কৃষ্ণভাবনায় নারীরা

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২:১৫ অপরাহ্ণ

এই পোস্টটি 7 বার দেখা হয়েছে

কৃষ্ণভাবনায় নারীরা

কৃষ্ণভাবনায় নারীরা– বিশাখা দেবী দাসী রচেস্টার ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির একজন গ্র্যাজুয়েট, একজন পেশাধারী আলোকচিত্রশিল্পী এবং ফটোমাইক্রোগ্রাফির একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি এবং তার স্বামীও পেশাধারী ফটোগ্রাফার। সম্প্রতি তারা কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উপর এক ডকুমেন্টারী ফিল্ম তৈরির জন্য সারা বিশ্ব ভ্রমন করছেন কৃষ্ণভাবনামৃতে নারীদের ভূমিকা ও অংশগ্রহণ বিষয়ে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার নেয়া হলে তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে এবং শ্রীল প্রভুপাদের শিক্ষা থেকে বিস্তারিত তুলে ধরেন। ব্যাক-টু-গডহেড পরবর্তীতে তার সেই সাক্ষাতকারটি প্রকাশ করে। নিচে সেই সাক্ষাতকারটির বঙ্গানুবাদ প্রদত্ত হল।

প্রশ্ন: কেন নারীদের কৃষ্ণভাবনায় আগ্রহী হওয়া উচিত?
উত্তর: যদি আমরা আমাদেরকে নারী হিসেবে চিন্তা করি তবে সেক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের উচিত প্রকৃত পরিচয়ের অনুসন্ধান করা। ‘নারী’ শব্দটি উল্লেখ করে একটি ক্ষণস্থায়ী জড় শরীরকে। এটি দেহের মধ্যে অবস্থিত শাশ্বত চিন্ময় আত্মাকে নির্দেশ করে না। হয়ত চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর পর এই দেহটির বিনাশ হবে এবং তখন নারী হিসেবে আর থাকব না। কিন্তু চিন্ময় আত্মা যে দেহের মধ্যে বিরাজমান তার বিনাশ হবে না। কৃষ্ণভাবনা আমাদেরকে এই উপলব্ধি প্রদান করে যে, চেতন আত্মা, পরমাত্মা ও জড় দেহের মধ্যে পার্থক্য কি? মনুষ্য বুদ্ধির প্রয়োগ সাধন করা উচিত এই পার্থক্য সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য। পক্ষান্তরে ক্ষণস্থায়ী জড় ভাবনায় নিয়োজিত হওয়া উচিত নয়।

প্রশ্ন: নারীর স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে আপনি কি মনে করেন?
উত্তর: সর্বোচ্চ স্বাধীনতা হল ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া এবং অদ্ভুত জন্ম, মৃত্যু বা জরা ব্যাধির সম্মুখে আর কখনো ফিরে না আসা। যদিও নারীর মুক্তি আন্দোলন কিছু প্রস্তাবনা প্রদান করে যা সাধারণত এই সর্বোচ্চ লক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার মাধ্যমে একজন নারী এই জীবন এবং পরবর্তী জীবনেও স্বাধীন; তাই কৃষ্ণভাবনা হল প্রকৃত নারী স্বাধীনতা আন্দোলন।

প্রশ্ন: কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে নারী ভক্তদের অবস্থান কোথায়?
উত্তর: পারমার্থিক প্রেক্ষাপট থেকে নারী এবং পুরুষ (এবং সমস্ত জীব) হল সমান। জড় দেহের মধ্যে অবস্থিত যে আত্মা তা হল কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অন্য সব আত্মার মতই গুণগত এবং পরিমাণগতভাবে সমান। কিন্তু জাগতিক, দেহগত প্রেক্ষাপট থেকে এর সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

