প্রভুপাদ চেতনার কাছে ক্যান্সারের হার

0
19
২০০৪ সালের ১ মে ও ২০০৭ সালে ১৪ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার বার্পেন্টেরিয়াতে শ্রীধর স্বামীর এক শিষ্য মায়াপুর দাসের সাথে শ্রীমৎ গিরিরাজ স্বামীর এক কথোপকথন হয় তিনি ছিলেন শ্রীধর স্বামীর প্রধান সেবক। নিম্নের সারগর্ভ প্রতিবেদনটিতে মায়াপুর দাসের সেই কথোপকথন তুলে ধরা হল । প্রসঙ্গ শ্রীধর স্বামীর জীবন ও তাঁর অপ্রকট লীলা।

আমি শ্রীমৎ গিরিরাজ স্বামী মহারাজের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। সেসাথে এখানে আসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। ১৯৯৩ সাল থেকে আমি ভক্তসঙ্গ শুরু করি এবং পরবর্তীতে ক্রোয়েশার চাকোবেকের একটি ইস্কন মন্দিরে চলে যাই। ঐ বছর ইউরোপে অনেক উন্নত বৈষ্ণবদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হরিকেশ প্রভু, কৃষ্ণক্ষেত্র প্রভু ও শ্রীমৎ শচীনন্দন স্বামী। আমি তখন একজন গুরুর অনুসন্ধান করছিলাম।
এই কৃষ্ণভাবনায় আসার পেছনে যে বিষয়টি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল সেটি হলো শ্রীল প্রভুপাদের জীবনী। আমি তাঁর সম্পর্কে ভিডিও দেখেছিলাম এবং গ্রন্থ পড়েছিলাম। এক্ষেত্রে অবশ্যই আমি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতও অধ্যয়ন করেছিলাম, কিন্তু বিশেষভাবে আমি যেটির অন্বেষণ করছিলাম সেটি হল তাঁর দৃষ্টান্তসমূহ। কেননা আমার চারপাশে আমি যে সমস্ত লোকদের দেখেছিলাম ধর্ম ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে তারা বলে একভাবে, আচরণ করে অন্যভাবে। তাই, আমি দেখতে পেলাম যে, ভগবানকে ভালোবাসার সর্বোচ্চ আদর্শ পন্থা অনুসরণ করা সম্ভব এবং সেসাথে ভগবান আমাদের যেটি করতে বলেন সেটিও অনুসরণ করা সম্ভব। তাই, ১৯৯৫ সালে আমি শ্রীল প্রভুপাদের কাছে প্রার্থনা শুরু করি, “অনুগ্রহ করে আমাকে গুরু পরম্পরা ও শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হতে সহায়তা করুন। আমি আপনার অনুসারীর একজন অনুসারী হতে চাই, যিনি একজন তত্ত্বজ্ঞ গুরুদেব এবং আপনার প্রতিনিধি।” ইস্‌কনে ভিন্ন ভিন্ন গুরুদেব রয়েছে এবং তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মহৎ গুণাবলীসমূহ তাদের শরণাগত হওয়ার জন্য আমাদের আকর্ষণ করে। কিন্তু পূর্ণরূপে সেরকম কারো প্রতি যে শরণাগত হবো সে বিষয়ে অনুপ্রেরণা অনুভব করিনি। যদিও তাঁরা সবাই ছিলেন অনুপ্রেরণাদায়ক, অত্যন্ত দার্শনিক এবং তাঁরা সবাই সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করে চলেছেন এবং এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই নেই যে, তাঁরা সবাই ছিলেন একেকজন শুদ্ধ ভক্ত।
স্লোভেনিয়াতে ঐ বছরই একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমি ঐ ক্যাম্পের কর্মসূচী সম্পর্কে পড়েছিলাম যে কি কি বিষয়ের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে এবং কোন কোন বৈষ্ণব আমন্ত্রিত তাদের নাম এবং সেখানে দেখলাম মাত্র একজন নব্য বৈষ্ণবের নাম। আমার আশেপাশের খুব কম ভক্তই তাঁর কথা জানত। তিনি ছিলেন শ্রীমৎ শ্রীধর স্বামী এবং তার সেমিনারটি ছিল “উচ্চতর বৈষ্ণবদের সাতটি অভ্যাস” এই বিষয়ের ওপর। আমি ক্যাম্পে আসার পূর্বেই যারা সেমিনার প্রদান করবেন তাঁরা এসে সেমিনার শুরু করে দিল। কিন্তু দ্বিতীয় দিন একটি গাড়ি আসল এবং সেখানে ছিলেন একজন দীপ্তিময় ব্যক্তি, দূর থেকে অস্পষ্ট দেখালেও ভিতরে প্রবেশ করে এক ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা লাভ করলাম। প্রথমবারের মতো পূর্নাঙ্গভাবে আমি তাঁর প্রতি মাথা নত করে প্রণাম নিবেদন করলাম। এটি যেন কেমনভাবে ঘটে গেল এবং আমার জন্য কেমন এক অদ্ভুত ব্যবস্থাপনা ছিল; পূর্ণাঙ্গভাবে মাথা নত করে প্রণাম করার ব্যাপারটি আমার কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ছিল এবং সেই মুহূর্তে শ্রীধর স্বামী গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন এটি ছিল আমার জন্য মজার ও অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। আমি সেটি বুঝতে পারলাম না।
ক্যাম্পের সেমিনারে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে এবং তাঁর বিষয়ে আমাকে যেটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল তা হলো শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি তাঁর আসক্তি। তিনি যেটিই বলতেন সে বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদের কোনো উক্তি বা তাঁর জীবনের কোনো দৃষ্টান্ত কিংবা তাঁর শিক্ষা সম্পর্কে বলতেন এবং সে সাথে শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে তাঁর চরম সততার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তিনি নিজের ভক্তিজীবন সম্পর্কে অত্যন্ত সৎ ও সরল ছিলেন। তাঁর ভাবনায় যেটিই আসত তিনি সেটি বলে দিতেন। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না।
আরেকটি বিষয় আমাকে আকর্ষণ করেছিল। সেটি হলো তিনি ছিলেন অত্যন্ত রসিক, একই সাথে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠ । তার রসিকতাও ছিল কার্যকরী পন্থায় ভক্তদের জন্য শিক্ষণীয়। মাঝে মাঝে কোনো ভাবগম্ভীর বিষয়কেও তিনি সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করতেন।
সে সময় শ্রীধর স্বামীর সাথে আমার প্রথম দর্শন ঘটে। আমার জীবনের কিছু পারমার্থিক দিক-নির্দেশনা বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আমার কি অনুসরণ করা উচিত বা কি করা উচিত সে প্রসঙ্গে। তিনি সাধনার ওপর জোড় দিলেন। সে সময় ক্রোয়েশিয়াতে সংকীর্তন করাটা ছিল প্রধান বিষয়, সাধনা নয়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, মন্দিরে একজন নতুন ভক্ত হিসেবে সাধনা করাটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও অন্যরা খুব কঠোরভাবে তা অনুসরণ করতো না, কিন্তু তখন থেকে আমার জন্য সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়িয়েছিল। তাই, আমি তাঁর দিক-নির্দেশনাসমূহ অনুসরণ করতে আরম্ভ করলাম এবং ধীরে ধীরে আমি তাঁর প্রতি অধিক আসক্ত হয়ে পড়লাম।
একসময় আমি বৃন্দাবনে গমন করলে অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রীধর স্বামীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি জানতাম না তিনি কোথায় ছিলেন? শেষবার এক পত্রে তিনি লিখেছিলেন যদি ভারতে আসতে পারি তবে সেটি আমার জন্যে ভালো হবে। কার্তিক মাসের শেষ দিকে গুজরাটে এক সেবার উদ্দেশ্যে আমি সেখানে যাচ্ছিলাম। বৃন্দাবন থেকে আমার রওনা হওয়ার দু’দিন আগে একজন ভক্ত আমার কক্ষে আসলেন। তিনি বললেন “আমি দেখতে পাচ্ছি কৃষ্ণ তোমার কত যত্ন গ্রহণ করছেন। তাই আমার পারমার্থিক জীবনের যত্ন গ্রহণের জন্য আপনাকে আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে।” তারপরই তিনি বললেন, “তোমার আধ্যাত্মিক গুরুদেব এসেছে; তোমার যাওয়া উচিত এবং তাঁকে দর্শন করা উচিত।”
