হস্তরেখা : ভাগ্য কি আপনার হাতেই?

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 95 বার দেখা হয়েছে

হস্তরেখা : ভাগ্য কি আপনার হাতেই?

চৈতন্য চরণ দাস:মহাভারতে, বিদুরধৃতরাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, “অদৃষ্ট নির্ধারণ করে আমাদের কর্মের ফলাফল, পক্ষান্তরে আমাদের কর্মসমূহকে নির্ধারণ করে না”। এর অর্থ আমরা রোবটের মত নয় যে,আমাদের কোন স্বাধীন ইচ্ছা থাকবে না, কোন পছন্দ থাকবে না। আমাদের অতীত কর্ম নির্ধারণ করে যে, আমাদের জীবনে কি ঘটবে, কিন্তু এটি নির্ধারণ করে না যে, কিভাবে আমরা এর প্রতিক্রিয়া করব।অদৃষ্ট অনেকটা কোন ভ্রমন প্রসঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাষের মত। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ আমাদেরকে বলতে পারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমনের সময় এটি রোদ্রময় কিংবা বৃষ্টিময় হতে যাচ্ছে। কিন্তু পূর্বাভাষ এটি নির্ধারণ করে দেয় না যে, ভ্রমনের সে সময়ে আমাদের কি করতে হবে?গন্তব্যের ক্ষেত্রে আমাদের ভাবনার স্তরভিত্তিক দুটি বিদ্যা রয়েছে যাদের একটি হল ‘কর্মবাদ’ এবং অন্যটি ‘দৈববাদ’। ‘কর্মবাদ’ মানে, “আমার কর্ম দিয়েই আমি সফল হব।” এক্ষেত্রে বহির্জগতের দিকে তাকালে দেখা যায় অনেকই কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু সবাই সফল হয় না, অতএব, ‘কর্মবাদ’ মানে হল সবকিছুই আমার কাজের উপর নির্ভর করে ঠিকই কিন্তু এক পর্যায়ে হতাশা ডেকে আনে। অনেক সময় আমরা পড়ালেখায় অনেক পরিশ্রম করি। তা সত্ত্বেও ভালো ফলাফল পাই না, তখন খুব মন খারাপ করি। কিন্তু সৎভাবে চিন্তা করলে দেখব পরীক্ষার পূর্বমুহূর্তে যতটা মনযোগ দিয়ে পড়েছি আগে সেভাবে পড়া মার্কস্ও পাওয়া হয়নি। তাই কর্মের আইন উভয় প্রেক্ষাপট থেকে কাজ করে।অপরপক্ষে, ‘দৈববাদ’ মানে “সবকিছু অদৃষ্ট দ্বারা নির্ধারিত”। কোন ব্যক্তির শক্তি নেই তা পাল্টানোর।
প্রকৃত বৈদিক উপলব্ধি হচ্ছে, সকল কর্মের ফলাফল নির্ভর করে এই জন্মের এবং পূর্ব কর্মের প্রতিক্রিয়ার উপর। জন্মের উদাহরণস্বরূপ-জমিতে বীজ বপন এবং জমি চাষ হল কৃষকের কর্মের উপর। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টি হবে কি হবে না সেটি হল ‘দৈব’। জমিতে শুধুমাত্র বীজ বপন এবং চাষের মাধ্যমেই ফসল ফলে না। যদি না পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হয়। তাই বৈদিক শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে যে, আপনাকে কর্ম করতে হবে। কারণ যদি আমরা এখনই কর্ম করি তবে ফলটি দৈব অনুসারে পাব। তাই কোন কর্তব্য সম্পাদনে অনুৎসাহিত হওয়ার কারণ নেই।কেউ যদি ভালো কর্ম করে তবে তাকে এই জড়জগতে অবস্থান করতে হবে তার ফল উপভোগের জন্য। যেমন-কেউ দরিদ্র সংস্থাকে বিনামূল্যে জলের ব্যবস্থা করে দেয় তবে সেটি নিঃসন্দেহে ভালো কর্ম। কিন্তু সেই কর্মফলের জন্য তাকে আবার মৃত্যুর পর এ জড়জগতে এমন স্থানে পাঠানো হবে যেখানে সে কোনদিন জলের অভাবে কষ্ট পাবে না। তার জন্ম হয়ত সেরকম কোন জলাশয় বা নদীর পাশে হবে। যদি কেউ দরিদ্রদের বই-খাতা বিতরণ করে তখন পরবর্তী জন্মে সে কোন ছাপাখানার মালিক হতে পারে। কিন্তু এ জড় জগতে জন্ম নেয়া মানে হল বৃদ্ধ হওয়া, রোগে শোকে কষ্ট পাওয়া ত্রিতাপ দুঃখ কষ্ট ভোগ করা এবং মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি।তাই ভালো কর্মের মাধ্যমেও আমরা এ জড় জগৎকে অতিক্রম করতে পারি না। কেননা এসমস্ত ভালো কর্ম ভগবৎ কর্ম নয়। যতদিন পর্যন্ত আমরা ভগবানকে ভুলে থাকি ততদিন আমরা এ জড়জগতে অবস্থান করি। তাই জড়জগতের দুঃখদুর্দশাকে অতিক্রম করার জন্য ভগবদ্ভক্তিই হল প্রকৃত উপায়।

