বিস্মৃত আত্মপরিচয়

0
68

প্রতিষ্ঠাতার প্রবচন

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রে ভারত।
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়ােজ্ঞানং যত্তজ্জ্ঞানং মতং মম ॥
“হে ভারত! আমাকে সমস্ত ক্ষেত্রের ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানবে এবং ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ সম্বন্ধে যথাযথভাবে অবগত হওয়াই আমার মতে প্রকৃত জ্ঞান।”                                                                   (ভগবদ্গীতা ১৩/৩)
(তাৎপর্যাংশ পাঠ) “আমরা যখন দেহ, দেহের জ্ঞাতা, আত্মা ও পরমাত্মা সম্বন্ধে আলােচনা করি, তখন আমরা তিনটি আলােচনার বিষয় দেখতে পাই, তা হচ্ছে ভগবান, জীব এবং জড় পদার্থ। প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে বা প্রতিটি দেহে দুটি আত্মা রয়েছে-জীবাত্মা ও পরমাত্মা।”
শ্রীল প্রভুপাদ : কখনও কখনও মায়াবাদী দার্শনিকেরা দাবী করে যে কেবল একটি আত্মা রয়েছে-পরমাত্মা। কিন্তু এখানে ভগবদ্গীতায়, জ্ঞানের পরম উৎস শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে দুটি আত্মা রয়েছে-জীবাত্মা ও পরমাত্মা। একটি আত্মা নয়। আত্মা ও পরমাত্মা।
(তাৎপর্যাংশ পাঠ) “যেহেতু পরমাত্মা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণেরই প্রকাশ, শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘আমিও ক্ষেত্রজ্ঞ কিন্তু আমি দেহের একক ক্ষেত্রজ্ঞ নই, আমি হচ্ছি পরম ক্ষেত্রজ্ঞ। পরমাত্মারূপে আমি প্রতিটি শরীরেই অবস্থান করি।” আমরা ইতােমধ্যে আলােচনা করেছি যে পরমাত্মা বা শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি দেহের সুখ দুঃখ সম্বন্ধে জ্ঞাত, কিন্তু জীবাত্মা কেবলমাত্র তার নিজের দেহগত সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে জ্ঞাত। আরেকটি জায়গায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্-সমস্ত দেহ জুড়ে জীবাত্মার চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। সেটি অবিনাশী। তার বিনাশ হয় না। সেটিকে ধ্বংস করা যায় না। কৃষ্ণ বলছেন, অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং তত। যেন, অর্থাৎ আত্মার দ্বারা, সে তার শক্তির দ্বারা সমস্ত দেহে ছড়িয়ে যায়।

মায়ার আরেকটি শক্তি হল প্রক্ষেপাত্মিকা শক্তি যা চেতনাকে আচ্ছন্ন করার পর আমাদেরকে ক্রমশ কৃষ্ণের কাছ থেকে দূরে ছুড়ে ফেলে। মায়া পরীক্ষা করে দেখে কেউ সত্যি কৃষ্ণকে চায় কি না, না কি সে কৃষ্ণকে সামনে রেখে জড় সুখ ভােগ করতে চায়। তখন মায়া তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। এইভাবে মায়া শক্তি কাজ করছে।


তেমনি যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমাত্মা, তাঁর চেতনা কেবলমাত্র আমার দেহেই সঞ্চারিত হয় না, তার চেতনা সকল দেহে বিস্তৃত হয়। জগতজুড়ে চুরাশি লক্ষ রকমের জীব রয়েছে এবং কৃষ্ণের চেতনা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। তিনি সবকিছু জানেন। তাই, আমরা যখন কৃষ্ণভাবনাময় হই, কৃষ্ণ সেটি বুঝতে পারেন কৃষ্ণ আপনার হৃদয়ে রয়েছেন। ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদেশেহজুন তিষ্ঠতি, (গীতা ১৮/৬১)। কৃষ্ণ আপনার উদ্দেশ্যসমূহ বুঝতে পারেন। আমরা কৃষ্ণকে প্রবঞ্চিত করতে পারি না। ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য বা তাঁর শরণাগত হওয়ার পথে বা কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য আপনি কতখানি ঐকান্তিক কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে তা বুঝতে পারেন। কৃষ্ণ সেটি বুঝতে পারেন। যখনই তিনি বুঝতে পারেন যে “এখানে এই আত্মাটি অত্যন্ত ঐকান্তিক”, তিনি বিশেষভাবে আপনার যত্নবিধান করবেন।সমােহহং সর্বভূতেষু পরমেশ্বর ভগবানরূপে কৃষ্ণ প্রত্যেকের কাছে সমান। সমােহহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যাহস্তি ন প্রিয়ঃ কৃষ্ণ যেমন কারাে প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ নন, তেমনি কারাে প্রতি অনুরক্তও নন। তিনি কারাে প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ নন। প্রকৃতপক্ষে ভগবানের অবস্থানটি হচ্ছে নিরপেক্ষ। তিনি সকলকেই ভালােবাসেন। সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি তিনি সকলের সুহৃদ। ভগবদ্গীতায় এই কথাটিরও উল্লেখ রয়েছে।
আমরা আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য কত রকমের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব কামনা করি। কিন্তু আমরা যদি কৃষ্ণকে আমাদের বন্ধুরূপে কামনা করতে পারি তাহলে আমাদের সমস্ত কামনাই পূর্ণ হতে পারে। উপনিষদে দুটি পাখির এই দেহরূপ একই গাছের ডালে বন্ধুরূপে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। অতএব, আমরা যদি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি যে শ্রীকৃষ্ণই আমাদের পরম সুহৃদ তাহলে আর আমাদের কোনাে সমস্যা থাকে না। কৃষ্ণ বলছেন সুহৃদং সর্বভূতানাম্ । তিনি কেবল আমার আপনার বন্ধু নন, তিনি সকলের বন্ধু। তাই সেই বন্ধুত্ব সমভাবে বন্টিত হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি প্রেম ও প্রীতির সঙ্গে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হন, যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা, তিনি একজন বিশেষ ভক্তে পরিণত হয়ে বিশেষভাবে ভগবানের প্রতি অনুরক্ত হন। সেটি ভক্তের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ কৃপা। কৃষ্ণ সকলের প্রতিই সমভাবাপন্ন, কিন্তু যে ভক্ত প্রেম ও বিশ্বাসের সঙ্গে তার সেবায় নিযুক্ত, তাঁকে তিনি বিশেষভাবে কৃপা করেন। 
তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্।
দদামি বুদ্ধিযােগং তং যেনমামুপযান্তি তে॥
                                                                                                                (ভ. গী. ১০/১০)
কৃষ্ণ বলছেন, যাঁরা নিত্য ভক্তিযােগ দ্বারা প্রীতিপূর্বক তাঁর ভজনা করেন, কৃষ্ণ তাদের শুদ্ধ জ্ঞানজনিত বুদ্ধিযােগ দান করেন যাতে তারা কৃষ্ণের কাছে ফিরে যেতে পারেন। কৃষ্ণ তাদের বিশেষ বুদ্ধি দান করেন কেননা এইভাবে তিনি ভক্তদের বিশেষ যত্নবিধান করেন।
প্রত্যেকের হৃদয়েই কৃষ্ণ অবস্থান করছেন। ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত। কিন্তু তিনি বিশেষভাবে ভক্তদের যত্নবিধান করেন, তাদের পরিচালনা করেন এবং বুদ্ধিমত্তা দান করেন। কি ধরনের বুদ্ধিমত্তা? যেন মামুপযান্তি তে। কিভাবে কেউ ভগবদ্ধামে, তার স্বীয় আলয়ে ফিরে যেতে পারে তিনি তাকে সেই সূত্র প্রদান করেন। কৃষ্ণ কাউকে জড়জাগতিক উন্নতি কী করে করতে হয় সেই বুদ্ধিমত্তা প্রদান করেন না। সেটি প্রদত্ত হয় শ্রীকৃষ্ণের মায়া শক্তি বা দুর্গাদেবী দ্বারা।
