয়ে যায় তখন আমাদের সকল আধ্যাত্মিক অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এরূপ আমরা দেখতে পাই প্রজাপতি দক্ষের জীবন কাহিনীতে। প্রজাপতি দক্ষ একবার যজ্ঞ করছিলেন। তখন তিনি তাঁর যজ্ঞে শিবকে নিমন্ত্রণ করেননি। কেননা তিনি সংকল্প করেছিলেন, তিনি শিবহীন যজ্ঞ করবেন। শিবকে তিনি এরূপ অবজ্ঞা করেই ক্ষান্ত হননি। যজ্ঞস্থলে শিবপত্নী সতীর সম্মুখে শিবের নিন্দা করেছিলেন। তিনি শিবকে জাগতিক দৃষ্টিতে দর্শন করে তাঁর নিন্দা করতে শুরু করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে পদ্মপুরাণের উদ্ধৃতি-

অচ্যে বিষ্ণৌ শিলার্ধী পুরুষ,
নবমতিবৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি
বিষ্ণোর্বা বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে
পাদতীর্থেহম্বুবুদ্ধি

শ্রীবিষ্ণোনান্নিমন্দ্রে সকল কলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধ বিষ্ণো সর্বেশ্বরেশে তদিতর সমধীযম্য বা নারকী সঃ
যে ব্যক্তি পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে পাথর, কাঠ, বা ধাতু নির্মিত বলে মনে করে, ভগবানের নিত্য পার্ষদ শ্রী গুরুদেবকে একজন সাধারণ মরণশীল মানুষ বলে গণ্য করে । বৈষ্ণব ভক্তকে কোনো বিশেষ জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে, কিংবা কলিযুগে সমস্ত কলুষ নাশ করতে সক্ষম বিষ্ণু বা বৈষ্ণবের চরণধৌত জলকে সাধারণ জল বলে মনে করে। সকল কলুষহরণকারী ভগবানের পবিত্র নাম বা ভগবান সম্বন্ধীয় মন্ত্রকে সাধারণ শব্দের সাথে তুলনা করে এবং সর্বেশ্বর বিষ্ণুকে দেবতাদের সমকক্ষ বলে মনে করে, সেই ব্যক্তি নারকীয় বুদ্ধির অধিকারী। যে ব্যক্তি এভাবেই চিন্তা করে সে নিঃসন্দেহে নরকের বাসিন্দা। তাই এরূপ শুদ্ধভক্তদের কখনোই জড়বুদ্ধিতে দেখা উচিত নয়।

