তাৎপর্যপূর্ণ কর্ম

0
175
হরেকৃষ্ণ ভক্তরা
অস্ট্রেলিয়ার একজন ভক্ত পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহ মায়াপুরে
নিয়ে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন
ব্রজ-সেবকী দেবী দাসী
 
যখনই সারাবছর ধরে মায়াপুরে শ্রীশ্রীপঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহ স্থাপনের প্রস্তুতি চলছিল, তখন মায়াপুর একটি মৌচাকের ন্যায় কর্মউদ্যমক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। বিগ্রহ তৈরিই ছিল প্রধান কার্য এবং এটির পাশাপাশি অন্যান্য প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল । তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরের নবরূপদান এবং নববেদি স্থাপন, এখানেই পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহের বিলাস স্থান তৈরি করা হবে। সমগ্র বিশাল মন্দিরেই হাতুড়ির শব্দ এবং প্রলেপের কাজ চলতে লাগল। ইটের দেওয়াল সরিয়ে উত্তর পাশের কোণে একটি নতুন প্রবেশদ্বার তৈরি করা হল। তখনকার সেই কঠিন পরিস্থিতির ভেতরেও একজন ব্যক্তি এমন একটি নির্মাণ-কাজ পরিচালনা করেছিলেন যেটি ছিল দুরূহ একটি কাজ। এই ধরনের একটি বিশাল প্রকল্পের কাজ সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন। এ ছাড়াও তিনি দক্ষিণ ভারতে বিগ্রহের খােদাই কাজও পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সামনে আগত বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব যাঁর কাঁধে। মায়াপুরে ভরত মহারাজ দাসের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। তিনি সাধারণত মন্দির নির্মাণ চত্বরে থাকেন। আবার অন্য যেকোনাে স্থানেও থাকতে পারেন এবং আরাে হাজারাে কাজে ব্যস্ত থাকেন যাকে পাশ্চাত্যে ক্ষুদ্র কর্ম বলা হলেও ভারতে সেটি বিরাট আকার ধারণ করেছে। এমনকি কেউ যদি তাঁকে খুঁজে পানও তবে তাঁর সাথে কথা বলার তেমন সুযােগ থাকে না।
খুবই শান্তশিষ্ট অস্ট্রেলিয়ান ভক্ত ভরত মহারাজ দাস। যাকে স্থানীয় ভক্তরা ভরত নামে চেনে, যিনি ১৬ বছর যাবৎ মায়াপুরে বাস করছেন। সিডনিতে ভক্তদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং ১৯৮১ সালে তিনি তাঁর স্ত্রী ভক্তগুণ দেবী দাসীর সাথে সিডনির উত্তরে কোলাে নদীর নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ইস্কন মন্দিরে যােগদান করেন। উভয়েই ছিলেন যােগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক, তাই তাঁরা নিউ সাউথ ওয়ালেস-এর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত অরণ্যময় নিউ গােবর্ধন ফার্মে সেবার অধিকার লাভ করেন। স্কুলটি সরকার অনুমােদিত এবং এটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্যান্য সকলের সাহায্য প্রার্থনা করেন। স্কুলটি দারুণভাবে চলছিল। ভরত এবং ভক্তগুণা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নিউ গােবর্ধনে অবস্থান করেছিলেন এরপর তাঁরা ২য় বারের মত মায়াপুরে ফিরে আসেন।
 