সাধারণ মানুষ তাই কৃষ্ণের আরাধনার জন্য খুব বেশী উৎসাহী নয়। সাধারণত তারা দুর্গাদেবী বা শিবের আরাধনার জন্য বিশেষ আগ্রহী। কেননা শিব বা দুর্গাপূজার মাধ্যমে তারা জড় ঐশ্বর্য লাভ করতে পারে। অতএব, দেবতাদের পূজা করাটা হচ্ছে একশত শতাংশ জড়বাদ। পারমার্থিক জীবনের কোনাে প্রশ্ন সেখানে নেই। শ্রীকৃষ্ণ তাই বলছেন-কামৈস্তৈস্তৈহৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেহন্যদেবতাঃ (গীতা ৭/২০)-যারা দেবতাদের আরাধনায় আগ্রহী তাদের জ্ঞান বা বুদ্ধিমত্তা অপহৃত হয়েছে। মায়া দুভাবে কাজ করে-প্রক্ষেপাত্মিকা শক্তি এবং আবরণাত্মিকা শক্তি। ‘আবরণাত্মিকা শক্তি’র অর্থ হচ্ছে সে বাস্তবকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ঠিক যেমন মেঘ সূর্যালােককে আচ্ছন্ন করে রাখার ফলে আমরা তা দেখতে পাই না। এখন কিছুদিনের জন্য আকাশ মেঘে ঢাকা থাকছে। আমরা সূর্যকে দেখতে পারছি না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আকাশে এখন সূর্য নেই। তেমনিভাবেই মায়া আমাদের কৃষ্ণকে দর্শন করতে দেয় না। এটি হল মায়ার একটি শক্তি-আবরণাত্মিকা শক্তি। মায়ার আরেকটি শক্তি হল প্রক্ষেপাত্মিকা শক্তি যা চেতনাকে আচ্ছন্ন করার পর আমাদেরকে ক্রমশ কৃষ্ণের কাছ থেকে দূরে ছুড়ে ফেলে। মায়া পরীক্ষা করে দেখে কেউ সত্যি কৃষ্ণকে চায় কি না, না কি সে কৃষ্ণকে সামনে রেখে জড় সুখ ভােগ করতে চায়। তখন মায়া তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। এইভাবে মায়া শক্তি কাজ করছে।
কৃষ্ণ তাই বলছেন-দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া (গীতা ৭/১৪)। মায়া অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু কেউ যদি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ভগবৎ সেবায় নিযুক্ত থাকে তাহলে মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে দুরতিক্রম্য মায়ার প্রভাবকে সে জয় করতে পারে। অতএব ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি। কৃষ্ণ হচ্ছেন ক্ষেত্রজ্ঞ। তিনি এই দেহের মধ্যে রয়েছেন। আমরা যদি তাঁর প্রতি ঐকান্তিক হই, তিনি সবসময়েই আমাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। সেটি কৃষ্ণের কৃপা। এই হল কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার পন্থা। ঠিক যেমন আমরা এখানে একত্রে বসে কৃষ্ণ সম্বন্ধে কথা বলছি। আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের বিশেষ উদ্দেশ্যই হচ্ছে কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় কথা বলা। এটিই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ব্রত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নির্দেশ দিয়েছেন-
যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ-উপদেশ।
আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার এই দেশ
                                                                                             (চৈতন্য চরিতামৃত মধ্য ৭/১২৮)