দেবাদিদেব শিবের চরণে দক্ষের অপরাধ

প্রজাপতি দক্ষ শিবকে এরূপ জাগতিক দৃষ্টিতে দর্শন করেছিলেন। শিব সর্বদা ভূতপ্রেতের সঙ্গ করতো, যতসব অজ্ঞানী মূর্খের সাথে সখ্যতা ছিল। তিনি সর্বদাই এমন সব কর্মকাণ্ড করতেন যা থেকে মনে হতো, তিনি অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন। তিনি বাঘের চামড়া পরিধান করতেন। সারা শরীরে শ্মশানের ভস্ম মেখে থাকতেন। সাধারণভাবে কেউ এরূপ ব্যক্তিকে নিজের অতিথি হিসেবে চায় না। তিনি সবসময় শ্মশানে ঘুরে বেড়াতেন। যে স্থানকে সকলেই অস্পৃশ্য মনে করতো। তৎকালীন সময়ে একটি প্রথা প্রচলিত ছিল কেউ যদি শবদাহ করার জন্য শ্মশানে যেত তবে তার কয়েক সপ্তাহ মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সেই স্থানে শিব নিত্য বাস করতো এবং সে স্থানেই শিব তার ভজন সাধন করতেন। তিনি সর্বদা কণ্ঠে সর্প জড়িয়ে রাখতেন। প্রজাপতি দক্ষ বাস্তবেই ছিলেন দুর্ভাগা। তিনি তখন ছিলেন শিবের চেয়েও বেশী জনপ্রিয় ব্যক্তি। জনপ্রিয়তা তথা প্রতিষ্ঠা অপরাধ সংঘটনের জন্য এটি একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যখন কোনো ব্যক্তি এরূপ শুদ্ধভক্ত বিশেষ করে তার গুরুদেবের চেয়ে নিজেকে বেশী জনপ্রিয় তথা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি মনে করে তখন সে তার গুরুদেবকে খুব সাধারণ একজন ব্যক্তি বলে মনে করতে শুরু করে। তখনই তার গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়। আবার অপরদিকে শিব ছিলেন প্রজাপতি দক্ষের জামাতা। জাগতিকভাবে দক্ষ চিন্তা করেছিলেন আমিই শিবের কাছ হতে সম্মান পাবার যোগ্য। তিনি কখনোই ভগবানের শুদ্ধভক্তরূপে শিবকে দর্শন করেননি। দক্ষ শিবকে নিন্দা করার অপরাধে সর্বস্ব হারিয়েছিলেন। মান-সম্মান, যশ প্রতিপত্তি, প্রাচুর্য, সম্পদ এমনকি তাঁর কন্যাকেও। তার কন্যা সতী শিবের নিন্দা সহ্য করতে না পেরে উপস্থিত সবার সামনেই যজ্ঞের অগ্নিতে আত্মাহুতি দেন। এটা হলো ভক্তের স্বভাব। একজন ভক্ত কখনোই বৈষ্ণবের নিন্দা শ্রবণ করতে পারেন না। সতী তার পতি শিবের নিন্দা শ্রবণ করে ক্রোধান্বিত ও অপমানবোধ করলেন যে, তিনি যজ্ঞস্থলেই নিজেকে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করলেন। কেননা সতী চিন্তা করছিলেন যে, দক্ষ আমার জন্মদাতা পিতা । এই শরীর তাঁরই দেওয়া, তাই তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। এমন কিছু আমার কাছে রাখা উচিত নয় যা তার দেওয়া। আর তিনি আমার কর্ণ ও হৃদয়কে অপবিত্র কলুষিত করেছেন। এটাই হলো একজন সচেতন ভক্তের ভাব। কেউ যখন বৈষ্ণব অপরাধ শ্রবণ করে তখন তার উচিত, যে ব্যক্তি বৈষ্ণব নিন্দা করছে তাকে যুক্তি তর্ক দিয়ে পরাস্ত করা। অথবা তার প্রাণ ছিনিয়ে নেওয়া বা তার জিহ্বা কেটে দেওয়া, অথবা তার নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া। কেননা বৈষ্ণব অপরাধ শ্রবণ করার ফলে তার হৃদয় কলুষিত হয়ে গেছে। অথবা এগুলোর কিছুই করতে না পারলে তত্ক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করা। তাই সতী যজ্ঞাগ্নিতে তার দেহ বিসর্জন দেন। বৈষ্ণব অপরাধের ফলে দক্ষের মস্তক কাটা যায় এবং সেই স্থানে একটি ছাগমুণ্ড বসানো হয়। তোমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে দক্ষ ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি। তিনি সাধারণ ব্যক্তি নন। তাকে প্রজাপতি বলে অবহিত করা হয়। অর্থাৎ যিনি সমস্ত শাস্ত্র সম্বন্ধে পারদর্শী। তিনি অনেক তপস্যা করেছিলেন। এরূপ ব্যক্তির বৈষ্ণব অপরাধের কারণে কি দুর্গতিই না হয়েছিল । তিনি অনেক দিন শাস্তি ভোগ করেছিলেন। পরবর্তীতে ভগবানের করুণায় সব ফিরে পেয়েছিলেন।

