পৌরাণিক মন্দিরে দৃষ্টিকটু ভাস্কর্য!

0
77

দৃষ্টিনন্দন বা দৃষ্টিকটু বিষয়টি নিরূপন করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি । দৃষ্টিভঙ্গি নিরুপিত হয় আমাদের জ্ঞানের ওপর। আমরা যখন বৈদিক শাস্ত্রের সামগ্রিক দর্শন সম্পর্কে জ্ঞাত হব, তখন অভিভূত হব এই ভেবে যে, কি এক মহান তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছে এই সব পৌরাণিক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মের মাধ্যমে ।

চৈতন্য চরণ দাস

পৌরাণিক মন্দিরগুলোর গায়ে প্রায়ই বৈদিক শাস্ত্র নির্দেশিত মহাবিশ্বের মানচিত্রের প্রতিলিপি অঙ্কিত থাকে। যেমন বৈদিক শাস্ত্রে এই মহাবিশ্বের চৌদ্দটি গ্রহলোকের বর্ণনা রয়েছে এই সকল গ্রহলোক পার হলেই অপ্রাকৃত ধাম বৈকুণ্ঠলোকের শুরু। যখন অপ্রাকৃত জগত অভিলাষী ব্যক্তি বৈকুণ্ঠ লোক বা ভগবানের অপ্রাকৃত ধামের অভিমুখে যাত্রা করেন তখন তাকে স্বর্গীয় গ্রহলোকগুলো পার হয়ে যেতে হয়। এই স্বর্গীয় গ্রহলোকগুলোতে রয়েছে ভোগ- বাসনা ও আনন্দ প্রাপ্তির বিপুল সমাহার। কিন্তু পরম আনন্দ প্রাপ্তির প্রয়াসে নিবিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই স্বর্গীয় গ্রহলোকগুলোতে থাকা আড়ম্বরপূর্ণ আনন্দ প্রাপ্তির প্রলোভন প্রত্যাখান করতে হয়। সেই সাথে দৃঢ় থাকতে হয় চূড়ান্ত লক্ষ্য বৈকুণ্ঠধামের দিকে। যদি সেই ব্যক্তি জড় আনন্দ প্রাপ্তির প্রলোভনের ফাঁদে পা দেয় বা আকর্ষিত হয় (স্বর্গ লোকে থাকা বিভিন্ন ভোগ-বাসনার সুযোগগুলো জড় এবং ক্ষণস্থায়ী) তখন ব্যক্তিটি অপ্রাকৃত ধামে উত্তীর্ণ হওয়ার চরম সুযোগটি হারিয়ে ফেলে। একইভাবে পৌরাণিক অনেক মন্দির সাতটি দেয়াল বিশিষ্ট। যেগুলি সাতটি স্বর্গীয় গ্রহলোকের নির্দেশ করে। এই গ্রহলোকগুলো পৃথিবী হতে ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী । পৃথিবীও সাতটি গ্রহলোকের একটি এবং এর ওপরে রয়েছে বৈকুণ্ঠ লোক। এই মন্দিরের দেয়ালে অঙ্কিত ভাষ্কর্যগুলো শুধুমাত্র সেই সমস্ত গ্রহলোকগুলোকেই প্রদর্শন করে না সেই সাথে সেই গ্রহগুলোতে অবস্থিত সুযোগ-সুবিধা, কার্যকলাপও চিত্র বা ভাস্কর্য আকারে দেয়ালের গায়ে খোদাই করা থাকে। যেহেতু অন্যান্য জড় সুযোগ সুবিধার মত কাম বা যৌনবাসনা চরিতার্থ করাও একটি সুবিধা তাই সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত দৃশ্যগুলোর সাথে সাথে কামোদ্দীপক দৃশ্যগুলোর উপস্থিতি মন্দিরের দেয়ালের গায়ে দৃশ্যমান হয়। যা আমাদের শিক্ষা দেয় কাম, যৌনবাসনা ও অন্যান্য জড় আনন্দগুলো পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র পরমেশ্বরের প্রেম লাভের একটি উদ্দেশ্যকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। শাস্ত্রের এই শিক্ষা যাদের কাছে জ্ঞাত নয় তাদের কাছে মন্দিরের গায়ে খোদাইকৃত নগ্ন ভাষ্কর্যগুলোকে প্রণয়াসক্তির বিকৃত কামোদ্দীপক প্রদর্শন মনে হতে পারে। কিন্তু সত্য এই যে, তারা ভগবৎ অভিমুখে যাত্রারত আত্মার প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিবিম্ব যারা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছাতে ভ্রমণ পথের একেকটি পর্যায় অতিক্রম করছে মাত্র। এটিই আমাদের প্রথম ও প্রাথমিক শিক্ষা।

