ক্ষমা

0
30
ক্ষমা একটি মহৎ গুণ কিন্তু সেই গুণটি অর্জন করার ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন? কিভাবে এই মহৎ গুণটি আমরা অর্জন করতে পারি?

মহাত্মা দাস

একবার এক মদিরালয়ে একটি ছেলে একটি মেয়ের সাথে প্রেমের ভান (Flirting) করছিল । এক পর্যায়ে মেয়েটি ছেলেটির ওপর এত বিরক্ত হয় যে সঙ্গে সঙ্গে একটি ছুরি নিয়ে ছেলেটিকে আঘাত করে এবং তার মৃত্যু হয়। আপনি যদি সেই ছেলেটির মা হতেন তবে আপনার কেমন লাগত? আশ্চর্যজনকভাবে, তার মা এ ঘটনার সূত্র ধরে বিশেষ একটি কাজ করেছিল। তিনি সেই মেয়েটিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিয়মিতভাবে কারাগারে মেয়েটিকে দেখার জন্য যেতেন যেন তার কোনো ক্ষতি না হয় সেটিই লক্ষ্য। তিনি তার সমস্ত সমস্যার সমাধান করেছিলেন। এতক্ষণ যে নারীর কথা বলা হল তিনি মহান কোনো সাধু ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু তবুও যে মেয়েটির কোনো কারণ ছাড়াই তার ছেলেকে হত্যা করল তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
এই ক্ষমা প্রসঙ্গে শাস্ত্রে অনেক অভাবনীয় কাহিনি রয়েছে এবং এ ধরনের ক্ষমা শুধু উন্নত ভক্তদের পক্ষেই সম্ভব। অর্জুন তাঁর ও ভাইদের চরণে অপরাধী কৌরবদের ক্ষমা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু প্রহ্লাদ তার পিতাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যদি তার পিতা পুনঃ পুনঃ তাঁর ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন এবং এমনকি হত্যা করতেও চেয়েছিলেন, সেই তিনিই তাঁর পিতার মুক্তি কামনা করেছিলেন। অম্বরীষ মহারাজ যিনি শুধু দুর্বাসা মুনির সেবা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই দুর্বাসা মুনি একটা সময়ে অম্বরীষ মহারাজকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মহারাজ তাকে এ জন্যে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। প্রভু যীশু তাকে যারা হত্যা করতে চেয়েছিলেন তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। হরিদাস ঠাকুরকে যারা নির্দয়ভাবে প্রহার করতে করতে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তিনি তাদের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। নিত্যানন্দ প্রভু জগাই মাধাইকে ক্ষমা করেছিলেন এবং তাদের উদ্ধারের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
এটি প্রচলিত যে, ক্ষমা করার মতো এমন মহৎ কার্যকলাপ মহাত্মাদের পক্ষেই সম্ভব। অপরাধ গুরুতর হলে ভিন্ন বিষয়। উপরোক্ত ঐসব দিব্য কাহিনি শ্রবণ করে আমার চেতনার পরিবর্তন হতে শুরু করল।

ক্ষমার মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা

আমার জীবনের পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, চারজন ব্যক্তি আমার জীবনের ব্যথা বেদনা ও হতাশার জন্য দায়ী ছিল। এজন্যে জ্যেষ্ঠ ভক্তগণ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন যেন আমি তাদের ক্ষমা করে দিই।
প্রথমত, যেভাবে তারা আমাকে আঘাত দিয়েছিল। সেগুলোর প্রতি আলোকপাত করি। তারপর আমাকে বলা হল তাদেরকে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে দর্শন করার জন্য তারা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের সর্বোত্তমটি দিয়েছে এভাবে বিবেচনা করার জন্য। পরবর্তীতে, আমাকে বলা হল যদি আমি তাদের ক্ষমা করতে ইচ্ছুক হই তবে এ আশা যেন না থাকে যে, তারা পরিবর্তন হয়ে যাবে বা, তাদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠবে। বরঞ্চ নেতিবাচক চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য তাদের ক্ষমা করতে হবে। আমি তখন উপলব্ধি করলাম, এরকম খারাপ অনুভূতি বেশিদিন ধারণ করে রাখার চেয়ে চিন্তা থেকে ফেলে দিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ অনুভব করেছিলাম।
ক্ষমা করার মাধ্যমে আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে, তাদের আচরনের জন্য আমি নিজেকে নিচের দিকে নামাচ্ছিলাম। এর মাধ্যমে পূর্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমার ভবিষ্যৎকে দৃঢ় করছিলাম। আমি নির্যাতিতের ভূমিকা পালন করেছিলাম এবং আমার নিজের পরিস্থিতির জন্য দায়ভার নিই নি।
এভাবে আমি এ ধরনের বিরক্তিজনিত ভাবকে ব্যবহার করেছিলাম এভাবে যে কেন আমি ঐ সময় কৃষ্ণচেতনায় ছিলাম না। ফলশ্রুতিতে আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে, আমার আচরণ নিতান্তই ছেলেমানুষি। যদি আমার পারমার্থিক জীবন তাদের কার্যকলাপের জন্য বিপর্যস্ত হয়, যদি তাদের আচরনের কারণে আমি যথাযথ আচরণ করতে ব্যর্থ হই, তবে এই আমিই তো আমার কার্যকলাপের জন্য দায়ী। জানি না আমার আচরণ কতটা যথাযথ ছিল, তবে আমাকেই কার্যকলাপের ফল ভোগ করতে হবে। যেরকম শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছিলেন, “কেউ তোমাকে আঘাত করতে পারবে না যদি না তুমি তা করতে দাও।”