কৃষ্ণ উপদেশ বর্ণনা করা, প্রচার করা, এই হচ্ছে আমাদের ব্রত। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা প্রচারের জন্যই আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন। ভগবদগীতা যথাযথ’ হচ্ছে কৃষ্ণ উপদেশ । আরেকটি কৃষ্ণ উপদেশ হল কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় কথা। ভগবদ্গীতা হচ্ছে সরাসরি শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত নির্দেশ আর শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে ব্যাসদেব ও অন্যান্য মুনি ঋষি প্রদত্ত শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় নির্দেশ। উভয়ই কৃষ্ণ কথা।
আমরা যদি নিজেদের উন্নতি চাই, আমরা যদি আমাদের জীবনকে সার্থক করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই কৃষ্ণভাবনামৃতের অনুষ্ঠানসমূহে নিজেদের যুক্ত করা উচিত, কৃষ্ণ সম্বন্ধে শ্রবণ করা উচিত। কৃষ্ণ আপনাদের হৃদয়ে রয়েছেন। তাই যত শীঘ্র আপনি অত্যন্ত একনিষ্ঠভাবে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ে জানতে আগ্রহী হবেন তত শীঘ্র আপনি মুক্তি লাভ করবেন। কেবলমাত্র কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। এটিই হচ্ছে বেদের নির্দেশ- কস্মিন্ ভগবদ্বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি কেবলমাত্র কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করলে আর সমস্ত বিষয়ই আপনা থেকে জানা হয়ে যায়। আপনাকে আর আলাদা করে অন্য কিছু জানার চেষ্টা করতে হবে না। আপনি জানতে পারবেন–পরমাত্মা কি, ব্রহ্ম কি, এই জড় জগৎ কি, জড়া প্রকৃতি কি, আমাদের সম্পর্কগুলি কি–এই সমস্ত কিছুই আপনা থেকে প্রকাশিত হবে। ভগবদ্গীতায় (১০/১১) কৃষ্ণ বলছেন–
তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ।
নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা॥
“তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করে আমি তাদের হৃদয়ে অবস্থান করি।” ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ এ কথা বলেছেন। আপনি যদি যথার্থভাবে কৃষ্ণভাবনাময় হন, তার ফলস্বরূপ আপনি কৃষ্ণের বিশেষ আনুকূল্য লাভ করবেন। ভক্তদের প্রতি কৃষ্ণ বিশেষভাবে আনুকূল্য প্রদর্শন করেন। যে ভজতে তু মাং ভক্ত্যা। অতএব এটিই হচ্ছে গুরু। কৃষ্ণকথা শ্রবণ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও তা অনুমােদন করেছেন। জ্ঞানে প্রয়াসং উদপাস্য নমস্ত এব/স্থানে স্থিতাঃ শ্রুতিগতাং তনুবাঙমনােভিঃ। আমাদের বিনীত হতে হবে। আমি এখন ব্রহ্ম হয়ে গেছি” এই ধরনের মনােধর্ম পােষণকারীদের মত হলে চলবে না। কেননা সকলেই ব্রহ্ম। তাই ব্রহ্ম হয়ে ওঠার কোনাে প্রশ্নই আসে না। আমরা যে ব্রহ্ম সেটা আমরা এখন ভুলে গিয়েছি। এই দেহকে আমরা ভ্রান্তবুদ্ধি করছি। এই হল মায়া। এমন নয় যে, কোনাে বিশেষ পন্থার মাধ্যমে আমি ব্রহ্ম হব। প্রকৃতপক্ষে আমি তাে ব্রহ্ম, কিন্তু মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
আমি মনে করছি যে, আমি এই জড় জগতের একটি উৎপাদন মাত্র–যেমন, আমি আমেরিকান অথবা আমি ভারতীয়। আসলে আমি যেখানে জন্মগ্রহণ করেছি সেখানকার ভূমির পরিপ্রেক্ষিতে আমি তা ভাবছি। সারা পৃথিবী জুড়েই, কৃষ্ণকে আরাধনা করার পরিবর্তে সকলে তার জন্মভূমিকে পূজা করছে। নানা প্রকার আদর্শের নামে এখন এইসবই চলছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের নিত্য অংশ। কৃষ্ণ হচ্ছেন পরমব্রহ্ম । ঠিক যেমন সােনার কণা তা অংশমাত্র হলেও সেটি সােনা, তেমনিভাবে কৃষ্ণের নিত্য অংশ হওয়ার সূত্রে আমরাও ব্রহ্ম। তাই ব্রহ্ম হওয়ার কোনাে প্রশ্নই আসে না। আমরা ইতােমধ্যে ব্রহ্ম। আমাদের কেবলমাত্র অবগত হতে হবে যে, আমি এই দেহ নই, আমি চিন্ময় আত্মা, শ্রীকৃষ্ণের নিত্য অংশ। এটিই হল জ্ঞান-আমি ব্রহ্ম। এখন যত শীঘ্র সম্ভব আমরা এই পারমার্থিক জ্ঞানে যথার্থভাবে অধিষ্ঠিত হতে পারব যে অহং ব্রহ্মাস্মি, তখন ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শােচতি ন কাঙ্ক্ষতি, অর্থাৎ আর কোনাে শােক থাকবে না।
