সন্তান জন্মদান ও প্রতিপালন (পর্ব-১)

0
17

যথার্থ পন্থায় কিভাবে সন্তান জন্মদান করতে হয় সে বিষয়ে অনেকেরই অজানা। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সন্তান জন্মদান এবং তৎসূত্রে মাতার পরিচর্যা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে, যা প্রতিটি বিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য জীবনের পাথেয় স্বরূপ।

পদ্মনাভ দাস

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে শিশুরোগ চিকিৎসা (কৌমার ভৃত্য) সংক্রান্ত একটি শাখা রয়েছে, যেটি জন্মের পূর্বে ও পরে শিশুর যত্নগ্রহণ এবং সে সাথে গর্ভধারণের পূর্বে ও গর্ভাবস্থায় মায়ের যত্ন গ্রহণ প্রসঙ্গে শিক্ষা প্রদান করে। এতে আরও বর্ণিত হয়েছে, কিভাবে পিতা-মাতা আকাঙ্ক্ষিত শিশু সন্তান লাভ করতে পারে এবং সে সাথে শিশুটির বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক গঠন সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিভাবে পিতা-মাতা শিশুটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ করা যায় সে প্রসঙ্গেও শিক্ষা প্রদান করে।
শিশুর সুস্বাস্থ্য মানে হলো তার শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যতা। শরীর ও মন পরস্পর সম্পর্কিত। যখন কারো মন অবাস্তব উদ্বিগ্নতার দ্বারা বিক্ষুব্ধ হয় তখন শিশুটার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অক্ষমতা, কিংবা শিশুটি দীর্ঘকালীন অসুস্থ হতে পারে। সেই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাসমূহ মনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই মানসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনাহীন দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যাসমূহ নিরসনের উদ্যোগ শুধুমাত্র অস্থায়ী সমাধানই নিয়ে আসে।
শিশুর যথাযথ মানসিক উন্নয়নের জন্য, শিশুর পিতাকে অবশ্যই যথাযথ স্নেহশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝি হয় যে, ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ত্যাগ করার অর্থ হলো শিশুর প্রতি কোনো স্নেহ ভালোবাসা প্রদর্শন না করা। আমি দুঃখের সহিত এরকম কিছু পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছি যে, কিছু ভক্ত এভাবে নিজেদের জন্য তো বটে তাদের পরিবারে জন্যও কিছু কঠিন পরিস্থিতির অবতারণা করেছে, কেননা তারা ত্যাগ বা বৈরাগ্যের সর্বশেষ স্তরটি অর্জনের প্রয়াস করেছিল। তারা কৃত্রিমভাবে আত্মার স্বাভাবিক আবেগময় শক্তিকে দমিয়ে রেখেছিল।
একটি আদর্শ আয়ুর্বেদ শাস্ত্রগ্রন্থ চক্রসংহিতায় বর্ণিত হয়েছে যে, গর্ভধারনের সময় পিতা-মাতার চেতনা কিভাবে শিশুটির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। সেই শাস্ত্রানুসারে, শিশুর চেতনা চারটি বিষয়ের মাধ্যমে সমভাবে নির্ধারিত হয়। সেগুলো হলো:
১. শিশুটির পূর্বজীবনের কর্ম।
২. পূর্ব জীবন থেকে এখনও বর্তমান তার কামনা বাসনাসমূহ।