এটি একটি পছন্দ, চেষ্টা করুন

বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে ক্ষমা করার জন্য। শ্রীমদ্ভাগবতে ক্ষমাকে সভ্য মানুষের গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে বলেছিলেন পরস্পর পরস্পরকে ক্ষমা করার জন্য যাতে করে আমরা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পারি। বৈদিক শাস্ত্রে আমাদের পূর্বকৃত সমস্ত দুর্দশাকে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে আমাদের কর্মের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ। যদিও হৃদয় পরিমার্জন অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু তবুও এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে, তখন আমাদের অনেকের জন্য ক্ষমা করাটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়। এক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই অনুভব করি, আমি এত গভীরভাবে আঘাত পেয়েছি যে, আমি জানি না কিভাবে আমি ক্ষমা করতে পারি।”
প্রায় সবারই ক্ষমা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান বা মনোভাব জানা প্রয়োজন। মাঝে মাঝে একমাত্র বিষয় যেটি আমাদের অনুপ্রেরণা দিতে পারে তা হল আমাদের নিজেদেরই দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য আত্ম-কেন্দ্রিক মনোভাব। কৌশলটি অপ্রাকৃত নয়, কিন্তু এর একটি ফলাফল রয়েছে। তাই এমনকি যদি আপনি সত্যিই অন্যকে ক্ষমা করতে চান না, তবে সেক্ষেত্রে আপনি হৃদয় থেকে উৎসারিত ব্যাথা, বেদনা, অসন্তোষ (resentment) চলতে যেতে দিতে চান। তাদের কথা ভুলে যান এবং যা করার আপনার নিজের জন্য করুন। যেরকমটি একজন নারী এভাবে বলছিলেন যে, “ক্ষমার অনুশীলন প্রচারের পর আমি উপলব্ধি করলাম, ক্ষমা না করার ব্যাপারটি এমন যেন কোনো উপর্যুপরি পরিশ্রম চলছে এবং একইসাথে সে পরিশ্রমের ফলস্বরূপ শিশুটিকে বেরিয়ে আসতে অস্বীকার করা হচ্ছে।”
শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, ভগবান আমাদের জন্য লাভ বা ক্ষতি যাই প্রেরণ করুক না কেন, তা হল ভগবানের কৃপা। যদি এভাবে আমরা দর্শন করি এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি, তখন এমনকি সর্বোচ্চ বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য থেকেও আমরা অর্জন করতে পারি অনেক কিছু।
যদি আপনি এমনকি নিজের জন্য হলেও ধারাবাহিক অসন্তোষে ভোগেন, সেক্ষেত্রেও কৃষ্ণ আপনাকে সহায়তা করবে ক্ষমা করার মনোভাবের প্রতি আপনাকে নিয়ে যেতে।
কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখবেন, এই যুদ্ধে আপনার মিথ্যা অহংকারও আপনার সাথে লড়ছে। বলা হয় যে, এ অবস্থায় আপনার উচিত ব্যাথা বেদনাও আপনার সাথে অপরাধ করেছে সেরকম পরিস্থিতি নিয়ে থাকা এবং একইসাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। অহংকার নিজেকে সঠিক বলে প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, এর মাধ্যমেতো আমরা শুধুমাত্র নিজেরা নিজেদেরই আহত করছি। অপরাধ করেছে আপনার সাথে এরকমটি থাকাটা হল হৃদয়ে একটি আগাছা থাকার মতো এবং এটি আমাদের তিক্ততার মধ্যে রাখে।
ক্ষমা সম্পর্কে কোনো পত্র লেখাও আমাদের সহায়তা করতে পারে। (পত্রটি পাঠানোর প্রয়োজন নেই। যদি অপরাধীরা অনুভব না করে যে, তারা আমাদের কাছে অপরাধ করেছে এবং এক্ষেত্রে অনেক সময় সেই পত্রটি পাঠালে অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে পারে) ব্যক্তিটির হৃদয় পরিবর্তন হবে এটি আশা করে অথবা আপনার সাথে উত্তম সম্পর্ক গড়ে উঠবে এরকমটি আশা করে ক্ষমা করবেন না।
এরকমটি সম্ভবপর নাও হতে পারে। পত্রটি লেখার উদ্দেশ্য হলো শুধুমাত্র আপনার নিজের হৃদয়কে নির্মল করা।
