ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিং

0
76

বেদনানাশক ঔষধই যদি বেদনার কারণ হয়, তখন কেন আরো কিছু বেদনানাশক ঔষধ গ্রহণ করে আমাদের বেদনাকে বাড়িয়ে তুলব?

চৈতন্য চরণ দাস

বলতে পারছি না, বলা নিষেধ, বলার নিয়ম নেই

প্রেসরুমে তাক করা ক্যামেরায় জিজ্ঞাসু জনা পঞ্চাশেক সাংবাদিক আর লক্ষ লক্ষ দর্শকের প্রতি আইসিসির প্রধান নির্বাহীর এই নির্বিকার উত্তর।
বলতে পারছেন না তিনি, কিইবা বলা নিষেধ, কেনইবা বলার নিয়ম নেই, অবশ্য বিষয়টি তার বলার অপেক্ষা রাখেনি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে “টক অব দ্যা টাউন”। ক্রিকেট, শতবর্ষীয় এই খেলা ইংল্যান্ড থেকে উপমহাদেশের আমদানি করা এই সাহেবদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে আর কালের প্রবাহে ঝোঁকে বসেছে বাবুদের মাথায়। মেটাতে শুরু করে তাদের রসনার খোরাক। আজ উপমহাদেশীয়রা বিদেশি সাহেবদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে কিন্তু স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি ক্রিকেটীয় আসক্তি থেকে। তার সঙ্গত কারণও রয়েছে। সেই ক্রিকেটই যখন স্পট ফিক্সিং নামক দুর্নীতির কবলে জড়িয়ে পড়ে তখন তা জনমানুষের কাছে মনোরঞ্জনের পরিবর্তে মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠে। শিরোনাম হয়ে উঠে গণমাধ্যমগুলোতে, হয়ে থাকে আলোচনা সমালোচনা, পত্রিকাগুলো মন্তব্য প্রতিবেদন কী ভুল? কী সঠিক, এই নিয়ে ।
যেমন প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে উৎপল শুভ্র লিখেছেন……
বিপিএল জাতীয় টুর্নামেন্টগুলোতে (IPL, T 20 খেলা) যে জুয়াড়িদের মৃগয়াক্ষেত্র এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। যেখানেই জুয়াড়িদের আনাগোনা, সেখানেই লোভের ফাঁদ। সেই ফাঁদে খেলোয়াড় কর্মকর্তারা অনেকেই যে পা দেবেন, এটা মোটেও অভাবনীয় কিছু নয়। যে ফিক্সিংয়ের বিষ কুড়ে খাচ্ছে ক্রিকেটকে, বাংলাদেশকে তা স্পর্শ করবে না- এটা ভাবা তো বোকার স্বর্গে বাস করার সামিল। যা হওয়ার কথা, তাই আসলে হয়েছে।…
বিপিএলের কল্যাণে উম্মোচিত হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্ধকার জগৎ।” (প্রথম আলো ১৪ আগস্ট, ঘোর সংকট, আবার সুযোগ, পৃষ্ঠা ১)
ফিক্সিং বিতর্ক এখন এক বহুল আলোচিত বিষয়। দর্শক, শ্রোতা, আলোকে সবার প্রশ্নবাণে জর্জরিত। কিন্তু প্রশ্ন হল স্পট ফিক্সিং কি প্রধান সমস্যা? উত্তর হল না। এটি সমস্যার উপসর্গ মাত্র। এর মূল আরো গভীরে। সেটি নিয়েই সবিস্তারে আলোচনা করেছেন চৈতন্য চরণ দাস।
স্পট ফিক্সিং এর অভিযোগে তিন ক্রিকেটারের গ্রেপ্তার এবং ক্রিকেটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, খেলোয়াড়দের জড়িত থাকার অভিযোগ এই সব কিছুই ইদানীং খেলার পাতার প্রধান শিরোনাম হয়ে উঠে আসছে। গণমাধ্যম জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এজন্য ক্রিকেট প্রশাসনে অবশ্যই সচ্ছতা প্রয়োজন ৷
এই ধরনের সমস্যা আমাদের নাড়া দেয় এবং ভাবায় যে মানসিক ক্লেশদায়ক ও বিব্রতকর। সমস্যাটি শুধু ক্রিকেটে নয় আমাদের সংস্কৃতিতেও বিদ্যমান। বর্তমান স্পট ফিক্সিং নামক অনৈতিক কর্ম সেই সমস্যার একটি উপসর্গ মাত্র ৷
এ বিষয়টি আলোচনার পূর্বে চলুন দেখা যাক মানব সংস্কৃতিতে খেলাধুলার ভূমিকাটি কী? ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে খেলাধুলা মূলত বিনোদনের খোড়াক হিসেবে ব্যবহৃত হত যাতে একঘেয়েমি জীবনের অবসান ঘটে। দর্শকদের উপস্থিতিতে যখন এ খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয় তখন তা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে একটি জমকালো আবহ ধারণ করে। একদল মেধাবী ও নিবেদিত খেলোয়াড় যখন দর্শকদের সামনে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তা তখন মানবের একটি চমৎকার প্রদর্শনীরূপে মর্যাদা পায়, আর দর্শকরা সেখান থেকেই আনন্দের অনুসন্ধান করে। যখন কোনো খেলোয়াড় একটি ছক্কা হাঁকায় অথবা বেসবলে হোম রান দেয় তখন দর্শকরা এই বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য উৎফুল্লতা প্রকাশ করে। নিজের দেশ, ক্লাবের পক্ষ থেকে তখন খেলোয়াড়রা সম্মান অর্জন করে নেয়। এভাবে যখন খেলোয়াড়রা তাদের ক্ষমতা সর্বোচ্চ উজাড় করে দেয়, তখন দর্শকরা সেই বিনোদনের জন্য কিছু পরিশোধ করে। যার ফলে খেলোয়াড় এবং সেই দলের মালিকরা লাভবান হয়।
কেন খেলোয়াড়রা তার ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করে যে অর্থ আয় করে তার ওপর ভরসা না করে প্রতারণা করে অর্থ আয়ে উৎসাহিত হয়। তার উত্তর হচ্ছে অতিরিক্ত লোভ, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