প্রত্যেকেই শােক করছে কেননা তারা সকলেই শূদ্র। শূদ্রের কাজই হল শােক করা। কিন্তু কেউ যখন ব্রহ্মকে অবগত হতে পারে, তখন আর সে শােক করে না। আমরা অনেক ব্রাহ্মণ দেখেছি। তাঁরা জড় ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যশালী নয়, কিন্তু তাঁরা অত্যন্ত সুখী। তাঁরা কৃষ্ণের সঙ্গ লাভ করে সুখী। এটিই হচ্ছে ব্রাহ্মণের কাজ। ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণব। একজন ব্রাহ্মণের অবশ্যই কৃষ্ণভাবনাময়–বৈষ্ণব হওয়া উচিত। ব্রাহ্মণ যদি বৈষ্ণব না হন, তাহলে তিনি গুরু হতে পারেন না। সেটিই শাস্ত্র নির্দেশ।
ষটকর্মনিপুণাে বিপ্রাে মন্ত্রতন্ত্রবিশারদঃ।
অবৈষ্ণবো গুরুর্ন স্যাদ্বৈষ্ণবঃ শপচো গুরুঃ ॥
পণ্ডিত ব্রাহ্মণকে বিপ্র বলা হয়। যিনি সকল বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন করে জ্ঞান আহরণ করেছেন তাকে বিপ্র বলা হয়। কেবলমাত্র বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করলেই হবে না, ব্রহ্ম কি? সেটি অবশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, ব্রহ্ম জানাতি ইতি ব্রাহ্মণ, তবেই তিনি ব্রাহ্মণ হবেন। ব্রাহ্মণ হল একটি যােগ্যতা। এমন নয় যে, জন্মেই কেবল ব্রাহ্মণ হয়। ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করতে হয়। উচ্চ আদালতের বিচারপতির পুত্র যেমন উপযুক্ত যােগ্যতা ব্যতিরেকে উচ্চ আদালতের বিচারপতি হতে পারে না, তেমনি জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণের ছেলে ব্রাহ্মণ হয় না। ব্রাহ্মণের গুণাবলী অর্জন করলেই কেবলমাত্র তখন সে ব্রাহ্মণ হবে। সেই গুণাবলীগুলি ভগবদ্গীতায় (১৮/৪২) বর্ণনা করা হয়েছে-
শমাে দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরাজবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্ ॥
অর্থাৎ, “শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং আস্তিক্য–এইগুলি হচ্ছে ব্রাহ্মণের স্বাভাবিক গুণাবলী।”
এইসব গুণাবলী কল্পিত কোনাে বর্ণনা নয়। এখন এই সমস্ত গুণাবলী হারিয়ে গেছে। আর যেহেতু এই বৈদিক সভ্যতা হারিয়ে গেছে, ভারতবর্ষের অবস্থাও সমস্যাসঙ্কুল ও বিভ্রমাত্মক। আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ভগবৎ-চেতনা হারিয়ে ফেলছি। আমরা এখন ভাবাবেগ বা হুজুগ দ্বারা চালিত হচ্ছি। ভারতের জন্য এ এক অতি দুঃখপূর্ণ অবস্থা। যদিও কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে ভারতের মূল সংস্কৃতি। এই দেশের মাটিতে কৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছিলেন। যদিও কোনাে নির্দিষ্ট ভূমি থেকে কৃষ্ণের দূরত্ব বলে কিছু নেই। কিন্তু তবুও ভারতের মথুরার পবিত্র ভূমিতে কৃষ্ণ অবতরণ করেছিলেন।
এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন, কৃষ্ণভাবনাময় সংস্কৃতিকে হৃদয়ঙ্গম করে, এই আন্দোলনে ঐকান্তিকভাবে অংশগ্রহণ করা আজ প্রতিটি ভারতবাসীরই কর্তব্য। সেটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ। তিনি নির্দেশ প্রদান করেছেন–