একজন ব্যক্তি এমন একটি অবস্থায় পড়েছে যে, সে এরকম কোনো অপরাধ বা খারাপ কোনো ঘটনা ঘটাল এরকম উপলব্ধি করে, কিংবা ব্যক্তিটি সারাজীবন এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে যার পরিণতি এরকম হীন কার্য করেছে। এ ধরনের বিষয়গুলো উপলব্ধি করাটা সম্পূর্ণরূপে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করবে। “পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়”। কিংবা যদি আপনি চান এরকমটি গ্রহণ করতে পারেন যে, “পাপকে ঘৃণা কর এবং পাপীকে ভালবাস ।”
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অসন্তোষ দূর করার একটি সুন্দর পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন যখন তাঁর কোনো শিষ্য অন্য একজন ভক্তের প্রতি কোনো অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে আসতেন, তখন তিনি বলতেন, “ঐ ভক্তটির মধ্যে কি কোনো সদগুণাবলী রয়েছে? যখন শিষ্যটি সেই ব্যক্তিটির সদগুণাবলী সম্পর্কে বলে, তখন তিনি বলতেন, তাহলে তার ঐসব গুণাবলীর ওপর নজর দাও”। এটি এমন একটি আশ্চর্যকর শক্তিশালী মাধ্যম, কেননা যখন হৃদয় পূর্ণ সম্মতিতে ভরে উঠে তখন হৃদয়ে অসন্তোষের স্থান হয় না। যখন আমরা ভালো কিছুর ওপর নজর দিই তখন সেই ভালো আমাদের মনকে প্রসারিত করে এবং এটি আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।
যখন আমরা অসন্তোষের ওপর নজর দিই, তখন সেটি খুবই খারাপ অবস্থা ডেকে আনে। যারা আমাদেরকে আঘাত দিয়েছে তাদের মাঝে ভালো গুণগুলো দর্শন করার মনোভাবের মধ্যে যদি নিজেদের নিয়ে আসতে পারি তবে তা অলৌকিকভাবে অসন্তোষ বিদূরিত করবে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, তাদের মধ্যে অবশ্যই কোনো মহৎ গুণাবলী রয়েছে।
যদিও ব্যাপারটি গ্রহণ করাটা কঠিন, বিশেষত যখন কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা গমন করি । শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, ভগবান আমাদের জন্য লাভ বা ক্ষতি যাই প্রেরণ করুক না কেন, তা হল ভগবানের কপা। যদি এভাবে আমরা দর্শন করি এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি, তখন এমনকি সর্বোচ্চ বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য থেকেও আমরা অর্জন করতে পারি অনেক কিছু। এ সম্পর্কিত একটি কাহিনি উল্লেখযোগ্য। এক ব্যক্তি বলেছিল “আমাকে আক্রমণকারী এক ব্যক্তিকে ক্ষমা করতে সমর্থ হয়েছিলাম কেননা যদি আমি তা না করতাম তবে সংঘাতের ফলে আমি নরকগামী হতাম। সেই অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থে আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। আমি দেখতে পেরেছিলাম যে, আক্রমণকারী ব্যক্তিটি ছিল প্রকৃতপক্ষে নাছোরবান্দা ও বিষণ্ন। এ অবস্থায় তার প্রতি অনুকম্পা বা করুনার উদয় হয়েছিল আমার। তবে সেটি এ জন্যে নয় যে, আমার প্রতি সে কি করেছে তার জন্য, বরং ব্যক্তিটির জন্যেই করুনার উদয় হয়েছে।”
এটি আশ্চর্যকর। কেউ ভাবতে পারে যে, একজন ব্যক্তি কোনোভাবে আক্রমন হওয়ার পর এরকম অধিক অনুকম্পা প্রদর্শন করতে পারে? যেভাবে হোক তিনি ঐ ব্যক্তির অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। আমি এরকম আরো অনেক ব্যক্তির সাথে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম। এরকম পরিস্থিতিতে সাধারণ অধিক সংখ্যক ব্যক্তি ক্রোধান্বিত হয়। কিন্তু যখন তারা পরবর্তীতে নিজেদের উন্মোচন করে তখন তারা বুঝতে পারে, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। সাধারণত তারা তখন স্বীকার করে থাকে যে, যদিও ব্যাপারটি ঠিক হয়নি, তারা নিজেদের কর্মফল অনুসারে এগুলোর মুখোমুখি হয়েছে এবং এক্ষেত্রে যদিও তারা যা ঘটেছে তা পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে বর্তমানে তারা যে আঘাত ভোগ করছে তার পরিবর্তন করতে পারে এবং এটি তাদের ভবিষ্যত পরিবর্তন করবে।