বৈষ্ণব অপরাধের আরো কিছু দৃষ্টান্ত

বৈদিক সাহিত্য হতে আমরা জানতে পারি যে, ভগবান কখনোই তার ভক্তের নিন্দা সহ্য করেন না। চৈতন্য চরিতামৃত গোপাল চাপালের একটি কাহিনি আছে-গোপাল চাপাল শ্রীবাস ঠাকুরের চরণে অপরাধ করেছিলেন। শ্রীবাস ঠাকুর ছিলেন গৃহস্থ। গোপাল চাপাল শ্রীবাস ঠাকুরকে একজন সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে দর্শন করেছিলেন। তিনি নবদ্বীপে শ্রীবাস ঠাকুর সম্পর্কে গুজব ছড়ালেন যে, তিনি জাগতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তন্ত্রমতে দেবী দুর্গার পূজা করছেন প্রতি রাতের অন্ধকারে। তিনি তামসিকভাবে দেবী দুর্গার পূজা করার জন্য যেসব উপাচারগুলো প্রয়োজন যেমন-মদ, মাংস, হাড় সবগুলো জড়ো করে শ্রীবাস ঠাকুরের গৃহের বাইরে রেখে গ্রামবাসীদের ডেকে দেখান এবং বলেন, দেখুন দেখুন শ্রীবাস দিনের বেলায় বৈষ্ণব বলে নিজেকে পরিচয় দেন। আর রাতের আঁধারে কি জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়। সবাই শ্রীবাস ঠাকুরকে এর সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হ্যা আমি দেবী দুর্গার পূজা করি।
শ্রীবাস ঠাকুরের জাগতিক মান অপমান প্রতিষ্ঠা এগুলোর প্রতি কোনো আসক্তি ছিল না। তাই কে কি বললো, না বললো তার প্রতি শ্রীবাস ঠাকুরের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। পরদিন সকালে গোপাল চাপালকে অদ্ভুত রূপে দেখা গেল। যে লোকটি গতকালও সুস্থ ছিল, আজ সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। তার দেহের বেশীর ভাগ অঙ্গে পঁচন ধরেছে। সেখানে পোকা কিলবিল করছে। তৎকালীন সময়ে কুষ্ঠরোগ হলে ঐ কুষ্ঠরোগীকে সমাজচ্যুত করা হতো। সমাজপতিদের সিদ্ধান্তে গোপাল চাপালকে সমাজচ্যুত করা হলো। সমাজচ্যুত হওয়ার পরও তার শাস্তি শেষ হলো না। পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। তখন সে গঙ্গার তীরে একজন ভিখারির মতো জীবনযাপন করতে লাগলেন। অনেক দিন এভাবে অতিবাহিত হলো। একদিন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোপাল চাপালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখে গোপাল চাপাল তাঁর চরণে পতিত হয়ে ক্রন্দন করতে করতে স্বীয় অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন, “প্রভু আমি অপরাধের জন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত। আমি মহা অন্যায় করেছি। আমাকে দয়া করুন। কৃপা করে আমাকে এই রোগ থেকে মুক্ত করুন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
তখন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু ক্রোধে বললেন, যেহেতু তুমি আমার ভক্তের চরণে অপরাধ করেছ, তোমার কোনো নিস্তার নেই। তোমাকে এর দণ্ড ভোগ করতেই হবে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এই বলে চলে গেলেন। উল্লেখ্য, ভগবান সর্বদাই করুনাময় ও ক্ষমাশীল। কিন্তু কেউ যখন তার ভক্তের চরণে অপরাধ করে তখন তার প্রতি কোনো দয়া প্রদর্শন করেন না। তার জন্য দণ্ড অনিবার্য। এর কিছুদিন পর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবার সে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। মহাপ্রভুকে দেখে গোপাল চাপাল পূর্বের চেয়ে বেশী আর্তি সহকাৱে মহাপ্রভুর চরণে পতিত হল এবং বললো প্রভু আপনি আমাকে যেরূপ ইচ্ছা শাস্তি দিতে পারেন কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি আর কখনোই আপনার ভক্তের চরণে অপরাধ করবো না। মহাপ্রভু দেখলেন বাস্তবেই গোপাল চাপাল তার দুস্কর্মের জন্য অনুতপ্ত। তখন মহাপ্রভু বললেন, যে আমার ভক্তের চরণে অপরাধ করে তাকে ক্ষমা করার শক্তি আমার নেই। তুমি শ্রীবাসের চরণে পতিত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। শ্রীবাস তোমাকে ক্ষমা করলে তুমি এই রোগ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। একমাত্র শ্রীবাসই তোমাকে রক্ষা করতে পারে। গোপাল চাপাল সঙ্গে সঙ্গে শ্রীবাস ঠাকুরের নিকট গিয়ে হৃদয়ের সমস্ত আর্তি সহকারে শ্রীবাস ঠাকুরের চরণে পতিত হয়ে বললেন, প্রভু এই পাপীকে ক্ষমা করুন। আপনি ক্ষমা না করলে আমার কোনো নিস্তার নেই। তখন শ্রীবাস ঠাকুর বললেন, আপনি এমন কোনো অপরাধ করেননি যে, আমার কাছে আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে। আপনি উঠুন। তখন গোপাল চাপাল বললেন, প্রভু সেদিনের সব ষড়যন্ত্র আমিই করেছিলাম 1 আমি বুঝতে পেরেছি, আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি। আমাকে কৃপাপূর্বক ক্ষমা করুন। শ্রীবাস ঠাকুর দেখলেন, সত্যিই গোপাল তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তখন শ্রীবাস ঠাকুর তাকে হাত দিয়ে উঠিয়ে আলিঙ্গন করলেন। শ্রীবাস ঠাকুরের ক্ষমায় পরবর্তীতে গোপাল চাপাল শুদ্ধ ভক্ততে পরিণত হয়েছিলেন। একইভাবে গোপাল চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল চাঁদপুরে। একজন শুদ্ধ ভক্ত হিসেবে হরিদাস ঠাকুর অসাধারণ দৈন্য প্রদর্শন করেছিলেন। জমিদার হিরণ্য মজুমদার ও গোবর্ধন মজুমদার তাদের সভায় হরিদাস ঠাকুরকে বিভিন্ন দার্শনিক বিষয় সম্বন্ধে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে হরিনামের প্রসঙ্গ এলে হরিদাস ঠাকুর সভায় উপস্থিত পণ্ডিতগণের মতের বিরোধিতা করে ঘোষণা করলেন যে, মুক্তি, পাপক্ষয় এসব হরিনামের মাধ্যমে অনায়াসেই সাধিত হয়। হরিনামের আসল উদ্দেশ্য কৃষ্ণপ্রেম লাভ। তখন সভায় উপস্থিত ছিলেন গোপাল চক্রবর্তী নামক এক ব্রাহ্মণ। তিনি হরিদাস ঠাকুরের তীব্র সমালোচনা করলেন এবং হরিদাস ঠাকুরকে বললেন, যদি আপনার কথা বাস্তবিক প্রমাণ আগামীকাল সকালের মধ্যে না দিতে পারেন তবে আমরা পণ্ডিতরা সবাই মিলে আপনার নাক কেটে নিব। হরিদাস অপমানিত হয়েও বিনীত ছিলেন। তিনি সেই ব্রাহ্মণকে কোনো কথা বললেন না এবং সভার অন্যান্যরা রেগে গেলেও হরিদাস ঠাকুর তাদের শান্ত করলেন। কিন্তু হরিদাস ঠাকুর তাকে ক্ষমা করলেও কৃষ্ণ সেই ব্রাহ্মণকে ক্ষমা করেননি । তিনদিন পর অবিশ্বাস্যভাবে কুষ্ঠরোগে সেই ব্রাহ্মণের নাক খসে পড়েছিল।
একবার রামচন্দ্র খান নামক এক নাস্তিক জমিদার হরিদাস ঠাকুরকে তার সাধনা থেকে চ্যুত করার জন্য হীরা নামে পরমা সুন্দরী বেশ্যাকে নিযুক্ত করেন। কিন্তু হরিদাস ঠাকুরের প্রভাবে সেই বেশ্যা পরবর্তীতে লক্ষহীরা নামে শুদ্ধ বৈষ্ণবী বলে পরিচিত হন। হরিদাস ঠাকুর সেই জমিদারকে ক্ষমা করলেও নিত্যানন্দ প্রভু ক্ষমা করেননি। শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু এবার রামচন্দ্র খানের জমিদারির এলাকায় যান। কিন্তু রামচন্দ্র খান নিত্যানন্দ প্রভুকেও অপমান করেন। পরবর্তীতে মুসলমানরা এ গ্রাম আক্রমণ করে তার বসতভিটায় গো হত্যা করে অমেধ্য রন্ধন করে এবং এ জমিদারকে সপরিবারে হত্যা করে ।
শ্রীমদ্ভাগবতে আমরা এরূপ ঘটনা দেখি। দুর্বাসা মুনি ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী ঋষি। পান থেকে চুন খসলেই তিনি অভিশাপ দিয়ে ভস্ম করে দিতেন। সবাই তার ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতো। সেই দুর্বাসা মুনি ভগবানের শুদ্ধভক্ত অম্বরীষ মহারাজকে চণ্ডালত্ব প্রাপ্তির জন্য অভিশাপ দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র দুর্বাসা মুনির পিছনে ধাওয়া করতে শুরু করলে দুর্বাসা মুনি বিচলিত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে লাগলেন। অনন্যোপায় হয়ে তিনি ব্রহ্মা, মহেশ্বরের কাছে গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেও তারা আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন তাদেরই পরামর্শে দুর্বাসা মুনি ভগবান বিষ্ণুর কাছে যান। তখন ভগবান বিষ্ণু দুর্বাসা মুনিকে পরামর্শ দিলেন, অম্বরিষ মহারাজের কাছে গিয়ে নত মস্তকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। দুর্বাসা মুনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অবনত মস্তকে অম্বরীষ মহারাজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাকে দেওয়া অভিশাপ নিজে গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে দুর্বাসা মুনি বহু বছর তপস্যার মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত যোগশক্তি হারিয়ে সাধারণ মানুষের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। এটাই হলো বৈষ্ণব অপরাধের ভয়ংকর পরিণাম।

