এই পোস্টটি 4 বার দেখা হয়েছে
যমুনা নদীর মধ্যে এক হৃদ ছিল, ভীষণ সর্প কালীয় সেই হৃদে বাস করত। তার ভয়ঙ্কর বিষের প্রভাবে চারদিক এত বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল যে, সেখান থেকে চব্বিশ ঘন্টা বিষবাষ্প উত্থিত হত। সেই হৃদের উপর দিয়ে যখন কোন পাখিও উড়ে যেত, সেই বিষের প্রভাবে সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হত। এই বিষাক্ত বাষ্পের প্রভাবে যমুনার তীরবর্তী সমস্ত গাছপালা এবং ঘাস শুকিয়ে গিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ সেই ভীষণ সর্পের বিষের প্রভাব দর্শন করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বৃন্দাবনের সামনে দিয়ে যমুনা, তার সমস্ত জল বিষাক্ত হয়ে গেছে। বয়ে চলেছে যে সমস্ত দুষ্কৃতকারীদের হত্যা করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন যে-কৃষ্ণ, তিনি তৎক্ষণাৎ যমুনার তীরবর্তী একটি মস্ত বড় কদম্ব বৃক্ষ আরোহণ করলেন। সেই গাছের একেবারে উপরে উঠে তিনি তাঁর ধুতিটাকে ভাল করে কষে কোমরে বেঁধে নিলেন। একজন কুস্তিগীরের মতো হাত দিয়ে বাহুতে আঘাত করতে করতে সেই অতি উচ্চ বৃক্ষ থেকে তিনি বিষময় হৃদে ঝাঁপ দিলেন। যে কদম্ব বৃক্ষটি থেকে শ্রীকৃষ্ণ ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সেইটি ছিল সেখানে একমাত্র বৃক্ষ যা তখনও মরে যায়নি। কোন কোন ভাষ্যকার বলেন যে, শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের স্পর্শ লাভকরার ফলে বৃক্ষটি তৎক্ষণাৎ পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। অন্য কোনও পুরাণে বলা হয়েছে যে, বিষ্ণুর বাহন গরুড় জানতেন যে, ভবিষ্যতে শ্রীকৃষ্ণ এভাবে লীলাবিলাস করবেন। তাই সেই গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি তাতে কিছু অমৃত ঢেলে দিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়লেন, তখন নদীর জল দু’কূল ছাপিয়ে উঠল, যেন বিরাট বড় কিছু তাতে পতিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে এই শক্তি প্রদর্শন মোটেই অস্বাভাবিক নয়, কেননা তিনিই হচ্ছেন সমস্ত শক্তির উৎস।
শ্রীকৃষ্ণ যখন এক বিশাল মত্ত হস্তীর মত প্রচণ্ড শব্দ করতে করতে সেই জলে সাঁতার কাটতে লাগলেন, ভয়ঙ্কর কালীয় সর্প তা শুনতে পেল। সেই প্রচণ্ড শব্দ তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল এবং সে বুঝতে পারল যে, কেউ তার গৃহ আক্রমণ করার আয়োজন করছে। সে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে বেরিয়ে এসে শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখীন হল। কৃষ্ণ দু’ঘন্টা ধরে কালীয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি সাধারণ শিশুর মতো সেখানে পড়ে রইলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে, তাঁর মা, বাবা, গোপিকা, গোপশিশু, গাভী আদি সমস্ত গোকুলের অধিবাসীরা মৃতবৎ হয়ে পড়েছেন এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোন আশ্রয় তাঁদের নেই, তিনি তখন নিজেকে সেই সর্পের বন্ধন থেকে মুক্ত করলেন। তিনি তাঁর দেহটিকে বর্ধিত করতে লাগলেন এবং সর্পটি যখন তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করল, তখন সে প্রচণ্ড ভার অনুভব করল। সেই ভারের ফলে তার অঙ্গ শিথিল হয়ে গেল এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তার বন্ধন থেকে মুক্ত করা ছাড়া আর কোনও উপায় রইল না। কালীয় তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল এবং সে তার ফণা বিস্তার করল। কিন্তু কৃষ্ণ এত দ্রুতগতিতে তার চারদিকে ঘুরতে লাগলেন যে,কৃষ্ণকে দংশন করার সমস্ত চেষ্টা তার ব্যর্থ হল।কৃষ্ণ তখন সেই সর্পের ফণার উপর লাফিয়ে উঠলেন। সেই সর্পের মাথার সমস্ত মণিমাণিক্যের দ্যুতিতে কৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম রক্তিম হয়ে উঠল। তারপর সমস্ত শিল্পকলার আদি শিল্পী শ্রীকৃষ্ণ সেই সাপের মাথার উপর নাচতে লাগলেন। তা দেখে স্বর্গের দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন এবং নানা রকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে স্তব করতে লাগলেন। কৃষ্ণ যখন কালীয়ের মাথার উপরে নাচছিলেন, কালীয় তখন তার অন্য ফণা দিয়ে তাঁকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কালীয়ের মাথায় প্রায় একশ ফণা ছিল, কিন্তু কৃষ্ণ তার সেই সমস্ত ফণাগুলিকে দমন করলেন। তিনি তাঁর শ্রীপাদপদ্ম দিয়ে কালীয়ের মাথায় আঘাত করতে লাগলেন। কালীয়ের পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব হল না।
কালীয়ের পত্নীরা দেখল যে, যার গর্ভে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড বিরাজ করে, সেই পরমেশ্বর ভগবানের পদাঘাতে তাদের পতির প্রাণান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই নাগপত্নীরা তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্তব করতে শুরু করল। আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। আপনি হচ্ছেন সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এবং আপনিই আবার সেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা। আপনি এই ব্রহ্মাণ্ডের অধ্যক্ষ ও পালনকর্তা এবং আপনিই হচ্ছে তার আদি কারণ। আপনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, যিনি পরম জ্ঞান প্রদান করতে পারেন। আপনি কৃপা করে কালীয়কে ক্ষমা করে দিন, কেননা যদি এর মৃত্যু হয়, তাহলে আমাদের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। আমাদের মুখ চেয়ে কৃপা করে আপনি এই মহা অপরাধীকে ক্ষমা করুন। কালীয় এবং তার পত্নীদের প্রতি ভগবান প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাঁর আদেশ শ্রবণ করা মাত্রই নাগপত্নীরা দিব্য বস্ত্র, মাল্য রত্ন, উত্তম ভূষণ, দিব্য গন্ধানুলেপন এবং উত্তম উৎপল মালার দ্বারা গরুড্রপতি জগনাথের পূজা করে তাঁর প্রসন্নতা উৎপাদনপূর্বক প্রীত এবং তাঁর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে প্রদক্ষিণ ও অভিবাদন করে স্ত্রী, আত্মীয় ও পুত্রসহ সমুদ্রের মধ্যবর্তী রমনক দ্বীপে গমন করল। তখনই মানব শিশুরূপে লীলাবিলাসপরায়ণ ভগবানের অনুগ্রহে সেই যমুনার জল বিষহীন হয়ে অমৃত-তুল্য হল। বেদের ভৌগলিক বর্ণনা অনুসারে কালীয় নাগ এখন ফিজিতে রয়েছেন তথ্য মতে ফিজির অধিবাসীরা মহাসমুদ্রে মাঝে মাঝে একটি বৃহৎ কালো সর্পের দর্শন পান। হরে কৃষ্ণ।
আগস্ট-২০১১ইং