ক্ষমা করলে ক্ষমা পাবেন

যদি এমনটা হয় যে, যতটা আপনি কোনো ব্যক্তিদের ক্ষমা করেছেন সে পরিমান ক্ষমা যদি আপনার পূর্বের কোনো পাপ কর্ম ও ভুলের জন্য পেয়ে যান তবে আপনি কি করবেন?
সমস্যা হল প্রায়শই আমরা নিজেদের জন্য হলে কৃপা চাই, কিন্তু অন্যের জন্য হলে বিচার চাই।
আমি এটি জানি যে, যদি আমি ভুল করি, কারো কাছে অপরাধ করি কিংবা কাউকে আঘাত করি, সেক্ষেত্রে আমি অবশ্যই চাই ক্ষমা পেতে। এর মাধ্যমে অন্যদের আমি এটি জানাতে চাই যে, আমার বদ্ধ অবস্থার দরুন মাঝে মাঝে আমি ভুল করি, কিন্তু তাই বলে আমার অভিপ্রায় ভুল করা নয়। আমি অন্যদের জানাতে চাই যে, যদিও আমি যথাযথ নই তবুও আমার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমার এতেও কোনো অভিযোগ নেই, যদি যাদের কাছে আমি অপরাধ করেছি তারা আমার ভালো হোক সেটি প্রার্থনা করে (এবং আমি যতটুকু জানি তারা হয়তো সবার জন্য এটি করতে পারে) অতএব, নিশ্চিতভাবে অন্যের ক্ষেত্রেও কৃপা এবং এ ধরনের বিবেচনা অনুমোদন হওয়া উচিত।
এখন থেকে অনুশীলন হোক সাধনা মানে হল অনুশীলন। আমরা শুদ্ধ বৈষ্ণবের আচার আচরণ ও কার্যপ্রণালী অনুশীলন করি। অনুশীলন মানে হল আমরা যা করতে হয়তো পছন্দ করি না এমন কিছু করা এবং তা করার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ গড়ে উঠে। একবার শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, যদি আমরা নৃত্য করার প্রতি আকর্ষণ না থাকে তবে আমাদের যেকোনোভাবে নৃত্য করা উচিত, তখন নৃত্যের প্রতি আমাদের অনুরাগ জন্মাবে। তদ্রুপ যদিও অপরাধীকে ক্ষমা করার অভ্যাস আমাদের মধ্যে নেই, তবুও আমাদের ক্ষমা অনুশীলন করা প্রয়োজন। যখন আমরা ক্ষমা করা অনুশীলন করব, তখন ক্ষমা করার ব্যাপারটি সহজতর হয়ে উঠে। অবশেষে আমাদের এমন অবস্থানে উপনীত করে, যেখানে আমরা অপরাধীদের প্রতি আশীর্বাদ বর্ষণ করতে পারি কিংবা সহায়তা প্রদান করতে পারি।
যদি আপনি অনুভব করেন যে, আপনি কাউকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমা করতে পারবেন না, সেক্ষেত্রে চেষ্টা করুন অন্তত এক দিনের জন্য হলেও ক্ষমা করতে এবং পরখ করে দেখুন তা আপনাকে কিভাবে সহায়তা করে এবং আপনি যদি খুব অসন্তোষ হন অর্থাৎ আপনি ভাবতেই পারছেন না যে, আপনি এটা করতে পারবেন, তবে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য কিংবা এমনকি অন্তত এক মিনিটের জন্য এরকম ব্যাথা বেদনা থেকে কিছুটা নিস্তার লাভের জন্য ক্ষমা করে দেখুন না কেমন লাগে। এর মাধ্যমে আশা করি কাউকে ক্ষমা করার ব্যাপারটি অব্যাহত রাখতে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে। মনে রাখবেন, আপনার মনের ভেতর কোনো ভাবনায় বিনা ভাড়ায় বাসা বাঁধে না।
যদি আপনি এখনই এভাবে নিজেকে ভাবতে ইচ্ছুক না হোন, তবে সেক্ষেত্রে নিজেই নিজেকে ঐ একই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করুন আগামী কালকে পরবর্তী সপ্তাহে, পরবর্তী মাসে যতক্ষণ পর্যন্ত ভাবতে ইচ্ছুক না হচ্ছেন, আপনি দুর্দশাগ্রস্থ বা অসন্তোষ নন। এগুলো হলো নিছক আপনার অনুভূতি এবং আপনি আপনার এসব অনুভূতি থেকে ভিন্ন একজন। কেননা আপনি আপনার অনুভূতি নন, আর তাই আপনি সেগুলো যে কোনো সময় ফেলে দিতে পারেন। সেগুলো ত্যাগ করতে পারেন।