পরমেশ্বর ভগবানের লীলা ও আমাদের মানসিকতা

অন্যদিকে আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে, বৈদিক সংস্কৃতিতে প্রণয়বাসনাকে কখনো প্রত্যাখান করা হয়নি। অবশ্যই রাধা ও কৃষ্ণের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটিও এক ধরনের প্রণয়াসক্তির প্রকাশ কিন্তু সেটি পৃথিবীতে প্রচলিত নারী-পুরুষের মধ্যে যে কামাসক্তি দেখা যায় তার মত নয়। এই কারণে প্রভুপাদ বহু জায়গায় বলেছেন, “পারমার্থিক জগতে প্রণয়ভাবে যে আনন্দ রয়েছে এখানে তার ছিটেফোটাও নেই।” একই সাথে তিনি আরো বলেছেন, পরমেশ্বর ভগবানের সাথে যত রকম সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, তাদের মধ্যে প্রণয়ভাব হচ্ছে সর্বোত্তম। যেটি সকল বৈদিক শাস্ত্র এবং এমনকি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পর্যন্ত সেই সম্পর্কের মহিমা কীর্তন করেছেন। যদিও রাধাকৃষ্ণের মধ্যকার প্রণয় সম্পর্ক জড়জাগতিক কাম সম্পর্কের মতো নয় তথাপিও তাঁর মধ্যে নারী-পুরুষ দ্বৈতভাব রয়েছে। সেই সাথে তাঁদের মধ্যে রয়েছে দাম্পত্যভাব বা যুগল সম্পর্ক। কিন্তু এটিও জড়জাগতিকভাবে দৃশ্যমান দাম্পত্য সম্পর্কের মতো নয়। কিন্তু এটি অত্যন্ত প্রেমোদ্দীপক ও রোমাঞ্চকর এবং এই রসোৎপাদক শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির যুগল লীলার প্রতিরূপও বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে খোদাইকৃতভাবে প্রতিভাত হয়। শুধু কী মন্দিরের গায়ে? বিভিন্ন সাহিত্যেও রাধাকৃষ্ণের প্রেমভাবের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি জয়দেব গোস্বামীর গীত গোবিন্দ, গৌড়ীয় বৈষ্ণব কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ কৃত লীলামৃত, রঘুনাথ দাস কৃত সংগীত মত্ত্বসহ নানা সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর সখাদের অন্তরঙ্গ রসময় লীলাগুলোর বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এখন বর্তমান সময়ে আমাদের হৃদয় কাম প্রবৃত্তির দ্বারা এতটায় কলুষিত হয়ে গেছে যে, আমরা নিজেদের কাম প্রবৃত্তিকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তা উপভোগ করতে উৎসাহী হয়ে পড়ি। এমনকি তার মধ্যে ভগবানকে জড়াতেও পিছপা হই না।
যখন প্রায় সাত থেকে আটশ বছর পূর্বে গীত গোবিন্দ রচিত হয়েছিল, সেটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সর্বজন কর্তৃক স্বীকৃত হয়েছিল। গীত গোবিন্দ সর্বসাধারণের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ছিল। ভগবান ও ভক্তদের রসময় লীলাকে বিশুদ্ধ ও পবিত্র হিসেবে মান্য করে সেই মহিমা কীর্তিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের হৃদয় কাম বা যৌনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে ফলে আমরা সবকিছুর কেন্দ্রে কামকে স্থান দিয়েছি। অপ্রাকৃত কর্মগুলোকে দর্শন করার ক্ষেত্রেও কামকে প্রাধান্য দিই। নিজের উপলব্ধির অযোগ্যতা স্বীকার করি না। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
শ্রীল প্রভুপাদ এই সম্পর্কে একটি গল্প বলেছিলেন: আস্তাবলে বাঁধা একটি ঘোড়া হঠাৎ আগুনে আটকা পড়ে। তখন সে দেখে আগুনের লাল শিখা ধেয়ে আসছে এবং তাকে দগ্ধ করছে। সে প্রচণ্ডভাবে ভীত হয়ে চিৎকার দিতে থাকে। তখন ঘোড়াটির মালিক ছুটে আসে এবং ঘোড়াটিকে রক্ষা করে। অতঃপর যখন আগুনে পুড়ে যাওয়া আস্তাবলটি (ঘোড়ার থাকার ঘর) পুনরায় সংস্কার করা হয় তখন আস্তাবলটিকে লাল রঙের প্রলেপ দেয়া হয়।