৩. গর্ভধারনের সময়কালীন পিতা-মাতার চেতনা।
৪. দ্বিতীয় শব্দতরঙ্গ যেটি গর্ভাবস্থার নয় মাস সময়কালীনে শিশুটি শ্রবণ করে। পিতা-মাতার বোঝা উচিত, যে শিশুটি জন্ম নিতে যাচ্ছে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই তাদের চেতনারই প্রকাশ, বিশেষত এটি গর্ভধারনের সময়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্টি বিধানের প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবারে নতুন সদস্যের আগমনের জন্য দম্পতিদ্বয়ের সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। এজন্যে বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে শিশুর প্রতি পিতা মাতার দায়িত্ব কর্তব্য শুরু হয় গর্ভধারনের পূর্ব থেকেই পিতার এসব দায়িত্ব-কর্তব্যসমূহ সম্পাদিত হয় ভিন্ন ভিন্ন কার্যাবলী সম্পাদনের মাধ্যমে যেটিকে বলা হয় সংস্কার।
ইসকনের মধ্যে নৈমিত্তিক ভক্তি অনুশীলন রয়েছে যেটিকে বলা হয় সাধনা। এটি কারো চেতনাকে ঊর্ধ্বস্তরে উন্নীত করতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে গর্ভধারনের ক্ষেত্রে কৃষ্ণের প্রীতিবিধানমূলক যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য বিশেষ বিশেষ কর্তব্য রয়েছে। যেমন শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর গৃহস্থ শিষ্য ও শিষ্যাদের বলেছিলেন যে, একটি শিশুকে গর্ভধারনের (Conceive) প্রয়াসের পূর্বে ন্যূনতম ৫০ মালা হরিনাম জপ করতে।

টেবিল-১
গর্ভাবস্থায় যে সমস্ত জিনিষ পরিহার করতে হবে

১. ঔষধ-শিশুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
২. ভিটামিন- শিশুর দেহ অত্যধিক বড় হয়ে উঠবে, ফলশ্রুতিতে সিজার করার আশংকা বৃদ্ধি পায়।
৩. অতিরিক্ত নিদ্রা কর্মহীনতা – শিশুটি মন্দ অলস প্রকৃতির হবে।
৪. প্রাকৃতিক ডাক দমিয়ে রাখা-শুধু মল-মূত্র ত্যাগই নয়, হাঁচি, হাই তোলা ইত্যাদি দমিয়ে রাখার ফলে ভাট রোগ হবে।
৫. অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করা
৬. আরামবিহীন আসনে বসা
৭. কঠিন অনুশীলন করা
৮. অতিরিক্ত মিষ্টি গ্রহণ করা- এতে শিশু দুর্বল কিডনির অধিকারী হবে।
৯. অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ- শিশুর চুল কম বয়সে ধূসর হয়ে উঠবে।
১০. অতিরিক্ত টক গ্রহণ- শিশুর সহজেই রক্তক্ষরণ হবে।
১১. অতিরিক্ত কটু গন্ধ গ্রহণ- শিশুটি দুর্বল হয়ে উঠতে পারে।
১২. অতিরিক্ত তেঁতো জিনিস গ্রহণ- শিশুটি ক্ষীণকায় হবে।
১৩. অতিরিক্ত ঔষধি লতা-গুল্ম গ্রহণ- শিশুটির কোষ্ঠকাঠিন্য হবে।
১৪. গভীর কূপের মধ্যে তাকানো।
১৫. ঝাঁকুনি হয় এমন গাড়িতে চড়া।
১৬. খোলা বাতাসে ঘুমানো- ভূত-প্রেত দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে এবং শিশুটি উন্মাদ বা বিকৃত মস্তিষ্কের (Insane) হয়ে উঠবে।
১৮. শুধু পিঠের ওপর ভর করে ঘুমানো-নাভিরজ্জু পাকানো হবে।
১৯. শারীরিক কষ্ট প্রদান- শিশুটি মৃগীরোগী(Epileptie) হবে।