এখন সমাধি
 
একসময় শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দিরের নির্মাণকাজ থেমে গিয়েছিল, কিন্তু ভরত প্রভুর আগমনের পর থেকে পুনরায় কাজ শুরু হয়। ভরত মহারাজ দাস একসময় অস্ট্রেলিয়ায় নিজস্ব কুমার ব্যবসায় নিয়ােজিত ছিলেন। তিনি মায়াপুরে আসার পর প্রথম শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দিরের দেওয়ালে থাকা টেরাকোটা (পােড়ামাটির ভাস্কর্য) প্যানেলসমূহকে স্বহস্তে মাটি দ্বারা তৈরি এবং তৎপরবর্তী মাটি পােড়ানাের কাজ করেন। শুরুর দিকে সেই প্যানেলসমূহ ছিল সমতল টেরাকোটা নির্মিত কিন্তু পরবর্তীতে মৎস্য অবতার দাস নামক আরেকজন ভক্ত যুক্ত হন এবং তখন রং ব্যবহারের সূচনা হয়। অবশেষে কাজ আরাে এগিয়ে গেল এবং ফলাফল হিসেবে আমরা পেলাম বহু রঙ বিশিষ্ট ফ্লোরেনটাইনের শৈলী। এবার একবারের জায়গায় সর্বোচ্চ চারবারের মত আগুনে পােড়ানাে হল। এই সুন্দর নান্দনিক শিল্পকর্মটি সম্পূর্ণ করতে এক বছরের প্রস্তাবনা থাকলেও চরম দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির মধ্যে আট বছর অতিবাহিত হয়।
শিল্পকর্মসমূহ তৈরি হওয়ার পর শ্রীল প্রভুপাদের একজন প্রথম দিকের শিষ্যা যমুনা দেবী হাস্যমুখে ভরতকে বললেন, “মাত্র ৮ বছর? এই পরিস্থিতির মধ্যেও এত দ্রুত হয়ে গেল বলে আমি বিস্মিত হচ্ছি !” এই রকম কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ জড়িত ছিল সেখানে।
১৯৯৫ সালে শ্রীল প্রভুপাদের পুষ্প সমাধির নির্মাণকাজের পূর্বে পার্শ্ববর্তী শহর কৃষ্ণনগর থেকে মিলান বাগ নামক এক শিল্পী মায়াপুরে এসেছিলেন। তাঁরা পঞ্চতত্ত্বের ছােট বিগ্রহের নমুনা তৈরি করেন যেগুলাে বর্তমানে মন্দিরে অবস্থান করছেন। তিন মাসের মধ্যে ভরত মহারাজ তাঁর বাসার পাশের ওয়ার্কশপে বিগ্রহসমূহের নমুনা মডেল তৈরির কাজ সমাপন করেন। নমুনা তৈরির এক পর্যায়ে ওয়ার্কশপে কাজ বন্ধ করা হয়। সমস্ত শিল্পী এবং মাটি প্রলেপকারীগণ ভরতের ঘরে স্থানান্তরিত হন। তখন তাঁদের বেডরুমে কাজ চলছিল, অন্যদিকে ভক্তগুণা রান্নাঘরে সম্পূর্ণ বিগ্রহসমূহে রং লাগাচ্ছিলেন। শিল্পীরা রাতে ভরতের ঘরে বিশ্রাম নিত এবং দিনে বিগ্রহসমূহের কাজ করত। তখন এই কাজের পরিবেশে বসবাস করাই ছিল তপস্যার মত, যা তিন মাস স্থায়ী হয়েছিল। অবশেষে ছােট বিগ্রহসমূহের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল।
 