আমাকে একজন শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করার জন্য এ ধরনের কিছু আমি শ্রীধর স্বামীকে বলিনি, কিন্তু আমি অনুধাবন করেছিলাম যে, তিনিই হলেন আমার আধ্যাত্মিক গুরুদেব, শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গে, পরম্পরার সঙ্গে আমার সংযোগ স্থাপন। তো, আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গমন করলাম। আমি যে এসেছি তার জন্য তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। ঐ সময় তিনি আমাকে ধৌত করার জন্য তাঁর কিছু বস্ত্র দিলেন। পরবর্তী দিন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কি আমাকে তাঁর শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করবেন কিনা এবং তখন তিনি এ ধরনের কিছু একটা বলেছিলেন, “আচ্ছা, আমার চেয়েও অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক ভক্ত এখানে রয়েছে। আমি অত্যন্ত সাধারণ একজন ভক্ত। আমি জানি না তুমি কি প্রত্যাশা করছ। এ বিষয়ে তোমার ভাবা উচিত এবং তারপরও তুমি যদি সত্যিই চাও, তবে আমি তোমাকে আমার শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করব।” আমি এটি উপলব্ধি করেছিলাম যে, তিনি আমাকে গ্রহণ করেছেন। ১৯৯৬ সালে গুরুমহারাজেরই ব্যাসপূজার দিন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করার। ঐ সময় শ্রীমৎ গিরিরাজ স্বামীও উপস্থিত ছিলেন এবং তখন আমি ছিলাম একমাত্র দীক্ষাপ্রার্থী।
আমার মনে হয় আধ্যাত্মিক গুরুদেব কিংবা যেকোনো শিক্ষকের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর কাছ সেরাটুকু বের করে আনা। আমি এই বিষয়টি গুরুমহারাজের কাছ থেকে অনেকবার শুনেছিলাম যে, “জ্ঞান অর্জন ভালো, তবে শুধুমাত্র জ্ঞানের শক্তি নেই, শক্তি নিহিত রয়েছে সেই জ্ঞানের প্রয়োগ সাধনের মধ্যেই” এবং তিনি আমার প্রতি সেটাই বার বার বলছিলেন আমার জ্ঞানকে প্রয়োগ সাধনের জন্য। আমি সর্বদাই সেবার পেছনে থাকতে চাইতাম, নিজেকে প্রকাশ করতাম না এবং এজন্যে প্রচারের সাথেও সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। কিন্তু কেননা আমি জানতাম যে তিনি এতে প্রসন্ন হবেন তাই যেকোনোভাবে হোক আমি তাঁর নির্দেশ পূরণ করতে সর্বোত্তমভাবে প্রচেষ্টা করতাম ।

বিনম্রতার শিক্ষা

গুরু মহারাজ অপ্রকট হওয়ার এক মাস পূর্বে, তিনি অবগত হয়েছিলেন যে, তার পরিণত স্তরের ক্যান্সার হয়েছে এবং তিনি আমাদের সাথে আর বেশি দিন অবস্থান করছেন না। ঠিক সে সময় তাঁর সাথে এক কথোপকথন হয়েছিল। তিনি আমাকে ভেতরে ডেকে বললেন, “মায়াপুর, তুমি তমালকৃষ্ণ মহারাজকে এবং তার শিষ্যদের সম্পর্কে জান? মহারাজ ব্যক্তিগতভাবে তাদের যত্নসহকারে খুব কঠোরভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন আর তাই তারা সবাই ভালোভাবে প্রশিক্ষিত । কিভাবে তারা একত্রে থাকে তার মাধ্যমে তুমি সর্বদাই তমালকৃষ্ণ মহারাজের শিষ্যদের চিনতে পারবে। সবকিছুই তাদের পাক্কা, প্রথম শ্রেণির। তুমি যেখানেই যাওনা কেন তুমি তাদের চিনতে পারবে। আমি চাই তুমি ও আমার সমস্ত শিষ্যরা বিনম্র হবে, বৈষ্ণবদের বিনম্র ও ভদ্র সেবক হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে হয়।” তিনি সবসময় এই বিষয়গুলোর ওপর জোড় দিতেন এবং তিনি বলতেন, “আমি চাই আমার শিষ্যরা প্রভুপাদের পরিবারে অবস্থান করবে এবং আমার সমস্ত গুরুভ্রাতাদের সেবা করবে, যেরকম তুমি আমাকে সেবা করেছ। তুমি যদি আমার গুরুভ্রাতাদের সেবা কর তবে আমি খুশি হব। আমি আনন্দিত হব।”