২০. মৈথুন করা- শিশুটি নির্লজ্জ হয়ে উঠবে এবং নারীদের বশীভূত বা অধীন (Subjugated) হয়ে থাকে।
২১. বিষণ্ন থাকা- শিশুটি ভীতু হয়ে উঠতে পারে।
২২. অন্যের অনিষ্ঠতা চিন্তা করা- শিশুটি অসামাজিক এবং ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে।
২৩. চুরি করা- শিশুটি হিংস্র (Fierce), প্রবঞ্চক (deceitful) এবং ঈর্ষাপরায়ণ হবে।
২৪. অ্যালকোহল গ্রহণ- শিশুটি চঞ্চল প্রকৃতির হবে এবং সর্বদা তৃষ্ণার্ত হবে।
কোনো দম্পতি যদি পুত্র কিংবা কন্যা সন্তান লাভ করতে চায় তবে তারা আয়ুর্বেদিক নিয়ম-নীতিসমূহ অনুসরণ করতে পারে। শ্রীমদ্ভাগবতে (৬/১/৫৪) এক তাৎপর্যে শ্রীল প্রভুপাদ ঋগ্‌বেদ শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন যে, মৈথুনের সময় যদি মাতার স্রাব (Secretions) পিতার থেকে অধিক হয়, তা হলে সন্তান স্ত্রীদেহ প্রাপ্ত হয় এবং পিতার স্রাব যদি মাতার থেকে অধিক হয় তা হলে সন্তান পুরুষ শরীর প্রাপ্ত হয়। পুরুষ স্রাব বর্ধিত করতে একজন পুরুষ মিষ্টি, চর্বি, টকজাতীয় ও লবনাক্ত খাবার গ্রহণ করতে পারে এবং তখন তার শরীরে কফ বর্ধিত হয়। যদি একজন নারী তেতো মসলাদার বা ঝাল জাতীয় খাবার গ্রহণ করে তবে সেগুলো মৈথুন তরল পদার্থ হ্রাস পাওয়ার মাধ্যমে তার শরীরকে শুষ্ক করে দেয়। উপবাস থাকার মাধ্যমেও এটি করা যেতে পারে। পুত্র বা কন্যা সন্তান গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু দিন অধিক সুবিধাপ্রদ। চন্দ্র দশার নির্দিষ্ট কিছু দিন গর্ভধারনের জন্য নিষিদ্ধ। এর কারণ কিছু বিশেষ দিনে তাদের শরীর দুর্বল থাকে।
টেবিল-২ এ প্রদত্ত তালিকা সতর্কতার সহিত পর্যবেক্ষণ করুন।
প্রথম তালিকাটি শুরু হয় রজঃস্রাবের সূত্রপাত দিয়ে এবং তাই তা প্রত্যেক দম্পতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন হয়। দ্বিতীয় তালিকাটি শুরু হয় পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যা দিয়ে এবং তাই এটি সার্বজনীন।
গর্ভধারনের জন্য নারীদের পিঠের ওপর ভর করে শোয়া উচিত, কেননা অন্যভাবে শুয়ে থাকলে তিনটি দোষকে বিক্ষুব্ধ করতে পারে। সূর্যাস্তের পর গর্ভধারণ সত্ত্বগুণ সম্পন্ন।
শব্দতরঙ্গ বলতে উল্লেখ করা হয় সে সমস্ত শব্দগুলোকে যেগুলো মা জাগ্রত অবস্থায় শ্রবণ করে থাকে। গর্ভাবস্থায়, তার উচিত পারমার্থিক শব্দ শ্রবণ ও জপ-কীর্তন বৃদ্ধি করা এবং বিশেষত বেশি বেশি উচ্চস্বরে পারমার্থিক শাস্ত্র অধ্যয়ন করা। এ সমস্ত অপ্রাকৃত শব্দতরঙ্গ শিশুর জন্য খুব মঙ্গলদায়ক। চক্রসংহিতা অনুসারে মাতা তার শিশুর মধ্যে যেসমস্ত গুণাবলী প্রকাশিত হোক কামনা করে থাকেন, সে সমস্ত লোকদের কথা মানসিকভাবে চিন্তা করতে পারেন। তাকে তাদের খাবারও গ্রহণ করা উচিত এবং তাদের পোশাক পরিচ্ছদ অবলম্বন করা উচিত।
শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে বৈকুণ্ঠ সংস্কৃতি প্রদান করেছেন, যেখানে শাড়ি ও ধুতি পরিধান, কৃষ্ণপ্রসাদ আস্বাদন এবং কৃষ্ণকথা শ্রবণের মাধ্যমে আমরা আগত আত্মার জন্মগ্রহণের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছি। একজন দম্পতি কোনো মহান চিন্ময় ব্যক্তির রূপ ও কার্যাবলী সম্পর্কেও ধ্যান করতে পারেন এবং তা দ্বারা গর্ভের শিশুটিকে একটি পবিত্র জীবন লাভের জন্য প্রস্তুত করতে পারেন।
একজন গর্ভবতী নারীর সে সমস্ত কিছু বর্জন করা উচিত, যেগুলো ভাট দোষের সঙ্গে সম্বন্ধীয় কিংবা তমো ও রজো গুণের মতো নিম্নগুণ সম্বন্ধীয়। ভূত প্রেতদের প্রবেশের আশংকাকে এড়িয়ে চলতে, গর্ভবতী নারীকে উদ্দেশ্য করে চেঁচামেচি, প্রহার, উঁচু নিচু স্থানে চড়া, গভীর কুপের দিকে তাকানো, বাইরে খোলা মাঠে নিদ্রা যাপন করা উচিত নয়। তার মিথ্যা কথা বলা অথবা অন্য কারো সম্পর্কে মন্দ বাক্য বলাও উচিত নয়। কেননা এই বিষয়গুলো তখন গর্ভের শিশুর ওপর প্রতিফলিত হবে। কোনো গর্ভবতী নারীর মৈথুন করা নিষিদ্ধ কেননা সেটি পুত্র শিশুটিকে কোনো নারীর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলবে।
তাকে খাদ্য গ্রহণের প্রতি সতর্ক থাকা উচিত। তাকে হালকা অথচ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। গর্ভকালীন সময়ে, শারীরিকভাবে সবচেয়ে বড় বিপদ আসতে পারে ভাট দোষের বর্ধিতকরণ থেকে।
ভাট দোষ গঠিত হয় বায়ু ও ইথারের সমন্বয়ে। তাই, বিশেষত জন্মের পূর্বে শরীরকে অতিরিক্ত শুষ্ক হওয়া থেকে সুরক্ষা রাখা উচিত। যদি শরীর অতিরিক্ত শুষ্ক বা শক্ত থাকে, তখন মা ও শিশু সন্তানের জন্য জন্মদানের ব্যাপারটি অনেক দুরূহ হবে। শরীরে কোনো শুষ্কতার লক্ষণ দেখা দিলেই তা অনতিবিলম্বেই চিকিৎসা করা উচিত।
এক্ষেত্রে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ হলো শুষ্ক চামড়া বা শুষ্ক ঠোঁট। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্যতাও আভ্যন্তরীণ শুষ্কতার একটি লক্ষণ।
শরীরের এই শুষ্কতা প্রতিরোধ করা যেতে পারে একটি সুষম খাবারের মাধ্যমে যেটি কফ বর্ধিত করে, সেটি হলো তরল পদার্থের সাথে চর্বিযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত লবণ এবং টক জাতীয় খাবার।
গর্ভকালীন সময়ে, মায়ের শরীরে হরমোন উৎপাদনে পরিবর্তন ঘটে, যেটি তার শরীর ও চেতনায় প্রভাব বিস্তার করে।

টেবিল-২
গর্ভধারনের ওপর সংযোজিত কিছু বিষয়

১ম মাস: শুধু দুধ এবং সেটি রান্না হয়নি এমন। এই মাসে ভ্রুণের মাথাটি বেড়ে উঠে।
২য় মাস: মিষ্টি ঔষধ লতাগুলোর (মধুরা রস, কমফ্রে ইত্যাদি) সঙ্গে সেদ্ধ করা দুধ। এই মাসে ভ্রূণের হাত ও পা বেড়ে উঠে।
৩য় মাস: মধু ও ঘি এর সাথে দুধ। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য ঘি এবং মধু পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হতে হবে, সমপরিমানের হলে এটি বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। এই মাসে ভ্রুণের নখ, চুল ও জননাঙ্গ (Genitals) গঠিত হয় ।
৪র্থ মাস: মাখনের সাথে দুধ, এই মাসে ভ্রুণের রক্ত, মাংস, হাঁড়, মজ্জা, চামড়া ও শুক্র-ধারক বীর্য গঠিত হয় ।