খেলোয়াড়দের লোভ

যখন তারা ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখিয়েই ভাল অর্থ উপার্জন করতে পারে, তবে তারা প্রতারণা করে কেন আরো বেশি অর্থ আয় করতে চায়? আমাদের সংস্কৃতি যখন আমাদের এই সকল সমস্যার সম্মুখীন করে তখন এটি আমাদের হতাশ করার মত প্রশ্নের মুখোমুখি করে যে, কেন তারা এটি করবে না? যে সংস্কৃতিতে আমরা সামাজিক স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই সেই সংস্কৃতিতে এর চেয়ে ভাল আর কিইবা আশা করা যায়? যখন তাদের চতুর্পার্শ্বে থাকা অনেক ব্যক্তিই তাদের (খেলোয়াড়) আর্থিক লাভের প্রলোভন দেয় তখন দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মন সেই প্রলোভনের দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় এবং এর কিছু চরমভাবে প্রকাশ পায় স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে। লেখক Ed Howkins তার “ Gambler, Bookie, Fixe, Spy: A Journey to cricket under World” নামক গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কীভাবে T20 জাতীয় খেলা ও লীগসমূহ, IPL, ICL গুলো ফিক্সিং তথা জুয়াড়িদের জন্য আদর্শ জায়গা। যখন খেলোয়াড়দের সাথে দলের সত্ত্বাধিকারীদের কোনো সম্পর্ক থাকে না, যখন একজন খেলোয়াড় তার কিছু সময় একটি দলে খেলার পর অন্য দলে খেলার সুযোগ থাকে। যখন খেলার ফলাফল বৃহত্তর কোনো দুর্ভাবনার কারণ হয় না তখন। তারা কেন সেই সুযোগটি ব্যবহার করবে না? তখন দেশীয়, জাতীয় বা দলীয় স্বার্থ ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থ উপার্জনের যে উচ্চাভিলাষ সেটির দ্বারা কি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা খেলোয়াড়রা বিক্ষিপ্ত হন না? যখন অর্থ আয়ের সুযোগ যার কাছে নেই সেই ব্যক্তি পর্যন্ত অর্থ আয়ের জন্য উৎসুক থাকেন তখন যার কাছে সেই সুযোগ রয়েছে তিনি তা হেলা করবেন? প্রমাণ পেতে আমাদের বহুদূর দৃষ্টি দিতে হবে না। কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডের সাথে পাকিস্তানের খেলায় একটি ম্যাচে পাকিস্তানের কিছু খেলোয়াড় এই স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। সমস্যা শুধু কিছু ক্রিকেটার এই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে বা অভিযুক্ত হয়েছে সেটি নয়, এটি আরো বড়ো সমস্যা হয়তো আরো অনেক ক্রিকেটারই এর সাথে যুক্ত রয়েছে। সত্যিকার সমস্যা আমাদের সংস্কৃতিতে একজন একজন করে বেশিরভাগ লোকেরই এই সমস্যাটি রয়েছে প্রত্যেকেই নৈতিকতাকে এড়িয়ে চলতে চায়। কি মানুষকে নৈতিকভাবে আচরণ করতে উৎসাহী করবে? সেটি হচ্ছে জীবনের উচ্চতর মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শ্রদ্ধাবোধ আসে। জীবনের সফলতা কি সেটি বোঝার মাধ্যমে যে শ্রদ্ধাবোধ আসে সেটি ব্যাংক হিসেবে রাখা যে কোনো পরিমাণ সঞ্চিত অর্থের অংকের চেয়েও বড়।
ক্রমাগত হঠকারি জুয়াড়িদের প্রলোভন ও নৈতিকতাকে এড়িয়ে চলার মানসিকতারূপ দৃঢ়মূল বৃক্ষের কদর্য ফল হচ্ছে এই স্পট ফিক্সিং।
সত্যিকার অর্থে মূল্যবোধ অবক্ষয়ের প্রভাব আমাদের সমাজে গভীর থেকে গভীরতর। আর এই মূল্যবোধের মূল্যহীনতা সমাজে ক্রমাগত প্রমাণিত হচ্ছে। মূল্যবোধ রক্ষার জন্য তথাকথিত কিছু প্রচার প্রচারণা চললেও সেগুলো কোনো কাজেই আসছে না। কেননা অনেকেরই মধ্যে জীবনকে রঙ্গমঞ্চ ভেবে তাকে উপভোগ ও ফূর্তি করার প্রবণতা থেকেই যাচ্ছে যা সত্যিকার জীবনাদর্শের জন্য চরম ভ্রান্তি। তাই গুটিকতক নৈতিক আদর্শের শৃঙ্খল তাদের এই দিকভ্রান্তিকর মানসিকতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে কোনো দৃশ্যমান ফল বয়ে আনতে পারছে না। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চতর জ্ঞান ও পারমার্থিক শিক্ষা। চলুন দেখি কীভাবে ৷