পরম বৈষ্ণব নরোত্তম দাস ঠাকুর প্রার্থনা করছেন, “হে আমার প্রিয় গোবিন্দ, কেউ যদি তোমার চরণে অপরাধ করে তবে তোমার দিব্য নাম জপের মাধ্যমে তা থেকে মুক্তি পেতে পারে কিন্তু কেউ যদি তোমার ভক্তের চরণে অপরাধ করে তবে তার আর কোনো নিস্তার থাকে না। হে প্রভু, আমি যাতে বৈষ্ণব অপরাধ হতে মুক্ত থাকতে পারি।”


পরম বৈষ্ণব নরোত্তম দাস ঠাকুর প্রার্থনা করছেন, “হে আমার প্রিয় গোবিন্দ, কেউ যদি তোমার চরণে অপরাধ করে তবে তোমার দিব্যনাম জপের মাধ্যমে তা থেকে মুক্তি পেতে পারে কিন্তু কেউ যদি তোমার ভক্তের চরণে অপরাধ করে তবে তার আর কোনো নিস্তার থাকে না। হে প্রভু, আমি যাতে বৈষ্ণব অপরাধ হতে মুক্ত থাকতে পারি। একমাত্র সেই শুদ্ধভক্ত যদি সেই অপরাধীকে ক্ষমা করেন তবেই তার নিস্তার।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এই বৈষ্ণব অপরাধের নির্মম পরিণতির উদাহরণ দিয়েছেন। বৈষ্ণব অপরাধের জন্য স্বীয় বংশকেও তিনি ক্ষমা করেননি। তাঁর নিজের যদুবংশকে এই গ্রহ হতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন, তার ভক্তের চরণে অপরাধ সংগঠনের মাধ্যমে। একবার কিছু যাদব (যদুবংশীয়দের যাদব বলা হতো) শাম্ভা নামক যাদবকে তার পেটের ওপর এক মুষল (লৌহখণ্ড যার দুই মুখ সুঁচালু) রেখে তা কাপড় দিয়ে ঢেকে তাকে গর্ভবতী নারীর মতো সাজালেন। সে সময় নারদ মুনি, পর্বত মুনিসহ আরো অনেক তপস্বী অবস্থান করছিলেন দ্বারকায়। যাদবরা সেই গর্ভবতী রমনী রূপী শাম্ভাকে নিয়ে মুনিদের কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মুনিবর আপনারা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞাত। দয়া করে বলবেন কি, এই নারীর গর্ভের সন্তান কি হবে? তখন ঋষিরা বুঝতে পারলো যে, যাদবরা মজা করছে। যাদবরা তপস্বীদের হেয় প্রতিপন্ন করতে এই নাটক করেছিলেন। নারদ মুনি বুঝতে পারলেন যাদবরা বৈষ্ণব অপরাধ করছে। এটা বুঝতে পেরে নারদ মুনি বললেন, তোমরা এর পেটের নিচে যে বস্তুটি রেখে বৈষ্ণবদের সাথে মজা করছো সেই বস্তুটিই তোমাদের যদুবংশের ধ্বংসের কারণ হবে। তখন যাদবরা খুব ভয় পেয়ে এই মুষলকে ধ্বংস করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও বিফল হয়। অবশেষে এই মুষলই সমগ্র যদুবংশের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল।
শ্রীল প্রভুপাদ ১ম স্কন্ধের তাৎপর্যে লিখেছেন, বৈষ্ণব অপরাধের ভয়ংকর পরিণাম স্বয়ং কৃষ্ণ আমাদের দেখিয়ে গেছেন। যদুবংশ ছিল ভগবানের নিজের বংশ। কিন্তু বৈষ্ণব অপরাধের পরিণাম হতে তিনি নিজের বংশধরদেরও রক্ষা করেননি। বৈষ্ণব অপরাধ যে শুধুমাত্র অপরাধীকে শাস্তি দেয় তা নয়। তার পরিণাম ভোগ করতে হয় তার সমগ্র পরিবারকে। তার জ্বলন্ত উদাহরণ রামচন্দ্র খান। মুসলমানরা শুধুমাত্র তাকে নয় তার সমগ্র পরিবারকে হত্যা করেছে। তার সমস্ত সম্পদ লুট করেছে এবং তার নগর, গ্রামের সবকিছু লণ্ড ভণ্ড করে দিয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই বৈষ্ণব অপরাধীর সাথে সাথে তার পরিবার পরিজন এমনকি সমাজ পর্যন্ত তার সাজা ভোগ করে। তাই আমাদের উচিত এই বৈষ্ণব অপরাধকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা।