৫ম মাস: মাখন থেকে তৈরি ঘি, শিশু এই মাসে নড়াচড়া করতে শুরু করে।
৬ষ্ঠ মাস: মিষ্টি ঔষধ লতাগুল্মের সঙ্গে ঘি, লতাগুল্ম থেকে একটি কড়া চা তৈরি করে তারপর ঘি দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করতে হবে, যতক্ষণ না সমস্ত পানি উধাও হয়।
৭ম মাস: ৬ষ্ঠ মাসের মতোই, যে সমস্ত জিনিস ভাটকে বিক্ষুব্ধ করে সেগুলো পরিহার করার জন্য সতর্ক থাকুন। যেমন: শুকনো শাক, আলু, তেতো খাবার, মানসিক চাপ, দুঃশ্চিন্তা, দূরবর্তীস্থানে ভ্রমণ। কোষ্ঠকাঠিন্য (পেট খালি করা বা মলত্যাগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা) গড়ে উঠতে দিবেন না।
প্রয়োজন হলে শরীর শুষ্ক হওয়া থেকে রক্ষা করতে তেলের সাথে একটি ডুশ (Enema) (এক প্রকার তরল যেটি মলদ্বার দিয়ে শরীরে প্রবেশ করানো হয়) গ্রহণ করতে পারেন।
৮ম মাস: পুডিং (দুধ ও শস্য সম্বলিত, কিন্তু মধু ব্যবহার করবেন না)।
৯ম মাস: ৮ম মাসের মতোই, সে সাথে তেল সম্বলিত ডুশও গ্রহণ করুন। এটি শুধু কোষ্ঠকাঠিন্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে তাই নয়, সে সাথে আভ্যন্তরীন আর্দ্রতাও প্রাপ্ত হয় এবং জন্ম নির্গমন পন্থাকে (Birth canal) নরম ও নমনীয় রাখে। তেলে সিক্ত একটি তুলা মুছাও ঐকই উদ্দেশ্যে জননাঙ্গে রাখতে পারেন।সকালের অসুস্থতার জন্য রাতে প্রসাদ গ্রহণ করুন। সান্ধ্যকালীন অসুস্থতার জন্য সকালে প্রসাদ গ্রহণ করুন। ঋতুস্রাবের সময় থেকে নিন্মোক্ত দিনগুলো সুপারিশকৃত: ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৪, ১৫, বিজোড় দিনগুলো কন্যা সন্তান পরিচর্যার জন্য এবং জোড় দিনগুলো পুত্র সন্তান পরিচর্যার জন্য । বৈদিক জ্যেতির্বিদ্যা অনুসারে পুত্রের জন্য চন্দ্র পুংলিঙ্গ চিহ্ন সূচক হওয়া উচিত। (যেমন: মেষ, মিথুন, সিংহ, তুলা, ধনু ও কুম্ভ রাশি জাতক)।
চন্দ্ৰ পঞ্জিকা (Lunar calender) অনুসারে নিম্নোক্ত দিনগুলো অনুমোদিত নয়:
পূর্ণিমা, অমাবস্যা, অষ্টমী, একাদশী, চতুর্দশী। এ দিনগুলোতে শরীর স্বভাবতই দুর্বল থাকে এবং শিশুকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করবে।
ঐ সময় পিতার সহনশীল হওয়া উচিত। যেমন তেল পূর্ণ একটি পাত্র বহন করার সময় যেরকম সাবধান থাকা উচিত। তেমনি সতর্কভাবে একজন গর্ভবতী নারীর সাথেও আচরণ করা উচিত।
এজন্যে গর্ভবতী নারীর মনকে শান্ত রাখতে, ঐ সময় তার সমস্ত ভক্তি অনুকূল বাসনা যথাসম্ভব পূর্ণ করা উচিত। মায়ের কার্যকলাপ শিশুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যদি মাতা প্রায়ই শয্যায় শুয়ে থাকে আর নিদ্রা যাপন করে তবে শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর অলস প্রকৃতির হবে। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্ম করা উচিত। এক্ষেত্রে সাধারণ জ্ঞানের অবশ্যই প্রয়োগ ঘটাতে হবে যে, কতক্ষণ তার বিশ্রাম প্রয়োজন, বিশেষত গর্ভাবস্থার শেষের দিকে।
উল্লেখ্য, সাধারণত একজন গর্ভবতী নারীর আবেগ প্রবল হয়ে উঠে। তাই, মাঝে মাঝে তারা কোনো ছোটখাটো কারণে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্রন্দন করে। এটি কিন্তু দমিয়ে রাখা উচিত নয়, কেননা এটি একটি স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি। শরীর এই প্রক্রিয়ায় আমাদের টক্সিনগুলো ছুঁড়ে দেয়।
গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মাসে মায়ের যে সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত সে বিষয়ে টেবিল-২ এ তালিকাভুক্ত করা হলো। এই তালিকাটি একচেটিয়া নয়, বিশেষ মাসে এই প্রস্তুতিগুলোর ওপর জোড় দেয়া উচিত।
গর্ভকালীন সময়ে দুধ এবং দুগ্ধ জাতীয় দ্রব্য বিশেষভাবে উপকারী। দুধ তালিকার অন্যান্য খাবারের শক্তি বৃদ্ধি করে। দুধ রক্তকে বিশুদ্ধ করে এবং বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি বর্ধিত করে। দুধ একটি রসায়নও, এটি এমন একটি খাদ্য যা যৌবনদীপ্ত মনোবল এবং নমনীয়তা বজায় রাখে।
যদি দুধ হজমের ক্ষেত্রে মায়ের কোনো জটিলতা থাকে তবে এর সঙ্গে মসলা জাতীয় দ্রব্য যেমন-আদা, দারুচিনি বা এলাচ যোগ করা যেতে পারে। এই মসলাসমূহ শ্লেষ্মা (mucus) কমিয়ে দেয়।
বৈষ্ণব ঐতিহ্য অনুসারে জন্মের দু’দিন পূর্বে তাকে কীর্তনের মাঝে রাখা হয়, মাকে তখন একটি ছোট কুড়েঘরে নেওয়া হয় যেখানে সন্তান জন্মদানের পর অপবিত্র বা অবিশুদ্ধ সময়ে শেষ না হওয়ার আছা পর্যন্ত তাকে আরো দশ দিন রাখা হয়।
লংকাগুঁড়ার সাথে ঘি এর মিশ্রন মায়ের জন্য প্রস্তুত রাখা উচিত। জন্মদানের ঠিক পরপরই শরীরে গর্ভের কারণে মায়ের শরীরে ভাট গোলযোগের বিপদ থাকে। যদি তার পেটে এই মিশ্রন দ্বারা মর্দন (massage) করা হয়, তখন সেটি ভাট বৃদ্ধির ব্যাপারটি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করবে।
যখন তার কিছু ক্ষুধা প্রবৃত্তি হবে, তখন প্রথম যে জিনিসটি তার গ্রহণ করা উচিত সেটি হলো সামান্য একটু আদা মিশ্রিত ঘি এবং এটি ভাটকেও নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি খাওয়ার পর তিনি তার স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করতে পারেন।
যদি মায়ের দুধ উৎপাদন স্বাভাবিক না থাকে, তবে তিনি মসলা জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে পারেন, অন্যথা মসলা জাতীয় খাবার তার পরিহার করা উচিত। মসলা ব্যবহার করা হয় হজম বৃদ্ধি করতে। কিন্তু হজমের পর শরীরে একটি শীতল প্রভাব থাকা উচিত। তিনটি মসলা সুপারিশ করা হয় সেগুলো হলো মৌরি (Fennel), জিরা এবং ধনিয়া, যেগুলো এমনকি পিত্ত সমস্যার জন্য ঔষধ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিশু সন্তানের জন্য আমাদের ৫টি দ্রব্য প্রয়োজন, সেগুলো হলো: এক জোড়া পাথর, ঘি, তিলতৈল, জল ও একটি রৌপ্য বা স্বর্ণচামচ। এই জিনিসগুলো শিশুটিকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রয়োজন, কারণ জন্মের ধকলটি তাকে দুর্বল করে দেয়।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here