ভারত-ভূমিতে হৈল মনুষ্য জন্ম-যার।
জন্ম সার্থক করি কর পর উপকার ॥
যেহেতু এই ভারতভূমিতে বৈদিক জ্ঞানের আবির্ভাব হয়েছে, তাই যে কেউই বিশেষভাবে যিনি ভারতবর্ষের এই পবিত্র ভূমিতে মনুষ্য জন্মগ্রহণ করার সুযােগ লাভ করেছেন, তাঁর অবশ্যই বৈদিক জ্ঞানের সুযােগ গ্রহণ করে অন্যের উপকার করা উচিত। কেননা পৃথিবীর অন্য কোনাে অংশে এই সুযােগটি নেই। দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতবাসীরা এখন এই বৈদিক শিক্ষাকে অবহেলা করছে। কিন্তু ইউরােপীয়ান ও আমেরিকানরা এখন এই দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমাদের তাই কেবলমাত্র কোনাে নির্দিষ্ট জাতি বা দেশের কথা বিবেচনা করলে চলবে না-
‘যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ উপদেশ’
যার সাথেই আপনার সাক্ষাৎ হােক না কেন, তা তিনি ভারতীয়ই হােন, ইউরােপীয়ান হােন, আমেরিকান হােন, আফ্রিকান হােন, সেটা কোনাে ব্যাপার নয়, তাকে কৃষ্ণভাবনামৃতের উপদেশ প্রদান করা উচিত। তাহলে তার জীবন যেমনি সার্থক হবে তেমনি কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রচারকের জীবনও সার্থক হবে। এই হল কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন।
কৃষ্ণভাবনায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য এই হল শুরু-কৃষ্ণকথা শ্রবণ এবং কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করা।
শৃন্বতাং স্বকথাঃ কৃষ্ণঃ পুণ্য শ্রবণ-কীর্তনঃ ।
হৃদ্যন্তঃস্থােহ্যভদ্রাণি বিধুনােতি সুহৃৎ সতাম্ ॥
(ভাগবত ১/২/১৭)
আমরা সকলকেই কৃষ্ণকথা শ্রবণ করার সুযােগ করে দিচ্ছি। সেটিই আমাদের কার্যক্রম। আমরা কোনােরকম মুনাফার উদ্দেশ্যে মন্দির নির্মাণ করছি না। আমরা মানুষকে কৃষ্ণকথা শ্রবণের সুযােগ দিতে চাইছি। মানুষকে কৃষ্ণকথা শ্রবণের সুযােগ করে দেবার জন্য আমরা সারা পৃথিবীজুড়ে মন্দির স্থাপন করছি। মানুষ যখন ঐকান্তিকভাবে কৃষ্ণকথা শ্রবণে নিয়ােজিত হবে, তার হৃদয়ের কলুষ তৎক্ষণাৎ দূরীভূত হয়ে যাবে। আর কলুষ দূরীভূত হলে এই জড় জগতে তার সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হৃদয় মার্জনের অর্থ হচ্ছে এটা হৃদয়ঙ্গম করা যে, আমরা কৃষ্ণ নই কিন্তু আমরা কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে। কৃষ্ণের সেবা করা।

কৃত্রিম জীবন কখনােই সুখের হয় না। স্বাভাবিক জীবনই সুখের হয়। আর স্বাভাবিকভাবে আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের দাস। যদি আমরা কৃষ্ণের সেবা না করি তাহলে আমাদের মায়ার সেবা করতে হবে।


ঠিক যেমন মায়াবাদী দার্শনিকেরা মনে করছে যে, তারা কৃষ্ণ-‘আমিই ভগবান। সেটি কলুষতা। কেননা তাদের বুদ্ধিমত্তা এখনও পরিচ্ছন্ন নয়। তাই তারা ভাবছে যে, তারা কৃষ্ণ কৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের নিত্য দাস। সেইজন্যই শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় (১৮/৬৬) দাবি করছেন –সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্ৰজ–কেবল আমার শরণাগত হও। “তােমরা আত্মসমর্পণ কর এই কথাটি একমাত্র মালিকেরই তার দাসদের বলা যুক্তিযুক্ত। তেমনই, এই সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ – শিক্ষাটি প্রদান করার জন্য কৃষ্ণ অবতরণ করেন। কেননা আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের নিত্য সেবক বা দাস। মায়াবাদী দার্শনিকগণ এই ব্যাপারটি ঠিক বুঝতে পারে না। সেবক বা দাস মালিক হতে চায়। কিন্তু সেটি কখনও সম্ভব নয়। দাস যদি কৃত্রিমভাবে মালিক হতে চায়, তবে সেটি একটি বিরক্তিকর অবস্থামাত্র।