যেহেতু ঘোড়াটি লাল আগুনের শিখায় দগ্ধ হয়েছিল
তাই তার ঘরে থাকা লাল রঙকে সে আগুনের শিখা মনে করে ভয়ে বিকটভাবে চিৎকার করতে লাগল। ঘটনাটি বুঝতে না পেরে ঘোড়ার মালিক একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতে ঘরের রঙ পরিবর্তন করা হলে ঘোড়াটি শান্ত হয়। একইভাবে আমরা প্রত্যেকে কামরূপ আগুনে দগ্ধ হচ্ছি এবং যখন আমরা কৃষ্ণভাবনামৃতের অমৃতোপম সাগরে অবগাহন করব তখন সেই আগুন ধীরে ধীরে নির্বাপিত হবে। তখন আমরা প্রেম ও কামের মধ্যে পার্থক্য হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হব। কিন্তু যেহেতু এখন আমরা জড় নারী-পুরুষের কাম বা যৌন সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করছি এবং মানসিকভাবে সেগুলো নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছি। তাদের সাথে মানসিক সঙ্গ করছি তাই যখন আমরা পরমেশ্বর ভগবানের লীলা দেখি, তখন তাদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য থাকা স্বত্ত্বেও আমরা তাদের সমপর্যায়ভুক্ত করে ফেলি। তখন আগুনে পোড়া ঘোড়ার মত চিৎকার করতে থাকি “কেন কৃষ্ণ এটি করল”? কেন রাধা-কৃষ্ণ ওটি করল”? ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কারণে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কলিযুগে পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। যিনি স্বয়ং কৃষ্ণ এবং সমস্ত গোপ-গোপীগণ গোস্বামীরূপে তাঁর সাথে সংকীর্তন মহাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর সাথে নৃত্য করেছেন এবং ভগবানের মহিমা কীর্তন করেছেন। এই লীলা অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও অপ্রাকৃত। এটিকে ভুল বোঝার বা বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেমন আস্তাবলটি পুনরায় রঙ করার পর ঘোড়াটি শান্ত হয়েছিল। তেমনি শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের হৃদয়ের কাম ও কলুষতার অগ্নি নির্বাপনের জন্য হরিনামরূপ জল সিঞ্চন করেন যাতে হৃদয় কৃষ্ণপ্রেমে শীতল হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাধা-কৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলা সম্পর্কিত তত্ত্বসমূহ সাধারণের নিকট প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত করতেন। এমনকি আমাদের সম্প্রদায়ের আচার্যবর্গরাও রাধা-কৃষ্ণের লীলা বর্ণনা সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলেন। কারণ আমরা যথেষ্ট শুদ্ধ নই। আমরা ঘোড়ার মত লাল রঙকে আগুন মনে করি।
ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, প্রভুপাদও উচ্চমার্গীয় শাস্ত্রগ্রন্থসমূহ অধ্যয়নে নিষেধ করেছেন। একই ঘটনা মন্দির দর্শনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা খোদাইকৃত ভাষ্কর্যগুলো দর্শন এড়িয়ে ভগবানের দর্শনে মনোযোগী হব। এর মানে এই নয় যে, পৌরাণিক মন্দিরগুলো যত ভাষ্কর্য রয়েছে সবগুলোই রাধা-কৃষ্ণের প্রতিনিধিত্ব করে। সাধারণভাবে বেশীর ভাগ ভাষ্কর্যে স্বর্গলোক ও অপ্সরাদের ক্রিয়া-কর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। সেখানে কোনো কিছুই তেমন বিস্তৃতভাবে বিবৃত হয়নি কিন্তু যদি কোথাও রাধা-কৃষ্ণের লীলা প্রদর্শিত হয় তবে সেটি আমাদের ভালোভাবে বোঝা এবং অপ্রাকৃত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করা উচিত। কখনো এগুলোকে ভুল বোঝা উচিত নয়।