প্রশ্ন: সে পার্থক্যগুলো কি কি?
উত্তর: কৃষ্ণসেবা এবং কৃষ্ণভাবনা প্রচারের ক্ষেত্রে জাগতিক পার্থক্যগুলো অগ্রাহ্য করা হয়। নারী পুরুষ উভয়ই মন্দিরে ভগবানের বিগ্রহের সেবা করে, পূজা করে, মন্দির পরিস্কার করে, ভগবানের জন্য রান্না করে এবং তারা আগ্রহী লোকদের মাঝে প্রচারের জন্য প্রতিদিন বের হয় এবং কৃষ্ণভাবনা সম্বন্ধীয় সাহিত্য বিতরণ করে। যাদের সন্তান রয়েছে তারা তাদের প্রতিও যত্ন নেয়। আসলে, ভগবানের ভক্ত হিসেবে একটি সন্তানকে লালন পালন করে গড়ে তোলাটাও একটি বড় কৃষ্ণসেবা হিসাবে পরিগণিত।

প্রশ্নঃ কিন্তু আমি শুনেছি যে, আপনি নাকি মনে করেন যে, নারীরা পুরুষের চেয়ে অধস্তন (inferior) এটি কি সত্য?
উত্তর: আমি আগেই উল্লেখ করেছি, পারমার্থিক প্রেক্ষাপট থেকে এখানে কোন ভেদাভেদ নেই। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যদি তার শরণাগত হয় তবে নারী ও পুরুষ উভয়ই উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনে ভগবৎ ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য যোগ্য। পারমার্থিক প্রেক্ষাপট থেকে দেহ ও মনের উপর ভিত্তি করে কোন উচ্চতর কিংবা নিম্নতর বা অধস্তন এরকম কোন দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু এখানে জড় পার্থক্য রয়েছে। নারীরা সাধারণত শারীরিকভাবে পুরুষের মত শক্তিশালী নয়। পক্ষান্তরে শুধুমাত্র নারীরাই সন্তান প্রসব করতে পারে এবং সন্তানদের বুকের দুধ দিতে পারে। তাই স্বাভাবিকভাবে নারীরা পুরুষের থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন। নারী পুরুষের অধস্তন, পুরুষ নারীর অধস্তন এসব অহেতুক তর্কে না গিয়ে উভয়ে উভয়ের পরিপূরক বললেই তর্ক বন্ধ হয়ে যায়। কারণ নারীকে নারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। পুরুষকে পুরুষের ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন পুরুষ চাইলেও মা হতে পারবে না। এসব ভগবানই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

প্রশ্ন: আজকাল অনেক লোক এ ব্যাপারটি অগ্রাহ্য করে। এটি নারীদের মাঝে আপনার আন্দোলনকে খুব একটা জনপ্রিয় করবে না।
উত্তর: জনপ্রিয় করার জন্য আমরা কৃষ্ণভাবনার দর্শনকে পরিবর্তন করতে পারি না। আমরা জনপ্রিয়তা বিবেচনা করি না। আমরা শুধুমাত্র কৃষ্ণের শিক্ষাগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে চাই এবং যারা এগুলো মেনে চলবে তারাই উপকৃত হবে। পারমার্থিক উপলব্ধির প্রথম পদক্ষেপটি হল দেহগত ধারণার উর্ধ্বে গমন করা। “আমি পুরুষ” অথবা, “আমি নারী” এরুপ চিন্তা করাটাই মায়া। এই দেহটি হল আত্মার জন্য একটি জড় পোশাক মাত্র। যেটি প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মৃত্যুতে এর অবসান হবে। কিন্তু আত্মা সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে এটি জন্ম মৃত্যু ইত্যাদি জড় প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত নয়।