আমরা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের নিত্য দাস বা সেবক এই সত্যটি সকলকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সকলকে শিক্ষা দান করছে। কৃষ্ণকে অনুকরণ করার চেষ্টা করবেন না। সেটি একটি বিরক্তিকর ব্যাপার। ঐভাবে আপনি সুখী হতে পারবেন না। আপনি যা নন, সেটি যদি আপনি হতে চান, তখন সেটি কেবল একটি বিরক্তিকর ব্যাপার মাত্র। এতে কোনাে সুখ নেই ।
কৃত্রিম জীবন কখনােই সুখের হয় না। স্বাভাবিক জীবনই সুখের হয়। আর স্বাভাবিকভাবে আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের দাস। যদি আমরা কৃষ্ণের সেবা না করি তাহলে আমাদের মায়ার সেবা করতে হবে। যারা কৃষ্ণভাবনাময় নয়, যারা কৃষ্ণসেবা ত্যাগ করেছে, তাদেরকে নানা ধরনের সেবা করতে হচ্ছে। কেউ ভাবছে “আমি আমার দেশের সেবক।” কেউ ভাবছে “আমি আমার পরিবেশের সেবক। কেউ মনে করছে আমি আমার মায়ের সেবক”। কেউ কেউ ভাবছে “আমি আমার কুকুরের সেবক। এসবও চলছে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, তাকে দাস বা সেবক রূপে অবশ্যই থাকতে হচ্ছে। কিন্তু যদি সে কৃষ্ণের দাস না হতে চায়, তাহলে তাকে অন্য কিছুর দাস হতেই হচ্ছে। কেউই তার দাসত্ব অবস্থা ত্যাগ করতে পারে না। সেটিই বাস্তব বা সত্যি। সুতরাং যে বুদ্ধিমান, যে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, সে ভাববে, “দাস হওয়াই যদি আমার অবস্থা হয়, তাহলে কেন আমি সর্বোচ্চ মালিকের দাস হব না?” সেটিই বুদ্ধিমত্তা।
কামাদীনাং কতি ন কতিধা পালিতা দুর্নিদেশাস্তেষাং জাতা ময়ি ন করুণা ন ত্ৰপা নােপশান্তিঃ।  আমরা আমাদের ইন্দ্রয়ের দাস। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি অসংখ্য মূর্খ বিষয়ে আমাদের আদেশ দিচ্ছে আর আমরা তা পালন করছি। অতএব, যে তার ইন্দ্রিয়ের দাস নয়, যে কৃষ্ণের দাস, সে অবশ্যই তার ইন্দ্রিয়সমূহের প্রভু। এই ধরনের ব্যক্তিদের স্বামী অথবা গােস্বামী বলা হয় । সারা পৃথিবী জুড়ে সকলেই ইন্দ্রিয়ের দাস, গােদাস। ‘গো’ মানে ইন্দ্রিয়। কিন্তু ‘গোদাস‘ নয় ‘গােস্বামী‘ হতে হবে।
তাই শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিচ্ছেন, “আমি সবার হৃদয়ে রয়েছি।” আপনি কৃষ্ণের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারেন। কৃষ্ণ সে জন্য প্রস্তুত। কৃষ্ণের আরেকটি নাম ‘চৈত্য-গুরু‘ – আপনার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত যে গুরু। দীক্ষা গুরু ও শিক্ষা গুরুরূপে কৃষ্ণ বাইরে আছেন আর চৈত্য-গুরু রূপে তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। কৃষ্ণ আমাদের দু’ভাবেই সাহায্য করতে প্রস্তুত বহির্গুরু ও অন্তর্গুরু রূপে। অন্তর্গুরু হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আর বহির্গুরু হচ্ছেন পারমার্থিক গুরুদেব, যিনি শ্রীকৃষ্ণেরই প্রকাশ। আমরা তাই এই উভয়গুরুর সুযােগ গ্রহণ করে আমাদের জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারি। সেটিই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন।
অসংখ্য ধন্যবাদ।
 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here