চারটি পুরুষার্থের প্রদর্শনী

এগুলো ছাড়াও কিছু প্রদর্শনী নির্মিত হয়েছে কামসূত্রের ভিত্তিতে। আমরা চারটি ‘পুরুষার্থ’ (ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ) এর কথা জানি। কাম হচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্যগুলোর একটি। এছাড়াও রয়েছে ধর্ম, ইন্দ্ৰিয়তৃপ্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ধন সম্পদ উপার্জন এবং মুক্তি। কাম জীবনের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং কীভাবে একজন ব্যক্তি হৃদয়ের জড় আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে এই সমস্ত বিষয় ঋষি বৈশানন কর্তৃক রচিত কাম শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই গ্রন্থে এটিকে ইন্দ্রিয়তৃপ্তির সক্ষম পন্থা হিসেবে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। আত্মার অগ্রযাত্রা একটি পদক্ষেপ হতে পারে এবং এই যাত্রা পরিপূর্ণতা লাভ করে মোক্ষ লাভের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ মানুষ ধর্মপথে চলতে আগ্রহী নয়। তারা মোক্ষ লাভের প্রতিও যত্নবান নয়। তারা শুধু অর্থ চায়। চায় ইন্দ্রিয় তৃপ্তি। লোকেরা এটিকে জীবনের চরম লক্ষ্য করে নিয়েছে।

যেহেতু মন্দিরের গায়ে থাকা অনেক ঐতিহ্যগত প্রদর্শনী ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মূল শিক্ষাকে গৌণ করে ভুল ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, তাই পারমার্থিক জগতে কামকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণভাবনামৃত সংস্কৃতিতে।

আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ কখনো বৈদিক সংস্কৃতি শিক্ষা দেয় না বরং বৈদিক সংস্কৃতির সর্বোত্তম সারাতিসারটি শিক্ষা প্রদান করে। বৈদিক সংস্কৃতিতে রয়েছে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। মোক্ষেরও ওপরে রয়েছে প্রেম ৷ প্রেমই হচ্ছে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। যেটিকে পঞ্চম পুরুষার্থ বলা হয়। আর এটি একমাত্র কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনেই সহজলভ্য। যেহেতু আমরা সর্বোত্তমটির ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছি তাই ধম, অর্থ, কাম, মোক্ষের মত জড় ধর্মের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। ধর্ম, অর্থ, কাম এর মত পন্থার মাধ্যমে আত্মার উন্নয়নের গতি অত্যন্ত মন্থর। এর মাধ্যমে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উত্তীর্ণ হতে বহু সময়, জন্ম, সাধনার প্রয়োজন। যদি একজন ব্যক্তি অত্যন্ত ভাগ্যবান হয় তখন সে বুঝতে পারে মোক্ষের ওপরে রয়েছে প্রেম। ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন-
বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মাং প্রপদ্যতে ।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ ॥
বহু জন্মের পর তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে সর্ব কারণের পরম কারণ রূপে জেনে আমার শরণাগত হন। সেইরূপ মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ। (গীতা-৭/১৯)
কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের মাধ্যমেই আমরা প্রেম লাভের, সর্বোত্তম তড়িৎ পন্থাটি লাভ করতে পারি। যদি আমরা সহজেই সর্বোত্তমটি লাভ করি তবে কেন ধর্ম, অর্থ, কামের মত মন্থর পন্থা অনুসরণ করে জীবন ও সময়ের অপচয় করব? আমাদের সহজে সর্বোত্তম লক্ষ্যটি অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-নীতি পালন করা আবশ্যক। যেমন— আমিষাহার, জুয়াখেলা, নেশাসক্তি, অবৈধ যৌনসঙ্গ বর্জন এগুলি পারমার্থিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। বৈদিক সংস্কৃতিতে কামকে প্রত্যাখান করা হয়নি কেননা এটি অন্যতম একটি পুরুষার্থ। কিন্তু বর্তমানে এর প্রতি অত্যাসক্তির কারণে অন্যান্য পুরুষার্থগুলো প্রত্যাখান করায় তারা চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারছে না, তাই পারমার্থিক জগতে এর ওপরে দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। কেন মন্দিরের দেয়ালে দৃষ্টিকটু ভাষ্কর্য? এই প্রশ্নের আলোকে উপরোক্ত আলোচনার সারাংশ হচ্ছে
প্রথমত-এই ভাস্কর্যগুলো বৈদিক শাস্ত্র বর্ণিত মহাবিশ্বের কার্যকলাপের প্রতিরূপ।
দ্বিতীয়ত-রাধা-কৃষ্ণের লীলার বর্ণনা সম্বলিত যা সম্পূর্ণরূপে অপ্রাকৃত এবং একে জড় মানসিকতা দর্শন করে ভুল বোঝা উচিত নয় ।
তৃতীয়ত-অনেক ক্ষেত্রে হয়তো চারটি পুরুষার্থের সচিত্র প্রদর্শনী হতে পারে। অতএব মন্দিরে এসে মানুষ ধর্ম অনুশীলন করতে চায় ৷ সে চায় অর্থ উপার্জন ও কাম উপভোগ করতে এবং সবশেষে মোক্ষ লাভ করতে। যার একটি বিস্তৃত বিবরণ মন্দিরের গায়ে দেখতে পাই। আবার এই সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু সর্বোচ্চ আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয় ভগবানের বিগ্রহকে অর্থাৎ এই সবকিছুরও উর্ধ্বে হচ্ছে ভগবানের দর্শন লাভ বা প্রেম লাভ। যার প্রতি আসক্ত হয়ে যে কেউ সর্বোচ্চ আনন্দ অবগাহন করতে পারে অতএব এই সকল প্রদর্শনী একটি গূঢ় পারমার্থিক তাৎপর্য রয়েছে।