ভক্তির মাধ্যমে অদৃষ্টের সমাধান


ভগবৎ নির্দেশিত কর্মের মাধ্যমে আমাদের অনেক আশীর্বাদ বর্ষিত হয়। তা নিম্নে দেয়া হল:-

১। ভুল ও সঠিকের পার্থক্য: যখন আমরা ভগবদ্ভক্তি অনুশীলন করি তখন ভগবান পরমাত্মা হিসেবে হৃদয় থেকে ভালোটি বাছাইয়ের জন্য জ্ঞান দান করেন। আমরা অনেক সময় হৃদয় থেকে এরকম নির্দেশ শ্রবণ করি, যাকে বলা হয় ‘বিবেক-বুদ্ধি’। যখন আমরা কোন ভুল করতে যাই তখন ভিতর থেকে সতর্কবার্তা আসে “এটি করো না”। আবার ভালো করলে বিবেক বা পরমাত্মা বলে, “হ্যাঁ, এটি করো”। তাই যখন আমরা কৃষ্ণের পবিত্র নাম জপ করি, ভক্তিমূলক সেবা করি, তখন ভেতরের এই বিবেক শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং জীবনের ভালো-মন্দ যাচাইয়ের মাধ্যমে কর্ম করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

২। ভাল অনুসরণ এবং খারাপ বর্জনের প্রতি দৃঢ়তা : ভক্তিমূলক সেবা খারাপ কর্ম করা থেকে রক্ষা করে। হরিনাম জপ কীর্তনের মাধ্যমে হৃদয়ে যে সন্তুষ্টি অর্জিত হয় তা যেকোন খারাপ কর্মকে ‘না’ বলতে সাহায্য করে। আবার ভালো কর্মের প্রতি ইচ্ছাশক্তি অর্জনে সহায়তা করে।

৩। পাপময় কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত করা : ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের ফলে পূর্বের সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়াকে ক্ষুদ্র দুর্দশারূপে ভক্তদের দেয়। এটি এজন্যই দেয়, ভক্তরা যাতে বুঝে, এ জড়জগত অত্যন্ত দুঃখে পরিপূর্ণ।

৪। দুঃখগুলোকে মোকাবেলার জন্য আভ্যন্তরীণ শক্তি : ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের ফলে সমস্ত দুঃখদুর্দশাকে সহ্য করার শক্তি অর্জিত হয়। তাই কৃষ্ণের আরেক নাম ‘করুনা-নিধি’। আমাদের আচার্যগণ এ বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত দেন যে, যদি শিশু পড়া না শিখে স্কুলে যায় তখন সে নিশ্চিত শিক্ষকের নিকট থেকে শাস্তি পাবে। কিন্তু মা চায় না তার সন্তান শাস্তি পাক। পক্ষান্তরে তিনি চান তার সন্তান শৃঙ্খল হোক। ঠিক একইভাবে ভগবৎ ভক্তদের জন্য কৃষ্ণ দিয়েছে তার পবিত্র নাম যার মাধ্যমে তারা শক্তি পায়। যদিও অনেক সময় বাহ্যিকভাবে তাদেরকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে কিন্তু হৃদয়ের অভ্যন্তরে সে নিত্য আনন্দময় ভগবান কৃষ্ণকে স্মরণের মাধ্যমে সর্বদা চিন্ময় আনন্দে মেতে থাকে। তাই হস্তরেখা বা কপাল যেখানেই অদৃষ্ট বা ভাগ্য লেখা থাকুক না কেন একমাত্র ভগদ্ভক্তিই কর্মফলসমূহকে সমূলে ধ্বংস করতে পারে। হরে কৃষ্ণ।

[লেখক পরিচিতি:

চৈতন্য চরণ দাস ইলেক্ট্রনিক্স এবং টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে ইস্কন পুনেতে ব্রহ্মচারী হিসেবে ভগবানের সেবা করছেন।]

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।