শ্রীল প্রভুপাদের একটি উদ্ধৃতি রয়েছে: ‘ভজন কর সাধন কর মরতে জানলে হয়।’ আমি দেখতাম গুরুমহারাজের যা কিছু ছিল সবটুকুই শ্রীল প্রভুপাদের প্রতিষ্ঠানকে ভক্তদের দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে যে কেউ সহজেই পৌঁছে যেত, সে কি কনিষ্ঠ নাকি উচ্চতর ভক্ত সেটি কোনো ব্যাপার ছিল না। সেই ভক্তকে তিনি পারমার্থিক উপদেশ প্রদান করতেন এমনকি সরলভাবে তার বন্ধুত্ব প্রদান করতেন।
যখন তিনি মায়াপুর আগমন করেন তখন সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন একটি সময়, যে অভ্যর্থনা তার গুরুভ্রাতাগন আয়োজন করেছিলেন তিনি তা দর্শন করেছিলেন। যখন গুরুমহারাজ ও আমরা আসছিলাম শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী প্রতি বিশ মিনিট পর পর ফোন করছিল, “তোমরা এখন কোথায়?” দুই তিন মিনিট পর, গুরুমহারাজ বুঝতে পারলেন কি হতে যাচ্ছে। তিনি প্রায় কাঁদছিলেন। তিনি বললেন, “আমি কোথাও এক পাশে পড়ে থাকতে চাই। আমি কোনো বড় অভ্যর্থনা চাই না।” কিন্তু তিনি যখন সেখানে পৌঁছলেন তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। প্রত্যেক গুরুভ্রাতা তাঁর গাড়ির জানালার পাশে এসেছিলেন। তিনি যখন ভ্যানকুবার থেকে আসলেন, তখন ভেবেছিলেন তিনি আর বেশিদিন আমাদের সাথে থাকছেন না, কেননা তখন তিনি অত্যন্ত নিঃশেষিত ছিলেন। তাকে বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। তাঁর পাকস্থলী থেকে কিছু তরল পদার্থ সরানোর জন্য তাঁকে দু’বার জরুরি ওয়ার্ডে যেতে হয়েছিল এবং দ্বিতীয়বার ডাক্তাররা এটি করেছিল, তারা শরীরের কিছু অঙ্গে খোঁচা দিয়েছিল, তাই ভেতরে ভেতরে কিছু রক্তক্ষরণ হয়েছিল এবং তাঁর উদর রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় কি করা যায় তা আমার জানা ছিল না। এটি নিশ্চিত ছিল না তিনি কতদিন আর অবস্থান করবেন, কিন্তু আমি ভাবতে পারছিলাম না যে তিনি চলে যাচ্ছেন। কেননা মায়াপুরে পঞ্চতত্ত্ব অভিষেকের সময় তিনি থাকতে চেয়েছিলেন, যেটি এক প্রকার নিশ্চিত ছিলাম। কেননা তার গুরুভ্রাতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তিনি কয়েকজন জিবিসি’র মধ্যে অন্যতম যাকে এই অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে। গুরুমহারাজ সে সময় সারাদিন বিছানায় শুয়ে
থাকতেন, মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হয়তো একটু বসতেন বা সকালে একটু বাইরে বের হতেন জপ করার জন্য অথবা গঙ্গাতে স্নান করার জন্য। তিনি তখন অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। কিন্তু সে সাথে তিনি অভিষেকের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর ইচ্ছাশক্তি দর্শন করার ব্যাপারটি ছিল অবিশ্বাস্য, তিনি যেটিই করতে চাইতেন তা দেহগত প্রয়োজন বা ব্যাথা বেদনাকে অতিক্রম করে যেত। তাঁর শরীরে কি আঘাত হচ্ছে কিংবা ব্যাথা-বেদনা হচ্ছে এর কোনো কিছুই কখনো তিনি বলতেন না। যখন তার ব্যাথা প্রবল হতো তখন তিনি কম কথা বলতেন। অভিষেকের দিন সকালে তিনি প্রস্তুতি নিলেন অভিষেকের জন্য। তিনি প্রায় এক ঘন্টা ধরে তা করেছিলেন। অনেক ভক্তরা বলাবলি করছিল যে, তাঁকে দেখে তারা অত্যন্ত অনুপ্রানিত হয়েছেন। অভিষেকের কলসসমূহ খাঁটি রৌপ্য দিয়ে তৈরি ছিল এবং এর ভিতরে জলসহ প্রতিটির ওজন প্রায় ৫ থেকে ৬ কেজি ওজনের হবে। তিনি সেগুলো এক থেকে দেড় ঘন্টা ধরে অভিষেকের সময় উত্তোলন করে অভিষেক করাচ্ছিলেন।
তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর পেছনে ছিলেন। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল কোথায় তিনি থাকতে চান, হয়তো তিনি সবাইকে অভিষেক করাতে চেয়েছিলেন আবার পরক্ষনেই বলে উঠলেন, “না আমি নিত্যানন্দ প্রভুর অভিষেক করাতে চাই।” তিনি প্রায় দশ মিনিটের মত কেঁদেছিলেন। তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর পেছনে ছিলেন এবং তাঁর শ্রীঅঙ্গ স্পর্শ করে কাঁদছিলেন। আমি কখনো তাকে এরকমটি দেখিনি, মাঝে মাঝে শুধু যখন তিনি শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে বলতেন, তখন ছাড়া। এ সময় আমি অনুভব করতে পারতাম যে, তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। শেষের দিনগুলোতে সেই অভিষেক অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে, শ্রীল প্রভুপাদ ও সমস্ত ভক্তদের কৃপা লাভের জন্য তিনি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণত তিনি আবেগ লুকিয়ে রাখলেও এখন কোনো কিছুই ঢেকে রাখেন নি। ঐ মুহূর্তগুলো আমার জন্য সম্পদ হিসেবে ছিল। এটি দৃষ্টান্তস্বরূপ ছিল যে, কিভাবে একজন বৈষ্ণব পৃথিবী থেকে অপ্রকট হন-তার ভাব কেমন ছিল ঐ সময় তাঁর চেতনা কেমন ছিল। তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল অপ্রকটের সময় তিনি চেতনা ধরে রাখতে সমর্থ হবেন না। কেননা এরকম রোগের সময় ৯৫% মানুষ মৃত্যুর সময় কোমায় চলে যান। তিনি তাতে ভীত ছিলেন এবং বলেন, “আমি সত্যিই কোমাতে যেতে চাই না।” তিনি স্বচ্ছ চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়ে অপ্রকট হতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণ তাঁর সমস্ত বাসনা পূর্ণ করেছিলেন। তিনি অভিষেক দর্শনের জন্য গৌর পূর্ণিমার আগ পর্যন্ত অবস্থান করতে চেয়েছিলেন। তখন কেউ একজন এসে তাকে বললেন, “মহারাজ আপনি অপ্রকট হতে যাচ্ছেন, তাই হয়তো গৌর পূর্ণিমা হবে… ।”

তিনি প্রায় দশ মিনিটের মত কেঁদেছিলেন। তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর পেছনে ছিলেন এবং তাঁর শ্রীঅঙ্গ স্পর্শ করে কাঁদছিলেন। আমি কখনো তাকে এরকমটি দেখিনি, মাঝে মাঝে শুধু যখন তিনি শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে বলতেন, তখন ছাড়া।

মহারাজ থামিয়ে বললেন, “এটি শ্রীধর স্বামীর উৎসব নয়। এটি গৌর পূর্ণিমা উৎসব।” এটি প্রদর্শন করে যে, সত্যিকার অর্থে অনেক ভক্ত যখন থাকবে না তখন তিনি অপ্রকট হতে চেয়েছিলেন। তিনি এটিকে বড় করে তুলতে চান নি। তিনি খুবই বিনম্র অনুভব করছিলেন কেননা তখন তাঁর প্রতি সবার অনেক বেশি মনোযোগ ছিল এবং পরবর্তী পবিত্র দিনে তিনি অপ্রকট হন- কৃষ্ণ তাকে নিয়ে গেলেন।
সন্ধ্যার দিকে তাঁর প্রচুর ব্যাথা হচ্ছিল এবং ডাক্তাররা তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন তারা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাথা নিবারণের ঔষধের কথা বললেন। কিছু ঔষধ ছিল খুবই শক্তিশালী, যেমন মর্ফিন। কিন্তু ডাক্তাররা ভয় পেয়েছিলেন যে, যদি তিনি সেগুলো গ্রহণ করেন তবে তার কোমায় চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাই, তারা খুব একটা শক্তিশালী নয় এমন ঔষধের কথা বলেন। সেগুলো খাওয়ার পর তিনি বলেন, “ব্যাথা এখনো কমছে না।” এর কয়েক ঘণ্টা পর তারা আরেকটা ঔষধের কথা বললেন, যেটি আরো শক্তিশালী ছিল। তাতেও কাজ হলো না। অবশেষে সবচেয়ে শক্তিশালী ঔষধটা দেওয়া হলো। তখনো তিনি পরিষ্কার চেতনায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু ঐ অবস্থায় তিনি বললেন, “আমার মনে হয় এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।” ভোর ৩:৩০ মিনিটের দিকে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “মায়াপুর, এখন কীর্তনের প্রয়োজন।” আমি বললাম, গুরু মহারাজ, “আপনার কেমন লাগছে?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমার জীবনে কখনো এরকম উত্তম অনুভব করিনি।” তিনি অনেক যন্ত্রণা অনুভব করলেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত তার রসিকতা ধরে রেখেছিলেন।