শত্রুকে আশীর্বাদ করুন

এখন আপনারা বলতে পারেন, “যে আমাকে আঘাত করেছে তাকে কি আমার অবশ্যই ক্ষমা করতে হবে?” এক্ষেত্রে এটি জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, একজন অপরাধীর বা একজন ব্যক্তি যে আপনি বা অন্যদের জন্য বিপদজনক তার বিরুদ্ধে নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাও তাকে ক্ষমা করাটি হল সঙ্গতিপূর্ণ (compatible)। ধরুন, একজন ব্যক্তি আপনার কাছে কোনো অপরাধ করছে, সেক্ষেত্রে আপনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে ক্ষমা করতে পারেন এবং সে সাথে ব্যক্তিটিকে বিচারে (Prosecuting) জড়াতে পারেন। ক্ষমা মানে এই নয় যে, আমাদেরকে কোনো ভুলকে সঠিক হিসেবে প্রতিপন্ন করতে হবে। এর মানে হল অপরাধীদের কাছে যে অসন্তোষ আমরা অনুভব করি সেটি থেকে নিজেদের মুক্ত করা। এজন্যে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের আর কোনো ক্ষতির আশংকা থেকে রক্ষার জন্য কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমা করতে ও আশীর্বাদ করতে কৃষ্ণের কাছে এমনকি প্রার্থনা করতে পারি।
সম্পূর্ণ ক্ষমার মধ্যে রয়েছে আমাদের অপরাধীদের জীবনে কৃষ্ণের আশীর্বাদ বর্ষণের জন্য প্রার্থনার বিষয়টিও। অন্য কথায় আমরা প্রার্থনা করি যে, তাদের সাথে এমনভাবে আচরণ করতে হবে যেরকমটি আমরা ভগবানকে আমাদের সাথে দেখতে চাই। শ্রীল প্রভুপাদ এ বিষয়ে লিখেছেন যে, যদি আমরা কাউকে ক্ষমা না করি তবে আমরা সেই অপরাধীর মতই দোষী। ক্ষমা না করার পাপে আমরা দোষী থাকব।
যদি আমরা কাউকে কৃপা প্রদান করি, তবে আমরা কৃপা পাব। মহাত্মাগণ কখনো কৃপা প্রদান স্তিমিত করেন না। আবার, এটি ভাববেন না যে, ক্ষমার মহৎ কার্যকলাপসমূহ শুধু মহাত্মাদের জন্যই সংরক্ষিত তা নয়, আমার আর আপনার মত প্রতিটি সাধারণ আত্মাও ধরনের এ কার্যকলাপে সামিল হতে পারে। আর এভাবে করার মাধ্যমে, আমরা মহাত্মা হয়ে উঠবে।

মহাত্মা দাস ১৯৬৯ সালে ইস্‌কনে যোগদান করেন এবং একজন মন্দির অধ্যক্ষ, বিতরণকারী, সংকীর্তন নেতা, কলেজ প্রচারক, মেম্বারশীপ পরিচালক এবং VIHE (Vaishnava Institute of Higher Education) এর শিক্ষক ও সহ পরিচালক ইস্‌কনে তিনি সু-পরিচিত তার রেকর্ড করা সঙ্গীত ও তার সেমিনারের জন্য। লেখক সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পরিদর্শন করতে পারেন এই ওয়েবসাইট : WWW.mahatmawisdom.com


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here