বৃটিশদের অজ্ঞতা

দুঃখজনকভাবে বৃটিশরা যখন ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছিল তখন খ্রীস্টিয়ান ধর্মপ্রচারকরা অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে তাদের ধর্ম প্রচারে প্রবৃত্ত হয়ে পড়ে। বৃটিশরা ছিল অত্যন্ত উচ্চমাত্রার যৌন-বিনয়ী চরিত্রের। যার অর্থ তারা উচ্চমাত্রার যৌন বাসনাকে বিনম্রতার চাদরে ঢেকে রাখতো। যৌনতার অনৈতিকতা তাদের হৃদয় থেকে দূরীভূত না হলেও তারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইতো না। একে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে তার প্রতি ঘৃণাভাব প্রদর্শন করত। ঠিক এই সময় ইউরোপিয়ান পাদ্রিরা ভারতে ধর্মপ্রচারে আসে। তারা ভারতে পবিত্র তীর্থস্থানগুলো পরিদর্শন করে। তখন তারা মন্দিরের গায়ে খোদাইকৃত ভাস্কর্যগুলো নিজেদের জড় নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দর্শন করে উষ্মা প্রকাশ করে। এটি মনে করা হতো যে, একটি মন্দির মানে অত্যন্ত পবিত্র স্থান এবং সেখানে পবিত্র ভাস্কর্য প্রদর্শিত হবে কিন্তু তারা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত প্রদর্শনী দেখে মন্দির ও তার চতুপার্শ্বে থাকা খোদাইকৃত ভাষ্কর্য সম্বলিত স্থানগুলোকে অপবিত্র ও অনৈতিক বলে গণ্য করতে শুরু করে। যেহেতু এই ভাষ্কর্যগুলোর প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে যে অন্তর্নিহিত গূঢ় তাৎপর্য রয়েছে সেটি তাদের বোধগম্যতার অতীত ছিল। এছাড়া তৎকালীন ভারতীয় পণ্ডিতগণ যারা নিজ শাস্ত্র, সংস্কৃতি, ধর্মকে ভালবাসতো তারা বৈদিক শাস্ত্র বিরোধী পাশ্চাত্যের শিক্ষা, মহাবৈশ্বিক জ্ঞান, ভাষা ইত্যাদি প্রত্যাখান করেছিলেন এবং তাদের এড়িয়ে চলতেন। যেহেতু ভারতীয় পণ্ডিতগণ এই পাশ্চাত্যবাসী ও তাদের প্রচারকগণকে গ্রহণ করেনি সেহেতু পাশ্চাত্যবাসীরা সেই ভাষ্কর্যগুলোর গূঢ়ার্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আহরণে সমর্থ হয়নি। একশ্রেণির ভারতীয়রা ইংরেজি শিক্ষা ও ইংরেজদের পেছনে এতটায় উৎসাহী ছিল যে, তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও শিকড় সম্পর্কে ততটা গুরুত্ব দেননি এবং জ্ঞাতও ছিলেন না। ফলে ইংরেজরা তাদের এই বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। যেহেতু তারা বিষয়টি জ্ঞাত ছিলেন না তাই তারা ইংরেজদের কাছে বিব্রত ও লজ্জাবোধ করতেন। বরং তারাও বিষয়টিকে অনৈতিক, অবিশুদ্ধ ভাবতে শুরু করলেন এবং তাদের পূর্বপুরুষগণকে নিকৃষ্ট ভাবতে শুরু করলেন। যেটি আমাদের বোঝা উচিত যে, এই সমস্ত খোদাইকৃত চিত্র, ভাস্কর্য প্রদর্শনীর পেছনে এক গূঢ় পারমার্থিক তাৎপর্য রয়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ বর্তমান মানুষের জড় দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। তাই তিনি তার প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলোর ক্ষেত্রে এই সকল প্রদর্শনী এড়িয়ে গেছেন, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি উৎপন্ন না হয় সেই সাথে সাধারণ মানুষ অযাচিত প্রশ্ন থেকে বিরত হয়ে আদর্শিক প্রশ্ন ও জ্ঞান আহরণে উদ্দীপিত হয়। বিশেষ করে কলিযুগে আমরা ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই পর্যায়ের মাধ্যমে আত্মোন্নয়নের পন্থা অনুসরণ করি না। বর্তমানে গুরুপরম্পরার ধারা অনুসৃত সংঘগুলো মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থাপত্য বা ভাস্কর্য প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটু ভাস্কর্যকে এড়িয়ে পরমেশ্বরের প্রতি প্রেমোদ্দীপক চিত্রকর্মকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যাতে নবীন ও আগ্রহী ভক্তগণের হৃদয়ে পরমেশ্বরের প্রতি অপ্রাকৃত প্রেমের সঞ্চার হয়। পৌরাণিক মন্দিরগুলোতে প্রদর্শিত ভাস্কর্যগুলোও অপ্রাকৃত কিন্তু এখানে আত্মার উন্নয়নের পর্যায়ক্রমিক পন্থাগুলোর প্রদর্শন করা হয় যা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অজ্ঞতার কারণেই আমরা ভুল বুঝি। যদি আমরা বৈদিক শাস্ত্রে সামগ্রিকভাবে দর্শন সম্পর্কে জ্ঞাত হয় তখন আমরা প্রদর্শনীগুলো নিয়ে লজ্জিত বা বিব্রত হবো না বরং অভিভূত হবো এই ভেবে যে, কি এক সুমহান জ্ঞান ও তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছে সেই পৌরাণিক চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যগুলোর মাধ্যমে ।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here