মাটির তৈরি নমুনা
 
১৯৯৬ সালে প্রভুপাদের জন্মশতবার্ষিকীতে সেই বিগ্রহসমূহ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দিনটি ছিল গৌরপূর্ণিমার পূর্বে সর্বশেষ একাদশী। এর কিছুদিন পরই ভরত মহারাজ দাস পঞ্চতত্ত্বের বড় আকারের মাটির বিগ্রহসমূহের কাজ শুরু করলেন। বন্যায় যাতে তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত না হয় সেই কারণে তারা মায়াপুর গদা ভবনের ছাদে এবং অতিথিশালায় বিগ্রহ তৈরির কাজ শুরু করলেন। মিলান বাগ পুনরায় ভরত মহারাজ দাসের সাথে মিলিত হয়ে বিগ্রহের নমুনা তৈরিতে যােগ দিলেন, যেগুলাে একসময় ৮ ফুট উচ্চতার পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহে পরিণত হবে। মিলানের অন্তর্ভুক্তির পূর্বে ভরত বিভিন্ন ভঙ্গিতে বিভিন্ন নমুনা বিগ্রহ তৈরি করে পরখ করলেন, কিন্তু একসময় বন্যায় সেগুলাে ধ্বংস হয়ে গেল। এর কিছুকাল পরে মাটির নমুনা বিগ্রহসমূহ অনুমােদিত হল এবং ভরত ফাইবার গ্লাস মডেলের কাজ শুরু করলেন। যখন তাঁদের কাজ শেষ হল তখনও বিগ্রহ খােদাই করা এবং মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে কোনাে সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই নমুনা বিগ্রহসমূহ শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দিরের বারান্দায় দীর্ঘ দুই বছর রাখা হয়।
এই সময়ে ভরত, ভক্তিচারু স্বামী মহারাজের সাথে ভ্রমণ করছিলেন ‘অভয়চরণ ভিডিও সিরিজের আর্ট ডাইরেক্টর হিসেবে। তাঁরা ১৮ মাস যাবৎ সমগ্র ইউরােপ ভ্রমণ করেন। যখন ১৯৯৯ সালে অভয়চরণ নির্মাণ শেষ হল, তখনও মাটির বিগ্রহসমূহ সমাধি মন্দিরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিল।
ভরত সহধর্মিণী ভক্তগুণাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ফিরে যান। তিনি ভেবেছিলেন যে, হয়তাে বা একদিন যখন তিনি পুনরায় মায়াপুর ফিরে যাবেন তখন হয়তাে বা বিগ্রহসমূহকে বেদিতে দর্শন করবেন। কিন্তু কৃষ্ণের পরিকল্পনা ছিল ভিন্নতর।
 
দায়িত্বের আহ্বান
 
অস্ট্রেলিয়ায় ভরত, মায়াপুরের প্রধান পূজারি জননিবাস দাসের একটি চিঠি পান- “শ্রীশ্রী রাধামাধব এবং পঞ্চতত্ত্বের সেবার জন্য আমাদের আপনার মত একজনের সাহায্য খুবই প্রয়ােজন… আমি প্রায়ই আপনার কথা ভাবি কেননা আপনার প্রচুর প্রায়ােগিক কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আপনার ভাল সৃজনশীলতা এবং পূর্ণতা রয়েছে।
সেই পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটল দক্ষিণ ভারতে পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহ খােদাই করার সময়। ভরত সমগ্র কাজটিতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করলেন এবং পঞ্চবিগ্রহেই সুন্দর মুখাবয়ব খােদাই করা হল। অবশেষে, এই ফলাফল পেতে বহু বছর সময় লেগে গেল এবং বহু ভক্তের আত্মত্যাগের প্রয়ােজন হল।
ভরত বললেন, “পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহের আবির্ভাবটি ঠিক বিভিন্ন রাধুনির একটি পদ রান্নার মতই। বহু বছর ধরে অনেকেই তাঁদের নিজের হস্ত স্পর্শ দ্বারা এই মহকর্মে সিক্ত হয়েছেন- ছিল একটু বাঙালি স্পর্শ, এক ফোঁটা নিউজিল্যান্ডের, দক্ষিণ ভারতের আঘাত, আর্মেনিয়ানের কাদাজল, আমেরিকানের স্পর্শ, অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত একজন বৃদ্ধ ইংরেজের মহানুভবতার স্পর্শ এবং শেষের দিকে একজন ইটালিয়ানের জল ছটা। আমার কাজ ছিল শুধুমাত্র সময়ে সময়ে সেই পাত্র নাড়ানাে এবং সমস্ত উপকরণগুলাে মেশানাে।
ভরত মহারাজের আর কিছু বলার ছিল না। আমি বললাম, না, এই ধরনের আরো অনেক কথা গুরুত্ব বহন করতে পারে। তবে আমি এখন ভগবানের সেই বিগ্রহসমূহের জন্য একটি সুন্দর মন্দির নির্মাণ করতে চাই।
সত্যি বলতে গেলে ভরতের এই কর্মটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং মন্দির ও বিগ্রহসমূহ হচ্ছে তাঁর শৈল্পিক ও শাস্ত্রচক্ষুর দৃষ্টি। সমগ্র বিশ্বের সকল ভক্তগণ ভরত মহারাজ দাসের এই অনবদ্য সেবা এবং আত্মত্যাগের জন্য তাঁর কাছে ঋণী এবং তাঁকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
 
 
ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল-জুন ২০১৩

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here