ভক্ত খুশী হলে ভগবানও খুশী হন, কৃষ্ণ, ভক্ত সুখে সুখী, ভক্ত দুঃখে দুখী

উপরোক্ত ঘটনাবলী থেকে প্রমাণিত হয়, ভগবানের কাছে তার ভক্ত কত প্রিয়। কেউ যখন তার ভক্তের চরণে কোনো অপরাধ করে তখন তিনি তা খুব গুরুত্বের সাথে নেন এবং তার জন্য দণ্ড অনিবার্য। তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না যে, কৃষ্ণ কি পরিমাণ আনন্দিত হন যখন কেউ তার ভক্তের মহিমা কীর্তন করে। শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধবকে বলেছিলেন মদ্ভক্ত পূজাভ্যধিকা। ১১/১৯/২১
অনুবাদ : আমার ভক্তের পূজা আমার পূজা থেকেও অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ। কেউ যখন বলে, হে প্রভু, আমি তোমার ভক্ত তখন কৃষ্ণ বলেন, না তুমি আমার ভক্ত নও, কিন্তু কেউ যখন বলে হে প্রভু আমি তোমার ভক্তের ভক্ত, তখন কৃষ্ণ বলেন, হ্যা সত্যিই তুমি আমার প্রিয় ভক্ত ।
যস্য প্রসাদাৎ ভগবত প্রসাদো গতিকুতোহপি।