মানসিক বেদনানাশক

লোকেরা সবসময় উপভোগ ও বিনোদন প্রাপ্তির শর্তে অর্থ ব্যয়ে ইচ্ছুক। কিন্তু ক্রিড়াকে বাণিজ্যিকীকরণ করায় এর সাথে কিছু ইতিহাসও সৃষ্টি হয়েছে। যদি তখনকার দিনের মধ্যযুগের ঐশ্বর্যশালী কোনো নাগরিককে যদি আমাদের যুগে স্থানান্তর করা হয় তবে সেই ব্যক্তিরও চক্ষু ছানাবড়া হয়ে উঠত যে কীভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির একজন বোলারও বাইশগজের একটি মাঠে ছয়টি খারাপ বল করার শর্তে একটি বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ির মালিক হতে পারে! আরেকটু ভালভাবে বললে কি হত যদি এই বিনোদনের অর্থ এভাবে খরচ না করে সারাবিশ্বের দরিদ্র ক্ষুধার্ত ব্যক্তিদের খাওয়ানোর জন্য ব্যবহার করতাম? তা সম্ভব নয়, কেননা এটি ক্রীড়াপিপাসুদের মনের খাবারের মাধ্যমে অনেক ব্যক্তিই সাময়িক দুশ্চিন্তা ও মানসিক বেদনা ভুলে থাকতে পারেন। যেমন করে মানসিক বেদনানাশক ঔষধ মস্তিষ্কের স্নায়বিক ক্রিয়া পদ্ধতিকে অসার করে এবং চিন্তাশীল স্নায়ুগুলোর মৃত্যু ঘটিয়ে আমাদের মানসিক যন্ত্রনাকে দমিয়ে রাখে। তেমনি খেলাও আমাদের সাময়িকভাবে মনকে অন্যরকম এক উত্তেজনা ব্যস্ত রেখে আমাদের সাময়িক স্বস্তি প্রদান করে। জীবনের অপরিহার্য নীতিই হচ্ছে এটি দুঃখ ও দুর্দশার মধ্যেই অতিবাহিত হয়। তাই এটা কী হবে? ওটা কী হবে? এভাবে ভাবার চেয়ে কিছু
লোক ভাবে বরং একটু খেলার চ্যানেলে গিয়ে খেলা উপভোগ করি। সে আশা করে খেলার উত্তেজনায় ডুবে গিয়ে সে কিছু সময় হলেও স্বস্তি পাবে। নেইল পোস্টম্যান ‘Amusing Ourselves to Death explains eloquently the bankruptcy of our current culture’ নামক গ্রন্থে বলছেন যখন একটি জাতি তুচ্ছ জিনিস নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, যখন বাকদুষ্ট ও অপলাপ; সমাজের সর্বাধিক বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে পড়ে, যখন অতি প্রয়োজনীয় বিষয়টি শিশুর আধো আধো কথার মত তাচ্ছিলের পাত্র হয়ে পড়ে, যখন অনাচার দেখে জনগণ নীরব দর্শক হয়ে থাকে এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে যায় তখন সে জাতি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, সে ঝুঁকি নিজেকে হারিয়ে ফেলার। সেসাথে সংস্কৃতির মৃত্যু একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়ায়। কিছু সংস্কৃতি রয়েছে যেখানে আমরা উচ্চতর মূল্যবোধ ও এর গভীরতর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারি এবং সে অনুসারে জীবন-যাপন করতে পারি। জীবনের চূড়ান্ত অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। এই মৃত্যুর সংস্কৃতির কাছে পর্দায় এই জৌলুসপূর্ণ বিনোদন বা খবরে বাজিমাত করা স্পট ফিক্সিং একটি ছোট্ট ঘটনা মাত্র। গীতা ১৮ অধ্যায়ে ২২ নং শ্লোকে বলা হয়েছে-
যত্তু কৃৎস্নবদেকস্মিন্ কাৰ্যে সক্তমহৈতুকম্।
অতত্ত্বার্থবদল্পং চ তত্তামসমুদাহৃতম্ ॥
