দয়া

0
70

বৈদিক যুগে রাজা রন্তিদেব, সর্বোত্তম দয়া প্রদর্শনের জন্য কি প্রকারের উপলব্ধি প্রয়োজন তা প্রদর্শন করেছেন।

দ্বারকাধীশ দেবী দাসী

বর্তমান সময়ে কেউ যদি তার নিজ সন্তানের আহার অপর কোনো অপরিচিত ব্যক্তির ক্ষুধা নিবৃত্তির উদ্দেশ্য দান করে, তাহলে আধুনিক যুগের লোকেরা এই ব্যক্তিকে কী রূপে বিচার করবেন? যেখানে তার নিজের পরিবারের সদস্যগণ অভুক্ত কিন্তু তথাপিও তিনি এই ধরনের অস্বাভাবিক আবেগ তাড়িত বদান্যতা প্রদর্শন করলেন!
রাজা রন্তিদেব, যিনি বহু বছর পূর্বে পৃথিবীতে বাস করতেন, তিনি এমন বদান্যতা প্রদর্শন করেছেন। শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধে উল্লেখ রয়েছে রাজা রন্তিদেবের কথা। রাজা রন্তিদেব কখনো কিছু উপার্জন করার চেষ্টা করতেন না। তিনি অযাচকের ন্যায় থাকতেন, অর্থাৎ কোনো প্রচেষ্ঠা ব্যতিত ভগবানের কৃপাতে যা পেতেন তা তিনি গ্রহণ করতেন।
বাস্তবিকপক্ষে, যদিও মনে হতে পারে যে রন্তিদেবের আচরণ অদায়িত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁর মানে এই নয় যে, তিনি পরিবারের কল্যাণ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তার নিজের কোনো জাগতিক চাহিদা ছিল না। তিনি নিশ্চিতভাবেই অবগত ছিলেন যে, ভগবানের অপরিসীম কৃপার ফলেই আমাদের কাছে সবকিছু আসে। যদি ভগবানের তাকে প্রতিপালন করার অভিলাষ থাকে, তবে তিনি করবেন। যদি তা না থাকে তবে তার জীবনে যেই ভাগ্যই লিখা থাক তা তিনি মেনে নেবেন।


একসময় রন্তিদেব ৪৮ দিন উপবাস থাকার পর প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। যেই মুহূর্তে তিনি তার পরিবারসহ প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখনই একজন ব্রাহ্মণ এলেন। তিনি ব্রাহ্মণকে সমাদর করে শ্রদ্ধা সহকারে সেই অন্নের একভাগ প্রদান করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ অতিথিটি সেই অন্ন আহার করে প্রস্থান করলেন।


রাজা রন্তিদেব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন, তাই সকল জীবই রাজার ন্যায় শ্রদ্ধা এবং দয়া লাভের যোগ্য। তাই যখনই কোনো জীবকে তিনি অভুক্ত দেখতেন, তিনি তৎক্ষণাৎ কোনো ধরনের আক্ষেপ না করেই তার নিজের পরিবারের খাদ্য অন্যদের বিলিয়ে দিতেন।

সম্মানিত অতিথি

একসময় রন্তিদেব ৪৮ দিন উপবাস থাকার পর প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। যেই মুহূর্তে তিনি তার পরিবারসহ প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখনই একজন ব্রাহ্মণ এলেন। তিনি ব্রাহ্মণকে সমাদর করে শ্রদ্ধা সহকারে সেই অন্নের একভাগ প্রদান করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ অতিথিটি সেই অনু আহার করে প্রস্থান করলেন।
তারপর রন্তিদেব অবশিষ্ট অন্ন স্বজনদের মধ্যে বিভাগ করে দিয়ে যখন স্বয়ং ভোজন করতে যাবেন, তখন এক শূদ্র উপস্থিত হলেন। এখন কেউ হয়তো বলতে পারে যে বৈদিক যুগে একজন ব্রাহ্মণ উচ্চতর সম্মান লাভের যোগ্য ছিলেন, তাই শূদ্র হয়তো তেমন সম্মান পাবেন না। কিন্তু রন্তিদেব তাকে শূদ্র বলে হেয় করলেন না। তিনি সেই অতিথিকে তার অন্নের আরেকটি অংশ প্রদান করলেন।
সেই শূদ্র চলে গেলে, আর একজন অতিথি কুকুর পরিবেষ্টিত হয়ে সেখানে এসে বলেছিল, “হে রাজন্! আমি এবং এই কুকুরগুলি ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর। দয়া করে আমাদের কিছু আহার্য প্রদান করুন।”
রাজা রন্তিদেব পরম আদরে অবশিষ্ট অন্ন কুকুর এবং কুকুরের প্রভু অতিথিকে বহু সম্মান সহকারে প্রদান করেছিলেন এবং তাদের প্রণতি নিবেদন করেছিলেন ।
তারপর, কেবল পানীয় জল অবশিষ্ট ছিল, তাও কেবলমাত্র একজনের তৃপ্তি সাধনের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু রাজা যখন সেই জল পান করতে যাবেন, তখন একজন চণ্ডাল সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, “হে রাজন! যদিও আমি অত্যন্ত নীচ কুলোদ্ভূত, দয়া করে আমাকে কিছু পানীয় জল দান করুন।” সেই পরিশ্রান্ত চণ্ডালের দৈন্যযুক্ত বাক্য শ্রবণ করে মহারাজ রন্তিদেব অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন এবং অমৃতের মতো মধুর এই কথাগুলি বলেছিলেন। “আমি ভগবানের কাছে অষ্ট-যোগসিদ্ধি কামনা করি না এবং জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তিও কামনা করি না। আমি যেন কেবল সমস্ত জীবের সঙ্গে থেকে তাদের সমস্ত দুঃখভোগ করতে পারি, যাতে তারা তাদের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হতে পারে।”