তিনি সবসময় কৌতুক করতেন, “যখন আমি মারা যাব, শেষ কৌতুকটি আমাকে নিয়েই হবে। আমি হেসে হেসে চলে যাচ্ছি।”
৩টা ৩৫ এর দিকে আমরা কীর্তনের আয়োজন করি প্রায় ৬টা নাগাদ তিনি বাথরুমে যেতে চেয়েছিলেন। যখন তিনি বেরিয়ে আসলেন, তিনি আর হাঁটতে পারছিলেন না। তাঁর শরীরটি ভেঙ্গে পড়ছে, কিন্তু তখনো চেতনা বর্তমান ছিল। তিনি পড়ে যান নি-আমরা তাকে ধরে ফেলেছিলাম এবং বাথরুম থেকে বের করে আনছিলাম। তখন তার হাত দরজার সঙ্গে আঁটকে গিয়েছিল। তিনি বললেন, “থাম! তোমরা আমার হাত ভাঙ্গতে যাচ্ছ।” এভাবে আমরা দেখলাম যে, তাঁর চেতনা তখনো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ছিল এবং কি কি ঘটছে সবকিছু সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু সমগ্র রাত ধরে ব্যাথার কারণে ঘুমোতে না পারায় তিনি নিঃশেষিত ছিলেন।
সময়টি ছিল তাঁর অপ্রকটের দশ কি পনের মিনিট পূর্বে। তাঁর অপ্রকটের আগ পর্যন্ত কীর্তন চলেছিল। যখন অবস্থার অবনতি হলো, তখন ডাক্তার গুরুমহারাজের দেহের লক্ষণগুলো পরীক্ষা করলেন আর বললেন, “তিনি অপ্রকট হতে যাচ্ছেন।” আমরা তাঁর সম্মুখে শ্রীল প্রভুপাদের বিশাল একটি চিত্রপট রাখলাম এবং তিনি গভীরভাবে সেটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। প্রায় আধাঘণ্টা পূর্বে, পঙ্খজাঙ্খী প্রভু আসেন এবং সঙ্গে শ্রী নৃসিংহদেহের চরণ তুলসী নিয়ে আসেন। আমি তখন গত দুই ঘণ্টা ধরে তাঁর মুখে জল দিচ্ছিলাম। আমরা যখন কীর্তন করছিলাম গুরু মহারাজ তখন গত দু’ঘণ্টা ধরে গঙ্গা জলে চুমুক দিচ্ছিলেন। সকাল ১০:৩০ নাগাদ শ্রীল প্রভুপাদের চিত্রপটের দিকে দর্শন করে তিনি অপ্রকট হন। আমি দেখেছিলাম এমনভাবে তিনি অপ্রকট হয়েছিলেন যা যে কোনো বৈষ্ণব কামনা করবেন। সে পরিস্থিতিতে তাঁর চেতনা ছিল যথাযথভাবেই স্বচ্ছ। তিনি পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় ছিলেন। প্রভুপাদ ভাবনায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, যেটি তিনি ইতোপূর্বে সর্বদায় ছিলেন। অতএব, তিনি যেখানেই যান না কেন, তিনি পুণরায় তার গুরুদেবের সঙ্গে রয়েছেন।

মায়াপুর দাস ১৯৯৫ সালে শ্রীধর স্বামীর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ভারতের জুহু মন্দিরে শ্রীধর স্বামীকে সেবা করেছিলেন এবং তাঁর সেক্রেটারি হিসেবে অনেক স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। ২০০৩ সালে ভক্তিশাস্ত্রী ডিগ্রি অর্জন এবং ২০০৭ সালে ভিটিই টিচার ট্রেনিং কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০০৫ সাল থেকে ক্রোয়েশিয়াতে স্থানীয় সংকীর্তন কর্মসূচীর আয়োজন করে এসেছেন এবং সেখানে শ্রীল প্রভুপাদের তাৎপর্যকৃত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ শিক্ষা দিয়েছেন। বর্তমানে বেলজিয়ামের রাধাদেশে অবস্থিত ভক্তিবেদান্ত কলেজের অধীনে তিনি অনলাইনে ভগবদ্‌গীতার কর্মযোগ বিভাগটি শিক্ষা দেন।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here