প্রশ্ন: কৃষ্ণভাবনায় নারী এবং পুরুষ কিভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়?
উত্তর: শুধুমাত্র তার স্ত্রী ব্যতিত একজন কৃষ্ণভাবনায় পুরুষ প্রত্যেক নারীদের তার মাতা হিসেবে শ্রদ্ধা করা উচিত। তাই কৃষ্ণভাবনাময় নারী এবং পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক কামের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয় বরং কৃষ্ণকে কেন্দ্রে রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি এই প্রকার মানসিকতা সকলের না থাকে তবে নারী-পুরুষ অবাধে মেলামেশা করবে এবং তাদের সম্পর্ক খুব সহজেই অনৈতিক কার্যকলাপের দিকে ধাবিত হবে এবং পরস্পরের সমূহ ক্ষতিসাধন ঘটবে।

প্রশ্ন: আরো অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিরুপ ঘটে?
উত্তর: আরো অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষ নারীদের প্রতিরক্ষা দেয়। নারীরা যুবতী অবস্থায় তার স্বামীর অধীনে থাকবে; এবং পরে তার বার্ধক্যের সময় সন্তান তার প্রতিরক্ষা দেয়।

প্রশ্ন: ‘প্রতিরক্ষা’ বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?
উত্তর: ‘প্রতিরক্ষা’ বলতে মায়া এবং কোন খারাপ পরিস্থিতিতে যাতে জড়িয়ে না পরে তার জন্য সুরক্ষা প্রদান করা। সেটিই হল প্রকৃত সুরক্ষা। যখন পিতা, স্বামী এবং পুত্র কোন পারমার্থিক গুরুর কাজ থেকে পারমার্থিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের পরিচালনা করার জন্য যোগ্য হয়। ভগবদ্গীতায় এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যখন পরিবারে ধর্মীয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য ভেঙে যায় তখন নারীদের চারিত্রিক সততা বা সতীত্ব এবং বিশ্বস্ততা নড়বড়ে হয়ে যায়, যখন নারী ও পুরুষ অবাধে মেলামেশা করে তখন তার ফলে গর্ভপাত এবং অবাঞ্চিত সন্তানাদি সৃষ্টি ইত্যাদি ঘটে। তাদের কুকর্মজনিত দোষের ফলে সর্বপ্রকার উন্নয়ন প্রকল্প এবং বংশের কল্যাণ ধর্ম উৎসন্নে যায়।

প্রশ্ন: কিন্তু যদি নারীরা শুধুমাত্র একজন স্ত্রীর ভূমিকা ছাড়া আরও বেশী কিছু চায়?
উত্তর : তখন তাদের স্বাগতম। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে নারীরা গান গায়, রান্না করে, লেখে, ছবি তোলে, ছবি আঁকে,অভিনয় করে, ভাস্কর্য তৈরি করে, শিক্ষা দেয়, নৃত্য করে ইত্যাদি। পশ্চিম ভার্জিনিয়া ফার্ম কমিউনিটিতে আমার এক গুরুবোন আছে যিনি একজন আর্কিটেক্ট। এখন তিনি সেখানে একটি বিশাল মন্দির তৈরি করতে সাহায্য করছেন। তাই যারা কৃষ্ণসেবার জন্য তাদের বিশেষ প্রতিভা ব্যবহার করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই স্বাগতম।

প্রশ্ন:নারীরা কি নেত্রী হতে পারে?
উত্তর: প্রকৃত নেতৃত্ব হল জীবন অবসানের পর ভগবদ্ধামে যাওয়ার শিক্ষা প্রদান করা। একজন পূর্ণরুপে কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত, সে নারী বা পুরুষ যাই হোক না কেন, আধুনিক সমাজের তথাকথিত নেতা-নেত্রীদের চেয়েও বিশেষ কিছু। জাগতিক নেতারা শুধুমাত্র আমাদের জাগতিক সমস্যাগুলোই বৃদ্ধি করে; পক্ষান্তরে একজন ভক্ত সেই সমস্যাগুলোকে কমিয়ে শূন্যে নিয়ে আসে। এটিই হল প্রকৃত নেতৃত্ব। হরে কৃষ্ণ।

আগস্ট-২০১১ইং

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।