দুর্লভ মহানুভবতা

রাজা রন্তিদেবের গল্পটি যদি আমাদের বর্তমান সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করি তবে আমরা দেখতে পাব যে, তার পরিবারের নিশ্চয় অজীর্ণ দশা ছিল এবং রাজা স্বয়ং অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। অন্যের জন্য দুঃখ দুর্দশা ভোগে কারো কোনো প্রকারের আনন্দ অনুভূতি হতে পারে? যাই হোক রন্তিদেব তাদের জীবনে কোন দুর্দশা তৈরি করেননি। যেহেতু তিনি ছিলেন একজন রাজা তাই তিনি খুব সহজেই তাঁর অবস্থানের প্রেক্ষিতে ঐশ্বর্য ভোগ করতে পারতেন।
বিশেষত রাজা রন্তিদেবের দৈব কার্যাবলীসমূহ বর্তমানের প্রেক্ষিতে উপলব্ধি করা অত্যন্ত জটিল কেননা এই ধরনের মহত্তম দয়া অত্যন্ত দুর্লভ। পুনঃ নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত রাজনীতিবিদগণের মধুর বাক্য শ্রবণে আমরা অভ্যস্ত। বর্তমানে তথাকথিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও আমরা সন্ধিহান, কেননা এই এগুলোর বেশিরভাগই দুর্নীতিগ্রস্থ। রাজা রন্তিদেবের মত স্বার্থহীন থাকার অর্থ হল চোরদের জালে কাটার ন্যায় আটকে থাকার মত। দান করা অন্য বিষয়, কিন্তু যদি আপনি নিজেই সমাজে প্রথম হওয়ার চেষ্টা না করেন তবে কে আপনার জন্য তা করবে?
রন্তিদেব জানতেন যে, পরমেশ্বর ভগবান তার দেখাশুনা করবেন। তাই তিনি বলেছিলেন, “জীবন ধারণেচ্ছু এই দীন চণ্ডালের জীবন রক্ষার জন্য জল দানের দ্বারা আমার ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, দেহের কম্পন, বিষাদ, দুঃখ, শোক, মোহ সব কিছুই নিবৃত্ত হয়েছে।”
মূলত, রাজা রন্তিদেব ব্রহ্মা ও শিব আদি দেবগণ কর্তৃক পরিক্ষীত হয়েছিলেন। অতিথি রূপে রাজার খাদ্য গ্রহণে বাধা প্রদানের মাধ্যমে তারা রাজাকে পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা বর দিতে চাইলেও রন্তিদেবের দেবগণের কাছ থেকে কোনো প্রকার জড়-জাগতিক বস্তু প্রাপ্তির আকাঙক্ষা ছিল না, তাই তিনি এই সুযোগও গ্রহণ করলেন না। তিনি শুধুমাত্র ভক্তি সহকারে বাসুদেবের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর চিত্ত সন্নিবিষ্ট করেছিলেন শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে, যাঁরা মহারাজ রন্তিদেবের আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন, তাঁরা তাঁর কৃপার প্রভাবে পরমেশ্বর ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত হয়ে জড় জগতের সকল দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।
একজন দৌড়বিদ ম্যারাথন দৌড়ে অংশগ্রহণের জন্য বহুদিন পূর্ব থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে, আমরাও তেমনি অকৃত্রিম উদার প্রকৃতির গুণাবলী অর্জনের জন্য নিত্যকাল জীবনের উদারতা অনুশীলন করতে পারি। প্রকৃত উদারতার বিকাশ তখনই হবে যদি আমরা উপলব্ধি করি যে, সমস্ত জীবের সাথে পরমেশ্বর ভগবানের একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। বাহ্যিকভাবে যে কেউ অধঃপতিত প্রতিভাত হোক না কেন, তিনিও ভগবানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন কেউ এই উপলব্ধির সাথে দয়ার প্রদর্শন করে, এই কর্ম পূণ্য কর্মের চেয়েও অধিক মহত্তম এবং এটি গভীরতম আনন্দ লাভের একটি উৎসও বটে।


দ্বারকাধীশ দেবী দাসী ব্যাক টু গডহেড এর নিয়মিত লেখক। তিনি এবং তাঁর পরিবার আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের আলাচুয়াতে হরেকৃষ্ণ কমিউনিটির একজন সদস্য হিসেবে বসবাস করছেন। তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। 


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here