“যে জ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত তত্ত্ব অবগত না হয়ে, কোনো একটি বিশেষ কার্যে পরিপূর্ণের ন্যায় আসক্তির উদয় হয়, সেই তুচ্ছ জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলে কথিত হয়।”
সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যহীন তথাকথিত অগ্রগতি আমাদের অজ্ঞতা বা তমোগুণের প্রসারতা মাত্র।
এই একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক সংক্ষিপ্তভাবে প্রদর্শন করছে যখন কোনোকিছু আমাদের কাছে সব কিছু হয়ে দাঁড়ায় আবার সেই সব কিছুই নিছক বা (কিছু না) মর্মার্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
যখন আমরা অতিরঞ্জিতভাবে অথবা বিশেষভাবে কোনো বিষয়ের ওপর (কৃত্স্নবদেকস্মিন) করি, তখন আমরা সম্পূর্ণভাবে সত্যের বা বাস্তবতার স্পর্শ রহিত হই (অতত্ত্বীর্থবদল্পং)। যখন টাকা ক্রিকেটারদের জন্য সবকিছু হয়ে যায়, যখন ক্রিকেট দর্শকদের জন্য সবকিছু হয়ে যায়, তখন তারা জীবনের সত্যিকার যে মর্মার্থ তার স্পর্শ হারিয়ে ফেলে। এখন ক্রিকেটকে সর্বাত্মকভাবে বিনোদন বলা চলে না। আমরা নিজ দায়িত্বে সেটিকে আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ করে নিয়েছি (!)
ভগবদ্‌গীতার ৬ অধ্যায়ের ১৭ শ্লোকে বলা হয়েছে-
“যিনি পরিমিত আহার ও বিহার করেন, যার নিদ্রা ও জাগরণ নিয়মিত, তিনিই যোগ অভ্যাসের দ্বারা সমস্ত জড়-জাগতিক দুঃখের নিবৃত্তি সাধন করতে পারেন।”
এখানে মানুষের ক্রিয়াকর্মের বেষ্টনি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর ফলে তার প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে কিন্তু এই নীতিগুলোর একটি বিধিবদ্ধতা প্রয়োজন। এই বিধিবদ্ধতা শুধু পরিমাণের বিধিবদ্ধতা নয় – কত সময় ও শক্তি সেখানে ব্যয় করেছি তার ওপর নয় বরং গুণবাচকতার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা এর উপর কত গুরুত্ব দিয়েছি তার উপরও। যখন এগুলো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠে তখন সেটি আমাদের সংস্কৃতি ও আদর্শকে গিলে ফেলে আর আমরা এর প্রাণীয় জঠরে আবদ্ধ হয়ে পড়ি। তাই আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের অধিকারী হতে হবে কেননা এই সংস্কৃতি সেই সংস্কৃতি যেটি সমূহ ক্ষতি উপকূলেই তার নোঙর গেঁড়েছে এবং টস করছে জড়বিষয় নামক উত্তাল ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যেতে। গীতার জ্ঞান এই ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য আমাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। এটি আমাদের বলছে আমরা শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় বা দর্শক নই। আমরা শিশুসুলভ বা অর্থলোলুপ নই যার উদ্দেশ্য অর্থ আয় করা আর ব্যয় করা। এমনকি আমরা শুধুমাত্র মানুষ নই যে, নিষ্ঠাবান পুলিশের মত ন্যায়নীতি পালনে বাধ্য থাকব। আমরা চিন্ময় বস্তু যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এই ক্ষণস্থায়ী জগৎ এবং নির্ধারিত ক্রিকেট জগৎ থেকেও অনেক ঊর্ধ্বে ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাজ হচ্ছে সাধুভাব ও মর্যাদার সাথে সর্বমহিমান্বিত ও সর্বহিতৈষি সত্য বস্তু পরমেশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করা যার ইচ্ছা হচ্ছে আমাদেরকে সর্বোত্তম পরমানন্দে অবগাহন করানো যে আনন্দ এই জড় জগতে অনুষ্ঠিত সর্বোত্তম আনন্দদায়ক যেকোনো ক্রিকেট ম্যাচের চেয়েও বহু বহু আনন্দদায়ক। এমনকি এটি ফিক্সিং থেকেও মুক্ত । আমাদের এই কামনা চিন্ময়ত্বে পরিবর্তিত হয়ে চমৎকারিত্বে রূপ নিতে পারে। সেখানে শুধু দর্শক হয়ে আনন্দিত হতে হবে না সেখানে প্রত্যেকেরই খেলোয়াড় হবার সুযোগ রয়েছে।
সেটি আমরা করতে পারি আমাদের যার যেরকম সামর্থ রয়েছে সেটি কৃষ্ণসেবায় ব্যবহার করার মাধ্যমে। আমাদের সামর্থ্য বা প্রতিভা কীরকম তা বিচার করার দরকার নেই। ভগবান এতই কৃপালু যে, ভক্তিপূর্ণ হৃদয় দিয়ে করলেই তিনি তা গ্রহণ করেন।
ভগবদ্‌গীতায় সপ্তম অধ্যায়ের ৩৯ নং শ্লোকে বলা হয়েছে –“হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কদাচিৎ কোনো একজন সিদ্ধি লাভের জন্য যত্ন করেন, আর সেই প্রকার যত্নশীল সিদ্ধদের মধ্যে কদাচিৎ একজন আমাকে অর্থাৎ আমার ভগবৎ-স্বরূপকে তত্ত্বত অবগত হন।” হাজার হাজার লোকের মধ্যে কিছু লোক মাত্র ভগবানকে জানার জন্য প্রয়াসী হন। আমাদের সেই দলে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। বেদনানাশক ঔষধই যদি বেদনার কারণ হয় তখন কেন আরো কিছু বেদনানাশক ঔষধ গ্রহণ করে আমাদের বেদনাকে বাড়িয়ে তুলব? প্রকৃতপক্ষে এই কাজ আমরা বহুবার করেছি। অনেকেই বলে, ভাল খেলা হলেই হল ম্যাচ ফিক্সিং-টিক্সিং কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু যে খেলাটির জয়-পরাজয় ফিক্সড হয়ে আছে সেখানে ভালই বা কী থাকে? বরং আমরা ব্যাপারটিকে ধামাচাপা দিতে চাচ্ছি আর আশা করছি এটি (স্পট ফিক্সিং) আর হবে না। কিন্তু এটি হবেই। তখন অন্য কোনো অপকর্ম ভেসে উঠবে। প্রকৃতি আমাদের জোরপূর্বক স্বীকার করতে বাধ্য করছে কত বোকাই না আমরা। স্পট ফিক্সিং এড়িয়ে যাবার জন্য আমাদের সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। তাই যারা গীতার জ্ঞান গ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য গীতা প্রস্তুত তাদের এই জড় সমস্যা পরিত্রাণ করে বিকল্প উচ্চতর পারমার্থিক জ্ঞান দ্বারা প্রশান্তি বিধান করতে। এটি আমাদের প্রদর্শন করবে যে, আমরা কি রকম পারমার্থিক ও আদর্শিক ভিত্তিকে হারিয়ে ফেলেছি, আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটি আমাদের শেখায় আমরা কীভাবে গ্রন্থগুলোকে জীবনের কেন্দ্রে এনেই হারানো মানসিক পরিবেশের ভারসাম্য আনতে পারি। আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটি আমাদের দেখাবে যে, ভক্তির পথ থেকে দূরে থাকা মানে চির আনন্দের পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া, প্রকৃত সত্য হতে দূরে চলে যাওয়া যে ভাবে দূরে চলে যাচ্ছি IPL এর মেগা শোর বিনোদনে নিজেদের হারিয়ে।

 
 
 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here