কেউ যদি কৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হতে চায় তবে অবশ্যই তাকে গুরুকৃপা প্রাপ্ত হতে হবে। যে গুরুকৃপা লাভ করতে পারে না সে কখনোই কৃষ্ণকৃপা লাভ করতে পারে না। কৃষ্ণকে কেউ সরাসরি লাভ করতে পারে না। শুধুমাত্র শুদ্ধ ভক্তের কৃপার ফলেই কেউ কৃষ্ণকে লাভ করতে পারে। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর গেয়েছেন- কৃষ্ণ সে তোমার……….কৃষ্ণ দিতে পার, তোমার শকতি আছে।
দেবাদিদেব শিব হলেন ভগবানের প্রতিনিধি এবং সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু তথা পরম বৈষ্ণব।
কেউ যদি শিবের মহিমা কীর্তন করে তখন সে বিষ্ণুরও প্রিয় হয়। শ্রীমদ্ভাগবতে আমরা দেখি, শিব বিষ্ণুর কত বড় ভক্ত ছিলেন। ক্ষীর সমুদ্র মন্থনের সময় হলাহল (মারাত্মক বিষ) উঠেছিল।
সেই বিষের তেজস্ক্রিয়ায় সমস্ত জগৎ আক্রান্ত হচ্ছিল। তখন শিব জগৎ রক্ষার্থে সেই বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। বিষক্রিয়ায় তাঁর কণ্ঠ নীলাভ হয়ে গেলেও তিনি সহ্য করেছেন।
উপরোক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, কৃষ্ণের কাছে তার ভক্তের সেবার চেয়ে বড় কোনো সেবা নেই। সেহেতু কৃষ্ণ সকলের বীজ প্রদানকারী পরম পরম পিতা, সবাই তার সন্তান। তাই কৃষ্ণ চান না, তার কোনো সন্তান আরেক সন্তানের কষ্টের কারণ হোক। কেউ যখন তাঁর ভক্তদের রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নেন তখন কৃষ্ণ খুশী হন। কেউ যখন তার ভক্তের কষ্ট লাঘব করার জন্য সেই কষ্ট নিজে গ্রহণ করে তখন সেই ব্যক্তি কৃষ্ণের কাছে অতি প্রিয় বলে পরিগণিত হন। আমরা প্রত্যেকেই তাঁর নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেহের কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে যেমন সমগ্র দেহটি এর যাতনা অনুভব করে, তেমনি কৃষ্ণের কোনো সন্তান যখন জাগতিক দুঃখ কষ্ট ভোগ করে তখন তিনিও কষ্ট পান। কেউ যদি তাঁর সন্তানদের তার কাছে ফিরে আনার জন্য প্রচেষ্টা করে তখন তিনি সেই ব্যক্তির প্রতি খুবই প্রীত হন। আমরা যতদিন এই জগতে থাকব ততদিন ত্রিতাপ ক্লেশ ভোগ করতে থাকবো। যখনই আমরা ভগবানের কাছে ফিরে যাব তখনই শান্তি লাভ করবো। কেউ তখনই শান্তি লাভ করতে পারে যখন সে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার জ্ঞান যথার্থভাবে লাভ করে এবং সেই জ্ঞান অন্যদের প্রচার করে।

ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ ।
ভবিতা ন চ মেদ তন্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুবি ৷ (১৮/৬৯)
অনুবাদ : এই পৃথিবীতে মানুষদের মধ্যে তার থেকে অধিক প্রিয়কারী আমার কেউ নেই এবং তার থেকে অন্য কেউ আমার প্রিয়তর হবে না।
অবশেষে আমরা বলতে পারি যে, যখন আমরা কোনো শুদ্ধভক্তের মহিমা কীর্তন করবো। তখন পরোক্ষভাবে ভগবানেরই মহিমা কীর্তন করবো আর এর মাধ্যমে শুধুমাত্র ভগবান খুশী হবেন তা নয় আমাদের হৃদয়ও পরিশুদ্ধ হবে এবং আমরা শ্রীকৃষ্ণের আরো আরো বেশী নিকটবর্তী হতে পারবো।

শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী ১৯৫০ সালে শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। যুবক বয়সে ভগবজ্ঞান অর্জনের জন্য ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। অবশেষে ভারতে অবস্থানকালে শ্রীল প্রভুপাদের সাক্ষাৎ করেন। তিনি এ বিষয়গুলো তার বিখ্যাত দ্যা জার্নি হোম গ্রন্থে তুলে ধরেন। শ্রীল প্রভুপাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজ বৃন্দাবন থেকে নব বৃন্দাবনে গমন করেন। তিনি সেখানে দৃঢ়ভক্তি ও তপস্যা সহকারে দীর্ঘ আট বছর সেবা করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে আমেরিকার বিভিন্ন কলেজে প্রচার শুরু করেন। ভারতে প্রচার প্রজেক্ট উন্নয়নে সহায়তা করেন। তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে অবস্থিত চৌপাট্টিতে শ্রীশ্রী রাধাগোপীনাথ মন্দির ও ইসকন বেলজিয়াম মন্দিরে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর নির্দেশনায় কানপুর, নাসিক ও নিগধিতে প্রচার কার্যক্রম প্রসারিত হচ্ছে। তিনি প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্তদের নিয়ে বিভিন্ন তীর্থ পরিক্রমা করেন। তিনি বেলজিয়ামের ভক্তিবেদান্ত কলেজেরও একজন ট্রাস্টি ।

 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here