ইস্‌কনের শিক্ষাধারার মূলকথা

0
165

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য


বেতার সাক্ষাৎকারী : স্বামীজী, আপনাদের শিক্ষাধারার মূল ভিত্তি কি?
শ্রীল প্রভুপাদ : এই শিক্ষাধারার মূল ভিত্তি হলো ‘ভগবদ্গীতা যথাযথ’। আমার এই গ্রন্থখানি আমি ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছি। গ্রন্থটি নতুন কিছু নয়। অতি প্রাচীন গ্রন্থ এটি। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন তো হবেই, আর সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে এর চর্চা অধ্যয়ন হয়ে থাকে। আপনাদের এই আমেরিকা মহাদেশেই তো আমি দেখেছি ইংরেজি ভাষায় গীতার বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে পঁচিশখানিরও বেশি। আর ঠিক তেমনি, জার্মান ভাষায় রয়েছে, ইংল্যান্ড, জাপানে সর্বত্র সারা দেশে এই গ্রন্থ অতি সুপরিচিত। ভগবদ্গীতা বলতে গেলে, এটি হলো কৃষ্ণভাবনামৃত। এই গ্রন্থটির প্রবক্তা হলেন শ্রীকৃষ্ণ, আর এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু হলো ভগবানের সাথে আমাদের কি সম্পর্ক। আর তারপরে, ভগবানের সাথে আমাদের কি সম্পর্ক সেটি জানা হয়ে যাবার পরেই আমরা সেইভাবে কাজকর্মে আত্মনিয়োগ করতে পারি। যেমন আপনারা হলেন আমেরিকার নাগরিক, রাষ্ট্রের সাথে আপনাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে আর সেই সম্পর্ক অনুসারেই আপনি এখানে কাজকর্ম করবেন সেটাই তো বাঞ্ছনীয়। আর তাহলেই আপনি হবেন সুনাগরিক, আইনকানুন মেনে চলা দেশবাসী, আর সেজন্য রাষ্ট্র থেকে আপনাকে সকল প্রকার নিরাপত্তা বিধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় আর তার ফলে জীবনের সর্বোচ্চ সার্থকতার পর্যায়ে আপনি উন্নতি লাভ করতে পারেন। সেভাবেই, আমরা যেন ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্কের স্বরূপ বুঝতে শিখি। যে ভগবানকে আমরা বলি, ‘শ্রীকৃষ্ণ’‘কৃষ্ণ’ মানে সর্বাকর্ষক। আর ‘শ্রীকৃষ্ণ’-ই হলেন ভগবানের সার্থক নাম। ভগবান যদি সর্বাকর্ষক না হন, তবে তিনি ভগবান হতেই পারেন না। ভগবান কখনো হিন্দুর ভগবান বা খ্রিস্টানদের ভগবান কিংবা ইহুদীদের ভগবান অথবা মুসলমানদের ভগবান হতে পারেন না। ভগবান সকলেরই জন্য, আর তিনি সর্বাকর্ষক। তিনি সর্ব ঐশ্বর্যময়, তিনি সম্যক জ্ঞানসম্পন্ন, সম্যক রূপবান, সম্যক ত্যাগী, সম্যক যশস্বী, সম্যক শৌর্যবান। এভাবেই তিনি সর্বাকর্ষক। তাই, ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্ক অবশ্যই জানা চাই। সেটাই এই ভগবদ্গীতা যথাযথ গ্রন্থখানির প্রাথমিক বিষয়বস্তু। আমাদের সম্পর্ক যথাযথভাবে বুঝে নেওয়ার পরে আমরা সেই মতো কাজ করতে পারি। বর্তমানে, আমাদের মধ্যে কিছু লোক, ভগবানকে মানে না তারা ‘ভগবান নেই’ বলে তাঁদের মধ্যে কিছু লোকের ভগবান সম্পর্কে অতি সামান্য ধারণা আছে “ভগবান মহান”, কিন্তু তারা বুঝতে চেষ্টা করে না যে, ভগবানের সাথে তাদের প্রকৃত সম্পর্ক কেমন। তারা এবিষয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। এভাবে, বস্তুত আমরা ভগবানের সাথে আমাদের চিরন্তন সম্পর্কের কথা এড়িয়ে চলি, আর তার ফলেই, যথাযথভাবে জীবনের কাজ আমরা করতেও পারি না। আর সেটিই হল যত দুঃখ-দুর্দশার কারণ। সেটিই সমস্ত সমস্যার কারণ। ঠিক যেমন, আপনারা যদি রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ঠিক ঠিক মতো না জানেন, তা হলে ঠিক মতো কাজকর্মও করতে পারেন না। সবসময়ে অন্যায় কাজের ভাগীদার হতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ, গাড়ি চালাতে যদি আপনি না জানেন, রাস্তার কোনদিকে চেপে চলতে হয়, না শেখেন, একবার ডানদিক, একবার বাঁদিক করতে থাকেন, আর ভাবতে থাকেন, আরে, এই তো বেশ গাড়ি চালাচ্ছি। ডানদিক বাঁদিক নিয়ে কী আসে যায়? কিন্তু না। আমেরিকায় ডানদিকে ছেড়ে যেই বাঁদিকে সরে যাবেন, অমনি আপনি আইন ভঙ্গকারী হয়ে যাবেন।
সেভাবেই, যেহেতু আমরা ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্ক ঠিকমতো জানি না, তাই আমরা ভ্রান্তভাবে সব কাজ করে চলেছি, আর সেই জন্যই ভগবানের আইনকানুন অনুসারে আমরা ক্রমেই অপরাধী হয়ে উঠছি, আর তাই আমাদের সমস্যার বোঝাও বেড়ে চলেছে। তাই শিক্ষা, বিজ্ঞান, সভ্যতা, পোশাক পরিচ্ছদ বাড়ি-গাড়ি এবং সব কিছুর এত প্রগতি হওয়া সত্ত্বেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। দেখেছেন? যেখানেই যান, কোনো ভদ্রলোকের বাড়িতে দেখবেন, ‘কুকুর আছে সাবধান’ বা ‘প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।’ সব সময়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস। একটা লোক আর একটা লোককে সন্দেহ করে। একটা সম্প্রদায় অন্য একটা সম্প্রদায়কে বিশ্বাস করতে চায় না। তাহলে কেমন করে পাবেন সুখ সমৃদ্ধি? সন্দেহবাতিকতা হলো পশুবৃত্তি। অন্য একটা কুকুর দেখলেই কুকুর মাত্রেই ঘেউ ঘেউ শুরু করে দেয়। সেটা কি মানুষের সভ্যতা? তা হলে মানব সভ্যতায় ত্রুটিটি কোথায়? মানব সভ্যতার ত্রুটি হলো এই যে, মানুষ ভুলে গেছে। ভগবানের সাথে তার সম্পর্ক।
তাই এখানে এই গীতা গ্রন্থে ভগবানের সাথে আমাদের সম্বন্ধ-সম্পর্কের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়া রয়েছে। আর তখন সেই সম্পর্ক অনুসারে। ঠিক ঐভাবেই, যেভাবে আপনাদের রাষ্ট্রে নাগরিক রক্ষার ক্ষেত্রে সুচারুভাবে সব কাজকর্ম করে চলতে হয়, সেভাবে কাজ করা দরকার। ঠিক এভাবে, আমরা যদি ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্ক বুঝতে পারি, তা হলে যথাযথভাবে কাজকর্ম করতে পারি আর সেটাই হয়ে ওঠে সুখময় জীবনধারা।
তা ছাড়া, এই জীবনটা, বর্তমান জীবনটাই সব কিছু নয়। মৃত্যুর পরেও আমাদের জীবন আছে। সেটা বাস্তব সত্য। ঠিক যেভাবে এই জীবনে আমরা অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা অনুসারে এগিয়ে চলেছি, এই বর্তমান জীবনে প্রথমে আপনি শিশু ছিলেন, আমি শিশু ছিলাম। আমাদের প্রত্যেকেই তো শিশু ছিলাম। সেটাই জীবনধারা। তারপর আমরা বালক হলাম। এরপরে আমরা যুবক হলাম। এখন আমরা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। আর, এইভাবেই সাধারণত আমাদের শরীরটা যখন অকেজো হয়ে পড়বে, আমাকে তখন অন্য একটা শরীর ধারণ করতে হবে। এইভাবেই চলছে।


 

চৈতন্য সন্দেশ ফেব্রুয়ারী ২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here